জোবায়েন সন্ধি

এমনিতেই বেশ কিছুদিন পারিবারিক দুঃশ্চিন্তায় মন খারাপ। বড় আপা অধ্যাপক হেলেন কিলার (শহীদ বুদ্ধিজীবি ছমির মন্ডলের কন্যা) এবছর হজ্জ্ব করতে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখানেই হার্ট এটাকে আক্রান্ত হয়ে মক্কার একটি হসপিটালের আইসিইউতে ২ সপ্তাহের অধিক কোমায় ছিলেন। সঙ্গতকারণেই পরিবারের সদস্য হওয়ায় বেশিরভাগ সময় খোঁজ-খবর আর টেনশনের ভিতরে সময় কাটাতে হয়েছে।

হেলেন আপা কেবল আমার মামাতো বোনই নয়, আমাকে মাতৃস্নেহে আদর করতেন, ভালোবাসতেন। তাঁকে কখনো নিজের বোন ছাড়া মামাতো বোন মনে করার কারণ ছিল না। তিনি আপন বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। আপার কৈশোরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি তাঁর বাবাকে হারান। রাজাকার আলবদর বাহিনী মামাকে মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। এরপর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। পিতৃহীন সন্তানদের দেখাশুনা ও লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করতে মামীকে প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধে বাড়িঘর, সহায় সম্পদ সর্বস্ব লুট ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংস হবার পরও আমাদের পরিবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে, কেবলই দৃঢ়চেতা মনোবলের কারণেই।

একাত্তরের যুদ্ধে মেজো খালার হত্যা, আমার দাদা আব্দুল জব্বার মণ্ডলকে রাজাকার-আলবদর বাহিনী মসজিদের সামনে গুলি করে হত্যা, রাজশাহী জেল ভেঙ্গে পালিয়ে বাবার মুক্তিযুদ্ধে লড়াই, তার সাথে আমার মা’রও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। সবমিলিয়ে পুরো পরিবারে একটা ভজঘট অবস্থা লেগে ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ আমার বাবাকে রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটক করে ধরে নিয়ে যায় বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে। রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী আব্দুল আলিমের নির্দেশে এই অপকর্মগুলো সংঘটিত হয় বলে বাবার কাছে শোনা। কারণ আব্দুল আলিমই বাবাকে ধরতে সহযোগিতা করেছিলেন। বাবা চমৎকার উর্দু লিখতে-বলতে পারতেন বলে কপালের ফেরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোনো এক অফিসারের সুবাদে খুন হবার হাত থেকে বেঁচে যান। হয়তো খুনও হতে পারতেন, কিন্তু সময়টা ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহ বলে পাকিস্তানি সেনারা আটককৃতদের ফেলেই পালিয়ে যায়। ফলে বাবা মৃত্যুর হাত হতে রক্ষা পান।

স্বাধীনতার পর রাজাকার আব্দুল আলিমকে আটক করে আমার বাবা। সেসময় সরকারের নির্দেশ ছিল আটককৃত রাজাকাররা এলাকার বাইরে যেতে পারবেন না। জয়পুরহাটে আমাদের বাড়ির পাশের খোলা জায়গায় প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় রাজাকারদের হাজিরা পরীক্ষা করতেন আমার বাবা। রাজাকার আব্দুল আলিমও ব্যতিক্রম ছিলোনা। অন্যান্য রাজাকারদের মতো তাকেও রোজ হাজিরা দিতে হতো। স্কুলের বাচ্চাদের যেমন রোলকল করায়, ঠিক সেভাবেই।

পঁচাত্তরে ১৫ আগস্টের পর আব্দুল আলিম হয়ে যান জয়পুরহাটের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। জিয়া সরকারের মন্ত্রীও হোন তিনি। এরপর আমাদের পরিবারে কী হতে পারে সেটা কল্পনা করলেই বোঝা সম্ভব! স্বাভাবিকভাবেই জিয়া সরকারের সময় অবৈধ অস্ত্র রাখা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বাবাকে জেলে ঢোকানো হয়। সেসময় আমাদের পারিবারিক বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট গাজীউল হক ও বর্তমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সহযোগিতায় বাবা জামিনে মুক্তি পান। মুক্তি পেয়েই বাবা পালিয়ে চলে যান সিংগাপুরে। দেশে পড়ে থাকলাম আমরা দুই ভাই বোন আর আমার মা। একদিকে আমাদের পরিবারে অভিভাবকহীন দুই সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই, অপরদিকে মামার বাড়িতে অভিভাবকহীন সন্তানদের নিয়ে আমার বড় মামীর বেঁচে থাকার লড়াই। পুরো সিনেমাটিক স্টোরি।

এর মধ্যে জিয়ার শাসনামল শেষ, আব্দুস সাত্তারের শাসনামল। বাবা সিংগাপুর থেকে দেশে ফিরে এলেন। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এরপর এরশাদের সামরিক শাসন শুরু। রাজাকাররা তখনও শক্তিশালী, ঘুরে ফিরে তাদের হাতেই ক্ষমতার প্রভাব। এরশাদের আমলে পুরাতন নথিপত্র ঘেঁটে পুলিস গ্রেফতার করে ডিটেনশনে দেয় বাবাকে। এরশাদ আমলেই ডজনখানেকবার এরেস্ট হয়ে জেলে কাটাতে হলো তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ।

এসব কেন হয়েছে? আমার বাবা খুনি ছিলেন? চোর ডাকাত ছিলেন?
মুক্তিযোদ্ধা হবার পরেও তিনি কেন মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র নিতে রাজি হন নি, এটাই কী বাবার অপরাধ? মজার ব্যাপার হলো উনি বরাবরই মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র নেয়ার বিষয় সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। যে মানুষটাকে শেখ মুজিবর রহমান নিজে ডেকে নিয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের চাকরি দিয়েছিলেন, সে মানুষটা সবিনয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন; ‘সরকারের চাকর হবার কোনো ইচ্ছা আমার নাই’। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তাঁর সন্তান হয়েও আমাকে সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে হয়েছে। যদিও এর জন্য কোনো তদবির, সুপারিশ কিংবা ঘুষ কিছুই লাগে নি।

রাজাকার আব্দুল আলিমের ‘বিচার’ শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে। যাদের হত্যার অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়, তাদের অন্যতম সেই পরিবার; অর্থাৎ আমাদের পরিবারকে মামলার সাক্ষীও করা হয় নি। অর্থাৎ বিচারে তার শাস্তিই হয় নি। রাজাকার আলিমকে মোটা টাকা লেনদেনের মাধ্যমে লঘু ‘শাস্তি’ দিয়ে হসপিটালে আরাম আয়েশে রাখা হয়েছিল। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই রাজাকারের লাশ জয়পুরহাটে নিয়ে আসার পর তার নমাজে জানাজা পড়িয়েছেন জয়পুরহাটের আওয়ামী লীগের নেতারাই! এবং এসব কিছু ঘটেছে আমাদের পরিবারের চোখের সামনেই।

২২ বছর সরকারি চাকরি করে ঘটনার প্যাঁচে পড়ে আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছে। বাস্তবতা হলো দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। কারণ দেশে মুক্তমত প্রকাশের অধিকার যখনই সংকুচিত হতে শুরু করেছিল, যখনই ইসলামি জঙ্গীদের সাথে বর্তমান সরকারের আপসরফা শুরু হয়েছিল; তখনই বুঝে নিয়েছি এই দেশ আমার নয়। এই দেশ হায়েনা রাক্ষসদের। আমি দেশ ছাড়ার পর আমার বৃদ্ধ বামা মাকেও দেশের বাইরে সরিয়ে নেয় আমার ছোট বোন।

যে দেশের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ করে পুরো পরিবার নিঃস্ব হলো, হারালাম দাদা, মামা ও খালাকে; সেই দেশে আমরাও থাকতে পারলাম না। কারণ দেশটা এখন রাজাকারদের হাতে।

যা বলছিলাম, বড় আপা হেলেন দু’দিন আগে সৌদি আরবে মারা গেছেন। তাঁর মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় নি বলে মক্কাতেই কবর দেয়া হয়েছে। দেশ ছাড়ার আগে বড় আপা বা আমার বাবা মাকে শেষ দেখা দেখেও আসতে পারিনি। এসব নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই। দুঃখ একটাই যে দেশের মানুষের মুক্তির জন্য এতো এতো মানুষের সংগ্রামী জীবন নষ্ট হলো সে দেশের জনগণের মুক্তি মিললো না।