নাজিম উদ্দিন

আগের পর্ব ছিল ‘এক’ নিয়ে। এ পর্ব ‘দুই’ নিয়েঃ

দ্বৈততার উপলব্ধি আমাদের চিরন্তন। আমাদের এ পৃথিবীতে দিনের পরে রাত আসে, আলো আর অন্ধকার এখানে জড়াজড়ি করে থাকে। তেমনি আমাদের জীবন ছোট-বড়, উঁচু-নীচু, আকাশ-পাতাল, ভালো-মন্দ, ডান-বাম, ভাল-মন্দ এরকম অসংখ্য বৈপরীত্যে ভরা। বৈপরীত্য যেন পাখির দুটি ডানার মত, যা নাহলে পাখি উড়তে পারে না। আর এ বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই চিৎসত্তার প্রকাশ এবং উপলদ্ধি।

অন্তর আর বাহিরের দ্বন্দ্বে আমাদের চেতনা বহির্বিশ্বকে বস্তুগত বাস্তবতা আর অন্তরের জগতকে মানসিক বাস্তবতা হিসেবে দেখে। বৈপরীত্যের কারনে আমাদের মধ্যে ভেদবুদ্ধির তৈরি হয়, এ বুদ্ধির স্বভাব ব্লেডের মত, সে সবকিছুকে কেটে-চিরে (discriminate) দেখতে চায়। এক থেকে দু’য়ের সৃষ্টি, পুরুষ আর নারী দুজনেই আসলে মানুষ, পৃথিবীর ঘুর্ণনের ফলে দিন আর রাত সম্ভব হয়। সৌরমন্ডলে সূর্য সবসময় বর্তমান, আলো দিয়ে যাচ্ছে,কিন্তু গোলাকার পৃথিবীর যেদিকে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না সেদিকে অন্ধকার বা রাত। ফকির লালনের ভাষায়, ‘আরেকদিকে নিশি হলে অন্যদিকে দিবা বলে’। বিপরীত জিনিসগুলো একটা বিষয়েরই দুটো ভিন্ন দিক, অনেক সময় তারা একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু ভেদবুদ্ধি আমাদের অন্তর্নিহিত মিলটা দেখাতে চায় না, বিভেদটাকেই সে আমলে নেয়, এবং বিভেদের রেখা টেনে তার বোধ তৈরি হয়, বিভেদের মাধ্যমে, পরস্পরের তুলনা করেই কোন কিছু সম্বন্ধে আমাদের প্রাথমিক জ্ঞান জন্মায়।

বাংলার তন্ত্রের রাকিনী দেবী। দ্বন্দ্ব (duality) এবং তাদের মধ্যে ঐক্য বুঝাতে দেবীর দু’মাথা।

ভেদবুদ্ধি আমাদের নিস্পৃহ হতে দেয় না, যার ফলে আমাদের দ্বন্দ্ব আসে, রাগ-দ্বেষের সৃষ্টি হয় এবং তাতে আমাদের প্রকৃতি আশ্রয় পায়। খুব নিম্নস্তরের ভেদবুদ্ধি থেকে দৈহিক ভোগ বা তৃপ্তি এবং ক্ষোভ ও হতাশা জন্মায়। অপেক্ষাকৃত উচুঁস্তরের ভেদবুদ্ধি থেকে সাফল্য-অসাফল্য, জয়-পরাজয়, সৌভাগ্য-দূর্ভাগ্য, উল্লাস-হতাশা, ভাল-মন্দ, ভালবাসা-ঘৃণা ইত্যাদির বোধ তৈরি হয়। আরও উচ্চস্তরের ভেদবুদ্ধি থেকে আসে পাপ-পূণ্য, উচিত-অনুচিত, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদি।

ভাল আর মন্দ একই মানুষের দুটি গুণ, ডক্টর জেকীল-মিস্টার হাইড। দোষে গুণে সৃষ্টি, মেঘে বানে বৃষ্টি। আলো আর অন্ধকারের দ্বন্দ্বে আলোটাই খাঁটি, কারণ আলোর কাছে অন্ধকার টিকে থাকতে পারে না। নিকষ অন্ধকার ঘরে একটা প্রদীপ সমস্ত ঘর আলো করে, আলোর উপস্থিতিতে অন্ধকার দূরে সরে যায়। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা আলো আর অন্ধকার দুটোই অনুভব করি। মায়ের পেটে অথবা গভীর ঘুমে আমরা নিকষ কালো অন্ধকারে তলিয়ে থাকি। অন্ধকার থেকে আলোর উৎপত্তি, কিন্তু আলোর উপস্থিতিতে অন্ধকারকে বিদায় নিতে হয়।

 “There is nothing either good or bad, but thinking makes it so.” -Shakespeare

জগতে দু’জাতের প্রাণি আছে, পুরুষ আর নারী। ভাষার মাধ্যমে আমরা জগতের লিঙ্গায়ন সম্পূর্ণ করেছি, ফলে এখন সবকিছুর একটা লিঙ্গায়ত রূপ আছে। কিছু ভাষায়  সকল বিশেষ্যপদের হয় পুংলিঙ্গ, নতুবা স্ত্রীলিঙ্গ একটা কিছু হতে হবে, সেসব ভাষায় বাংলার মত ক্লীবলিঙ্গ নেই। যেমন, ফরাসী ভাষায়,বই, চলচ্চিত্র,পৃথিবী এসব শব্দ পুরুষ লিঙ্গবাচক, অন্যদিকে গাড়ি,জীবন,রাত স্ত্রীলিঙ্গের শব্দ। বুঝার সুবিধার্থে আধুনিক ইলেকট্রনিক্সেও আমরা মেল আর ফিমেল দুটো পোর্ট নাম দিয়েছি, মোবাইল ফোনটা ফিমেল পোর্ট, চার্জার মেইল পোর্ট।

পুরুষের মধ্যে মেয়েলী বৈশিষ্ট্য আছে, আবার মেয়েদের মধ্যে পুরুষালী বৈশিষ্ট্য আছে। এসব বৈশিষ্ট্য খুব বেশি প্রকট হলে তখন আমরা সেসব মানুষকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখি। পাশ্চাত্য সমাজে মেয়েরা ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে, কিন্তু তারা আর মেয়ে নেই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের পুরুষের বেশ ধরতে বাধ্য করেছে। সমাজে নারীরও পুরুষালী ভাবের কারণে আজকে পেশী শক্তির দাপট বেশি। প্রকৃতির উপর জোর-জুলুমে তাদের কম বাধে। অনেকে মনে করেন,দুনিয়ায় এখন পুরুষতান্ত্রিকতার চরমে পৌঁছেছে, এবার আমাদের নারীসত্তার সাথে একটা সমঝোতা করা প্রয়োজন। এতে করে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্বন্ধে আমাদের সচেতনতা বাড়বে, যুদ্ধংদেহী পুরুষালী ভাব কমে শান্তিও আসতে পারে। পুরুষ প্রকৃতি আর নারী প্রকৃতির মিলনেই প্রকৃত স্বার্থকতা, সেজন্য শিব অর্ধনারীশ্বর, অর্ধেক নারী অর্ধেক পুরুষ। তেমনি তন্ত্রের রাকিনী দেবীর দুটো মুণ্ডো । বাংলা নবজাগরণের পথিকৃত শ্রীচৈতন্য ছিলেন একই অঙ্গে রাধা-কৃষ্ণ,বহিরঙ্গে রাধা অন্তরে কৃষ্ণ।

অর্ধনারীশ্বর শিব

বিপরীত বিষয়ের ভাবনা এবং জগতের দ্বান্দ্বিক অবস্থানকে দুনিয়ার সকল ধর্মে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোরানে আছে সবকিছুকে জোড়ায়, জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে।

“And of every thing We have created pairs: That ye may receive instruction.” (সূরা যারিয়াত, আয়াত ৪৯)।

চৈনিক সভ্যতায় ‘ইন’ এবং ‘ইয়াং’ খুবই মৌলিক একটা ধারনা। ইন মানে শুভ, ইয়াং অশুভ, এরা একে অপরের সাথে মিশে থাকে। ভাল-মন্দ নিরবচ্ছিন্ন কিছু নয়। খুব ভাল কিছুর মধ্যেও মন্দ মিশে থাকে আবার খুব মন্দ কিছুর মধ্যেও ভাল কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়।

গ্রিক পুরাণে দেবতা জানুস মনের দ্বিমুখীতার প্রতীক। তার দুটো মাথা, যার একটা মুখ জগতের দিকে ফেরানো, আরেকটা অন্তঃমুখী। এক মুখ থাকে অতীতের দিকে আরেক মুখে সে তাকিয়ে আছে সুদূর ভবিষ্যতে।

গ্রিক দু’মুখো দেবতা জানুস

ট্রিকস্টার পুরাণঃ

আদিম সমাজে নানাবিধ কর্মে ভাল-মন্দ, সৃষ্টি-ধ্বংসের ধারণা দেবতাদের দ্বৈত আচরণের মাধ্যমে পৌরাণিক ট্রিকস্টার চরিত্রে ফুটে ওঠে। ট্রিকস্টার একই সাথে সৃষ্টি-ধ্বংসকারী, দাতা-গ্রহিতা, ধূর্ত এবং বোকা, বেকুব এবং দুর্বৃত্ত, অন্যকে বোকা বানায় নিজেও বেকুবে পরিণত হয়। সচেতন ভাবে সে কিছুই চায় না। ভাল বা মন্দের ধারণা নেই, কিন্তু ভাল-মন্দ দুইয়ের জন্য সে দায়ী। নৈতিক বা সামাজিক মূল্যবোধের ধার ধারে না, আবেগ এবং তাড়না দ্বারা পরিচালিত হয়, তথাপি তার কর্মে সব মূল্যবোধ প্রকাশিত হয়। আদিম লোক-কাহিনীতে এরকম দ্বৈত চরিত্রের সাক্ষাত পাওয়া যায়। শামান বা গোত্র চিকিৎসকের চরিত্রে কৌতুক প্রবণতার সাথে এরকম কৌশলের আশ্রয় নিতে হয় যার কারণে তার নিজের জীবন বিপন্ন হবার শংকা তৈরি হয়, আবার একই সাথে সে অন্যদের জীবন রক্ষাকারী।

আমেরিকান কাটা ঠোঁট আর জমজের ( Harelips and Twins) মিথে দেবতা হিসেবে খরগোশের চরিত্র এতটা ধোঁয়াটে যা বর্ণনা কারী ও নৃতাত্ত্বিকদের ভীষণ ভুগিয়েছে। কখনো সে খুব প্রজ্ঞাবান একজন দেবতা যার কাঁধে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষার মত গুরুদায়িত্ব, আবার কখনো সে হাস্যকর এক ভাঁড়ের চরিত্রে যে কেবলই এক ঝামেলা থেকে আরেক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে।

মিথে বাইনারী পদ্ধতিঃ

কানাডার মিথে স্কেট মাছের দখিনা হাওয়াকে বন্দী করার গল্প শোনা যায়। এটি এমন সময়ের গল্প যখন পৃথিবীতে পশু ও মানুষ সেভাবে আলাদা হয়ে ওঠেনি। সেসময় ভীষণ বাতাসে সবকিছু বিপর্যস্ত হয়ে ওঠেছিল। তাই প্রাণীকুল দখিনা বাতাসকে জব্দ করতে স্কেট মাছের সাথে কিছু মানুষ-পশু অংশ নিল। ফলে দখিনা হাওয়া হার মানল, শর্ত হল ভবিষ্যতে সে আর এভাবে সারাক্ষণ বইবে না, শুধু মাঝে মাঝে বইবে। সেই থেকে দখিনা হাওয়া বছরের কিছুদিন বয় বা দুইদিনে একদিন বয়। বাকি সময়টা মানুষ নির্বিঘ্নে নিজের কাজ করতে পারে।

এতে বর্ণিত স্কেট মাছের চরিত্রে দু’ধরণের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত এটি চ্যাপ্টা এবং পিচ্ছিল মাছ, দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাপার, স্কেট মাছকে ওপর বা নীচ থেকে দেখতে বিরাট মনে হয়, কিন্তু পাশ থেকে খুব পাতলা। ফলে শত্রুর মোকাবেলার সময় এ মাছ তাড়াতাড়ি চম্পট দিতে পারে। তীর নিশানা করলেই দেখা যায় স্কেট মাছ নিমেষে ঘুরে বা পিছলে যায়। স্কেট মাছকে এ কাহিনীতে আমদানি করা হয়েছে কারণ সাইবারনেটিক্সের ভাষায় বললে- এটি কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দিতে সক্ষম। মাছটি বাইনারী পদ্ধতির মত বিপরীত অবস্থা তৈরি করতে পারে, একটা ইতিবাচক, অপরটি নেতিবাচক।

মহাভারতে দেখা যায় কৃষ্ণ কৌশল করে পান্ডব বাহিনীকে জিতিয়ে দেয়। শকুনি বরাবর অভিযোগ করে এসেছে ‘মায়াবী কৃষ্ণ’, ছলনার দ্বারা তার ভাগ্নেকে পরাজিত করে। পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে রাজদরবারে অফিসিয়াল ভাঁড়ের কাজ একই। ঐতিহাসিক ট্রিকস্টার চরিত্র হিসেবে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, গোপাল ভাঁড়ের নাম বিখ্যাত। আধুনিক সমাজে সার্কাসের ক্লাউন ভাঁড়ের চরিত্রে ট্রিকস্টার চরিত্রের নৈতিক দ্বন্দ্বের  মাধ্যমে মানবজীবনের দ্বৈধতাকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা দেখা যায়। মৃত্যু বা বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই হাসা,বা পরমুহুর্তে আবার কাঁদা সহজ নয়।

দ্বৈতবাদঃ

ভারতীয় দর্শনে সাধারণত প্রমাণ দু’প্রকার- ক) প্রত্যক্ষঃ ইন্দ্রিয়গোচর, চাক্ষুষ প্রমাণ খ) অনুমানঃ পূর্বকৃত প্রত্যক্ষ হতে অনুমান। নৈয়ায়িকদের মতে প্রত্যক্ষ ছাড়াও আরও দু’প্রকার প্রমাণ আছে, ক) উপমান বা তুলনা খ) শব্দ, আপ্তোপদেশ বা বেদ। বেদান্ত দর্শনে কেবল প্রত্যক্ষকেই প্রমাণ বলে স্বীকার  করা হয়। বেদান্ত অদ্বৈতবাদী দর্শনে জগত মায়া, একমাত্র ব্রহ্ম সত্য।

কিন্তু দ্বৈতবাদে ‘ব্রক্ষ্ম সত্য, জগৎ ব্রক্ষ্ম’। দুনিয়ায় বাস করে রক্তমাংসের মানুষ বলতে পারে না যে দুনিয়াটা মায়া। ফলে ব্রক্ষ্মা বা সৃষ্টিকর্তা যেমন সত্য, তেমনি দুনিয়াটাও সত্য। আশেক আর মাসুকে, পুরুষ-প্রকৃতি, রাধা-কৃষ্ণের বিচ্ছেদ এ দ্বৈততার অনুভূতির প্রাণ নিংড়ানো নির্যাস। মহাবিশ্ব বা প্রকৃতি পুরুষের কীর্তি, কিন্তু পুরুষ প্রকৃতিতে নেই, পুরুষ অধরা। অর্থাৎ সৃষ্টি জগত আর স্রষ্টায় ফারাক আছে, সৃষ্টি জগতে তাকে পাওয়া যাবে না, কিন্তু তার নিশানা বুঝা যাবে। আরেক অর্থে জগত প্রকৃতিতে কোন পুরুষ নেই, সৃষ্টিকর্তাই একমাত্র কর্তা, বাকি সব অকর্তা। পাণিনির সূত্রে আছে ‘কর্তৃকারকই এক মাত্র কারক’। ফলে সাধকেরা রাধাভাব বা নারীসত্তা নিয়ে সে অধর, পরমপুরুষ কর্তার ভজনা বা আরাধনা করেন। বিচ্ছেদের অনলে পুড়ে, নিজের দ্বৈত সত্ত্বার উপলদ্ধি থেকে পরম পুরুষের সাথে লীন হয়ে এক হয়ে যেতে চান।

চিন দেশের ধর্ম এবং দর্শনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ইন এবং ইয়াং।

ভাববাদ বস্তুবাদঃ

দর্শনের জগতকে মোটের উপর দুভাগে ভাগ করা যায়, ভাববাদী এবং বস্তুবাদী দর্শন। ভাববাদে বস্তুজগতের দ্বান্দ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে দ্বান্দ্বিক দর্শনের আবির্ভাব, ঐতিহাসিক বাস্তবতায় বিভিন্ন কর্মের পারস্পরিক সম্বন্ধের ভিত্তিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় অবস্থান থেকে কোন কিছুর হয়ে ওঠাকে বুঝার চেষ্টা দ্বান্দ্বিক দর্শনের লক্ষ্য। ৩ উপায়ে দ্বন্দ্বময় অবস্থাকে উপলদ্ধি করা যায়

ক) নয় (thesis), প্রতিনয় (antithesis) এবং সমন্বয় (synthesis)এর মাধ্যমে

খ)  অসংখ্য স্তরের মধ্যে প্রতিস্তরে এর পূর্ববর্তী স্তরকে বাতিল করে এগিয়ে যাওয়া

গ) কোন বস্তু বা তার পরিবেশে বিপরীত শক্তির ফলাফল বিবেচনা করে

বিপরীত ধারনা যুক্ত জগতের দ্বন্দ্বময় অবস্থাকে ভারতীয় দর্শনে বলা হয় ‘বিজ্ঞানময় অবস্থা’। দুটি বিপরীত ধারণার সহাবস্থান থেকে জ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এতে কেউ ভাবের প্রাধান্য দেন, কেউ বস্তুকে উৎস মনে করেন। প্লেটো, সক্রেটিস, হেগেল ভাববাদী, পক্ষান্তরে গ্রিক এপিকিউরীয়ান এবং ভারতীয় চার্বাকরা বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারী। বস্তুবাদী দর্শন সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের প্রতিবাদী দর্শন।

দার্শনিক পীথাগোরাস এরকম দশটি বিপরীত (enantia) জিনিসের তালিকা করেছেন। সীমা-অসীম, জোড়-বেজোড়, এক-বহু, ডান-বাম, পুরুষ-নারী, স্থির-গতিশীল, সোজা-বাঁকা, আলো-অন্ধকার, ভাল-মন্দ, বর্গাকার-গোলাকার। হেরাক্লিটাস ভাবতেন সকল কিছু বিপরীত জিনিসের সংঘর্ষে যে অনন্যতা সৃষ্টি হয় তার শক্তিতেই চলে।

কর্তা এবং কর্মের সম্পর্ক, সাবজেক্ট এবং অবজেক্টের সম্পর্ক দর্শনে একটা উল্লেখযোগ্য স্থান নিয়ে আছে। বাহিরের বস্তুজগত বা অবজেক্টকে আমরা কিভাবে জানি বা জানতে পারে সে নিয়ে পাশ্চাত্য দর্শন বুদ্ধিবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদ নামে দুটো প্রধানভাগে বিভক্ত। বুদ্ধিবাদীরা মনে জগত সম্বন্ধে আমাদের ধারনা পরোক্ষ, কতগুলো ভাবনা বা ধারনা দিয়ে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে মূল্যায়ন করি, ফলে দুনিয়াকে ‘এজ ইট ইজ’ আমরা জানতে পারি না। অপরদিকে অভিজ্ঞতাবাদীরা মনে করেন ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাই মূল কথা, অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বাহিরের জগত সম্পর্কে জানতে পারি।

ট্রিকস্টার পুরাণে যেমন মানুষের দুটি বিপরীত গুনকে স্বীকার করে তা আত্মস্থ করার চেষ্টা করা হয়। তেমনি দুনিয়ার অন্যতম আদিম ধর্ম যেমন জরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মে দুজন দেবতার নাম দেখা যায়।  এদের একজন ভাল, তার নাম আহুরা মাজদা, আরেকজন সকল মন্দ কাজের জন্য দায়ী তার নাম আংরি মাইনু। পরবর্তীতে ধর্মতত্ত্বে বিবর্তন হতে হতে আমরা বাইবেলের প্রথম দিকে ইয়াওয়ে’র মধ্যে মানবিক দোষ-ত্রুটি সম্পন্ন, রাগান্বিত দেবতাকে দেখতে পাই। তারপরে বাইবেলের আইয়ুব নবীর কাহিনী ‘জবের বই’ থেকে আমরা দুনিয়ার যত মন্দ কাজ হয়, ‘ভাল ঈশ্বর’ কেন মন্দ কাজ হতে দেন সেটার একটা সূরাহা করার চেষ্টা দেখি। তাতে বলা হয়, ঈশ্বর আসলে সব ভাল গুনের অধিকারী, দুনিয়াতে মন্দ কেন হয় সেটা আমাদের জ্ঞানের অতীত, একমাত্র তিনিই জানেন। আরো পরে এসে আমরা মন্দ কাজের জন্য একজনকে পাই, যে হল ‘শয়তান’, যার প্ররোচনায় সব খারাপ কাজ হয়। ‘শয়তান’ এর মত ‘ফল গাই’ এর কারনে দুজন দেবতার আর প্রয়োজন পড়ে না।

জরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মের দুই দেবতা বা ঈশ্বর। একজন ভাল গুনের যার নাম আহুরা মাজদা ( ছবিতে উপরে), আরেকজন মন্দ গুনের যার নাম আংরা মাইনু।

স্বর্গ আর নরক মানুষের দুটি মানসিক অবস্থা। কবি,সাহিত্যিক, দার্শনিকরা দুটো ভাব ধারণ করে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। বাঙালী কবির ভাষায়, স্বর্গ আর নরক দূরে কোথাও নয়, মানুষের মাঝেই স্বর্গ আর নরক। স্বর্গ আমাদের কল্পনা বিলাসী স্বপ্নময় আলোকের অভিজ্ঞতা। স্বর্গ অনৈসর্গিক আলো,বর্ণের তীব্রতা,অনৈসর্গিক তাৎপর্যময় অভিজ্ঞতা। স্বর্গীয় প্রতীক হিসেবে দেখা যায় স্বচ্ছ ফল, স্ফটিক, আগুনের পাথর, বর্ণিল খনিজ পদার্থ, সুন্দর ফুল, অপরূপ  সৌন্দর্যময়  মণিমুক্তা। দার্শনিক প্লেটোর ‘ফিডো’ স্বর্গ অনুপ্রাণিত রচনা। স্বর্গের মানসিক অবস্থা একটা সুবিধাজনক অবস্থান যেখান থেকে সাধারণ ব্যক্তিগত অস্তিত্বের অবস্থা থেকে আরও পরিষ্কারভাবে দিব্যভূমি অবলোকন করা সম্ভব।

অপরদিকে নরক অচেতন ভারী শরীর,যন্ত্রণাদগ্ধ চেতনাময় মানসিক অবস্থা। নরকের অভিজ্ঞতায় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীর বিশুদ্ধ আলোর জগত থেকে সরে অতল গহবরের দিকে ধাবিত হয়। নরক ভগ্নমনোরথ,মাতলামি,সংকুচিত, ভয়, ঘৃণা,ক্রোধ,আতঙ্কগ্রস্ত মানসিক অবস্থা। ইতালীর কবি দান্তের ‘ইনফারনো’, কাফকার রচনায়, শিল্পী ভ্যান গগ এবং গয়্যার চিত্রকর্ম নরকের অভিজ্ঞতা আরোপিত শিল্প সাহিত্য।

সঙ্গীত এবং নাটকে দুটি বিপরীত ধারণার বিরোধঃ

ফিউগ নামে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের যে প্রকারটি বাখের সময়ে ধ্রুপদী সঙ্গীতের মাত্রা পায় আশ্চর্যজনকভাবে  সেটি নির্দিষ্ট কিছু মিথের একেবারে জীবন্ত প্রতিফলন বিশেষ করে যেসব মিথে দুটি বাঃ দুই দল চরিত্র রয়েছে। যেমন ভাল-খারাপ, মিথের গল্প হল একদল আরেক দলের নিকট থেকে পালাচ্ছে, ফলে এখানে ধাওয়া করার একটা ব্যাপার আছে, কখনো ‘ক’ দল ‘খ’ দলের সাথে মিলিত হয়, কখনো ‘খ’ দল পালায় যার সবই ফিউগে পাওয়া যায়। এ বিরোধ বা বৈপরীত্য চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না দুটি দলের মধ্যে পুরোপুরি গুবলেট পাকিয়ে যায়- এ অবস্থাটা ফিউগের স্ট্রেটার মত। শেষে চুড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স আসে দুই নীতির সমন্বয়ের প্রস্তাবনার মধ্যে দিয়ে পুরো মিথ জুড়ে যার বিরোধিতা চলে আসছিল।

সেক্যুলার থিয়েটারের উতপত্তির মূলে কৃষিজীবি সমাজের মৌসুমী রিচুয়াল, গ্রিক ট্রাজেডিতে এসব রিচুয়ালের ফরম্যাট দেখা যায়। ট্রাজেডিতে ক) দুটি বিপরীত ধারণা যেমন, জীবন এবং মৃত্যু,গড এবং ড্রাগনের  মধ্যে সংঘর্ষ, খ) ঈশ্বরের বিয়োগান্তিক ভোগান্তি এবং মৃত্যুতে বিলাপ, গ) তাঁর পূনরুত্থানে আনন্দ, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা ইত্যাদি।

বাংলা আঞ্চলিক গানে, আধুনিক গানে নানা বিপরীত বিষয়ের  মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়।

আলো-অন্ধকারঃ

“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো”। ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

“আশা করি আলোক পাব, ডুবে যাই অন্ধকারে”। (শাহ আব্দুল করিম)

কালো-গৌরঃ

“যেদিন কালো ছেড়ে গৌর হবে সেইদিন, তুমি সেইদিন ঋণে খালাস পাবে”।

জ্যান্তে-মরার সাধনা বাউল-ফকিরদের সাধনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন বাউল গানে এর রেশ পাওয়া যায়। শুধু জীবিত থেকে জীবন আর মৃত্যুর দ্বন্দ্বকে ধরা যায় না, আবার মৃতের রাজ্যে জীবিতের কোন স্থান নেই। জীবনের গন্তব্য মৃত্যুর দিকে, জন্মালে মৃত্যুর স্বাদ নিতেই হবে। বাউলের সাধনা তাই জ্যান্তে-মরার সাধনা, জীবন আর মৃত্যুর দ্বন্দ্বকে এক করার সাধনা।

“তা কি পারবি তোরা জ্যান্তে মরা সেই প্রেমসাধনে।

যে প্রেমে কিশোর –কিশোরী মজেছে দুজনে।। – ফকির  লালন

মনোবিজ্ঞান এবং সমাজ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ‘Ambivalence’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারনা। সমাজবিজ্ঞানী বোম্যান এর ভাষায় এট আমাদের ঐক্য খোঁজার প্রচেষ্টা, ‘Quest for order’। সমাজ বিজ্ঞানের নানা শাখায় ‘এম্বিভ্যালেন্স’ শব্দটা দিয়ে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা হয়। এর মানে পারস্পরিক সম্পর্কের দোদুল্যমানতা ; যুগপৎ এবং পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী, লাভ-হেইট রিলেশানশীপ, ‘the simultaneous existence of attraction and repulsion, of love and hate’। অর্থাৎ, কোন সম্পর্কই চিরস্থায়ী শত্রুতা বা মিত্রতার নয়।

সমাজবিজ্ঞানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারনা হল  আপন এবং পর, আস এন্ড দেম, এর ধারনা। ‘অপর’, ‘আদার’ কারা তাদের কী ভাবে বুঝব? কাকে অপর ভাবব, কাকে আপন ভাবব? ফকির লালন বলেন, ‘পর বলতে পরমেশ্বর’, কিন্তু পাশ্চাত্য, ঔপনিবেশিক চিন্তাপ্রসূত এসব কম্পার্ট্মেন্টালাইজড বিষয়ে মানুষকে নানাভাবে ‘অপর’, ‘ভিন্ন’ বলে চিহ্নিত করা হয়।

বিজ্ঞানঃ

সরলরেখা  দ্বৈত সম্পর্কের সংশ্লেষণ। বিন্দু যখন চিৎসত্তা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তখন সৃষ্টি হয় সরলরেখা। জ্যামিতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী পাশাপাশি দুটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দুরত্ব সরলরেখা। দুটি বিন্দুর মধ্যে অসংখ্য রকমের সম্পর্ক তৈরি করা যেতে পারে কিন্তু একমাত্র সরলপথে তাদের অবস্থান সবচেয়ে কাছাকাছি। গ্যালিলিও এবং আইনস্টাইনের কাছ থেকে আমরা জানি স্পেস বঙ্কিম (curved) হওয়ায় বাস্তবে সরলরেখার কোন অস্তিত্ব নেই।

নিউটনের মহাকর্ষ সুত্র দুটি বিন্দুর মধ্যে আকর্ষণ এবং বিকর্ষণের মধ্যে সামঞ্জস্য করে। আধুনিক যুগে ডেমোক্রিটাস নয় বরং নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের প্রভাবে বিভিন্ন আকারের কঠিন, ভরবেগ সম্পন্ন, অভেদ্য কণার ধারণাই ইওরোপীয়ান মানসে সাড়া তুলতে ফেরেছিল।

পরমাণুর গঠন ব্যাখ্যায় এর অভ্যন্তরে ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক কণার আধান বা চার্জের সমতার বিধান দেখা যায়। জৈব রসায়নে দেখা যায় অপ্রতিসম জৈবযৌগের গঠনে ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে বস্তুকণাগুলো পরস্পরের সাথে যে সম্বন্ধে যুক্ত থাকে আয়নাতে সে যৌগের প্রতিরুপে বস্তুকণাগুলো ভিন্নভাবে সন্নিবদ্ধ থাকে। এক্ষেত্রে দুটি যৌগের গঠন, সংকেত, ভৌত-রাসায়নিক ধর্ম এক কিন্তু তাদের একটিকে অন্যটির উপরে প্রতিস্থাপন করা যায় না । যেমন ডান হাত বাম হাতের প্রতিরুপ, কিন্তু ডানহাতকে বামহাতের উপর বসিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না, বুড়ো আঙ্গুল এসে পড়ে কনিষ্ঠ আঙ্গুলের উপর। কেবলমাত্র নমস্কারের ভঙ্গিতেই দু’হাতের মিলন সম্ভব।  এখন এ যৌগের দ্রবণের মধ্য দিয়ে এক বর্ণের আলো চালনা করা হলে যৌগটি যদি আলোক-সক্রিয় হয় এবং আলোকে ডানদিকে ঘুরায়, তবে আয়নাতে তার প্রতিরুপ যে যৌগটি তা আলোকে বাম দিকে ঘুরাবে। যারা আলোকে ডানদিকে ঘুরায় তাদের বলা হয় ডেক্সট্ররোটেটরি, যার প্রতীক ডি, অন্যদিকে যারা আলোকে বামদিকে ঘুরায় তাদের বলা হয় লেভোরোটেটরি, যার প্রতীক এল। প্রকৃতিতে পাওয়া সব এমিনো এসিড এল-এমিনো এসিড। কৃত্রিমভাবে ডি-এমিনো এসিড তৈরি করা সম্ভব। ডি আর এল-এমিনো এসিডের সমান পরিমান মিশ্রিত করা হলে তার তৈরি দ্রবণ আর আলোকে কোনদিকে ঘুরাতে পারে না, তখন তাকে বলা হয় আলোক অসক্রিয় বা রেসেমিক মিশ্রণ।

রাসায়নিক অনুগুলোর আয়নায় প্রতিফলিত হলে যে ছবি পাওয়া সেসব অনু দেখতে একই রকম হলেও তাদের থ্রি ডি কাঠামো ভিন্ন ফলে তাদের রাসায়নিক চরিত্রও ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন, চিত্রে এল- এমিনো এসিড এলানিন এর ‘মিরর ইমেজ’ হলো ডি এলানিন, যাদের অনেক ধর্ম এবং ক্রিয়া ভিন্ন।

আমাদের জীবনে নানা বিষয়ে বিপরীত ধারনা, ভাবনা, বিপরীত চিহ্ন বা পরিচয় আমাদের বুঝার সুবিধার জন্য। এরকম পার্থক্য না করলে আমরা বুঝতে পারি না, আমাদের বুদ্ধি এ বিপরীতের মধ্যে সম্পর্ক  করেই জ্ঞান লাভ করে। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্যে মজে গিয়ে আমরা আপাত বিপরীতের থেকে তাদের অন্তর্নিহিত মিল,   দ্বান্দ্বিক কিন্তু পরিপূরক সম্পর্কের কথা ভুলে বসি এবং তাতেই যত বিপত্তি বাঁধে।

নাজিম উদ্দিন এর ব্লগ   ৪৪১ বার পঠিত