সেজান মাহমুদ

দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে পৃথিবীর আরো অনেকের মতো আমারও এক ধরনের ’অবসেশন’ আছে। এই অসাধারণ মানুষটির আত্নত্যাগ, নেতৃত্ব আমাকে শুধু মুগ্ধই করেনা, জীবনের অনেক ক্ষেত্রে প্রেরণাও জোগায়। ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম এমন এক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে, যেখানে নিজ দেশে কালো মানুষেরা ক্রীতদাসের মতো নিগৃত, অত্যাচারিত ছিল। স্কুল বয়সেই ছাত্র-নেতৃত্বে অংশগ্রহনের দায়ে বরখাস্ত হন তিনি। তারপর থেকে ক্রমাগত সংগ্রামের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিকামী মানুষের প্রিয় নেতা, তথা সমগ্র পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের প্রিয় নেতায় পরিণত হন তিনি। ১৯৬২ সালে বর্ণবাদী শাদাদের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার বিনাঅনুমতিতে দেশত্যাগের দায়ে তাকে অভিযুক্ত করে। সেই মামলায় নিজের পক্ষে নিজেই আইনজীবীর ভূমিকা পালন করেন নেলসেন ম্যান্ডেলা। প্রহসনের সেই মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে কালো মানুষদের মুক্তির আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল বর্ণবাদী শাসকেরা। দীর্ঘ প্রায় আটাশ বছর কারাবন্দী ছিলেন তিনি। বহুবার নানা শর্ত দিয়ে মুক্তির লোভ দেখিয়েছে শাষকের দল। নিজের অপরিসীম দূর্ভোগের মধ্যেও মাথা নত করেন নি তিনি, বরং বিপ্লবী স্পর্ধায় উত্তরে বলেছেন অসাধারণ সেই উক্তিঃ

“ওনলি আ ফ্রি ম্যান ক্যান নেগোশিয়েট”

১৯৮৮ সাল। সারা পৃথিবীব্যাপী নেলসন ম্যান্ডেলার সত্তরতম জন্মবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ চলছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি তখন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সারাদেশ থেকে নেলসন ম্যান্ডেলার নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এর উদ্যোগে এক লক্ষ স্বাক্ষর সংগ্রহের এক আন্দোলনের সঙ্গে আমিও জড়িয়ে গেলাম। এই উপলক্ষে ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। আমার ইচ্ছা নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে লেখা কোন গান শিল্পীদের দিয়ে গাওয়ানো। কিন্তু কোথাও কোন গান খুঁজে না পেয়ে নিজেই দুটো গান লিখে ফেললাম। তখন আমি সবেমাত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনে গান লেখা শুরু করেছি। সেই সূত্র ধরে বেশ কয়েকজন কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। সামিনা চৌধুরী আমার প্রিয় শিল্পীদের একজন এবং ভালো বন্ধুও বটে। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে গাইবার সম্মতি দিলেন। সামিনার গাওয়া ’নেলসন ম্যান্ডেলা, তুমি সবল দুটি হাতে লোহার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছো’ সেই গানটির সুর করলেন নকিব খান। দ্বিতীয় গানটি গাইবার জন্য বললাম গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীরকে। তিনিও এক কথায় রাজী হলেন। কিন্তু তার জন্য লেখা ’কালো কালো মানুষের দেশে’ গানটির তখনও সুর দেয়া হয়নি, এদিকে সময়ও কম। আমি নিজেই গানটিতে সুর দিয়ে পৌছে দিলাম তার কাছে। সেদিন মিটফোর্ডের হল ভর্তি মানুষকে মুগ্ধ করলেন এই শিল্পীদ্বয়, নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবীতে সংগৃহীত হলো অসংখ্য সাক্ষর। সামিনা যদিও তার গানটি আর অন্য কোন মাধ্যমে গাননি, কিন্তু ফকির আলমগীর মিটফোর্ডের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা একাডেমী বই মেলা, জনতার মঞ্চ ছাড়িয়ে সারাবিশ্বে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে পৌছে দিলেন গানটিকে। এমনকী গানটির একটি ক্যাসেট খোদ নেলসন ম্যান্ডেলাকেও পৌছে দেয়া হয়েছিল।

ছবি. নেলসন ম্যান্ডেলা, ছবির কপিরাইট: Paddle8

সেই নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা যাবার সুযোগ এলো এই ঘটনার ঠিক বারো বছর পর, ২০০০ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে বিশ্ব এইডস সম্মেলনে আমার গবেষণাপত্র উপস্থাপনের আমন্ত্রণ এলো। এই আমন্ত্রণ আমার জন্য ত্রিমুখী আনন্দের উৎস বলা যেতে পারে।

প্রথমতঃ এই এইডস সম্মেলনের সমাপ্তিদিনে প্রধান অতিথি স্বয়ং নেলসন ম্যান্ডেলা, তাঁকে কাছে থেকে দেখবার সূবর্ণ সুযোগ।

দ্বিতীয়তঃ আমেরিকার একটি স্টেস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতার চাকরি গ্রহণের পর এটাই আমার প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাওয়া।

তৃতীয়তঃ আমার স্ত্রী যিনি পেশায় চিকিৎসক এবং নেশায় নাট্যকর্মী, চাকরির কারণে প্রায় দেড় বছর পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, সে-ও বাংলাদেশ থেকে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য ইউ এন ডি পি’র স্কলারশিপ নিয়ে এই সম্মেলনে আসবে। যেহেতু এই সম্মেলনের বিশেষ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে আলাদা লেখার ইচ্ছে আছে তাই শুধু নেলসন ম্যান্ডেলার দেহরক্ষী প্রধানের বিষয়টিতেই কেন্দ্রীভূত থাকবো।

ভারত মহাসাগরের তীর ঘেঁষা অপূর্ব সুন্দর শহর ডারবান। মাত্র কয়েক বছর আগেও এখানে শাদাদের অত্যাচারে শৃঙ্খলিত কালো মানুষের আর্তনাদ শোনা যেতো, মুখ থুবরে পরে থাকতো মানবিক মূল্যবোধ। আজ সেখানে কালো মানুষেরা ক্ষমতার শীর্ষে। নেলসন ম্যান্ডেলা যদিও এখন আর প্রেসিডেন্ট পদে নেই, কিন্তু এখনও তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে সন্মানিত এবং ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। এই ডারবান শহরে সারা পৃথিবী থেকে সতের হাজার লোক একত্রিত হয়েছে এইডস সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য। এক অভূতপূর্ব মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হলো এই ডারবান শহর। একদিন আমার এক অনুজপ্রতিম ডাঃ মুনির হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানালো সম্মেলনের কাছেই এক হোটেল কক্ষে নেলসন ম্যান্ডেলার সাংবাদিক সম্মেলন হবে। দু’জনেই ছুটে গেলাম সেই হোটেলের কাছে। গিয়ে জানতে পারলাম এক অঙ্গাত কারণে সাংবাদিক সম্মেলন বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এইডস সম্মেলনের হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে কখন নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে দেখা হবে বা হতে পারে। একদিন লক্ষ করলাম দু’জন স্যুট কোট পরা কেতাদূরস্ত ভদ্রলোক সম্মেলন কেন্দ্রের আশে পাশে ঘুর ঘুর করছে। তাদের পেটানো শরীর, চোখের সার্বক্ষণিক সানগ্লাস, কানের পাশে প্যাচানো তার থেকেই বুঝতে পারি এরা সিকিউরিটির লোক। এদের মধ্যে একজন কালো। আমি তার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করি। সে জানায় যে সম্মেলনের সমাপণীদিনের জন্য আগাম সিকিউরিটি চেক করছে তারা। আমি একথায় সেকথায় নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে আমার গান লেখার কথা বলি, ভদ্রলোকও উৎসাহের সঙ্গে আমার সাথে আলাপ করেন। একসময় বলেন “ইউ লুক লাইক আ জার্নালিস্ট, আর ইউ লুকিং ফর স্টোরিজ?“। আমিও সহাস্যে সম্মতির মাথা নাড়ি। তিনি বলেন ’তুমি কি ররি স্টেইন এর নামে শুনেছো’? বললাম ’না’  তারপর তিনি ররি স্টেইন এর গল্প বললেনঃ

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ররি স্টেইন শাদা পুলিশ বাহিনীর ইন্টেলিজেনস ব্রাঞ্চ এবং ‘বোম্ব ডিস্পোজাল’ শাখার একজন সদস্য ছিলো। গণ আন্দোলনের বিজয়ের পর নেলসন ম্যান্ডেলা যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট পদে আসীন, ১৯৯৬ সালে ররি স্টেইন তখন নিযুক্ত হন নেলসন মেন্ডেলার দেহরক্ষী বাহিনী ’প্রেসিডেনশিয়াল প্রোটেকশন ইউনিট’ -এর প্রধান হিসেবে। নিযুক্তির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নেলসন মেন্ডেলার কাছে একটি গোপন ফাইল আসে, তাতে লেখা এই ররি স্টেইন শুধু শাদা বাহিনীর সাধারণ পুলিশ অফিসারই ছিলো না, নেলসন ম্যান্ডেলার সমর্থক ‘সাউথ আফ্রিকান কাউন্সিল অব চার্চেস’ এর হেডকোর্য়ারটার ‘খোস্টো হাউস’-এ ৮৮ সালে বোমা হামলার সংগেও জড়িত ছিল। শুধু তাই নয়, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অনেক নেতা কর্মীদের নির্যাতনের সাথেও সে জড়িত ছিলো। একথা শোনার পর স্বয়ং ররি মনে করেছিলো যে তাকে আর নেলসন মেন্ডেলার দেহরক্ষী বাহিনীতে রাখা তো হবেই না, উপরন্তু তাকে শাস্তি দেয়া হতে পারে। একদিন নেলসন মেন্ডেলার কক্ষে ডাক পড়লো। ররি ভাবলো এই বুঝি বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠলো।

কিন্তু বাস্তবে হলো অন্যরকম। নেলসন ম্যান্ডেলা তাকে ডেকে ’স্পিরিট অব নিউ সাউথ আফ্রিকা ’-র কথা বললেন। তাঁর মহানুভবতায় ররির মাথা নুয়ে আসে। তার ভাষায়, ‘আই উড, ইফ নেসেসারি, লে ডাউন মাই লাইফ ফর দিস ম্যান’. অর্থাৎ প্রয়োজন হলে এই মানুষটির জন্য প্রাণ দিতেও কুণ্ঠিত হবো না। এক সময়ের রেসিস্ট ররি স্টেইন শেষ সময় পর্যন্ত নেলসন মেন্ডেলার দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ররি তার এই কাহিনী লিপিবব্ধ করেছেন সাউথ আফ্রিকার একজন সাংবাদিকের কলমে, যার একটি কপিও সংগ্রহ করার হদিস পেলাম এই সিকিউরিটি অফিসারের কাছে। এভাবে মানুষের মন জয় করার কারণে নেলসন মেন্ডেলাকে স্থানীয় অধিবাসীরা বলতো ‘মাডিবা ম্যান্ডেলা’  আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একবার নেলসন ম্যান্ডেলাকে বামঘেঁষা দেশগুলোর সঙ্গে বেশী বন্ধুত্বের জন্য অভিযোগ করেছিলেন। জবাবে নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন,

’যখন আমরা বুটের নিচে নির্যাতিত হচ্ছিলাম, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? আমরা তো পুরনো বন্ধুদের ভুলতে পারি না’  

একথার পর আমেরিকার দৈনিকগুলোতে খবর ছাপা হয়েছিল এই বলে যে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টের মুখের ওপর একথা বলার সাহস পৃথিবীর একজন নেতারই আছে তিনি নেলসন মেন্ডেলা। অথচ এবছর নেলসন মেন্ডেলা যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য রাখার পর আমেরিকার কোন একজন পদস্থ ব্যক্তি বলেছিলেন ‘হু ইজ ম্যান্ডেলা?’।  কে বলেছিলো এই কথা, আমি আমেরিকায় বাস করেও মনে রাখার প্রয়োজনবোধ করিনি। অথচ নেলসন মেন্ডেলার কথা মনে থাকবে আজীবন, এখানেই তাঁর সাফল্য। নেলসন মেন্ডেলাকে নিয়ে লেখা আমার পুরো গানটির কথা তুলে দেবার লোভ সামলাতে পারছি নাঃ

‘কালো কালো মানুষের দেশে, ঐ কালো মাটিতে

রক্তের স্রোতের সামিল

নেলসন মেন্ডেলা তুমি অমর কবিতার অন্তমিল

তোমার চোখেতে দেখি স্বপ্ন-মিছিল

অগুন্তি মানুষের হূদয়ের মিল।।

শৃঙ্খল শিখিয়েছে শৃঙ্খল ভেঙ্গে দিতে আজ

রক্তের উষ্ণতা, মুক্তির মন্ত্রনা বিপ্লবী শ্রমিকের হাতুরির দৃঢ় কারুকাজ

কারাগার ভেঙ্গে আসে প্রতিবাদী এক গাংচিল।।

মৃত্যুর দরজায় করাঘাত করে আসে যুদ্ধ

বিপ্লব আসবেই আফ্রিকা হাসবেই, অগনিত কালো হাত পৃথিবীকে করবেই শুদ্ধ

মেঘের আকাশ হবে পতাকায় শোভিত সুনীল।।

শুভ হোক তোমার জন্ম দিনশুভ হোক তোমার মুক্তির দিন।।

এই গানের অনেক কিছুই সত্যি হয়েছে। এই গান লেখার দু’বছর পরেই নেলসন ম্যান্ডেলা মুক্তি পেয়েছিলেন কারাগার থেকে, আফ্রিকা হয়েছে শৃঙ্খলমুক্ত। এ গানের প্রতিটি অক্ষরই সত্যি হোক, পৃথিবী হোক শুদ্ধ, শোভিত সুনীল।

নোট: সাপ্তাহিক যায়যায়দিন এ পূর্বপ্রকাশিত