আগে মহিষাসুরের কথাই বলি, কারণ তিনিই আদি। মহিষ ও অসুর যোগ করলে মহিষাসুর হয় (মহিষ + অসুর = মহিষাসুর)। মহিষ শব্দের অর্থ বলি। মহ ও ঈষ জুড়ে মহিষ হয় (মহ + ইষ = মহিষ)। ‘মহ‘ মানে সমগ্র, অখণ্ড, যৌথ, বিশাল; আর ‘ইষ‘ মানে ইচ্ছা [সরল শব্দার্থকোষ]। ‘ইষ‘ শব্দে যে ইচ্ছা হতে পারে তা ইষ্টদেবতা, ইষ্টিকুটুম ইত্যাদি শব্দ থেকে বুঝতে পারা যায়। তাহলে যারা সমগ্র সমাজের, যূথের ইচ্ছাকে রূপায়িত করে তারাই মহিষ। মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বাহুবলী পুরুষদের ‘মহিষ‘ বলতে পারেন, তাদের পরিচালিকাদের মহিষী বলা চলে। রাজমহিষী শব্দটি এখনও প্রচলিত আছে।

 

প্রশ্ন: মহিষ মানে কাঁড়া হয় কী করে?

উত্তরটা সংক্ষেপে বলতে পারি। মহিষ শব্দের একটি অর্থ লুলাপ। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ‘-এ বলা হয়েছে লুলাপ [লুল(বিমর্দ্দন)+আপ+অ] মানে যে জলকে আলোড়িত করে। মহিষ (কাঁড়া) জল ঘাঁটে বলেই তাকে লুলাপ বলে (লুচি ভাজার সময় ময়দাকেও এমন ঘাঁটা হয়, ‘লু’ মানে এলোমেলো করে ঘাঁটা বুঝতে পারেন)। এখন জল শব্দের একটি অর্থ হতে পারে জনগণ। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি ‘জলজ্যান্ত কথা‘ মানে যে কথা জল বা জনগণের মধ্যে বেঁচে [জ্যান্ত] থাকে। যে জননেতা বা মহিষ যূথের বা সমগ্র জনসাধারণের হিতের নিমিত্ত কার্য্য করার জন্য জনগণকে (জলকে) আন্দোলিত করেন তিনিই মহিষ। তিনি সম্মাননীয়। এবার অসুর মানে বলি। অসুর কোন নিন্দনীয় শব্দ নয়। অসু মানে প্রাণ এবং অসুর মানে প্রাণবান। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পেলে বহু নেতাই দাম্ভিক ও মৌলবাদী হয়ে যান। যে জননেতা জনগণেরই অত্যন্ত ক্ষতিসাধন করে সেই নষ্ট গণনেতাই মহিষাসুর। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে স্বর্গ (ক্ষমতাকেন্দ্র) দখল করে মহিষাসুর দাম্ভিক ও দুষ্ট হয়ে গিয়েছিল (ক্ষমতা পেলে আজকের নেতারাও নষ্ট হয়)। সেই কারণেই দুর্গা (মানে প্রধানত মধ্যবিত্ত জনগণ) তাকে নাশ করেছিল। বর্ণসঙ্গীতে বলা হয়েছে :

”মহিষাসুরকে চিনিতে হইলে মহিষ চিনিতে হয়;
‘মহ’ অর্থাৎ যূথের ‘ইষ’ বা ইচ্ছা মহিষে বয়।
মহিষেরা করে মহিষিদিগের ইচ্ছার রূপায়ণ;
মাতৃতন্ত্রে মহিষের চেয়ে ‘মহিষী’রা বড় হন।

মহিষ মানে তো লুলাপ, সে করে জলকে বিমর্দ্দন,
জনসাগরেতে মিশে জননেতা জনতার প্রিয় হন।
নেতা বা মহিষ দুষ্ট হইলে সে হয় মহিষাসুর;
নষ্টনেতাকে বধিয়া দুর্গা দুর্গতি করে দূর।”

এবার দুর্গা শব্দের অর্থ বলি। দুর্গ ও দুর্গা শব্দের অর্থের সম্পর্ক আছে। দুর্গ [দুর+গম্‌+অ] মানে অশক্যগমন, দুর্জ্ঞেয়, অসুরবিশেষ, মহাবিগ্ন, কুকর্ম্ম, দুঃখ, নরক, যমদণ্ড, মহাভয়, অতিরোগ, পর্ব্বতাদি হেতু দুর্গম পুর-গড়-কেল্লা…[ব শ]। দুর্গা মানে যাকে দুঃখে পাওয়া যায়, যে দুর্গতি নাশ করে। পদ্যাভিধান ‘বর্ণসঙ্গীত‘ থেকে দুর্গ ও দুর্গা মানে বলছি :

”যাহাতে গমন দুঃখজনক তাহাকে দুর্গ কয়;
উহা দুর্জ্ঞেয়, দুর্গমস্থান, অতিরোগ, মহাভয়।
বহু দুঃখতে গমন করে যে তাকে দুর্গত বলে;
তার দুর্গতি দূর হতে পারে দুর্গা আসিয়া গেলে।

অনেক চেষ্টা করিলে তবেই দুর্গা আসিবে পাশ;
নষ্ট নেতাকে বধিয়া করিবে দেশের বিঘ্ন নাশ।
দুর্গা আসলে দেবী নয়, ওরা মধ্যবিত্ত জন;
নষ্ট নেতা বা অসুর বধিতে উহাদের প্রয়োজন।”

রামচন্দ্র রাবণ বধ করার জন্য দুর্গাপূজা করেছিলেন। অবশ্য় বাল্মীকি রামায়ণে এই কাহিনী নাই, কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে। এখানে দুর্গাপূজা বলতে আসলে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার কথা বুঝলেই ঠিক হবে। খান-চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’-এ মধ্যবিত্ত জনসাধারণকে মহাবিঘ্ননাশিনী দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মধ্যবিত্তদের মধ্যেই দুর্গাপূজার প্রচলন সবচেয়ে বেশী। বর্ণসঙ্গীতে বলা হয়েছে,

”রাবণ বধিতে শ্রীরামচন্দ্র করে দুর্গার পূজা;
দুর্গা পূজিয়া রাজ্য ফিরিয়া পাইল সুরথ রাজা।
না বুঝে দুর্গা পূজে লাভ নাই শুনহ সর্ব্বজন;
নষ্টনেতাকে সরিয়ে বঙ্গে আনা চাই সুশাসন। ”

রাবণ শব্দের অর্থ ‘রব কারয়িতা‘, ‘ভীতিজনক‘, হিংসক ইত্যাদি [বঙ্গীয় শব্দকোষ, শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়]। যে ‘তোমাদের জন্য হ্যান করে দিব, ত্যান করে দিব, স্বর্গেযাবার সিঁড়ি বানিয়ে দেব‘- ইত্যাকার রব তোলে [ভোটের আগে নেতারা যেমন জনগণকে নানা প্রতিশ্রুতি দেন] সেই রাবণ। রামায়ণে আছে এমন এক রাবণকে বধ করতে রাম দুর্গাপূজা করেছিলেন। এখানেও দেখুন দুর্গাপূজার মধ্যে অপশাসককে তাড়ানোর ব্যাপারটি রয়েছে। আধুনিক কালে আনন্দমঠের সন্নাস্যীরাও দেশকে স্বাধীন করার জন্য দুর্গাপূজা করতেন। অপশাসককে দূর করাই দুর্গাপূজার মূল কথা। কিন্তু অর্থ না বুঝে দুর্গাপূজা করে লাভ নাই,

”যান্ত্রিকভাবে পুতুলের পূজা ক’রে চলে যেই জন;
কিছু নাহি বুঝে করে অং বং মন্ত্র উচ্চারণ,
দুর্গার নামে চাঁদা তুলে যারা করিছে মদ্যপান;
নবরূপধারী পশু হন তারা যমের বাড়ীতে যান ।”

– ‘বর্ণসঙ্গীত’

এখানে ‘যমের বাড়ী‘ মানে আদালত বুঝতে হবে। যারা চাঁদার জন্য জুলুম করেন, তাদের আদালতে নিয়ে যাওয়া উচিত, মারধর করা চলবে না।

”নিত্য নিত্য দুর্গা পূজিলে পশ্বাচার তা হয়;
তন্ত্রশাস্ত্রে আছে এই কথা, মিথ্যা মোটেই নয়।
মধ্যবিত্ত লোকেরা দুর্গা, ওরা দুর্গম হয় –
এসো জনগণ, বিঘ্ন নাশিয়া ‘দুর্গ’ করিব জয়।”

– ‘বর্ণসঙ্গীত’

বৃহৎ তন্ত্রসার‘ গ্রন্থ মতে যারা নিত্য নিত্য দুর্গাপূজা, শিবপূজা ও বিষ্ণুপূজা করে তাদের ‘উত্তম পশু‘ বলে [প্রাসঙ্গিক শ্লোকটি হলঃ “দুর্গাপূজাং, বিষ্ণুপূজাং, শিবপূজাঞ্চ নিত্যশঃ।/অবশ্যং হি য করোতি ষ পশুরুত্তমঃ স্মৃতঃ”।] প্রসঙ্গত, পশু [পশ্‌+উ] শব্দে প্রথমেই animal বুঝলে চলবে না [সেটি প্রতীকী অর্থ]। যাস্কের নিরুক্তে ‘পশু‘ শব্দের অর্থ হল ‘যে অবিশেষে দেখে‘।বাস্তবিক কোনো সমাজচেতনা ছাড়াই অর্থ না বুঝে হুজুগে মেতে যান্ত্রিকভাবে দুর্গাপূজা করাটা পশ্বাচার়ই বটে। হুজুগে মেতে ওঠা নয়, যুক্তি দিয়ে ধর্ম্মের প্রকৃত তাৎপর্য্যকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। দুর্গাপূজায় শব্দবাজীর অত্যাচার এবং চাঁদার জন্য জুলুম বন্ধ হওয়া দরকার, একথা বলাই বাহুল্য।

আজকাল কেউ কেউ মহিষাসুরকে অনার্য্য রাজা এবং দুর্গাপূজাকে অার্য্যদের হাতে অনার্য্যদের পীড়নের প্রতীক বলে মনে করেন। এই ধরণের ধারণা ও অভিমান থেকে এদের কেউ কেউ দুর্গাপূজার বদলে অসুরের গুণগান / অসুরপূজা করতে চান। প্রকৃতপক্ষে মহিষাসুর কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক রাজা নয়। আর্য্য জাতির তত্ত্বও খুব বিতর্কিত। সোজা কথায় দুর্গাপূজার অর্থ হল শুভ শক্তির হাতে অশুভ শক্তির পরাজয়। দুর্গার বাহন সিংহের কথাও বলি। এখানে বনের সিংহ না বুঝে পুরুষসিংহ বুঝলেই বল। সিংহ মানে যে হিংসা করে। দুর্গা সিংহবাহিনী। অপশাসককে দূর করতে মানুষ সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। বর্ত্তমান লেখক অবশ্য অহিংসা নীতিতে খুবই শ্রদ্ধা রাখেন।

আমি দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিনে হিন্দুমুসলমানখ্রিস্টানের সহযোগিতায় কোনো দোষ দেখি না। তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে হুজুগে না মেতে ধর্ম্মের প্রকৃত তা্ৎপর্য্যকে বুঝতে হবে এবং যুগের প্রয়োজন মতো গতানুগতিকতা পরিত্যাগ করতে হবে। অর্থ না বুঝে যান্ত্রিকভাবে ধর্ম্মাচারণ করে গেলে মানবিকতার বিকাশ হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম্মমোহে পতিত হতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে আজকের দিনে মূর্ত্তিপূজার দরকার নাই। যারা মূর্ত্তিপূজা বাদ দিয়ে কেবল শারদোৎসব করতে চান তাদের আমি সাধুবাদ জানাই। তবে হিন্দুদেবদেবী এবং তাদের বাহনগুলির ধারণার মধ্যে যে যুক্তির পরিচয় আছে, তা জেনে রাখা ভালো। দেবদেবীরা থাকেন জনগণের মধ্যেই, কোনো কাল্পনিক স্বর্গে নয়। মহামায়া বলতে সমগ্র জনসাধারণকে বুঝতে হয়। সেই মহামায়ারা জ্ঞানচর্চ্চাকারী অংশ স্বরস্বতী, মজুর ও শ্রমিকেরা কালী ও বিশ্বকর্ম্মা, মধ্যবিত্ত অংশ দুর্গা ইত্যাদি। ঋগ্বেদেও আছে যে দেবতা বলতে আদিতে বহু ক্ষেত্রে মানুষকেই বোঝাত।

পরিশেষে বলি যে অপশাসককে দূর করাই দুর্গাপূজার মূল কথা। সেই অর্থ বিস্মৃত হয়ে কেবল হুজুগে মেতে বছরের পর বছর যান্ত্রিকভাবে দুর্গাপূজা করা যেমন নিন্দনীয় (পশ্বাচার), তেমনি ভিতরের অর্থ না বুঝে দুর্গাপূজার কদর্থ করাও নিন্দনীয়। দুর্গাপূজার যে অর্থ এখানে করা হল তার বাইরেও দুর্গাপূজার আরও আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্য্য থাকতে পারে, কিন্তু ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থবিধির আলোকে দুর্গাপূজার যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে সেটি ভাল করে বুঝে নেওয়া খুবই দরকারী। যারা দুর্গাপূজার তাৎপর্য্য সম্বন্ধে নতুন নতুন বিষয় জানেন তাঁরা অনুগ্রহ করে যুক্তিসহ তাঁদের মতামত জানান। সবাই সমাজচেতনায় ঋদ্ধ হয়ে পূজার দিনগুলি ভাল কাটান এবং দুষ্ট নেতাদের সরিয়ে দেশের দুর্গতি নাশ করার স্বপ্ন দেখুন, এই কামনা করি। বুদ্ধিজীবীরাও গতানুগতিকতা পরিহার করে মানুষকে নতুন নতুন শুভবুদ্ধি দিন।