গিয়াসুদ্দিন

মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রীর নাম খাদিজা। মুসলিম জগতে তিনি হজরত খাদিজাতুল কুবরা [রাযি আল্লাহ আনহা] নামেও পরিচিত। তাঁর পিতার নাম খোয়ায়লিদ ও মায়ের নাম ফাতিমা বিনত জায়দা। খোয়ায়লিদ ছিলেন একজন বণিক ও উচ্চশিক্ষিত। তাঁর ৬ষ্ঠ পুরুষ ইবনে কিলাব ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ পুরুষ এবং তিনি ছিলেন মক্কার শাসক। স্বভাবতই উত্তরাধিকারসূত্রে খাদিজা ছিলেন একজন বিত্তবান, প্রভাবশালী ও বিদুষী নারী। ছিলেন খুব সুন্দরীও। তিনি ছিলেন প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বুদ্ধিমতীও। তাঁর পিতা তাই তাঁর হাতেই বাণিজ্য ও সংসার পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছিলেন। যদিও তাঁর আরো দুই ভাই ও তিন বোন ছিল।

মুহাম্মদের সঙ্গে খাদিজার বিয়ের আগে তাঁর একাধিক বিয়ে হয়েছিল। মোট কয়টি বিয়ে হয়েছিল তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। একটা মত হলো দুবার, আর একটি মত হলো তিন বার। অবশ্য অধিকাংশ মত হলো দুবার বিয়ে হয়েছিল। যাঁরা মনে করেন খাদিজার তিন বার বিয়ে হয়েছিল তাঁদের মধ্যে আহমদীয়া মুসলিম জামাতও আছে। এই জামাতের পক্ষ থেকে মৌলানা দোস্ত মোহাম্মদ শাহেদ লিখেছেন,

“তাঁর প্রথম বিয়ে আবু হালা-র সাথে হয়। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পরে আতিক বিন আয়েব- এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় এবং তারপরে সাফি বিন উমাইয়ার সাথেও তাঁর বিয়ে হয়। সাফির মৃত্যুর পর তিনি তৃতীয়বারের মতো বিধবা হয়ে যান।”

[সাইয়্যেদাতুন নিসা, হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাযিআল্লাহ আনহা, পৃ-২]

খাদিজার জীবনীকার বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ মুফাচ্ছিরে কোরআন ও গবেষক মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদীও বলেছেন মুহাম্মদ ছিলেন খাদিজার চতুর্থ স্বামী। তিনি লিখেছেন,

“একাধারে তাঁর মহান দায়িত্ব পালন ও কর্তব্য সাধনে উৎসাহ ও প্রেরণাদানকারিনী, তিনি ইসলামের সেবায় মুসলিম জাহানের সর্বপ্রধান মাতৃত্বের আসন গ্রহণ করবেন। আল্লাহপাকের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কী করে সে খাদীজাতুল কোবরা [রাঃ] বসে থাকতে পারেন এক সাধারণ গৃহের কুলবধূ হিসেবে? এ সাময়িক ঘটনার অবসান ঘটিয়ে আল্লাহপাক হযরত খাদীজা [রাঃ}-কে যথাস্থানে পৌঁছে দিবেন তাই গন্তব্যে পৌঁছার পথ পরিষ্কার হওয়া দরকার। সে প্রয়োজনে হযরত খাদিজা [রাঃ]-এর তৃতীয় স্বামীও বিয়ের মাত্র কয়দিন পরেই ইন্তেকাল করলেন।”

[দ্রঃ হযরত খাদীজা (রাঃ) এর জীবনী, বাংলা বাজার ঢাকা, পৃ- ৩০,৩১]

উকিপিডিয়ার একটি সূত্র একইকথা বলছে,

“Khadija married three times and had children from all her marriages. While the order of her marriages is debated, it is commonly agreed that she first married Abu Hala Malak ibn Nabash ibn Zarrara ibn at-Tamimi and second ‘Atiq ibn ‘A’idh ibn ‘Abdullah Al-Makhzumi. To her first husband she bore two sons, who were both given what were usually feminine names, Hala and Hind. Abu Hala Malak died before his business became a success. To her husband Atiq Khadija bore a daughter named Hindah. This marriage also left Khadija as a widow.”

খাদিজার প্রথম বিয়ে হালা না আতিক – কার সাথে হয়েছিল তা নিয়েও প্রবল মতভেদ আছে। মতভেদ আছে খাদিজার স্বামী আতিক মারা গিয়েছিলেন, নাকী আতিকের সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল তা নিয়েও। অবশ্য বেশিরভাগ মতই হলো- আতিক মারা গিয়েছিলেন, তবে নিশ্চিত করে বলা যায় না যে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় নি। উইকিইসলাম তো বলছে বিবাহ বিচ্ছেদই হয়েছিল,

“Most sources state that Atiq died, although there is a variant tradition that the marriage ended in divorce.”

খাদিজার আগের স্বামীরাও ধনী ছিলেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর বিশাল ধন-সম্পত্তি খাদিজা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। ফলে তাঁর ঐশ্বর্য বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। পিতার সম্পত্তি ছাড়াও স্বামীর সম্পত্তি ও টাকা-পয়সা যে উত্তরাধিকারসূত্রে খাদিজা পেয়েছিলেন তা মুসলিম ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিজীবীরাও অস্বীকার করেন না।

বাংলাদেশের লেখক মোহম্মদ সাদাত আলী এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

“ইতোপূর্বে তাঁর যে দুটো বিয়ে হয়েছিল, তারমধ্যে দ্বিতীয় স্বামী মৃত্যুকালে অগাধ সম্পত্তি রেখে যান। সেইসূত্রে খাদিজা [রাঃ] হয়েছিলেন অঢেল ধনসম্পত্তি ও বিত্ত-বৈভবের অধিকারিণী। বিরাট ব্যবসা ছিলো তাঁর। কর্মচারী রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করাতেন। বিষয়-আশয়ের তত্ত্বাবধান করতেন নিজে।”

[মহানবীর (সঃ) এর বিবাহ, পৃ- ১৭]

কিন্তু মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও ইসলামি পণ্ডিতরা দাবি করে থাকেন যে প্রাক ইসলাম যুগে আরবে নারীরা পিতা-মাতা-স্বামীর সম্পত্তির ভাগ পেতো না। তাঁরা এরূপ দাবি করেন মুহাম্মদ ও ইসলামের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্যে, কিন্তু তা যে সঠিক নয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খাদিজা।

খাদিজার বয়স নিয়েও তীব্র মতভেদ রয়েছে। সাধারণ একটা মত হলো যে খাদিজা জন্ম গ্রহণ করেন ৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে এবং পঁচিশ বছরের যুবক মুহাম্মদের সঙ্গে যখন বিয়ে হয় তখন তাঁর বয়স ছিলো চল্লিশ বছর। অন্য একটি মত হলো খাদিজার বয়স ছিলো তখন মাত্র ২৮ [আঠাশ] বছর। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস যিনি মুহাম্মদের আত্মীয় ও তাঁর সঙ্গে মদিনাতেই ছিলেন তিনিও এ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন,

“Abdullah ibn Abbas, the cousin who lived at Muhammad’s side through the final years in Medina, stated that “on the day Khadijah married Allah’s Messenger, she was 28 years old.”

খাদিজার বয়স চল্লিশ বছর ছিল মুহাম্মদের সঙ্গে বিয়ের সময়- এ কথা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথার্থ বলে মনে হয় না। কারণ, মুহাম্মদের ঔরসে খাদিজার ছ’টি সন্তান হয়েছিল।

চল্লিশ বছরে বয়সে বিয়ে হলে কোনো নারীর ছ’টি সন্তান হওয়াটা অবিশ্বাসযোগ্য। বিশ্ব মুসলিম সমাজ খাদিজার বয়স সংক্রান্ত  এই অবিশ্বাস্যযোগ্য তথ্যটিকে ধ্রুবসত্য বলে বিশ্বাস করে এবং তা আবার ইতিহাসে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এই অবাস্তব তথ্যটাকে মুসলিম ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নেতারা বিশ্বাস করতে ও আঁকড়ে ধরে রাখতে চায় মুহাম্মদের বিরুদ্ধে অত্যধিক যৌনাকাঙ্ক্ষা ও বহুগামিতার যে অভিযোগ আছে তাকে খণ্ডন ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যে। যেমন তাঁরা দাবি করেন যে, মুহাম্মদের বিরুদ্ধে উক্ত অভিযোগ সত্য হলে তিনি মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে চল্লিশ বছরের প্রায় বিগত যৌবনা এক নারীকে বিয়ে করতেন না। তাঁদের আরো দাবি যে খাদিজার সঙ্গে দীর্ঘ পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে দ্বিতীয় বিয়ে না করে প্রমাণ করে গেছেন যে তিনি বহুগামীতা পছন্দ ও সমর্থন করতেন না এবং তিনি ছিলেন তাঁর একমাত্র স্ত্রী খাদিজার প্রতি বিশ্বস্ত ও শ্রদ্ধাশীল।

খাদিজাকে বিয়ের পেছনে এই যে দুটি কারণের কথা মুসলিম ঐতিহাসিকগণ বলে থাকেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা যায় মুহাম্মদের শেষ জীবনে খাদিজার মৃত্যুর পর। খাদিজার মৃত্যুর পর মাত্র কয়েকদিন যেতে না যেতেই একেবারে শোকের আবহের মধ্যেই সওদার সঙ্গে মুহাম্মদ দ্বিতীয় বিয়েটি সম্পন্ন করেন। স্ত্রীর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা, সততা ও শ্রদ্ধা থাকলে কেউ এমন কাজ করতে পারে না। আবার সওদাকে বিয়ে করেই তিনি থেমে যান নি, কিংবা ইসলামি আইনে সর্বাধিক চারটি স্ত্রী একত্রিত করার যে বিধান আছে সেখানেও তিনি থামেন নি। শেষ তেরো বছরে তিনি আরো অসংখ্য বিয়ে করেছিলেন এবং সে সংখ্যাটা দু’ডজনেরও বেশি বৈ কম নয়।

যদি ধরে নেওয়ায় যায় যে বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্লাহ পুরুষদের জন্যে চারটি বিয়ে করার বিধান বা অনুমতি প্রদান করেছে, তা হলেও তাঁর কি উচিত ছিলনা একটার বেশি বিয়ে না করা। অর্থাৎ বহুবিবাহ না করা? তিনি তো আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ বলে দাবি করেছেন, নিজেকে তিনি তো দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরবেন। তিনি বহুবিবাহকে নিরুৎসাহিত করছেন সে কথা তো তিনি নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করবেন, এটাই তো কাম্য একজন মহাপুরুষের কাছে। তা না করে তিনি বরং বিয়ে করার সর্বোচ্চ সংখ্যাটাকে নিজেই ভাঙলেন এবং যাকে খুশি, যতো খুশি বিয়ে করলেন, এবং যাঁদের তিনি বিয়ে করেছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন রূপসী ও যৌবনে ভরপুর।

সুতরাং তাঁর থেকেও বয়সে বড়ো এবং বিধবা নারী খাদিজাকে বিয়ে করার পেছনে অন্য কারণ আছে যা মুসলিম ঐতিহাসিকগণ দেখতে পান না কিংবা দেখতে চান না। কী সে কারণ তা জানার জন্যে মুহাম্মদ ও খাদিজার বিয়ের ঘটনা ও পরিপ্রেক্ষিতটা ভালো করে জানা ও বোঝা দরকার। এটা ঠিক যে তাঁদের বিয়ের সমস্ত সত্যি ঘটনার খুটিনাটি বিবরণ এখন জানার অবকাশ নেই। তবুও ইসলামি ইতিহাস থেকে যেটুকু জানা যায় তা থেকেই আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে কেন মুহাম্মদ খাদিজাকে বিয়ে করেছিলেন।

খাদিজা [২৮] ও মুহাম্মদ [২৫] বয়সের দিক থেকে ছিলেন প্রায় সমজুটি এবং দেখতে দুজনেই ছিলেন ভারী সুন্দর, সৌম্যদর্শন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। এদিক থেকে তাঁদের দুজনের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব অস্বাভাবিক ছিল না। খাদিজার দৈহিক সৌন্দর্য ছিল এতো অপরূপ যা বর্ণনাতীত বলে মুসলিম ঐতিহাসিকরাও মানেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামি গবেষক মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী লিখেছেন,

“… এগুলো ছাড়া দৈহিক রূপ ও সৌন্দর্যের তার কোন তুলনা ছিল না। তখন আর বিশ্বে তাঁর তুল্য রূপসী রমণী অন্য কেহ ছিল না।”

[দ্রঃ হযরত খাদিজা (রাঃ) এর জীবনী, পৃ – ২৭]

কিন্তু বাকি সবদিক থেকেই তাঁরা ছিলেন পরষ্পর বিপরীত মেরুর মানুষ, সেদিক থেকে তাঁদের মধ্যে বিয়ে হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। খাদিজা ছিলেন সেই সময়ে মক্কার সবচাইতে ধনী বণিক, অপরদিকে মুহাম্মদ এতোই গরীব ছিলেন যে, তাঁকে একদা খাদিজার অধীনেই কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল। যাঁরা বিত্তবান সমাজে তাঁদের প্রতিপত্তি অনিবার্যভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে  থাকে, কিন্তু তৎকালীন সমাজে খাদিজার প্রতিপত্তি অন্যান্য সকল বিত্তবানদেরই ছাপিয়ে গিয়েছিল। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের মৌলানা দোস্ত মোহম্মদ  শাহেদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

“তিনি অনেক ধন সম্পদ ও প্রাচুর্যের অধিকারী হয়ে গেলেন। ফলে তাঁর কাছে ধন সম্পদ ও প্রাচুর্যের এক ভাণ্ডার জড়ো হয়ে গেল। ফলে মক্কার সকল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা তাঁর হাতে এসে গেল এবং সমস্ত আরবেই তাঁর ঐশ্বর্যের কথা ছড়িয়ে পড়ল।”

[সাইয়্যেদাতুন নিসা, হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাযি আল্লাহ আনহা, পৃ-২]

খাদিজার এই বিপুল প্রভাব ও প্রতিপত্তির বিপরীতে মুহাম্মদ ছিলেন যেমন বিত্তহীন তেমনি প্রতিপত্তিহীন একজন সাধারণ ব্যক্তি। খাদিজা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত রমণী, অপরদিকে মুহাম্মদ ছিলেন ‘নিরক্ষর’। মুহাম্মদ সত্যি নিরক্ষর ছিলেন কী না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কিন্তু এই সংশয়কে ইতিহাস কোনো গুরুত্ব দেয় নি। খাদিজা ছিলেন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী, অপরদিকে মুহাম্মদ ছিলেন পৌত্তলিক। খাদিজা কোন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে, কেউ কেউ মনে করেন তিনি পৌত্তলিক ছিলেন এবং তাঁরা আল্লাহর কন্যা উজ্জার উপাসক ছিলেন। এ প্রসঙ্গে উইকিপিডিয়া যা লিখেছে,

“Khadija was said to have neither believed in nor worshipped idols, which was a typical for pre-Islamic Arabian culture. According to other sources, however, she kept an idol of Al-‘Uzzá in her house.

মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদি লিখেছেন তাঁর পূর্বোল্লেখিত গ্রন্থের ২৬ পৃষ্ঠায় যে খাদিজা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীই ছিলেন। তিনি লিখেছেন,

“হযরত খাদীজা [রাঃ]-এর পরিবারস্থ লোকেরা বংশগতভাবেই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তাই তাঁদের পরিবারে তৌরাত ও ইঞ্জিল কিতাব দুখানির খুব বেশি চর্চা হতো। পরিবারের প্রায় সকলেই এ দুটি গ্রন্থের জ্ঞান আয়ত্ত করেছিল।”

আর্থিক, সামাজিক মর্যাদা, সামাজিক প্রতিপত্তি, সাংস্কৃতিক, ধর্মবিশ্বাস, শিক্ষাদীক্ষা প্রভৃতি সবদিক থেকেই খাদিজা ও মুহাম্মদের মধ্যে পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। তাঁদের দুজনের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। তাঁদের দুজনের মধ্যে বিয়ে হওয়াটা ছিল একেবারেই অসম্ভব ও অবাস্তব ব্যাপার। আর খাদিজা যেহেতু মাত্র ২৮ বছর বয়সেই স্বামীর মৃত্যুজনিত কারণে বিধবা হয়ে গিয়ছিলেন, তাই তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত, অতুলনীয় সুন্দরী ও সর্বাপেক্ষা ধনী ও প্রতাপশালী রমণীর জন্যে তাঁর উপযুক্ত পাত্রের অভাব ছিল না। বরং যেটা সত্যি তা হলো খাদিজা তৃতীয়বার বিধবা হওয়ার পর তাঁর পাণি গ্রহণের জন্যে অনেকেই তাঁর পিতার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু খাদিজা পূনরায় বিয়ে করতে সম্মত হন নি। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের একজন ঐতিহাসিক, রশিদ আহমদ চৌধুরী, তাঁর বইয়ে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

“After the death of her second husband, several respected and influential men of the Quraish tried to seek her hand in marriage but she rejected their offers. She resolved that she would not marry again and decided to live an independent life.”

[Vide: HADHRAT SAYYEDAH KHADIJAH, page – 14]

বলাবাহুল্য যে এরূপ একজন উচ্চ শিক্ষিত, রূপবতী, গুণবতী ও ঐশ্বর্যশালী বণিক মহিলার কাছে মুহাম্মদ স্বভাবতই পাত্র হিসেবে বিবেচনার যোগ্যই ছিলেন না। অথচ মুসলিম ঐতিহাসিকরা ও ইসলামি পণ্ডিতবর্গ প্রচার করে থাকেন যে, বিগতযৌবনা খাদিজাকে বিয়ে করে মুহাম্মদ এক বিরাট উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন! এ কথাটি যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবাস্তব এবং মুহাম্মদের ভাবমূর্তি বাড়ানোর জন্যে এরূপ প্রচার করা হয় তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না।  মুহাম্মদ উদারতা দেখান নি, দেখিয়েছিলেন খাদিজা তাঁকে বিয়ে করে। মুহাম্মদ যে খাদিজার উপযুক্ত পাত্রী ছিলেন না, তা তিনি নিজেও উত্তমরূপে জানতেন, এবং খাদিজার দূত যখন তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান তখন তিনি সে কথা নিজেই দূতের সামনে ব্যক্ত করেছিলেন। পরে তিনি যখন বুঝতে পারেন যে, খাদিজা সত্যি-সত্যিই তাঁকে বিয়ে করতে চান; তখন মুহূর্তের মধ্যেই সম্মতি দিতে বিলম্ব বা দ্বিধা করেন নি। এটা যে সত্যি ঘটনা তা বোঝা যায় তাঁদের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পৃষ্ঠভূমির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে।

খাদিজা তাঁর বাণিজ্য পরিচালনা করতেন কর্মচারীদের সাহায্যে, নিজে কোনোদিন জিনিষপত্র কিনতে বা বিক্রি করতে বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে যেতেন না। বাণিজ্য আরো সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্যে একজন দক্ষ ও বিশ্বস্ত কর্মচারী তিনি খুঁজছিলেন। আবু তালিব সেটা জানতে পারেন, কারণ খাদিজার পরিবারের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা ছিলো। তিনি ছিলেন খাদিজার ভাইয়ের স্ত্রীর ভাই। এদিকে আবু তালিবও  মুহাম্মদের জন্যে একটা কাজের সন্ধানে ছিলেন। তিনি তাই কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদকে নিযুক্ত করার জন্যে খাদিজার কাছে সুপারিশ করেন। আবু তালিবের কথায় খাদিজা মুহাম্মদকে তাঁর কর্মচারী নিযুক্ত করেন। মুহাম্মদকে খাদিজা বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ায় পাঠান। মুহাম্মদ সেই সফরে ভালোই লাভ করেন, যা ছিল খাদিজার প্রত্যাশার থেকেও অনেক বেশি। ফলে মুহাম্মদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও সততায় তিনি মুগ্ধ হোন। একে তো মুহাম্মদের রূপ ছিলো দর্শনীয় ও প্রবল আকর্ষণীয়, তার উপর তাঁর এই  ব্যবসায়িক সাফল্য খাদিজাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।  এমনিতেই  মুহাম্মদ তো ছিলেন সুদর্শন উঠতি যুবক, তার উপর বাণিজ্য মসৃণভাবে পরিচালনার জন্যে যে লোকের সন্ধানে ছিলেন খাদিজা তাঁকে খুঁজে পেলেন মুহাম্মদের মধ্যে। স্বভাবতই মুহাম্মদের প্রতি খাদিজা ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হতে  লাগলেন।

তখন তাঁর বয়স মাত্র আঠাশ বছর, স্বভাবতঃই তাঁর শরীরে ও মনে যৌবন তখনও ভরপুররূপে বিরাজমান। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে তাঁকে তাঁর শরীর ও মনের যাবতীয় চাহিদাকে অবদমিত করে রাখতে হয়েছিল। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনে আর বিয়ে করবেন না। কিন্তু মুহাম্মদের সান্নিধ্যে আসার ফলে সেই অবদমিত সকল চাহিদা প্রবলভাবে জেগে ওঠে ধীরে ধীরে। এর প্রভাবে খাদিজার মনোজগতে এক বিশাল ঝড় বয়ে যায়। সে ঝড় তাঁর জীবনের সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়ে যায়।

মুহাম্মদের ও তাঁর মধ্যেকার আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অবস্থানগত আকাশ-পাতাল বিভেদের কথা ভুলে গিয়ে তিনি মুহাম্মদকে বিয়ে করবেন বলে স্থির করেন। তাঁর মনের এই উথাল পাতাল অবস্থা ব্যক্ত করেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাফিসাকে। নাফিসা খাদিজার ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকে প্রবলভাবে সমর্থন করেন এবং খাদিজা চাইলে তাঁকে এ বিষয়ে সর্বপ্রকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। খাদিজা তখন নাফিসাকে তাঁর দূত করে পাঠান মুহাম্মদের কাছে।

নাফিসা  মুহাম্মদের কাছে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি বিয়ে করছেন না কেন? মুহাম্মদ বলেন যে তাঁর বিয়ে করার মতো আর্থিক সংস্থান নেই তাই। নাফসা তখন জানতে চান কোনো ধনী রমণী যদি তাঁকে বিয়ে করতে চান তাহলে তাঁর আপত্তি আছে কী না। মুহাম্মদ তখন জিজ্ঞাসা করেন, কেউ আছেন নাকি এমন রমণী? নাফিসা তখন খাদিজার নাম বলেন। মুহাম্মদ এ কথা শুনে হকচকিয়ে যান। বলেন, এ হয় না কী? তিনি কতো বড়ো ধনী, শিক্ষিত, অভিজাত ও উচ্চ মর্যাদাশীল নারী, আর আমি তো একজন সামান্য দরিদ্র ও নিরক্ষর মানুষ, তিনি আমাকে বিয়ে করতে চাইবেন কেনো?

নাফিসা বলেন, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার, আপনি সম্মত কী না বলুন। মুহাম্মদ তখন বলেন, তাঁকে বিয়ে করবো এ কথা বলার ঔদ্ধত্য আমার নেই, তবে তিনি যদি স্বেচ্ছায় আমাকে বিয়ে করতে চান তাহলে আমার সম্মতি আছে। নাফিসা খাদিজাকে গিয়ে মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বিবরণ দেন। খাদিজা তখন মুহাম্মদের কাছে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ করেন। খাদিজার নাফিসাকে মুহাম্মদের কাছে দূত করে পাঠানো, নাফিসা ও মুহাম্মদের মধ্যে কথোপকথন এবং খাদিজার পক্ষ থেকে মুহাম্মদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ ইত্যাদি বিষয়ে উপরে যে আলোচনা করা হলো তার সমর্থন মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিকদের রচনাতেও পাওয়া যায়। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের খাদিজার রশিদ আহমদ চৌধুরী এ বিষয়ে লিখেছেন,

“Khadijah wanted to make him a proposal for marriage. She sought the opinion of her best friend Nafeesah, who approved of the idea and offered her help. One day Nafeesah went to Muhammad and during the conversation asked him why he had not married.

Muhammad replied that he was not rich enough to do so. Nafeesah asked him whether he would be willing to marry a respectable reach woman.

Muhammad asked, ‘Who is that woman?’

Nafeesah told him about Khadijah.

Muhammad apologised and said, “How can that be possible? Khadijah is too highly placed for me.  She is a wealthy woman and I am a poor person.”

Nafeesah said, “let me take care of that.”

Muhammad remarked, “In that case I have nothing to say but to agree.”

When nafeesah told the result of her talk with Muhammad, she sent him an offer of marriage.”

[Vide: HADHRAT SAYYEDAH KHADIJAH, page – 22]

নাফিসার সংগে কথোপকথনকে মুহাম্মদের স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছিল। সরাসরি খাদিজার কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসার  পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মুহাম্মদ নাফিসার কথাগুলি কতোটা সঠিক তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে ছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। তাঁর ভয় ছিল খাদিজার পিতাকেও। তিনি কি তাঁর মতো একজন  ‘নিরক্ষর’ ও হতদরিদ্র যুবক এবং তাঁরই অধস্তন একজন কর্মচারীকে জামাই হিসেবে মেনে নিতে পারবেন? ওদিকে খাদিজাও সংশয়ে ছিলেন কীভাবে তাঁদের বিয়েটা সম্পন্ন করবেন তা নিয়ে। কারণ, তাঁর পিতা মুহাম্মদকে কিছুতেই মেনে নেবেন না সে ব্যাপারে তিনি প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। খাদিজা তাই তাঁর পিতাকে এই বিয়েতে সম্মত করাবার প্রয়াস করার ঝুঁকি নেন নি। তিনি পিতার সম্মতি আদায়ের জন্যে একটা অসৎ কৌশল অবলম্বন করেন। পিতাকে না জানিয়েই বিয়ের দিন স্থির করে ফেলেন। বিয়ের দিন তাঁর বাড়িতে অন্য একটা অজুহাতে একটা জোরালো পার্টির আয়োজনও করেন। সেই পার্টিতে তাঁর পিতাকে অতিরিক্ত মদপান করিয়ে বেসামাল করে তোলেন। যখন তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর পিতার স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে, সেইসময় মুহাম্মদের কাকা আবু তালিব ও মুহাম্মদের পক্ষের অন্যান্য প্রতিনিধিদের তাঁর সামনে আসতে আহ্বান করেন। সেইসময় খাদিজা ও মুহাম্মদের বিয়ের কথাবার্তা ও দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়। খাদিজার পিতা কিন্তু এই বিয়েতে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট ও আহত হয়েছিলেন। খাদিজা যে তাঁর পিতাকে বোকা বানিয়ে তাঁর কাছ থেকে মুহাম্মদকে বিয়ে করার সম্মতি আদায় করেছিলেন সে কথা অনেক ঐতিহাসিকের লেখায় দেখতে পাওয়া যায়। উইকিইসলাম এই ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেছে,

“Marriage required the consent of the bride’s guardian, and Khadijah’s father Khuwaylid had refused her previous suitors. She therefore plotted to secure his permission through trickery. She plied her father with wine until he was drunk. Then she slaughtered a cow, covered his shoulders with a new striped robe and sprinkled him with perfume, whereupon Muhammad and his uncles entered the house. Khadijah extracted the legally binding words from her father while he was too inebriated to know what he was saying. As the day wore on and the wedding party was in full swing, Khuwaylid recovered hissobriety enough to ask, “What is this meat, this robe and this perfume?” Khadijah replied, “You have given me in marriage to Muhammad ibn Abdullah.” Khuwaylid was as furious as his daughter had expected, protesting that he had never consented to any such thing and even unsheathing his sword.”

মুসলিম ঐতিহাসিকরা এটা সত্য ঘটনা বলে স্বীকার করেন না।  কারণ, এতে মুহাম্মদের অনেকখানি মর্যাদাহানি হয়। তাই এটা নিয়ে বিতর্কের অবসানকল্পে তাঁরা দাবি করেন যে খাদিজা ও মুহাম্মদের বিয়ের আগেই খাদিজার পিতার মৃত্যু হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদের জীবনীকার প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ম্যুইর-এর উদ্ধৃতি ও অভিমত উল্লেখ করে উইকি ইসলাম কী বলছে তা দেখা যাক,

“Although the Muslim historian Waqidi denied this embarrassing story (even while reporting it), the British historian Muir points out that nobody had any reason to fabricate it. The tradition is from two independent sources, both of whom were biased in Muhammad’s favour and neither of whom had any reason to disparage Khadijah’s father or his clan. Two further independent sources, without mentioning the drunken party, state that it was Khuwaylid who married Khadijah to Muhammad. Although Waqidi claims that it was Khadijah’s uncle who gave her away because her father had died before the Sacrilegious War (591-594), his pupil Ibn Saad names Khuwaylid as a commander in that war. Muir therefore concludes that the tradition of Khuwaylid’s death “has been invented, to throw discredit on the story of his drunkenness.”

শুধু খাদিজার পিতার মৃত্যুকে ঘিরেই নয়, মুহাম্মদের ভাবমূর্তি কৃত্রিম উপায়ে নির্মাণ করার জন্যে মুসলিম ঐতিহাসিক ও ইসলাম বিশেষজ্ঞগণ বহু জায়গাতেই ইতিহাস ও তথ্য বিকৃতি ঘটিয়েছেন ও বহু মনগড়া গল্প রচনা করেছেন। সেরকম একটি আষাঢ়ে গল্প হলো খাদিজা ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন এ কথা ভেবে যে, তাঁর মতো একজন পৌঢ়া নারীকে কি মুহাম্মদ বিয়ে করতে সম্মত হবেন? মনের মাধুরী মিশিয়ে এই গল্পটা এভাবে পরিবেশন করা হয়েছে,

“…তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন, আর কোনদিনই বিয়ে করবেন না। কিন্তু খাদিজা [রাঃ] এর মনের অবস্থা হঠাৎ পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি মনের গভীরে এ আকাঙ্ক্ষাপোষণ করে ফেললেন যে, হযরত মুহাম্মদ [সঃ]-এর মত একজন গুণবান পুরুষকে যে নারী স্বামীরূপে লাভ করতে পারে তাঁর জীবন অবশ্যই ধন্য হবে। তবে তাঁর মনের বাসনা যতই প্রবল হোক না কেন, হযরত মুহাম্মদ [সঃ] কি তাঁর মতো একজন অধিক বয়স্কা নারীকে বিয়ে করতে সম্মত হবেন?”

[হযরত খাদীজা [রাঃ] এর জীবনী, ইসলামি গবেষক মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী, পৃ-৫৬]

মুহাম্মদের মর্যাদাকে খাদিজার ঊর্ধে স্থাপন করার জন্যেই যে এরূপ গল্প তৈরি করা হয়েছে তা বলা বাহুল্য। আর এরূপ গল্প কিংবা সিদ্ধান্তকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে খাদিজার বয়স আঠাশ থেকে বাড়িয়ে চল্লিশ করা একান্তই আবশ্যক হয়ে পড়ে। তাঁদের এই চালাকি বা অপকৌশল ধরা পড়তো না যদি না খাদিজার গর্ভে মুহাম্মদের ঔরসে ছ’টি সন্তানের জন্ম না হতো।

খাদিজা ও মুহাম্মদের দাম্পত্যজীবন পঁচিশ বছর দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। খাদিজার মৃত্যুর পরেই কেবল তাদের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। ইসলামি পণ্ডিতবর্গ, গবেষকগণ ও মুসলিম ঐতিহাসিকগণ মুহাম্মদের নৈতিক চরিত্র নিয়ে যে সমালোচনা আছে তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে গিয়ে এই ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে থাকেন। আগেই বলা হয়েছে তাঁদের দাবী হলো- মুহাম্মদ নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ ছিলেন বলেই একজন বয়স্কা নারীর সঙ্গে পঁচিশ বছর অতিবাহিত করা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি যদিও তখন আরবে বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল।

আপাতদৃষ্টিতে একথা সত্যি মনে হতে পারে এবং সাধারণভাবে মুসলিম সমাজ এটাকে ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাসও করেন। কিন্তু এই বিশ্বাসের ইমারতটা নড়বড়ে করে দেয় খাদিজা পরবর্তী মুহাম্মদের জীবনের অধ্যায়। যে অধ্যায়ে তিনি একের পর এক বিয়ে করেছেন। এই ঘটনা প্রশ্ন তুলে দেয়, খাদিজার জীবদ্দশায় আর কোনো বিয়ে না করার পেছনে তাহলে কী অন্য কারণ আছে? তা না হলে যে ব্যক্তি তাঁর ভরাযৌবনে দীর্ঘ পঁচিশ বছর এক স্ত্রীর সঙ্গে কাটিয়ে দেন, সেই ব্যক্তিই পৌঢ় বয়সে মাত্র তেরো বছরে কুড়ি-বাইশটা বিয়ে করেন কেনো?

সুতরাং এই সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে ওঠে যে খাদিজার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে না করার পেছনে নিশ্চয় অন্য কিছু কারণ নিহিত আছে! প্রশ্ন হলো, কী সেই কারণসমূহ?

খাদিজা ও মুহাম্মদের বিয়েতে কী কী চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ, এই চুক্তির বিষয়ে ঐতিহাসিকগণ সম্ভবত খুব বেশি কৌতূহলী ছিলেন না এবং এখনও নন। অথচ ইসলামকে বোঝার জন্যে, ইসলামের আগমনের আগে আরবে নারীর অবস্থা কেমন ছিল তা জানার জন্যে এবং সর্বোপরি নারী সম্পর্কে মুহাম্মদের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিলো তা সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্যে এই চুক্তিপত্রটি একটি প্রামাণ্য নথি হিসেবে আমাদের অনেক সাহায্য করতে পারতো। এই চুক্তিপত্রটির কিছু কিছু অংশ অবশ্য আমরা জানতে পেরেছি বিভিন্ন সূত্র থেকে। এই সূত্রগুলিও কিছুটা আলোক ফেলে এটা বোঝার জন্যে যে মুহাম্মদ কেনো দীর্ঘ পঁচিশ বছর তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার প্রতি বিশস্ত ও অনুগত ছিলেন। তাছাড়া সেই সময়ে মক্কার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা, সমাজে নারীর অবস্থান এবং খাদিজা ও মুহাম্মদের আর্থিক অবস্থা, তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি ইত্যাদি বিষয়গুলি গভীরভাবে বিচার বিশ্লেষণ করেও এক স্ত্রীর প্রতি মুহাম্মদের এই বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের কারণগুলি আমরা বুঝতে পারি।

কারণগুলি এরূপ-

এক

খাদিজা ছিলেন মক্কার বণিকদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী এবং প্রবল প্রতাপশালী একজন নারী। এ বিষয়ে কোনো মহলেই বিতর্ক নেই। মুহাম্মদদের সঙ্গে বিয়ের সময় যে চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়েছিল তাতে খাদিজা এরকম শর্ত হয়তো অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যে তিনি জীবিত থাকাকালীন মুহাম্মদ দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। এরকম চুক্তি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল, কারণ-চুক্তিপত্রে কী কী থাকবে তা নির্ধারণ করার মতো তিনি প্রভাবশালী ছিলেন, এবং সেসময়ে আরবে নারীরা অনেক স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতো বর্তমান যুগে মুসলিম নারী্রা যে স্বধীনতা ও অধিকার ভোগ করে তার তুলনায়। উইকি ইসলামও দাবি করেছে এই শর্তটি ছিলো,

“Khadijah asked for a dower of 20 camels. Twenty camels would have been worth about £8,000, which was four times the dower that Muhammad gave to any of his subsequent wives. This suggests that Khadijah was “worth four women” to him, i.e. that it was part of their marriage contract that he would not take another wife in her lifetime.”

দুই

বিয়ের আগে খাদিজা ছিলেন মনিব ও মুহাম্মদ ছিলেন কর্মচারী। বিয়েতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক স্থাপিত হলেও তাঁদের উভয়ের মনে পুরানো মনিব-কর্মচারীর সম্পর্কটির প্রভাব নিশ্চয় মুছে যায় নি। মনিব-স্ত্রীর বর্তমানে দ্বিতীয় বিয়ে করলে যে তাকে তাঁর মনিব ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেবেন সে কাণ্ডজ্ঞান মুহাম্মদের নিশ্চয় ছিল। ফলে তাঁর পক্ষে খাদিজার জীবিত অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করা অসম্ভব ছিল।

তিন

মুহাম্মদকে আর্থিক দিক থেকে সবসময় খাদিজার প্রতি নির্ভরশীল থাকতে হতো। খাদিজার সাহায্য ব্যতীত তাঁর নিজেরই ভরণ-পোষণ পরিচালনা করার সামর্থ ছিল না। ফলে তাঁর পক্ষে দ্বিতীয় বিয়ে করা তো দূরের কথা, সে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাও ছিল না।

চার

এক স্ত্রীর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা যে মুহাম্মদের চরিত্রবিরোধী ছিল তার প্রমাণ তিনি রেখে গেছেন নিজেই খাদিজার মৃত্যুর পর অনেক নারীকে বিয়ে করে। তাঁর হারেমে একইসঙ্গে তেরোজন পর্যন্ত স্ত্রী ছিল। খাদিজার মৃতুর পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই বিয়ে করেছিলেন সওদাকে। আবার কয়েকবছর পর সওদাকে বিনা দোষে তালাক দিয়ে দূরে সরিয়েও দিয়েছিলেন। সওদার দোষ ছিলো একটাই, অন্যান্য স্ত্রীদের তুলনায় তাঁর বয়স একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। সওদাকে তালাক দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে নবযুগ ব্লগে আমার অন্য লেখায়।

পাঁচ

এক নারী নয়, বহু নারীর সেবা ভোগ করতে মুহাম্মদ যে অধিক পছন্দ করতেন তা স্পষ্ট বোঝা যায় তাঁর দেওয়া বেহেস্তের [স্বর্গ] বর্ণনায়। মানুষকে তাঁর ধর্মে প্রলুদ্ধ করার জন্যে পরকালের বেহেস্ত ও দোজখের [নরক] যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে বলেছেন ইমানদার মুসলমানরা বেহেস্ত পাবেন যেখানে তাঁদের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত থাকবে ৭২ জন চিরকুমারী হুরী [স্বর্গীয় অপ্সরা]।

ছয়

প্রাক ইসলাম আরবে বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল বলে যে দাবী করা হয় তা মোটেই সঠিক নয়। ইতিহাসে এই দাবীর পক্ষে প্রামাণ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। মুহাম্মদ ও ইসলামের ভাবমূর্তি ঊর্ধে তুলে ধরার জন্যে এই দাবিটি অত্যধিক জোরের সঙ্গে নিরন্তর প্রচার করা হয়। বিশেষকরে মক্কা ও মদিনায় তো বহুবিবাহের  ব্যাপক  প্রচলন ছিল না তা সহজেই বোঝা যায়। মুহাম্মদের পিতা আবদুল্লাহ এবং কাকা আবু তালিব, আবু হামজা ও আবু লাহাব, মুহাম্মদের পিতামহ মোত্তালেব, মক্কার কোরেশদের মধ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী অন্যতম ব্যক্তিত্ব আবু সুফিয়ান ইত্যাদি বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের  একাধিক স্ত্রী ছিল বলে শোনা যায় না। খাদিজার প্রথম তিনজন স্বামীর মধ্যে কারুরই একাধিক স্ত্রী ছিল না। এসব তথ্যগুলি প্রমাণ করে সেসময় মক্কায় বহুবিবাহের প্রচলন বিশেষ ছিল না। মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদ অসংখ্য বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু   কিন্তু একটি বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে মদিনার কোনো নারী ছিল না। এটা প্রমাণ করে যে মদিনার মানুষ বহুবিবাহ প্রথাকে  পছন্দ করতেন না। তা না হলে আল্লার নবীর স্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিশ্চয় সেখানে নারীদের মধ্যে তৈরি হতো এবং মা-বাবারাও পরকালের মঙ্গলের কথা ভেবে নবীর সঙ্গে তাদের মেয়েদের বিয়ে দেবার জন্যে উতলা বোধ করতেন।

সুতরাং এটাও হতে পারে যে, মুহাম্মদের দ্বিতীয় বিয়ে না করার পেছনে অন্যান্য কারণ ছাড়া এটাও একটা কারণ ছিলো যে, সেই সময়ে মক্কায় বহুবিবাহের প্রচলন ছিল না। মুহাম্মদই মক্কা ও মদিনায় আল্লাহর নামে নিকৃষ্ট প্রথা বহুবিবাহের প্রচলন করেন যা পরবর্তীতে ইসলামের সৌজন্যে মুসলিমদের মধ্যে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

মুহাম্মদের জীবনে এবং ইসলামের ইতিহাসে মুহাম্মদ ও খাদিজার দীর্ঘ পঁচিশ বছরের দাম্পত্যজীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটা কথা প্রবাদ বাক্যের মতো চালু আছে – খাদিজার ঐশ্বর্য, মহানুভবতা, উদারতা ও ত্যাগ এবং আলীর তলোয়ার ছাড়া ইসলামের বিজয় সম্ভব হতো না। মুহাম্মদের ছিল প্রবল রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ। কিন্তু যে কোনো অভিলাষ পূরণের জন্যে প্রচুর বিত্ত ও বৈভব আবশ্যক হয়। অথচ মুহাম্মদ এতোটাই দরিদ্র ছিলেন যে তাঁকে একজন নারীর অধীনে কর্মচারীর কাজ নিতে হয়েছিল। তাই তিনি যখন নাফিসার মাধ্যমে খাদিজার কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন, তখন তৎক্ষণাৎ হ্যাঁ বলতে বিলম্ব করেন নি। এটা তাঁর কাছে হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতোই একটা অবিশ্বাস্য প্রস্তাব বলে মনে হয়েছিল।

রাজনৈতিক অভিলাষ পূর্ণ করার জন্যে আর্থিক চিন্তামুক্ত অখণ্ড অবসর যা তিনি পেয়েছিলেন খাদিজাকে বিয়ে করে। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে মাসের পর মাস হীরা গুহায় নিরালায় বসে চিন্তা করতেন কীভাবে ও কোনপথে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। বাণিজ্যের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে জেনেও খাদিজা মুহাম্মদকে এই কাজে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছিলেন। খাদিজার এই ত্যাগ ছাড়া মুহাম্মদ ইসলাম ধর্মের কথা ভাবতেও পারতেন না। মুসলিম ঐতিহাসিক ও ইসলামি শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞগণ খাদিজার এই অবস্মরণীয় অবদানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেন নি। বরং বহুক্ষেত্রে খাদিজার অবমূল্যায়ন করে তাঁকে হেয় ও অপমান করা হয়েছে। তাঁরা খাদিজার বয়স নিয়েও জালিয়াতি করেছেন। তাঁরা বলেছেন খাদিজা নিজেকে অতিশয় ধন্য হয়েছিলেন মুহাম্মদ তাঁকে বিয়ে করায়। এসব প্রচার করে তাঁরা খাদিজাকে যার পর নাই অপমান করেছেন। তাঁরা এসব করেছেন শুধুমাত্র অন্যায়ভাবে মুহাম্মদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্যে।

গিয়াসুদ্দিন এর ব্লগ   ৬৬৫ বার পঠিত