নাজিম উদ্দিন

“ত্রৈগুণ্যবিষয়া বেদা নিস্ত্রৈগুর্ণ্যো ভবার্জুনা।

নির্দ্বন্দ্বো নিত্যসত্ত্বস্থো নির্যোগক্ষেম আত্মবান।”

হে অর্জুন বেদসকল ত্রৈগুণ্যবিষয়ক, তুমি ত্রিগুণের অতীত হয়ে সুখ-দুঃখে তুল্যজ্ঞান বা নির্দ্বন্দ্ব, নিত্য সত্ত্বগুণাশ্রিত, যোগক্ষেমরহিত বা উপার্জন ও রক্ষার জ্ঞান বাদ দিয়ে আত্মবান হও।

 

আগের পর্ব

বিশ্বজগত এবং মানুষের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা অল্পকিছু সংখ্যক নিয়মের অধীন। ‘তিনের সূত্র’ এরমধ্যে অন্যতম। আমাদের চারপাশের আপাতবিরোধী যে বিভিন্নতা দেখা যায় এর মূলে আছে গভীর ঐক্য। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আণবিক জগত থেকে শুরু করে মহাজাগতিক মাত্রায় তিনটি শক্তির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আধুনিক চিন্তার জগত ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক দুটি শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে, কিন্তু সবকিছুতে শুধুমাত্র দুটি শক্তির প্রভাব অনুভূত হয় না। প্রাচীন বিজ্ঞানের মতে একটি বা দুটি শক্তি কোন ঘটনার জন্ম দিতে অপ্রতুল। একটা তৃতীয় শক্তির প্রয়োজন যার সাহায্য ছাড়া প্রথম দুটি দ্বারা কোন কিছুর উৎপাদন সম্ভব হয় না। প্রথমটিকে বলা যেতে পারে সক্রিয় বা ধনাত্মক,দ্বিতীয়টি নিষ্ক্রিয় বা ঋণাত্মক আর তৃতীয়টি নিরপেক্ষ, পরমানুর ক্ষেত্রে যেমন ধনাত্মক প্রোটন, ঋণাত্মক ইলেকট্রন এবং আধানবিহীন নিউট্রন। কিন্তু এসব শক্তি কেবল নামে মাত্র, মুলত এরা সব সমভাবে সক্রিয়। যখন আমরা তাদের ছেদবিন্দুতে লক্ষ্য করি তখন এরা ধনাত্মক, ঋণাত্মক বা নিষ্ক্রিয়রূপে দেখা দেয়। অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট সময়ে একের সাথে অন্যের সম্পর্কের ভিত্তিতে এসব বিশিষ্ট শক্তি তাদের নিজরূপে ক্রিয়া করে। প্রথম দুটি শক্তি আমরা কিছুটা হলেও বুঝতে পারি, কিন্তু তৃতীয়টি শক্তি মাঝেসাজে শক্তিদ্বয়ের ক্রিয়াবিন্দু,মাধ্যম অথবা ফলাফল থেকে বুঝা যায়।  সাধারণত আমরা তৃতীয় শক্তিটি পর্যবেক্ষণ বা বোধগম্যতার সীমায় আনতে পারি না, এটি আমাদের মানসিক ক্রিয়ার এবং স্থান-কালের উপলদ্ধি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। একটা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। ধরা যাক আমরা দৈহিক এবং মানসিক উঁচুস্তর অর্জনের জন্য ‘কাজ’ করতে চাই। সেক্ষেত্রে আমাদের ‘ইচ্ছা’ এবং সচেতন পদক্ষেপ হলো ধনাত্মক শক্তি। অপরদিকে আমাদের দীর্ঘদিনের মনোদৈহিক অভ্যাস এবং জড়তা বিপরীতমুখে ক্রিয়া করবে। শেষ পর্যন্ত এ দুটি শক্তি নিজেদের মধ্যে একটা সমতার তৈরি করতে পারে, বা একটি অন্যটির উপর জয়ী হতে পারে, একই সাথে দুটো শক্তিই দূর্বল হয়ে নতুন কোন কাজের শক্তি হারিয়ে ফেলে। এভাবে দুট শক্তি একে অন্যের চারপাশে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে একটি আরেকটিকে শোষণ করে ফলে কোন ফলাফল দেখা যায় না। কারো কারো ক্ষেত্রে এ অচলাবস্থা সারাজীবন ধরে চলতে থাকে। আমরা হয়ত পরিবর্তনের ইচ্ছা এবং তদুদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালাতে পারি, কিন্তু জীবনে অভ্যাসগত জড়তা অতিক্রম করার লড়াইয়ে এর সবটা শোষিত হয়ে যেতে পারে। শেষে দেখা যায়, আদিতে যে মহৎউদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল তা অর্জনে কোন শক্তি অবশিষ্ট নাই। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না তৃতীয় শক্তি সামনে এসে ধরা না দেয়। সেটা হতে পারে নতুন কোন জ্ঞান যা আমাদের কাজের উপকারিতা বা প্রয়োজনীয়তার নতুন উপলদ্ধি এনে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বাড়তি শক্তি জোগাতে পারে। এবং এ তৃতীয় শক্তির কল্যাণে আদি প্রচেষ্টা হয়ত স্থিতিজড়তাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এবং আমরা উদ্দীষ্ট লক্ষ্যে সক্রিয় হতে পারি। আমাদের মানসিক,সামাজিক এবং সমগ্র মানব জাতির বিভিন্ন প্রকাশে তিনশক্তির অনেক উদাহরণ দেখতে পাই। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছেন তারা জানেন এটি কি পরিমাণ কঠিন কাজ। একদিকে ওজন কমানোর সদিচ্ছা,অপরদিকে দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস,লাইফস্টাইল এ দুয়ের লড়াইয়ে অনেকে টিকতে না পেরে কিছুদিন চালিয়ে ছেড়ে দেন। আবার যে কে সেই অবস্থা, এভাবে কিছুদিন চলার পর সদিচ্ছাও দূর্বল হয়ে যায়। এরমধ্যে পড়াশোনার মাধ্যমে শারীরিক ওজন এবং এর কুফল সম্বন্ধে নতুন জ্ঞান,বা ভাল কোন প্রশিক্ষক পেলে, অথবা কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হলে এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের সম্ভাবনা থেকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হওয়া গেলে দেখা যায় ঝরঝর করে ওজন কমে যাচ্ছে এবং নবলব্ধ জ্ঞান এবং আত্মবিশ্বাসের কারণে দীর্ঘদিন সেটা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

   বৈদিক ত্রিমূর্তিঃ ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর (সৃষ্টি,পালন, ও ধ্বংস)

আদি বৈদিক দেবতাদের বেশিরভাগ ছিল মানুষের মত, তারা দুনিয়ার বিষয়-আশয় নিয়ে মেতে থাকত। দেবতারা ছিল মানুষের চেয়ে উঁচুস্তরের, মানুষের চেষ্টা থাকত বিভিন্ন প্রকারে দেবতাদের সন্তুষ্টি অর্জন করা যাতে তাদের  বস্তুগত সমৃদ্ধি আসে। বেদে দুনিয়ার অস্তিত্বের জন্ম, মৃত্যু আর পূনর্জাগরণের অনন্তকাল ধরে চক্রাকার চলমান ধারনার আভাস মিলে। মানুষ, জড়বস্তু, দুনিয়া এমনকী সমগ্র মহাবিশ্ব বিলীণ হয়ে যাবে কিন্তু অস্তিত্ব সবসময় থাকবে। এ ধারা চক্রাকারে চলতে থাকবে। সময়ের সাথে যেসব দেবতারা এরকম মহাবিশ্বের এমন চক্রাকার পরিবর্তনের ধারনার সাথে যুক্ত তাদের দ্বারা অন্যান্য দেবতারা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। বিষ্ণু রক্ষাকর্তা, শিব ধ্বংসের দেবতা আর ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা, তারা একত্রে বৈদিক ত্রিমূর্তি হিসেবে পরিচিত।

আমরা যে জগতে বাস করি এটাই প্রথম জগত বা মহাবিশ্ব নয়। গঙ্গা নদীতে যতফোটা পানি আছে তার বেশিসংখ্যক জগত এবং মহাবিশ্ব ছিল এবং থাকবে। এ মহাবিশ্বগুলোর জন্ম দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষ্মা,পালনকর্তা বিষ্ণু আর ধ্বংসকর্তা শিব। যেহেতু নতুন জগত সৃষ্টির জন্য পুরাতন জগতকে বিনষ্ট করতে হবে, তাই শিব একইসাথে ধ্বংসকর্তা এবং পূনঃসৃষ্টিকর্তা। এ তিন দেবতা পরম প্রভুর তিনটি রূপ এবং তার অংশ। কিন্তু অনাদি অনন্ত প্রভু এসব কিছুর আড়ালে,এদেরও ওপরে,তারঁ সৃষ্টিতে তাকে পাওয়া যাবে না।

প্রত্যেক পুরাতন বিশ্ব ধ্বংসের পর কেবল একবিশাল সাগর ছাড়া আর কিছুই থাকে না।এ সাগরে অনন্ত নামক সাপের কুন্ডলীতে শুয়ে আছেন বিষ্ণুদেব।সে জাগ্রত হলে তার নাভি থেকে একটা পদ্মফুল ফোটে। সে পদ্মের পাপড়িতে বসে আছে ব্রক্ষ্মদেব এবং এ ব্রক্ষ্মদেবের কাছ থেকে সবকিছুর সৃষ্টি। কোন কোন মতে ব্রক্ষ্মা খুব একাকীত্ব বোধ করছিল, তাই সে নিজেকে দুভাগ করে পুরুষ এবং নারীর সৃষ্টি করেন।তারপর আবার দুভাগ মিলিত হলে সেখান থেকে মানুষের জন্ম হয়।এভাবে সে সব রকমের প্রাণ অর্থাৎ বড় প্রাণি থেকে শুরু করে কীট-পতঙ্গ সব সৃষ্টি করে।অন্যত্র দেখা যায় বিভিন্ন প্রাণি এবং মানুষ ব্রক্ষ্মার মুখ,বাহু,উরু এবং পা থেকে তৈরি। সবকিছুর উৎপত্তি ব্রক্ষ্মার থেকে,ব্রক্ষ্মা আবার পরম প্রভুর রূপ, ফলে সবই সর্বশক্তিমানের লীলা।এ বিশ্বজগত,এবং ব্রক্ষ্মাকে তার আগের আরো অনেক ব্রক্ষ্মার মত এবং পরবর্তীতে যারা আসবে তাদেরকেও মহাদেব ধ্বংস করবেন।একটা মহাবিশ্বের জীবনকাল ব্রক্ষ্মার একদিনের সমান,চার হাজার মিলিয়ন বছরের বেশি সময়।প্রতিরাতে ব্রক্ষ্মা যখন ঘুমোয় তখন বিশ্বজগত ধ্বংস হয়। আবার পরদিন সকালে যখন সে জেগে ওঠে তখন আবার বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়।যখন ব্রক্ষ্মা তার জীবনকাল সমাপ্ত করে তখন দুনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়। সবকিছু তখন পরমপ্রভুর আশ্রয়ে থাকে।বিশাল সময় জুড়ে শুধুমাত্র পানি ছাড়া আর কিছুই থাকে না।এরপরে আবার বিষ্ণুর উদয় হয়, তার থেকে জন্ম নেয় ব্রক্ষ্মা এবং ব্রক্ষ্মা তার নতুন বিশ্ব তৈরি করে।এভাবে সৃষ্টি,পালন এবং ধ্বংসের চক্র চলতেই থাকে।

সৃষ্টি-ধ্বংস আর জীবন-মৃত্যুর চক্রে আবার পুনজন্মের বিশ্বাস হিন্দুধর্মের একটা উল্লেখযোগ্য দিক। মৃত্যুর পরে আমাদের আবার অন্যশরীরে পুনজন্ম হয়, এটা শুধুমাত্র মানুষের জন্য নয়, সকল প্রাণ অনবরত জন্ম-মৃত্যুর চক্রে পড়ে সৃষ্টিচক্রের চাকা সচল রাখে।আমরা যদি আমাদের ধর্ম পালন করি তাহলে তা আমাদের জন্য ভাল কর্ম সৃষ্টি করবে এবং তদনুযায়ী পরবর্তী জন্মে ভাল ফললাভ হবে।এখানে ধর্ম মানে কর্তব্য বা ডিউটি, ধর্মের আসল মানে তাই, নিজের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করা।প্রচলিত অর্থে ধর্ম মানে ‘রিলিজন’ তা হবে অধ্যাত্মবাদ।হিন্দুর কাছে সৃষ্টিজগতের সবকিছু পরম প্রভুর অংশ তাই জীবনের বৃহত্তর চক্রে সকল ধরণের প্রাণ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সচ্চিদানন্দঃ

আমাদের প্রকৃত স্বরূপ বর্ণনায় এককথায় বলা যায় ‘সচ্চিদানন্দ’( সত,চিত আর আনন্দ)। সৎ হলো সত্য, জ্ঞানস্বরুপ, অস্তিত্বময়, অপরিবর্তনীয় বিশুদ্ধ সত্তা। জাগ্রতাবস্থায় আমরা অস্তিত্ব অনুভব করি, অস্তিত্ব আমাদের প্রকৃতি এবং সকল প্রাণের মূল ভিত্তি।

চিৎ মানে চেতনা, বোধ; আমাদের অস্তিত্বের প্রথম প্রকাশ।সমস্ত সৃষ্টিজগত থেকে চেতনা বিচ্ছুরিত হচ্ছে।কিন্তু চেতনা যখন নিজেকে নিয়ে সচেতন হয়, তখন আয়নায় তার প্রতিফলন দেখে, এ যেন নিজের চোখের দিকে তাকানোর মত। বেশিরভাগ সময় চেতনা তার নিজের সম্বন্ধে সচেতন থাকে না, মন তাকে বিভ্রান্ত করে।কিন্তু মন যখন শান্তস্থির হয় তখন চেতনা তার নিজেকে লক্ষ্য করার সুযোগ পায়,এবং আনন্দময় সত্তার উদ্ভাস হয়।আনন্দ হলো পরম সুখাবস্থা,গভীর হর্ষ,পরম পুলক।একে জাগাতে হয় না, সূর্যের আলোকের মত আনন্দ আমাদের স্বভাবগত।

 পবিত্র ট্রিনিটি (পিতা, পুত্র ওপবিত্র ভুত)

খ্রিস্টধর্মে মনে করা হয় ঈশ্বরের তিন রূপ আছে, পিতা, পুত্র এবং আত্মা ( পবিত্র ভূত)। এতে একই ঈশ্বরের তিনটি ভিন্ন অবস্থা স্বীকার করা হয়।  এতে পিতা যিনি সৃষ্টি করেন, পুত্র মানে যিনি জন্মলাভ করেন এবং আত্মা বা ভূত একদেহ থেকে আরেক দেহে সঞ্চারিত হয়ে সৃষ্টির ধারা চালু রাখে। পিতার কাছ থেকে আত্মা পুত্রের কাছে যায়, কিন্তু পিতা কারো দ্বারা সৃষ্টি নন।

“Go, therefore, and make disciples of all nations, baptizing them in the name of the Father, and of the Son, and of the Holy Spirit” Matthew 28:19

বাইবেলে ট্রিনিটি থাকলেও খ্রিস্টধর্ম একান্তভাবে একেশ্বরবাদী ধর্ম, বাইবেলের কোথাও ঈশ্বর তিনজন বা দু’জন এমনটি বলা হয়নি।

সত্ত্বঃ, রজঃ আর তমঃ গুনঃ

সাংখ্য দর্শনে পুরুষ আর প্রকৃতি দুটো সত্ত্বাকেই স্বীকার করা হয়। সত্ত্বঃ, রজঃ এবং তমঃ এগুলো প্রকৃতির ধর্ম, পুরুষের নয়।

সত্ত্বঃগুন তিনগুণের মধ্যে সেরা। বিশুদ্ধ সত্ত্বগুন পানির মত কিন্তু রজ আর তমোর সাথে মিশে থাকার কারণে জন্মান্তরের ফেরে পড়তে হয়। সূর্য যেমন সারা দুনিয়াকে আলোকিত করে আত্মা তেমনি সত্ত্বগুনে প্রতিফলন, মিশ্র সত্ত্বের লক্ষণ, অহং ত্যাগ, ভক্তি, বিশ্বাস, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং অবাস্তবের থেকে মুখ ফেরানো। বিশুদ্ধ সত্ত্বগুনের লক্ষণ হলো আনন্দ,হাসিখুশী,নিজ সত্ত্বার জ্ঞান,শান্তি, সন্তুষ্টি,আত্মায় অবিচল ভক্তি।এর মাধ্যমে সাধক নিরবচ্ছিন্ন আনন্দ উপভোগ করেন।

রজঃগুনের বিক্ষেপ শক্তি আছে,এর থেকে মানুষের কর্মশক্তি,রাজসিক গুনাবলী দেখা দেয়।কর্মের কারণে নতুন নতুন কর্মে আসক্তি জন্মায় এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। যার ফলে ভোগ, লোভ, রাগ, অহংকার, ইর্ষা, হিংসা ইত্যাদি বন্ধনের কারণ তৈরি হয়।

তমঃগুনের হলো আবৃতিকারী শক্তি, যা জন্ম-মৃত্যু চক্রের কারণ। অজ্ঞতা, আলস্য,জড়তা, ঘুম, হঠকারিতা, মূর্খতা ইত্যাদি তমোগুনের মধ্যে পড়ে।এরফলে সঠিক বিচার ক্ষমতা থাকে না,তমাচ্ছন্ন বিচার শক্তির কারণে মানুষ অবোধ পশুতে পরিণত হয়।

ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলে দুটো কাঁটাই ফেলে দিবি। অর্থাৎ রজঃ বা কর্মে নিয়োজিত হয়ে আলস্য, জড়তা ইত্যাদি তমোগুনকে বিনাশ করতে হবে। কিন্তু সেখানে থেমে থাকলে চলবে না, কর্মের বন্ধনও এক প্রকারের বন্ধন। তারপরে দানশীলতা, পরোপকার, জ্ঞানচর্চা, ইত্যাদি সত্ত্বগুনের মাধ্যমে রজোগুনকে প্রতিস্থাপিত করতে হবে।

অ উ মঃ

মানুষের চেতনার তিন অবস্থা, জাগৃতি, স্বপ্ন এবং গভীর ঘুম। এ তিন অবস্থায় আত্মা তিন ধরণের শরীর ধারণ করে।স্থুলশরীর অতীত কর্মের ফলে সৃষ্ট আত্মার বাহন,জাগ্রত অবস্থায় স্থুল শরীর ব্যবহার করে আত্মা স্থুল বস্তু দেখতে পায়। জন্ম মৃত্যু ক্ষয় এ শরীরের বৈশিষ্ট্য। স্বপ্নে বুদ্ধি এবং আত্মার অবস্থান, এ সময় সূক্ষ শরীর আত্মার সকল কাজের যন্ত্র।সূক্ষ শরীরে পঞ্চভুত থাকে অমিশ্রিত, বিশুদ্ধ অবস্থায়। এ শরীরে অতীতের কাজের ছাপ থাকে ফলে আত্মা তার ফল ভোগ করে।গভীর ঘুমে আমাদের সকল প্রকার জ্ঞান লুপ্ত হয়,বস্তুজগতের কোন অস্তিত্ব থাকে না। গভীর ঘুমে আমাদের যে শরীর তাকে বলা হয় কারণ শরীর। স্বপ্ন এবং জাগ্রতাবস্থায় মন বাহিরের জগত তৈরি করে। গভীর ঘুমে মন নিশ্চল, কোনকিছুর অস্তিত্ব থাকে না।

কাব্বালায় ট্রিনিটিঃ

আইনঃ শুন্য, কাব্বালা মতে সৃষ্টির পূর্বে কেবলমাত্র শুন্যতাই ছিল যার থেকে প্রথম প্রজ্ঞা প্রকাশিত হয়।

আইন সফঃ জগৎপিতা, দুনিয়ার ভৌত এবং আধ্যাত্মিক জগতসমূহের সৃষ্টির পূর্বে একক সত্ত্বা যার কোন সীমা নেই যাকে বর্ণনায় প্রকাশ করা যায় না।

ওর আইন সফঃ স্বর্গীয় আলো।

জ্ঞান,কর্ম,ভক্তিযোগঃ

গীতায় তিন ধরনের মুক্তির কথা বলা আছে।

জ্ঞানযোগঃ জ্ঞানেই মুক্তি, ব্রক্ষ্মবাদ, বেদান্ত দর্শন,বৌদ্ধ দর্শন।

কর্মযোগঃ যাগযজ্ঞ ইত্যাদি কর্মের মাধ্যমে উপাসনা। জৈমিনির কর্ম-মীমাংসা। কর্মফল কৃষ্ণকে দান করে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া।

ভক্তিযোগঃ ভক্তিতে মুক্তি অর্থাৎ সত্তার স্বরূপ সন্ধানে মুক্তি। ভক্ত ধ্রুব প্রহ্লাদ,ভক্ত কবীর,ভক্ত রামপ্রসাদ।

“ভক্তের দ্বারে বান্ধা আছেন সাঁই

হিন্দু কি যবন বলে কোন জাতের বিচার নাই”।(লালন ফকির)

কর্মে মুক্তি অনেক কঠিন, এছাড়া কর্মযোগে এক কর্ম থেকে আরেক কর্মে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত কর্মের বন্ধনে জড়ানোই সার হয়। জ্ঞানপিপাসু বাঙালিদের জন্য  শ্রীচৈতন্য তাই জ্ঞান-ভক্তি যোগের প্রচার করেন। জ্ঞানের আলো দিয়ে অজ্ঞতা, কুসংস্কারকে সরিয়ে দিতে হবে সাথে থাকবে ভক্তি।

ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্নাঃ

বাংলা তন্ত্রে ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না বা গঙ্গা, যমুনা, স্বরস্বতী নামে মানুষের শরীরে তিনটি নাড়ীর কল্পনা করা হয়। মেরুদন্ডের বামদিকে ঈড়া, ডানে পিঙ্গলা এবং মধ্যে সুষুম্না নামের এসব  নাড়ীর অবস্থান। আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস মূলত এই তিনটি নারীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।। এরমধ্যে সুষুম্না নাড়ী সেরা কারন তার মাঝে সকল নাড়ী এসে মিলিত হয়। তিন নাড়ী যেখানে এসে মিলিত হয় তাকে বলা হয় ত্রিবেণী সঙ্গম।

“পাতালে চোরের বহর

দেখায় আসমানের উপর

তিন তারে হচ্ছে খবর

শুভাশুভ যোগ মতে।” -ফকির লালন

‘মেয়ে গঙ্গা, যমুনা, স্বরস্বতী’। -ভবা পাগলা

অগ্নি উপাসকঃ

অগ্নিতে তিন ধরণের শিখা আছে ভেতরের নীল শিখা হল গোপন ঈশ্বর,মধ্যবর্তী সোনালী শিখা অগ্নিদগ্ধ সন্তান যে তার স্বরূপ জানে না, আর একেবারে বাহিরে ধোঁইয়াটে লালচে-কালো শিখা জগৎপতি।

বাক্যেঃ বিশেষ্য হল প্রারম্ভ বিন্দু, ক্রিয়া তার গতিপথ এবং বিধেয় তার সমাপ্তি। কর্তৃকারকই একমাত্র কারক, বাকিসব তার সাথে সম্পর্কিত,সম্বন্ধযুক্ত।

কর্মঃ

 শাস্ত্রমতে কর্ম আবার তিনপ্রকারঃ ক) কর্ম বা যথার্থ কর্ম খ) বিকর্ম-অবিহিত কর্ম গ) অকর্ম- কর্মশূন্যতা

বাউলফকিরদের গানে ট্রিনিটিঃ

মুসলমান ফকির বাউলদের আলিফ লাম মীম। নবী মোহাম্মদ (সাঃ) মীম, তার দেখানো পথ লাম আর আলিফে আল্লা। নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় আলিফ, রূকুতে লাম আর সেজদায় মীম হরেফের রূপ।

“যাইতে চাইলে সে শহরে, আগে যা মুর্শিদের দ্বারে

লামের টিকিট দিবে তোরে, ভক্তি মাসুল মূল্য যার”। (দূরবীন শাহ)

“আলিফ লাম মিমেতে কোরান তামাম শোধ লিখেছে।

আলিফে আল্লাজী, মিম মানে নবি

লামের হয় দুই মানে,

এক মানে হয় শরায় প্রচার

আরেক মানে মারফতে”।( লালন সাঁই)

সূফী খিদর ধারার অনুসারীরা মনে করেন এক থেকেই ব্যবহারিক কারণে তিনের সৃষ্টি। আরবী একত্ব ‘আহাদ’, এক আল্লাহকে বুঝাতে ব্যবহৃত হয়, শব্দটি আরবী তিন অক্ষর দিয়ে গঠিত। সেকারণে তিন আসলে এক । (sufis 246)

লালনের গানে আছে মিম হরফ নফি করে আহাম্মদ হয়ে যায় আহাদ।

“আহাদে আহাম্মদ এসে নবি নাম তাই জানালে।

নবি যে তনে করিল সৃষ্টি সে তন কোথায় রাখিলে।।

আহাদ নামে পরোয়ার

আহাম্মদ রুপে সে এবার

জন্মমৃত্যু হয় যদি তার

শরার আইন কই চলে।” – লালন ফকির ( আবুল আহসান, ১৫৫)

আহামদ নাম লিখিতে

মিম হরফ কয় নফি করতে

সিরাজ সাঁই কয় লালন তোকে

কিঞ্চিত নজির দেখাই।। – লালন ফকির ( আবদেল মান্নান  ২৯৪)

“আহাদ নামে কেন আফি

মিম দিয়ে মিম করে নফি

কি তার মর্ম কও নবিজী

লালন তাই বলে।।” -লালন ফকির (২৯৮ মান্নান)

আহাদঃ অখন্ড নারী জগত, প্রকৃতি, সৃষ্টিজগত।

মিমঃ মোহাম্মদী অর্থাৎ গুণ অর্জন অথবা স্বভাব অর্জন করা, শানে মোহাম্মদ, স্বর্গীয় চরিত্র ও গুণাবলীর অধিকারী হয়ে ওঠা।

 বৃত্তঃ

সরলরেখাকে ব্যাসার্ধ ধরে কাল্পনিক কোন বৃত্তের পরিসীমা কেন্দ্রস্থ বিন্দুর ক্ষেত্রফল। প্রত্যেক নক্ষত্রের আলোকরশ্মির একটা বাহ্যসীমা আছে, তেমনি প্রত্যেক মানুষের কর্মক্ষেত্রের একটা চৌহদ্দী আছে যার বাইরে তার প্রভাব অকার্যকর। প্রত্যেক মানুষের মনেরও তেমনি সীমারেখা আছে যার বাইরে সে কাজ করতে পারে না। বৃত্ত এ সীমারেখার প্রতীক। বিন্দু কারণ, সরলরেখা তার উপায় আর বৃত্তে তার সমাপ্তি।

নিঃমীলিত চোখ- শাদা স্লেট। খোলা চোখঃ নিজেকে বাইরে খুঁজে পাওয়া, অহং। আকার, স্থান-কাল বহুত্বের বিভ্রম বা মায়া।

বিন্দু-বিশ্বচেতনা, রেখা- সর্বজনীন বুদ্ধিমত্তা আর বৃত্ত-সার্বলৌকিক শক্তি, জানা বিষয়ের তিন মাত্রার অজ্ঞাত কারণ।

মানুষের ক্ষেত্রে বিন্দু-আত্মা, রেখা-সচেতন কাজ, বুদ্ধিবৃত্তি, বৃত্ত-শরীর, উৎস চৈতন্যে থেকে মনের শক্তির ব্যাসার্ধ শরীরে এসে শেষ হয়। বস্তুজগতের অবস্থান বৃত্তের পরিসীমায়, শরীর এবং বস্তুজগতের জ্ঞান হল বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, আবেগ বা ভাবপ্রবণতার  জ্ঞান তার ধর্মতত্ত্ব, মানসিক এবং অতিমানসিক জ্ঞান দর্শনের জ্ঞান। মানুষের মন ক্রমপরিণতিতে বিজ্ঞান থেকে, ধর্মে এবং সবশেষে দর্শনে উপনীত হয়। Being, feeling and thinking চিন্তার জগত থেকে অনুভূতির জগত পরিক্রমা সেখান থেকে অস্তিত্বে।

বিন্দু, রেখা আর বৃত্ত দিয়ে ভাষায় ব্যবহৃত সকল বর্ণমালার সৃষ্টি। যীশুখ্রীস্টকে বলা হয় আলফা এবং ওমেগা, শুরু এবং শেষ।

বাদ্যের ত্রিতালঃ

ত্রিতাল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বহুল ব্যবহৃত তাল। ত্রিতাল ষোলো মাত্রার সমপদী তাল। এর ছন্দ চতুর্মাত্রিক (চার মাত্রার একেকটি, অর্থাৎ চার (১৬/৪) পংক্তি)। এর তিনটি তালি ও একটি ফাঁক, তাই এর নাম তিনতাল বা ত্রিতাল। ত্রিতালের বোল:ধা’ ধিন্’ ধিন্’ ধা’ । ধা’ ধিন্’ ধিন্’ ধা’ । না’ তিন্’ তিন্’ তা’ । তেটে’ ধিন্’ ধিন্’ ধা’ ।

ত্রিভুজঃ

জ্যামিতিতে ত্রিভুজের ধারনা গণিতের ইতিহাসের একেবারে শুরুর ধারনা। দার্শনিক পীথাগরাসের জ্যামিতিক ফর্মের প্রথম তিনটি সমবাহু ত্রিভুজের দ্বারা গঠিত, যার কারণে তাদের মধ্যে রুপান্তর সম্ভব। ঘনক চতুর্ভুজের তৈরি হওয়ায় মাটিকে পানি, আগুন বা বাতাসে রুপান্তর করা সম্ভব ছিল না।

গবেষণাঃ

পরিসংখ্যান এবং বিজ্ঞানের গবেষণা উপাত্ত সংগ্রহে সবসময় কমপক্ষে তিনটি ড্যাটা পয়েন্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রথম ড্যাটা বা পরীক্ষালব্ধ ফলাফল কাকতালীয় বা অনাকাঙ্খিত হতে পারে, তখন দ্বিতীয়বার করে সেটা যদি একইরকম হয় তাহলে ভাল, কিন্তু যদি কিছুটা ভিন্ন হয় যেটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, তখন তৃতীয় আরেকটা পয়েন্ট বা রেজাল্টের প্রয়োজন পড়ে তাহলে বুঝা যায় প্রথম দুটির মধ্যে কোন আসলে সঠিক ফলাফলের কাছাকাছি ছিল। এছাড়া ফলাফলের গড় তৈরি করা বা তাদের লেখচিত্রে সরলরেখা বা সমানুপাতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্যও তিনটি পয়েন্ট দরকার। যদিও দুটি পয়েন্ট দিয়েই সরলরেখা আঁকা সম্ভব কিন্তু ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে, তিনটি পয়েন্ট থাকলে সরলরেখার গতিপথ সম্পর্কে মোটামুটি একটা সঠিক ধারনা পাওয়া যায়।

সারণীঃ ধর্ম, দর্শনে, ভাবনা, চিন্তায় ট্রিনিটি বা ত্রয়ীর ধারনা।

 

ত্রয়ীর সমালোচনাঃ

ডায়ালেক্টিক বা দ্বান্দ্বিক সংশ্লেষণ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক একটা পদ্ধতি তাই যেকোন কিছুতেই আমরা এ তিনের যুক্তি দেখতে পাই কিন্তু দ্বান্দ্বিক যুক্তি তখনই সফল হয় যখন সেটা থাকে মুক্ত, স্বাধীন এবং প্রত্যেক ধাপে তার  সৃজনশীলতা বজায় থাকে তবে নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের উপায় হিসেবে একে সূত্রের মত ব্যবহার করা যায়,যার ফলে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া দিয়ে যেকোন দার্শনিক চিন্তাকে সহজে অনুসরণ করা যায় যেমন, কোন একটা মত উপস্থাপন করা, তার বিপরীত মতটাও বলা, সবশেষে  এ দুটোর সমন্বয় করা অথবা, সমগ্র বিষয়টাকে দেখা, তারপর সেটাকে দুটি বিপরীত বিষয়ে ভাগ করা, তারপরে সমগ্রকে ঐ দুই বিপরীতের সমন্বিত রুপ হিসেবে উপস্থাপন করা দার্শনিক হেগেল দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াকে এমনভাবে ব্যবহারের বিরোধীতা করেছেন। এ ধরণের ত্রয়ীকে তিনি  “shallow mischief বলে সম্বোধন করেছেন তাই সব ধরণের ত্রয়ীকে টিনিটির মর্যাদা দেয়া যাবে না তার মতে এতে কোন ধরনের মহৎ ধারনা বা উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল external ordering এর কাজে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করা হয় যেটা খুব সহজে করা যায় কিন্তু প্রতিটি ধাপে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীনভাবে অগ্রসর হতে দেয়া, তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়া, আমাদের চিন্তা-চেতনায় সেটার প্রতিফলন ঘটানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটা সমগ্রের ধারনার উপস্থিতি ছাড়া এর মাধ্যমে ‘বাহ্যিক বিন্যাস’ ছাড়া আর কোন কিছু অর্জন সম্ভব নয় রোজেনক্রাঞ্জ তাই এদের নাম দিয়েছেন innocent triads   ত্রয়ীর ব্যবহারে এবং তাতে মাত্রাতিরিক্ত আস্থা স্থাপনের ব্যাপারে আমাদের তাই সতর্ক থাকতে হবে।