অর্পিতা রায়চৌধুরী

পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর মধ্যে মানবশিশুর হাসি অন্যতম। অনন্য সে হাসি। অন্য কোনকিছুর সাথেই যার কোন তুলনা হয়না। যা মুহুর্তের জন্য হলেও সকল দুঃখ-কষ্ট, গ্লানি ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সে হাসির একমাত্র অধিকারী নিষ্পাপ মুখগুলো আরও অনেক বছর এই জীর্ণশীর্ণ, পাপে ভরপুর পৃথিবীতে আমাদের প্রবীনদের বেঁচে থাকার আশা জাগায়। সে হাসি রক্তের সম্পর্কের কারোর হোক বা নেহাতই অচেনা, দেখলেই ইচ্ছে করে তাদের সাথে তাদের নিষ্পাপ ভুবনে হারিয়ে যাই। হারিয়ে যাই নিজেদের ফেলে আসা শৈশব অথবা কৈশোরে। সেই ছোট্ট শরীরগুলো একটুখানি ব্যাথা পেলেও অনেকগুণ বেশি হয়ে সে ব্যাথা ফিরে আমাদের বুকে এসে লাগে। ভয় হয়, এই কঠিন পৃথিবী তাদের কোন আঘাত করবেনা তো?

আবার পরক্ষণে নিজ মনেই হাসি। পৃথিবী কী এতো নিষ্ঠুর, যে অকারণে কাউকে আঘাত করবে! পৃথিবীতো মায়ের মতো সর্বংসহা। ভয়তো আমাদের নিজেদের স্বজাতিকে নিয়ে। মানুষ নামক প্রাণিগুলোকে নিয়ে। আমরাইতো আমাদের শিশুদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলছি। জন্মের পূর্বেই তাদের লিঙ্গ নির্ধারণ করায় ব্যস্ত হয়ে পরছি। ছেলেশিশু জন্মালে আদরের কোন কমতি রাখছিনা, আর মেয়েশিশু জন্মালে তাকে আস্তাকুড়ে ফেলে দিতেও আমাদের হৃদয় কাপেনা। আর একশ্রেণীর না-মানুষ এই পৃথিবীতে ঘাপটি মেরে বসে থাকে যাদের শিশুদের দেখলেও চরম কামভাব জেগে উঠে। নিজেদের বিকৃত কাম চরিতার্থ করার জন্য শিশুরাই হয়ে উঠে তাদের তূলনামূলক নিরাপদ মাধ্যম ও সহজ শিকার।

আসিফার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা সেটাই আবারও প্রমাণ করে দিল। মাত্র আট বছরের এক শিশু। জীবন কী সেটা বুঝার আগেই যার কাছথেকে নির্মমভাবে তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

ছবিঃ আসিফা বানু (অনলাইন থেকে প্রাপ্ত)

আসিফাকে ধর্ষণ ও খুনের কারণ হিসেবে জানা যায় ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া জেলার রাসানা নামক অঞ্চল থেকে সংখ্যালঘু যাযাবর মুসলিম বাকারওয়াল গোষ্ঠীকে বিতাড়নের জন্যই একদল উগ্র হিন্দুধর্মাবতারদের এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিতাড়ন করাটাই এক্ষেত্রে একমাত্র কারণ হতে পারে না। যদি সেরকমটাই হতো তাহলে শিশুটিকে অপহরণ করে সাতদিন লাগাতার গণধর্ষণ করার প্রয়োজন পড়তোনা। পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা থেতলে মেরে ফেলার আগেও তাকে ধর্ষণ করা হতোনা। এর আরও একটা মূখ্য কারণ হলো আসিফা বানু মেয়ে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশ ও অঞ্চলের পুরুষদের কাছে নারী নেহায়তই এক ভোগ্যপণ্যতে রুপান্তরিত হয়েছে। আর মূল গলদটা এখানেই। ধর্মের কচকচানিই হোক অথবা রাজনৈতিক দলাদলিই হোক যেকোন অযুহাতে মেয়ে মানুষকে একটু ভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করার কথাই আসেনা, তা সে আট বছরের শিশুই হোক বা আশি বছরের বৃদ্ধাই হোকনা কেন।

তাছাড়া নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করার জন্য ধর্ষণই পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলের পুরুষদের প্রধান হাতিয়ার। আর ধর্ম সেসব অঞ্চলে বারুদে আগুনের ফুলকির মতো কাজ করে। এখানে আসিফার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

আসিফাকে অপহরণের পর কোন এক হিন্দু মন্দিরে নিয়ে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার পর আসিফার বাবা সব জায়গায় খোঁজ করলেও মন্দিরের ভেতরে মেয়েকে খুঁজতে যায়নি।  উনার বিশ্বাস ছিল মন্দির পবিত্র জায়গা, সেখানে কোন অন্যায় হতে পারেনা। অথচ সেই মন্দির, যাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের ঈশ্বরের বাসস্থান হিসেবে গণ্য করে সেই মন্দিরে ঈশ্বরের মূর্তির সামনে একদল হিন্দুধর্মাবলম্বী পুরুষের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। যে পুরুষেরা কোন নারী মূর্তিকেও নিজেদের ঈশ্বর মেনে মাতৃরুপে পূজা করে, যে পুরোহিত নারী মূর্তির পায়ে প্রতিদিন মাথা ঠেকিয়ে নতি স্বীকার করে সেই পুরোহিতের দ্বারা ধর্ষিত হয় আসিফা। সেইসব পুরুষরা, যাদের জন্ম কোন নারীরই গর্ভ থেকে। আসিফার ধর্ষক ও খুনিদেরও হয়তো আসিফার মতো নিষ্পাপ আর এমন মায়াবী চেহারার মেয়ে বা বোন রয়েছে। সেই ধর্ষকেরা যখন আসিফাকে ধর্ষণ করে নিজের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল তখন হয়তো তাদের কন্যারা তাদের কোলে ঝাপিয়ে পড়েছিল, নানান বায়না ধরেছিল বা কথার ফুলঝুড়ি ছুড়ছিল। সেইসব না-মানুষগুলোর আসিফার মাঝে নিজের মা, মেয়ে বা বোনের চেহারা একবারও কেন দেখতে পেলনা? একবারও কেন আসিফার মায়াবী মুখটা চোখে পড়লোনা? এতোই ধর্মীয় জোশ? এতোই ছিল তাদের পৌরুষ্যত্ব? যে পৌরুষত্বকে জিইয়ে রাখতে এক শিশুকে ধর্ষণ করার প্রয়োজন পরে সেকি পৌরুষত্ব নাকি কাপুরষতা? যে ধর্ম মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে হিন্দু, মুসলিম, বোদ্ধ, খ্রিস্টান, উচু-নিচু জাত-পাতের দাড়িপাল্লায় মাপতে শেখায়, যেখানে মানুষ নয় বরং শুধু যোনি চেনা যায় কী প্রয়োজন সেই ধর্মের?

আসিফার আয়তকার মায়াবী চোখদুটো আমার চোখের সামনে হয়তো আরও অনেক রাতপর্যন্ত ভেসে উঠবে। বিশাল ওই চোখদুটোতে না জানি কতো কথা ছিল। যাতে এখন শুধুই একরাশ শুন্যতা আর এই সমাজ, জাত-পাত, ধর্ম, ঈশ্বর আর এই পুরুষতন্ত্রের প্রতি করুণা ছাড়া হয়তো কিছুই নেই। আসিফা জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ বুঝতোনা, রাজনীতি বা পুরুষতন্ত্রও বুঝতোনা। বুঝতোনা নারী-পুরুষের বিভেদ। হয়তো মৃত্যুর আগেও সে তাকে হত্যার কারণ জানতে পারেনি। আসিফা মুসলিম ছিলনা, সে হিন্দুও ছিলনা; সে একটা মেয়ে ছিল আর তার একটা যোনি ছিল; এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল।

আমরা কথায় কথায় সমাজের না-মানুষগুলোকে পশুর সাথে তুলনা করে থাকি। কিন্তু কই? জীবজতের অন্য কোন পশু-পাখির মধ্যে নিজেদের সন্তানদের নিয়ে এমন আগ্রাসী মনোভাবতো দেখিনা। মানুষ ছাড়া প্রাণীজগতের অন্য কোন প্রাণীকে নিজেদের বা অন্য যেকোন গোত্রের শিশু প্রাণীদের দিয়ে কখনো মানুষের মতো শারীরিক ও মানষিক পরিশ্রম, নির্যাতন করাতে কখনো শুনিনি। বরং প্রাণীরা নিজেদেরতো বটেই, অন্য গোত্রের শিশুদেরকেও সাদরে গ্রহন করে বলেই জানি। এমনকী ডাইনী অপবাদ দিয়ে সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া মানবশিশুকেও তারা ফিরিয়ে দেয়নি। নিজেদের সন্তানের মতোই আগলে রেখেছে। এমন অসংখ্য নজির রয়েছে প্রাণীজগতে। কখনো কোন শিশু প্রাণীকে ধর্ষণ করাতো অনেক দূরের কথা। তাহলে মানব সমাজে কেন?

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এই পৃথিবীকে মানবশিশুর বসবাসের উপযোগী করে যেতে চেয়েছিলেন। সে স্বপ্ন তিনি পুরণ করে যেতে পারেননি। অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো প্রিয় কবিকে। কিন্তু সে স্বপ্ন আজও পুরণ হলোনা। যে পৃথিবীকে তিনি জঞ্জালমুক্ত করার শপথ নিয়েছিলেন সেই পৃথিবীই আজ জঞ্জাল দ্বারা কানায় কানায় পরিপূর্ণ। প্রিয় কবির সামনে তাই লজ্জায় মাথা নত করা ছাড়া আজ কিচ্ছু করার নেই। কবির অপূর্ণ স্বপ্নকে আজও পূরণ করতে পারিনি। এই পৃথিবীকে মানবশিশুর বসবাসের উপযোগী করতে পারিনি। এর দায় আমারও, এ আমার চরম ব্যর্থতা।

346 Shares