অর্পিতা রায়চৌধুরী

“অত্যন্ত স্বার্থের খাতিরে যে দেশ, যেদিন থেকে কেবল (মেয়েদের) সতীত্বটাকেই বড় করে দেখেছে তার মনুষ্যত্বের খেয়াল করেনি, তার দেনা আগে তাকে শেষ করতেই হবে।

… সতীত্বকে আমিও তুচ্ছ বলি নে, কিন্তু একেই তার নারী জীবনের চরম ও পরম শ্রেয়ঃ জ্ঞানকরাকেও কুসংস্কার মনে করি। কারণ, মানুষের মানুষ হবার যে স্বাভাবিক এবং সত্যকার দাবী, একে ফাঁকি দিয়ে যে কেউ যে কোন একটা কিছুকে বড় করে খাড়া করতে গেছে, সে তাকেও ঠকিয়েছে নিজেও ঠকেছে।”

– শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (স্বরাজ সাধনায় নারী)

বিবাহিতা হিন্দু নারীরা বিশেষত বাঙালি হিন্দু নারীরা, অতি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেন যে, তাঁদের স্বামী যতোদিন জীবিত থাকবেন ততদিন সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-নোয়া ইত্যাদি পরা উচিত। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন প্রথা চালু আছে। এগুলি তাঁদের সধবা থাকার সৌভাগ্যের লক্ষণ। বিবাহিত হিন্দু পুরুষদের অবশ্য তাদের স্ত্রী বেঁচে থাকা অব্দি এভাবে শরীরে কোন চিহ্ন ধারণ করতে হয় না। পৃথিবীর আর কোন বড় ধর্মের কয়েক কোটি বিবাহিত নারী-পুরুষকে এভাবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়না, তথা নারীদের শরীরে এভাবে দাগা মেরে দেওয়া হয় না। ব্যতিক্রম হিসেবে অবশ্য কোন কোন আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহিতা নারীদের মধ্যে সমগোত্রীয় কিছু প্রথা আছে এবং ভারতীয় উপমহাদেশীয় অঞ্চলে হিন্দুদের দেখাদেখি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কিছু বিবাহিতাও এমন সিঁদুর পরা, ইত্যাদি অনুসরণ করেন। কিন্তু তা সংখ্যায় অগণ্য।

বিয়ের পর এভাবে হিন্দু মেয়েদের চিহ্নিত করার মধ্যে অতি সাধারণ বিচারেই বোঝা যায় যৌক্তিকতা বিশেষ, নেই। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, বিবাহিতা নারীদের এভাবে চিহ্নিত করার ফলে ব্যভিচারী পুরুষের লালসা ও অত্যাচার থেকে তাঁদের বাঁচানো যায়। এইসব পুরুষরা অন্তত এটি ভেবে একটু থমকে যাবে যে, ওই নারীকে রক্ষা করার মত একজন পুরুষ আছে। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান এভাবে করার চেষ্টা করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত এ ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। ব্যভিচারী পুরুষ গায়ের জোরে বিবাহিত-অবিবাহিত সব নারীকেই নিছক ভোগ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করে। এ ব্যাপারে এ ধরনের জন্তুরা কোন বাছবিচারের ধার ধারে না। সুযোগ পেলেই তারা তাদের পাশবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার চেষ্টা করে। ধারে কেউ না থাকলে বা জানাজানি হওয়ার ভয় না থাকলেতো কথাই নেই। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করেই গায়ের জোর প্রয়োগ করে হিংস্রভাবে যৌনতৃপ্তি লাভ করতেও তারা পিছপা হয় না।

প্রায় সব বয়সের পুরুষদের দ্বারা নিতান্তই শিশু বা বালিকার উপরও যৌন উৎপীড়ন করার খবর প্রায়ই শোনা যায়। ভারতে কলকাতার এক প্রৌঢ় ট্রাম-কর্মচারী তার সহকমীর সাড়ে তিন-চার বছরের মেয়েকে আদর করার নামে যৌনাঙ্গ ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছে- এমন নিষ্ঠুর ও ঘৃণ্য ঘটনা সংবাদপত্রের পাতায় আমরা পড়েছি তরুণ-যুবক আত্মীয়ের দ্বারা এমনভাবে কচি মেয়ের উপর যৌন অত্যাচারের ঘটনাও মাঝে মাঝে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশেও সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, ৮ মাসের শিশুও ধর্ষণের শিকার। অন্যদিকে বিবাহিতা বহু নারীই যে এদেশে ধর্ষিতা হন তার নিয়মিত সংবাদ প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ থেকে জানা যায়। যে সব পুরুষরা এমন ধর্ষণ করেছে তারা প্রায় সব ক্ষেত্রেই জানে যে, এ নারী বিবাহিতা, এমনকী সন্তানের মা-ও। সিঁদুর দিয়ে বিবাহিতা হিসেবে ঘোষণা করলেও যা, না করলেও তাই। মুসলিম বা খ্রিস্টান বিবাহিতা নারীরা যেমন ধর্ষণ বা যৌন নিগ্রহের শিকার হন, তেমনি হিন্দু নারীর ‘পবিত্র’ সিঁদুর হিন্দু নারীদেরও রক্ষা করে না।

ইয়োরোপ আমেরিকার মত দেশে নারীদের উপর এমন যৌন নিপীড়ন আমাদের দেশের চেয়ে যথেষ্ট বেশি। কিন্তু এর কারণ সিঁদুর না পরা নয়। ব্যাপারটার মধ্যে কিছু সামাজিক অবস্থা, মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল কাজ করে। এখন আধুনিকীকরণ, নগরায়ণ ইত্যাদির ফলে এ সব দেশের মত ধর্ষণাদির ঘটনা আমাদের দেশেও বাড়ছে- যদিও,আগে কোনদিন একেবারেই ছিল না, তা কখনো নয়। সব মিলিয়ে এটি বাস্তব ঘটনা, শরীরে বিবাহিতার চিহ্ন থাকাটা যৌন নিপীড়ন কমানো বা বন্ধ করার কোন ফলপ্রসূ উপায় মোটেই নয়।

যৌন উচ্ছৃঙ্খল পুরুষের বিকৃতি সিঁদুর বা এ ধরনের চিহ্নের তোয়াক্কা করে না। সিঁদুরের মত চিহ্ন থাকলে বিবাহিতা কোন নারীকে ভালবেসে ফেলা বা বিয়ে করে পাওয়ার আকাঙ্খা ভিন্ন পুরুষের মধ্যে কমে আসে- এটিও অনেকে মনে করেন। এর পেছনে আদৌ বাস্তবতা নেই- তা নয়। কোন নারীকে ভাল লাগলে কোন পুরুষ প্রেম নিবেদনের চেষ্টা করতেই পারেন। কিন্তু এ নারী বিবাহিতা জানলে এ প্রচেষ্টা অঙ্কুরেই সাধারণত নষ্ট হয়, নেহাৎ নাছোড়বান্দা কিছু প্রেমিকের ক্ষেত্র ছাড়া। এক্ষেত্রে সিঁথিতে সিঁদুর হোক বা গলায় মঙ্গলসূত্র কিংবা আঙুলে বিয়ের আংটিই হোক- কাজ কিছুটা করেই। এ প্রেমিক প্রবরকে নারীটিকে অবিবাহিতা জেনে বেশিদূর এগিয়ে যাওয়ার করুণ পরিস্থিতি থেকে তা রক্ষা করে। তবে ব্যাপারটি পুরুষদের ক্ষেত্রেও সত্য। কোন পুরুষ বিবাহিত কীনা বুঝতে না পেরে অনেক মেয়েও ভালবাসতে পারে। বিবাহিত হলে এক সময় তার আশাভঙ্গ হয়।

সিঁদুর পরা দেখে বিবাহিতা কীনা যেমন চট করে বুঝে ফেলা যায়, কোন বিবাহিত পুরুষকে দেখে তা সম্ভব নয়। তাই মেয়েদের ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করতে হয়। ‘বাড়িতে কে কে আছে’, কিংবা সরাসরিই বিয়ে হয়েছে কীনা জিজ্ঞেস করতে হয় লজ্জার মাথা খেয়ে। তাই দাগা যদি মারতে হয় তবে বিয়ের পর নারীপুরুষ উভয়ের শরীরেই মারা উচিত। তা না করে শুধু মেয়েদেরকে একজনের স্ত্রী (তথা সম্পত্তি) হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া, আর পুরুষদের কলির কেষ্টর মতো বাজারে ছেড়ে রাখার মধ্যে কোন যৌক্তিকতা নেই। তবে এখন অনেক চপলচিত্ত আধুনিক বিবাহিতারা অন্যের সঙ্গে প্রেমপ্রেম খেলার জন্য সিঁদুর পড়েন না, তথা নিজের বিবাহিতা পরিচিতিটিকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন না।

কিন্তু এঁদের সংখ্যা সমচরিত্রের পুরুষদের চেয়ে অনেক কম এবং যেসব বিবাহিতারা সিঁদুর ব্যবহার করেন না তাঁদের বড় অংশের মধ্যে সিঁদুর দিয়ে নিজেকে দাগিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহও কাজ করে। অন্য দিকে বিবাহিত পুরুষদের অনেকেই নিজের অচিহ্নিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিয়ে করে এবং একাধিক নারীকে প্রতারিত করে। তবে এটি সত্য যে, এই ধরনের কিছু ঘটনা সমাজে আলোড়ন তুললেও এমন পুরুষের সংখ্যা তুলনায় খুবই নগণ্য। নারীবাদীদের কেউ কেউ এ ধরনের নানা ঘটনা তুলে ধরে সামগ্রিকভাবে পুরুষদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারটিও নিতান্তই একপেশে ও অবৈজ্ঞানিক।

যাই হোক, সিঁদুর পরার সঙ্গে আমাদের এতদ্বঞ্চলে মানুষের মধ্যে কিন্তু একটি আবেগগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে- বিশেষত মেয়েদের মধ্যে। নিছক যুক্তি,নারীমুক্তি ইত্যাদির কথা বলে রাতারাতি এই আবেগকে দূর করা সম্ভব নয়। একজন বিবাহিতা নারী হিন্দু বাঙালি সিঁথির সিঁদুরকে তাঁর বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক বলে মনে করেন। বাস্তবে যাই হোক না কেন, বা সবার ক্ষেত্রেই না হলেও, নারীরা সিথিঁর সিঁদুরের মধ্য দিয়ে যেন ঘোষণা করতে চান তিনি একজন পুরুষের প্রেমাম্পদা, তিনি তাঁর ছোট সংসারের কত্রী জীবনে কোন পুরুষের ভালবাসা না পাওয়া, কিংবা অবিবাহিতা একজনের থেকে তাঁর সগর্ব স্বাতন্ত্র্য যেন ঘোষণা করে সিঁদুর-শাঁখা-নোয়া (কিংবা মঙ্গলসূত্র)।

কিন্তু এই আবেগ আসলে তৈরি হয়েছে আজন্ম সংগৃহীত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। চারপাশের সিঁদুর পরা মহিলাদের দেখে শুনে, নানা কথাবার্তায় লেখাপত্রে এ সম্পর্কে নানাবিধ মন্তব্য মনের গভীরে প্রবেশ করার ফলে এ ধরনের আবেগ তৈরী হয়ে যায়। সিঁদুরকে (তথা স্বামীকে) একটি মেয়ে তার জীবনের পরম সম্পদ হিসেবে মূল্য দিয়ে বসে। আসলে এভাবেই তাদের শিক্ষিত করা হয়। ব্যাপারটির মধ্যে মূলত কাজ করে আমাদের সমাজে নারীদের অসহায়তা ও নিরাপত্তাহীনতাই। কয়েকদশক আগেও আমাদের এখানে উচ্চবর্ণের নারীরা যেভাবে কৌলিন্য প্রথার শিকার হয়ে অকাল বৈধব্য বরণ করতেন, সেটি এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা হয়। এখনো সাধারণভাবে স্বামী বর্তমানে যৌথ পরিবারেতো বটেই, বৃহত্তর সমাজে নারীর যতটুকু কর্তৃত্ব, জোর ও মূল্য থাকে, স্বামী-অবর্তমানে এক বিধবার ক্ষেত্রে তা প্রায়শঃই শূন্যে নেমে আসে। সংসার ও সম্পত্তি থেকে বিতাড়িত বঞ্চিত এবং সামাজিকভাবে অবমানিত এই নারী সারাজীবন যে দুর্দশায় জীবন কাটাতে বাধ্য হন যুগযুগব্যাপী তার অজস্র উদাহরণ মেয়েদের মধ্যে সধবা থাকাটাকে তথা তার চিহ্নাদিণ্ডলিকে নিজের অস্তিত্বের সমার্থক বলে মনে করেন। এ কারণে ধর্মের দোহাই দিয়ে স্বামীর মৃত্যুতে সতী হওয়াকে কিছু নারী স্বেচ্ছায় বরণ করতেন নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, কখনোবা ‘পতিভক্তি’ নামক এক মনোরোগী সুলভ তীব্র আবেগের তাড়নায়। এই তথাকথিত পতিভক্তি একদিকে প্রধানত যেমন পুরুষ আধিপত্যের সমাজে নারীকে পুরুষের অধীনস্থ এক ব্যক্তিত্ব বিসজর্ন দেওয়া দাসে পরিণত করার চেষ্টা, অন্যদিকে তেমনি তা উত্তরাধিকারীকে সুনিচিত করে সম্পত্তি সুরক্ষার প্রচেষ্টাও।

এঙ্গেলস মন্তব্য করেছিলেন-

“স্ত্রীর সতীত্ব এবং এইভাবে সন্তানের পিতৃত্ব সম্পর্কে সুনিশ্চিত থাকতে, স্বামীর ক্ষমতার কাছে স্ত্রীকে শর্তহীনভাবে সমর্পণ করা হয়, স্বামী যদি স্ত্রীকে হত্যাও করে, তবে সে শুধু তার অধিকারের প্রয়োগ করে মাত্র।”

নানা ধর্মসাহিত্যে, লোকগাথায় ও লোককাহিনীকে প্রাসঙ্গিক সমাজব্যবস্থার স্বার্থে মেয়েদের এ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে ‘পতি পরম ণ্ডরু দেবতার সার‘। কিন্তু পুরুষদের জন্য ‘পত্নিভক্তি‘ কথাটাই সৃষ্টি হয় নি, ‘দেবীর সার‘ হওয়াতো দূরের কথা। বড়জোর চালু হয়েছে ‘পত্মিপ্রেম‘। এক নারী ও এক পুরুষ পরস্পরকে প্রেম-ভালবাসা-বিশ্বাসে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে, পরস্পরের যৌন তৃপ্তি ও সন্তান লাভের মধ্য দিয়ে সমাজের একক ‘পরিবার’ গঠন করবে- তা আর হয়ে ওঠেনি।

পুরুষদের বসানো হয়েছে দেবতার আসনে, নারীরা পেয়েছে ভক্তের প্রতি ওই দেবতার ভালবাসা ও অনুকম্পা। বান্তবে নারীরা যদি এটুকু না পায়, তাহলেও তাদের পতিভক্তিতে ঘাটতি না করার জন্য শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। স্বামী যদি অসুস্থ, বিকলাংগ, পরস্ত্রীগত, অত্যাচারী ইত্যাদিও হয়, তাহলেও পতিব্রতা নারীকে তার এই ব্রতচ্যুত না হওয়ার শিক্ষা নানাভাবে দেওয়া হয়েছে। আর এসবেরই একটি বহিঃপ্রকাশ- সিঁথিতে সিঁদুর ইত্যাদি লেপে দিয়ে বিবাহিতা নারীদেরই শুধু চিহ্নিত করা, বিবাহিত পুরুষদের নয়।

পুরো ভারতবর্ষে যেসব নারী ও পুরুষেরা সিঁদুর ইত্যাদিকে পতিভক্তি ও স্বামীর অস্তিত্বের ( স্বামীর মূল অর্থই হচ্ছেপ্রভু) সমার্থক বলে গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, তাঁরা একটু সাধারণ বুদ্ধি ও সাধারণ জ্ঞানের সাহায্যেই জানতে পারবেন যে, পৃথিবীর অধিকাংশ বিবাহিতা নারীই সিঁদুর ব্যবহার করেন না। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইয়োরোপ, আমেরিকা, চিন, কোরিয়া, জাপান বা রাশিয়া- প্রাচ্য পাশ্চাত্যের বহু দেশেই বিবাহিতা নারীরা এমন সিঁদুর দিয়ে নিজেদের সধবাত্ব ঘোষণা করেন না। তারা তাদের স্বামীকে ভালবাসেন না বা এর সুযোগে বহু পুরুষের সঙ্গে ‘খেলে’ বেড়াচ্ছেন তা আদৌ নয়। এ ব্যাপারে বিরল কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও তা সিঁদুর পরা বা না পরার সঙ্গে আদৌ সম্পর্কযুক্ত নয়। তবে এটাও সত্য যে, পুরুষ প্রধান্যের সমাজে ও নারীপুরুষের চূড়ান্ত বৈষম্যযুক্ত কিছু সমাজে বিবাহিতা মেয়েদের নানা ভঙ্গীতে চিহ্নিত করা হয়-ই। ভারতবর্ষের বহু হিন্দু নারীরা যেমন বিয়ের পর ব্যবহার করেন অচ্ছেদ্য মঙ্গলসূত্র। ব্যাপারটা সবদিক দিয়ে সিঁদুর পড়ারই সমগোত্রীয়। কোথাও বা পরা হয় আংটি, কোন আদিবাসী গোষ্ঠীর নারীরা পরে গলায় মোটামোটা হাঁসুলি জাতীয় জিনিশ ইত্যাদি।

সিঁদুর পরা নিছকই স্থানীয় ও সাময়িক একটি লোকাচারমাত্র। কিন্তু যখন তাকে হিন্দুত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত করা হয় তখন ব্যাপারটি হাস্যকর হয়ে উঠে। আদপেই মূল হিন্দুধর্মের সঙ্গে বিবাহিতা হিন্দু নারীর সিঁদুর পরার কোন সম্পর্ক নেই। ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায় এ ধরনের প্রথা স্থানীয় এলাকায় আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। পরে তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এরও উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকে সিঁথির মাঝে রক্তবর্ণ সিঁদুর পরার মধ্যে নারীর বহি যৌনাঙ্গ ও ঋতুস্রাব তথা যৌনতা ও উর্বরতার প্রতীকী সম্পর্ক অনুমান করেন। এই প্রতীকী সম্পর্ক ছাড়া নারীর এ ধরনের চিহ্নাদির পেছনে আদিমকালের আসুরিক বিবাহ পদ্ধতির ধারাবাহিকতা আছে বলেও অনেক গবেষক মতপ্রকাশ করেন।

>>> ২য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন >>>

(২য় পর্বে শেষ হবে)