দীপ্ত সুন্দ অসুর

বন্ধুর মেসে ছিলাম রাতের বেলা।সকালের মিল খেয়ে ১১:০২ এর ট্রেন ধরার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।বন্ধু সাথে আছে।ও সামনের স্টেশনেই নামবে।ট্রেনের অনেক আগেই পৌঁছে গেলাম স্টেশনে।একেবারেই লোক নেই।কিন্তু ধীরে ধীরে ডাউন প্লাটফরম ভরে উঠছে।কত বিচিত্র মানুষের ভাবভঙ্গি। কত বিচিত্র তাদের চালচলন কথাবার্তা।কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছে,কেউ বসে ঝিমোচ্ছে।কারো হাতে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, কারো মোবাইল।

যদিও ঘড়ির কাটা দুপুর ছোঁয়ার ঢের দেরি, তবুও রৌদ্রের আমেজ কিন্তু হাড়ে হাড়েই বুঝতে পারছি।লম্বা স্টেশন পেরিয়ে সামনের দিকে আসতেই হাপিয়ে উঠলাম।বন্ধু টিকিট আনতে চলে গেলো।গিয়ে দাঁড়ালাম ফ্যানের তলে।কিন্তু লোকের চলাচলে অসুবিধা হবে ভেবে সামনেই বসে পড়লাম।আমার বিপরীত পাশেই দেখলাম একটা ছেলে পেপার পড়ছে।দেখে বেশ ভালো লাগলো।পেপার যে এখানে ওখানে সবখানে পড়তে দেখা যায় না তা নয়,কিন্তু ওর মত বয়সীদের হাতে খুব দুর্লভ ব্যাপার।অন্তত আমাদের এই সমাজে, আমাদের এই কালচারে।
বন্ধু আসার টিকিট কেটে আসার সময় দেখি একখানা অ্যাসিভার্স কিনে এনেছে।আমি জানি,ওর মানি ব্যাগ প্রায় শূন্য।বলল,কি বলব বই দেখলে কিনতে মন চায়।আমি হাসতে হাসতে বললাম একেবারেই ঠিক।
ট্রেনের সবে খবর হলো।তবে এখনো ২০/২২ মিনিট লাগবে স্টেশনে পৌঁছাতে। পুরোনো বইয়ের দোকান মানে আমার চোখ গুলোর পলক না ফেরা।গেলাম দুই বন্ধুতে।এ বই ও বই নাড়াচাড়া করলাম।তবে পছন্দমত বই পাচ্ছিলাম না।তাছাড়া,বইবিক্রেতা কাকুর সাথে আমার এই কয়বছরে এমন সম্পর্ক হয়েছে যে,যখন তখন শূন্য পকেটে গিয়েও বই আনতে কোন সমস্যাই নেই এখন।

আকাশের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে হতে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেড়ে গেছে।তবে রোদও যেমন আছে,গরমেরও দাপট কমে নি।অগত্যা কোন বই আজ পছন্দ না হওয়াতে চলে আসলাম।

এসে বসেই থাকলাম।কিন্তু ভাবছি যেখানে যাচ্ছি সেখানে বসে পড়ার জন্য অন্তত একটা বই নেওয়া দরকার।বাড়ীর থেকে তেমন কোন বই আনতে পারি নি।যাই হোক,আবার দোকানের বইয়ের সারিতে চোখের উঠানামা শুরু হল।পাশেই দেখি, সেই ভাইটি যে ওখানে পেপার পড়ছিল। বুঝেই ফেললাম,এর সাথে পরিচিত হলে মন্দ হবে না।এখানে বলে রাখি, এখানে,এই বইয়ের দোকানের সূত্র ধরেই আমার আরো কয়েকজনের সাথে ঘনিষ্টতা হয়েছে।তবে সেই কথা মনে রেখে কিংবা একজন বন্ধু বাড়াবার অভিপ্রায়ে নয় একান্ত মন থেকেই দুই এক কথায় আলাপ শুরু হলো।আমি একটু পর বললাম, তুমি পড়ার বইয়ের বাইরে অন্যান্য বই কেমন পড়ো?
ও বলল, পড়ি বেশ তবে ইংরেজিটা ভালো লাগে না।ও তখন ক্লাস টেনের একটা ইংরেজি বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল।তখনই বুঝলাম,ওর টেনে পড়ার সম্ভাবনা আছে।পরে অবশ্য আমার অনুমানই ঠিক হয়েছিল।

যাইহোক, কথা আমাদের বেড়েই চলেছে।আমি নাস্তিক হলেও কাউকে কখনো আমার অভিমত চাপানোর প্রয়াস চালাই না।বা আগে থেকেই একেবারে হুট করে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলি না।আমার স্টুডেন্টসরা এখনো পর্যন্ত সে খবর জানে না।তবে ওদের প্রশ্ন তোলার দক্ষতা বাড়িয়ে তুললে একসময় ওরাই প্রশ্ন তুলে বসবে সব কিছুকে আর সেটাই করি।কিন্তু এই ভাইটি, আমাকেই জিজ্ঞাসা করল,আপনি কি ধর্মের যা যা আছে সবকিছু বিশ্বাস করেন?
যদিও এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে একটু ঘুরিয়ে বললে ভালো হয়।কিন্তু আমি সরাসরিই বললাম,ভাই, আমি মনে করি ধর্ম একটা সামাজিক সমস্যা।
ও এবার বলল,দাদা,আমি একসময় গীতা প্রতিদিনই পড়তাম, প্রচন্ড বিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে কেমন মনে হচ্ছে এগুলো ভূল।

ওর জীবনের সাথে নিজের জীবন মেলাতে পেরে কেমন যেন আনন্দ লাগছিল।
ও বলল,দাদা,আমাদের জীবনবিজ্ঞান স্যারের সব কথা কেমন যেন বিশ্বাস হয় না।
আচ্ছা,বলা হয়ে থাকে ছেলে-মেয়ে ঈশ্বরের সৃষ্টি।

কিন্তু আমাদের আছে,ক্রোমোজোমের মিলনে আমরা সৃষ্টি।তাহলে ঈশ্বর আসছে কোথায়?

দারুণ। আমি ওর প্রশ্নকেই সমর্থন করলাম।এবং সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দেহমূলক আরেকটা প্রশ্ন জুড়ে দিলাম।

কথায় কথায় ট্রেন এগিয়ে এলো।আমার বন্ধুটি ও সাথে ছিল।ও জানে আমি কেমন। তাই এই যে সাময়িক আলাপন নেই,ওতে ও অভ্যস্ত আছে।

ট্রেনে ওঠে সিট পেয়ে গেলাম।অনেক অনেক আলোচনা। তবে ওর আন্তর্জাতিক বিশ্বের ব্যাপারে জানাশোনা আমার থেকে বেশি।বলল, দাদা,তুমি এটাকে কি বলবে রোবট সোফিয়াকে নাগরিকত্ব দিলো, অথচ কত লাখ লাখ শরণার্থীরা এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে।এখানে তুমি কি বলবে?
আমি কিন্তু এটাকে সাপোর্ট করি না।
এই যে ট্রাম্প, ইনি হয়তো আর আসবেন না।কিন্তু এমন কিছু করে রেখে যাচ্ছেন, যার মূল্য আগামী বিশ্বকে দিতে হবে হয়তো।

ওর কথা শুনে আর চিন্তার স্বচ্ছতা দেখে দারুণ লাগল।শুধু এক্ষেত্রে নয়।ওর এলাকায় একটা প্রতিষ্ঠান আছে।যে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ওর নিজেস্ব অভিমত আমাকে জানালো।যা ওর স্বাধীন চিন্তাকেই তুলে ধরছিল।

দেখতে দেখতে সাতটি আটটি স্টেশন পেরিয়ে আসলাম।ওর স্টেশন সামনেই।ওর ফোন নাম্বার, নাম, কোন স্কুলে পড়ে জেনে নিলাম।

ফোনে কথা হবে জানিয়ে বিদায় জানালাম।