আঞ্জুমান আরা
Adolf Hitler talking to Grand Mufti Haj Amin el Husseini Keystone. Photo courtesy: Times

 

কে এই গ্র্যান্ড মুফতি হাজী আল হুসাইনি? আল হুসাইনির জন্ম প্যালেস্টাইনে। উনি প্যালেস্টাইনে বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা ছিলেন।

আল হুসাইনি সৎ ভাই কামালের মৃত্যুর পর প্যালেস্টাইন একধরনের ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, রাজনৈতিকভাবে নড়বড়ে একটা স্টেটে আরব এবং জিউসদের (ইহুদি )মধ্যে ক্রমাগত সংঘাত লাগতেই থাকে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ শাসকরা ১৯২১ সালে হুসাইনীকে পুরা প্যালেস্টানের গ্রান্ড মুফতি (প্রধান ধর্মীয় নেতা ) হিসেবে দায়িত্বে বসায়। যদিও ব্রিটিশ আশা করেছিল আল হুসাইনি হয়ত এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে এবং আরব মুসলিম এবং ইহুদিদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছিল ঠিক তার উল্টো, আল হুসাইনি ক্ষমতাই বসার পরই, এই বলে মিথ্যা গুজব ছড়াতে লাগে যে ইহুদিরা আল আকসা মসজিদে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার পায়তারা করছে। এই গুজব আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজ্যে, যার ফলে অগাস্ট মাসের ২৩ তারিখে জেরুজালেম এবং ইহুদিদের উপর আক্রমণ করা হয়, যেখানে ১০৯ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। শুরু হয় প্রোপাগান্ডার যুদ্ধ।

 

নাজির সাথে মুফতির মদপান

 

ওই ঘটনায় ব্রিটিশের তদন্তে হুসাইনির ১০ বছরের জেল হয়, কিন্তু সেখান থেকে সে পালিয়ে প্রথমে সিরিয়া তারপর ইরাকে চলে যায়। ১৯৪১ সালে সাদ্দাম হোসেনের শ্বশুর জেনারেল খারিল্লা তুলফাহর সাথে এক হয়ে ইরাকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ওইখানের জিউসদের আক্রমণ করা শুরু করে, কিন্তু সেটাও ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার দায় তৎকালীন ইরাকে বসবাসরত খ্রিস্টান এবং জিউসদেরকে দায়ী করে হুসাইনি রেডিওতে একটা ঘোষণা দেয় এই বলে যে – ওরা বিশ্বাসঘাতক, ওদেরকে দেশছাড়া করতে হবে, শুরু হয় ইরাকে হাজার বছর ধরে বসবাস করা খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ওপর অক্রমণ; যা ফাহুদ নামে পরিচিত, ফলাফল শত শত মানুষের লাশ। আবারো ব্রিটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে, আগেরবারের মতো এবারও উনি পালিয়ে তেহরান হয়ে ইস্তাম্বুলে (ইজিপ্ট) জাপানিজ দূতাবাসে গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করে, কিন্তু সেখানেও পরিস্থিতি অনুকূলে নাই দেখে উনি মেয়েদের পোশাক (বোরখা) পড়ে ইতালিয়ান কাউন্সিলরের সাহায্যে ইস্তাম্বুল থেকে পালিয়ে ইতালিতে পৌঁছায়।

ওইখানে তিনি মুসোলিনির বন্ধু হয়ে ওঠেন এবং ওনার সাহায্য প্রার্থনা করেন, আল হুসানী বলেন যাতে তেলআভিবে (Tel Aviv যে জায়গা সাগরের কিনারে অবস্থিত) পানিতে বিষ ঢেলে দিতে যাতে ইহুদিরা পানি পান করে মারা যায়। কিন্তু ভাগ্যিস তারা সেটা করতে না রাজী থাকায়, এই ইচ্ছের আর বাস্তবায়ন হয়নি।

 

গ্র্যান্ড মুফতি হাজী আল হুসাইনি

 

Video: The Nazi Collaborators: The Grand Mufti

Video: The Turban and the Swastika, Amin Al-Husseini and the nazis

 

ওইখান থেকে মুফতি ১৯৪১ সালে জার্মানিতে হিটলারের সাথে দেখা করেন এবং হিটলারকে আশ্বাস দেন এই বলে যে, ইহুদি নিধনের সাথে আমি এবং আরব বিশ্ব এককাতারে আছি, এবং মন থেকে হিটলারকে ধন্যবাদ জানান, হিটলার খুশি হয়ে তাকে আলিশান বাড়িতে থাকতে দেন। যেটা বার্লিনে কল্পস্তক রোডে অবস্থিত ছিল (আছে) এবং ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মুফতির এই বাড়িটাও এক ইহুদিরই ছিল যাকে হত্যা করা হয়। আল হুসাইনিকে একজন নাজী সাহায্যকারী হিসেবে নাজী (NAZI) মাসে ৭৫০০০০ Reichsmark (জার্মান টাকা) ভাতা দিতেন। মুফতির অনেক ভাষণ আরবিতে রেকর্ড করে ইতালির ‘Bari ‘ টাওয়ার থেকে আরববিশ্বে প্রচার করা হতো। একটা ভাষণ আমি অনুবাদ করছি –

“যেখানেই ইহুদিদের পাও হত্যা করো, এটা আল্লাহকে খুশি করা হবে, ধর্ম রক্ষা হবে এবং আল্লাহ আমাদের মর্যাদা রক্ষা করবে। আল্লাহ তোমাদের সাথে আছে।”

তিনি সরাসরি কোরানের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে এই ভাষণ প্রচার করতেন (প্লিজ কেউ আমাকে বলবেন না উনি কোরানের অর্থ বুঝতেন না, কারণ উনি ইমাম হুসাইনেরই বংশধর ছিলেন এবং আরবিতে পণ্ডিত মানুষ)

মুফতি হিটলারকে রিকোয়েস্ট করে যাতে কোনোক্রমেই ইহুদিদেরকে  [জু’দেরকে(JEW)] প্যালেস্টাইনে পাঠানো না হয়, দরকার হলে সবাইকে হত্যা করা হোক। হিটলারের গ্যাস চেম্বারের পিছনে তার পরোক্ষ হাত আছে বলে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের তদন্তে উঠে আসে (যদিও এটা তারা অস্বীকার করে)। এই সেই গ্যাস চেম্বার যেখানে মানুষকে পুড়িয়ে বাষ্প করা হতো।

মুফতি অনেকভাবেই এই যুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন যেমন ধরুন মুফতি বোসনিনান ২৭,৯৯৯ জন পুরুষকে নিয়ে এস,এস নাজী মুসলিম ডিভিশন গঠন করেন যেটা হাঁনজার ভিভিশন নামেও পরিচিত ছিল। এই ডিভিশন ২৫০০০০ সার্বস (SERB), উদ্বাস্তুএবং ইহুদিদেরকে হত্যা করে।

হিম্লাকে (হিটলারের এক মন্ত্রী) হুসাইনিকে একটা চিঠিতে লেখেন, যার অনুবাদ হলো –

“ইসলামের সাথে আমার কোনো দ্বিমত নেই, এটা ডিভিশনের যোদ্ধাদের শিক্ষা দেয়, বেহেস্তের পাবার অঙ্গীকার দেয় যদি তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং মারা যায়, যোদ্ধাদের উতসাহিত করার জন্য এটা ধরনের মোটিভেশন অনেক জরুরী।”

শেষ করার আগে মুফতির একটা চিঠির কথা উল্লেখ করতে চাই, যেটা উনি অ্যাডলফ এইচম্যাননকে লিখেছিলেন। হুসাইনি এক পর্যায়ে জানতে পারলেন যে রেডক্রসের হস্তক্ষেপে এলাইড ফোর্সের (অন্য দেশগুলোর) সাথে নাজির একটা চুক্তি হয়েছে যেখানে তারা ৪০০০ পোলিশ ইহুদি শিশুদের ফেরৎ দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এই কথা শোনার সাথে সাথে মুফতি ক্ষেপে যান এবং সাথে সাথে চিঠি লেখেন, যার অনুবাদ হলো –

“আপনি কি জানেন না যে এই ছোট ইহুদিরা বড় হয়ে বড় ইহুদি হবে?…”

 

কী ঘটেছিল তাহলে ওই শিশুদের কপালে?

সবাইকে গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।

 

 

রেফারেন্স:

বই থেকে –

১) Nazi Palestine: The Plans for the Extermination of the Jews in Palestine BY Klaus-Michael Mallmann, ‎Martin Cüppers, ‎Krista Smith

২) The Arabs and the Holocaust: The Arab-Israeli War of Narratives BY Gilbert Achcar

৩) Nazi Propaganda for the Arab World By Jeffrey Herf

৪) Islamic Fascism By Hamed Abdel-Samad

ওয়েবসাইট থেকে –

১) Times: What Hitler and the Grand Mufti Really Said

২) WORLD FUTURE FUND: ADOLF HITLER AND THE GRAND MUFTI OF JERUSALEM, OFFICIAL TRANSCRIPT OF MEETING, NOVEMBER 28, 1941 BERLIN, GERMANY

৩) Frontpage Mag: Muslim Nazis are the real victims of a new Holocaust

৪) Tablet Mag: Fabricating Palestinian Responsibility for the Nazi Genocide

৫) The Grand Mufti Of Jerusalem Haj Amin Al-Husseini