প্রথমটি দিয়েই শুরু করি:

শিক্ষানবিশ হিসেবে আমার ফরাসি ভাষার অবস্থা তখন তথৈবচ। একটি পরীক্ষা দিতে হবে এই ভাষাতেই। সংগত কারণই আমি নার্ভাস ছিলাম। প্রস্তুতিপর্বে সাহায্য করবার জন্যে ধরলাম আমার জানি দোস্ত ফরাসি বান্ধবীকে। সকাল বিকাল দুই বেলা টেলিফোনে কথা বলি। সপ্তাহে এক-দুইবার একসাথে লাঞ্চ বা ডিনার করি। উইক-এন্ডে পাহাড়ে হাটা, স্কি করা, নাইট আউট, সবই করা হয় একসাথে। বান্ধবীও এক অনুরোধেই রাজি হয়ে গেল।

আমরা ঠিক করলাম সে আমার ১ ঘণ্টার একটি ইন্টারভিউ নেবে পরীক্ষকের স্টাইলে, আমরা কোথাও বসবো লাঞ্চ ব্রেকে। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছুবার আগেই বান্ধবী টেক্সট ম্যাসেজে জানাল ১৫ মি: তার দেরি হবে। আমি ওকে বলে উত্তর দিয়ে, তার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সে আসল ৩০ মি দেরি করে। এসেই অখুশি মুখে বলতে থাকলে, আইনজীবীর কাজটা কতোটা কঠিন, বিশেষ করে সেই দিনটাই ছিল খুবই স্ট্রেসফুল, তার লাঞ্চ ব্রেকটা শান্তিতে কাটানোর দরকার ছিল। এরই মধ্যে তাড়াহুড়া করে আমার বান্ধবীর বেজার মুখে হাসি ফুটানোর জন্যে তার লাঞ্চটাও আমি কিনলাম। আমাদের নির্দিষ্ট করা ১ ঘণ্টার ইন্টারভিউ শেষ করলাম ১৫ মিনিটে।

দ্বিতীয় ঘটনা:

আমার মা এপোলো হসপিটালে ভর্তি। ইমার্জেন্সি রক্তের প্রয়োজন। তাঁর রক্তের গ্রুপ এ-পজিটিভ। আমাদের পরিবারে একমাত্র আমার ছোট ভাইয়ের রক্তের গ্রুপ একই, তার হাইপ্রেসারের কারণে ওরা তার রক্তও নিল না। আত্নীয়-স্বজন যাকেই হাতের কাছে পাওয়া গেল কারো রক্তের গ্রুপ এক নয়, কেউ কেউ জানেনা তাদের রক্তের গ্রুপ কী!! অতি দ্রুত রক্তের সন্ধানে আশ্রয় নিলাম ফেইসবুকে অনেকটা কুণ্ঠিত চিত্তে। আমার এই কুণ্ঠা স্ট্যাটাসেও খানিকটা রয়ে গেল। মোবাইল থেকে লেখা বাংলায় ভুল বানান, রক্তের গ্রুপ বা হাসপাতালের নাম উল্লেখ না করা।

আমার আশংকাকে উড়িয়ে দিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার দুই ঘণ্টার মাথায় ২৩ টি ম্যাসেজ পেলাম আমার ফেইসবুক ইনবক্সে। সবার ফোন নম্বরসহ জানিয়ে দিল যে, তারা রক্ত দিতে চায়, কোথায় এবং কখন আসতে হবে। আমার বিস্ময়ের সেখানে শুরু হলেও শেষ সেখানে নয়। ঠিক করলাম প্রথম যিনি উত্তর দিয়েছেন তাকে দিয়েই শুরু করবো, চলতে থাকবে সেই ধারায়। প্রথম দুজন এলেন, একজন দিতে পারলেন না হাই প্রেশারের কারণে, তিনি অত্যন্ত লজ্জিত ভঙ্গিতে চলে গেলেন, আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে। দ্বিতীয়জন রক্ত দিয়ে যখন পালিয়ে যেতে ব্যস্ত তাকে অনেক কষ্টে, সত্যি কথা বলতে কী তাকে আমি থামতে পেরেছিলাম সেন্টিমেন্টের দোহাই দিয়ে। আমাকে বলতে হয়েছিল: আমি আপনার বড়বোনের মত, আপনার একজন বড়বোনের দাবী আপনি আমাকে একটু সময় দিন, অন্তত আপনার সাথে একটু কথা বলার। এর পরের দুজন ছিলেন আরও সরস রক্ত দিয়ে তারা মোটামুটি হাওয়ায় মিলিয় গেলেন।

রক্ত ডোনেটের মত এতবড় একটি মানবিক কাজ করে, আমাকে যে চিরঋণে বেঁধে ফেললেন, তার জন্যে ধন্যবাদটুকুও এরা নিতে রাজি নয়। আমি শুধু স্থানুর মত দাঁড়িয়ে অভিভূত হয়ে চোখের জল ফেললাম। যে জল ছিল কৃজ্ঞতায় এবং আনন্দে পূর্ণ। আর্থিক দিক দিয়ে হয়তো আমার দেশের মানুষ ধনী নয়, কিন্তু মনের এই ঐশ্বর্যের প্রকাশ পৃথিবীর আর কোথায় মেলে!!