গিয়াসুদ্দিন

মুসলিম সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস হলো কোরানই একমত্র সঠিক ধর্মগ্রন্থ এবং বিশ্বের সব চেয়ে পবিত্র গ্রন্থ। কোরানের প্রত্যেকটি বাক্য নির্ভুল, সত্য ও শাশ্বত। তাদের এই গভীর বিশ্বাস দাঁড়িয়ে আছে আর একটি বিশ্বাসের উপর। সেটা হলো, কোরান মানব রচিত গ্রন্থ নয়, এটা মহান সৃষ্টিকর্তা ও সর্ব শক্তিমান আল্লাহ্‌র সৃষ্টি। মুসলমানদের দাবী করে যে, কোরান শুধু আরবদের বা শুধু মুসলমানদের জন্যে পৃথিবীতে আসেনি, কোরান এসেছে সমগ্র বিশ্বের জন্যে বিশ্বের সকল মানুষের পথ প্রদর্শক হিসেবে। মুহাম্মদ হলেন আল্লাহ্‌র সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (প্রফেট) যাঁর উপর এই গ্রন্থটি অবতীর্ণ হয় তেইশ বছর ধরে জিব্রাইল ফেরেস্তার (আল্লাহ্‌র একজন বিশেষ অশরিরী দূতের) মারফত। মুসলিমরা  বিশ্বাস করে যে কোরানের শক্তিতেই মুহাম্মদ মক্কা বিজয় করে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং পরবরতীকালে তাঁর উত্তরসূরি খলিফাগণ অর্ধেক বিশ্বব্যাপী ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। আবার খলিফাগণ যখন কোরানের পথ থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করেন তখন থেকেই শুরু হয় ইসলামের পতনের যুগ এবং অবশেষে এক সময় ইসলামি সাম্রাজ্য ও খলফাতন্ত্রের অবসান হয়। এভাবে কোরানকে কেন্দ্র করেই মুসলিম সম্প্রদায়ের চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞান-বুদ্ধি আবর্তিত হয়ে থাকে। মোদ্দা কথা হলো কোরানই হলো বিশ্বের মুসলমানদের জীবন-দর্শন। কোরান সম্পর্কে মুসলিমদের মনে এই অগাধ বিশ্বাস আজও সমান প্রবল এই একবিংশ শতাব্দীতেও যে যুগে মানুষের কল্পনা শক্তিও হার মেনেছে বিজ্ঞান সভ্যতা এবং প্রযুক্তি বিজ্ঞানের প্রায় অবিশ্বাস্য উন্নতি ও অগ্রগতির কাছে। এ কথা বলা বাহুল্য যে, কোরান সম্পর্কে মুসলিমদের এই অগাধ বিশ্বাস একেবারেই অন্ধবিশ্বাস যার কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অন্ধবিশ্বাসের গর্ভে জন্ম নেই অন্ধানুগত্য ও অন্ধ শ্রদ্ধাবোধ যা ব্যক্তিপূজায় পর্যবসিত হয়। তাই কোরানের প্রতি মুসলমানদের অন্ধবিশ্বাস ও অন্ধানুগত্য যতটা তীব্র মুহাম্মদের প্রতি অন্ধবিশ্বাস ও অন্ধানুগত্যও ততটাই তীব্র। ফলে কোরান ও মুহাম্মদ সম্পর্কে সামান্য প্রশ্ন বা সমালচনাতেও মুসলিম সমাজ প্রচণ্ড উত্তেজিত ও অস্থির হয়ে ওঠে। তাদের সেই উত্তেজনা ও অস্থিরতা প্রায়শঃই হিংস্রতার রূপ নেয়।

এই অন্ধবিশ্বাস ও অন্ধানুগত্য মুসলিম সমাজের কোনো কল্যাণ করেনি, বরং মুসলিম সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে ক্রমশঃ। কোরানে ভাষা আরবি কারণ আরবদের ভাষা আরবি – এভাবে মুসলিমরা ভাবে না। তাদের বিশ্বাস আরবি আল্লাহ্‌র ভাষা, সুতরাং তাদের কাছে আরবি ভাষার স্থান মাতৃভাষারও উপরে। বাংলার মুসলিম নবাবকে পরাস্ত করে ইংরেজরা ভারতে সান্রাজ্য বিস্তার করেছিল বলে মুসলমানরা ইংরেজি ভাষা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। মুফতিরা ফতোয়া দিয়েছিল যে ইংরেজি শেখা পাপ। এমনকি বাংলাকেও হিন্দুদের ভাষা বলে ফতোয়া জারি করে বলেছিল মুসলমান বাঙালিদের বাংলা ভাষা শেখাও পাপ। কোরান ও মুহাম্মদের প্রতি অন্ধানুগত্যের কবলে শুধু ভাষাই পড়েনি, পড়েছিল বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়গুলিও। কোরানেই সব আছে – এই অন্ধবিশ্বাস থেকে মুসলমানরা কয়েকশ’ বছর ধরে বিজ্ঞান, দর্শন ও ইতিহাসের চর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।  মুসলিম সমাজের স্বাধীন বুদ্ধি, যুক্তি ও চিন্তার সমাধি রচনা করেছিল কোরানের প্রতি অন্ধবিশ্বাস। সেই অন্ধবিশ্বাসে মুসলিম সমাজ আজও নিমজ্জিত রয়েছে। কোরানে বর্ণিত সামাজিক ও রাষ্ট্রিক আইন ও বিধি-নিষেধগুলি আধুনিক সমাজে সম্পূর্ণ অপাঙ্কতেও একথা মুসলিম সমাজ এখনও মানতে নারাজ।  তাই কোরানের মধ্যযুগীয় আইন-কানুনগুলি বর্জন বা সংস্কার করার কথা বললেই আলেম সমাজ উন্মত্তের ন্যায় আচরণ করেন। তারা কতল (হত্যা) করার ফতোয়া জারি করে। বাংলাদেশ তো এখন মুক্তবুদ্ধির বুদ্ধিজীবী, লেখক ও ব্লগারদের বধ্যভূমি। মুক্তবুদ্ধির এই চিন্তাবিদরা প্রতিদিনই আক্রান্ত ও রক্তাক্ত হচ্ছেন। তাঁদের অনেককেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং অনেকেই প্রাণ নিয়ে স্বদেশ পরিত্যাগ করে বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্রব্যবস্থা নগ্নভাবে মোল্লাতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ভারতে এবং একদা বাম আন্দোলনের পীঠস্থান পশ্চিমবঙ্গেও মুক্তবুদ্ধির মানুষদের নিরাপত্তার বড়ই অভাব। এখন কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম মৌলবাদীদের তোষণকারী মমতা ব্যানার্জীর দল ক্ষমতায় আছে বলে নয়, কেন্দ্রের ক্ষমতায় যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বকারী জাতীয় কংগ্রেস এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যখন সিপিআই(এম) ছিল তখনও মুক্তবুদ্ধির লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের নিরাপত্তার অভাব ছিল। পশ্চিমবঙ্গ তো মোল্লাতন্ত্রের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে।

কোরান ও হাদিসেই মানবমুক্তি ও মানবকল্যাণের বীজ নিহিত আছে এমন বিশ্বাস যে অলীক কল্পনা তা নিয়ে তর্ক করার অবকাশ নেই। সারা বিশ্বের মুসলিম দেশগুলির দিকে তাকালেও তা স্পষ্ট বোঝা যায়। অনুন্নত বিশ্বের মানচিত্রে মুশলিম দেশগুলির যেন একচেটিয়া অধিকার। আমাদের (ভারতের) দেশের অভ্যন্তরীণ চিত্রটাও অনুরূপ। সবচেয়ে পশ্চাদপদ যারা তাদের প্রধান অংশটাই মুসলিম সম্প্রদায়। দারিদ্র, নিরক্ষরতা, অধিক জন্মহার, অধিক শিশুমৃত্যুহার, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও উগ্রতা সবচেয়ে বেশী মুসলিম সমাজেই। প্রশ্ন হল, এসব অভিশাপ ও পশ্চাদপদতা থেকে মুসলমানদের মুক্তির উপায় কী? মুক্তি পেতে এবং প্রগতি ও উন্নতির পথ খুঁজতে সর্বাগ্রে ত্যাগ করতে হবে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও অন্ধানুগত্য। পথ খুঁজতে হবে আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও সমাজভাবনার মধ্যে। কিন্তু মোল্লাতন্ত্র তা মানতে একদম নারাজ। তবে মডারেট মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এ কথাটা অনেকটাই মানছেন। হ্যাঁ, সেই বুদ্ধিজীবীদের কথাও বলছি যাঁদের আল্লাহ্‌ ও মুহাম্মদের প্রতি একশ’ ভাগ আনুগত্য বিদ্যমান। আমরা যারা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী বস্তুবাদী মানুষ যখন বলি যে পশ্চাদপদ  ধর্মশিক্ষা, ধর্মীয় আইনকানুন ও ধর্মীয় সংস্কৃতি পরিত্যাগ করে আধুনিক শিক্ষা ও আধুনিক সমাজের  মূল স্রোতে প্রবেশ করতে হবে তখন আলেম সমাজ আমাদের গায়ে ইসলাম ও মুসলমানের শত্রুর তকমা সেঁটে দিয়ে মুসলমান সমাজকে বিভ্রান্ত করে। তাই এখানে আল্লাহ্‌ ও ইসলামে বিশ্বাসী  মুসলিম সমাজের একজন উচ্চশিক্ষিত অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবীর চিন্তাধারার কিছু অংশ এ নিবন্ধে উল্লেখ করতে চাই যেখানে তিনি বেশ দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন যে, কোরান ও হাদিসের বহু জিনিষই আজকের মুসলিম সমাজে অপ্রযোজ্য ও অপাঙ্কতেও হয়ে পড়েছে। সেই অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী হলে ড. ওসমান গণী যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কর্মজীবনে এবং ইসলামের ইতিহাস, মুহাম্মদ ও খলিফাদের জীবনী ইত্যাদি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। এখানে তাঁর চিন্তাধারা থেকে যে কথাগুলি লিখব সেগুলি তিনি লিখেছেন একটা দীর্ঘ প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি রয়েছে একদা সিপিএমের নেতা মইনুল হাসান সম্পাদিত ‘মুসলিম সমাজ এবং এই সময়’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডে। এই সময়ে মুসলিম সমাজের কী কী করণীয় সে বিষয়ে ড. গণীর নিজস্ব চিন্তাধারার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে সেই নিবন্ধটিতে।

তিনি লিখেছেন, ‘প্রত্যেক নির্ধারিত কালের জন্য কেতাব (ঐশীগ্রন্থ) আছে’ কোরানঃ সুরা রাদঃ১৩/৩৮।’ কোরানের এই আয়াতটি দিয়েই ড. গণী প্রবন্ধটির সূচনা করেছেন। আয়াতটির বাখ্যায় তিনি লিখেছেন, ‘কোনকালের কোনো একটি কেতাব সকল কালের সমস্যার সমাধান দেয় নি, দেওয়াটা অযৌক্তিকও। চলমান সমাজে এটা সম্ভবও নয়।’ (পৃ-১৫২) অর্থাৎ ড. গণী প্রাঞ্জল ভাষায় বলেছেন যে কোনো ধর্মগ্রন্থই চিরন্তন নয়। তিনি এ কথাটা আরও স্পষ্ট করেছেন এভাবে, ‘চলমান মানব সমাজ এমনই স্থান, যেখানে জোর করে কিছু আনাও যায় না, রাখাও যায় না, আবার তাড়িয়েও দেওয়া যায় না। তারা কখনও ধর্মের প্রয়োজনে আসেন না, যায় না, থাকেনও না। তাই কোনো ধর্মগ্রন্থই চলমান সমাজে তার বিধি-বিধানগুলোকে কোনোদিনই চিরন্তন করতে পারে নি। পারবেও না।’ (পৃ-১৫৩) কোরানের বিধানগুলি আজকের সমাজে আঁকড়ে থাকা যে নির্বুদ্ধতা ও সংস্কার সে কথা তিনি বলেছেন অকপটে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘সময় ও যুগ ও কালের সাথে যেগুলোর আর কোনো সম্পর্ক নেই, মুসলমানগণ তাদেরই বুকে জড়িয়ে বসে আছে। পিতা-মাতা যতই প্রিয় হোন, মারা গেলে কবরে বা শ্মশানে নিয়ে যেতেই হয়। বন্য জন্তু তাদের সন্তান মারা গেলেও তাদের বুকে জড়িয়ে বসে থাকে। মানুষ ওরূপ করবে কেন। সমাজের বদ্ধ সংস্কার, কুসংস্কার, অপসংস্কার, অন্ধ অনুশাসন-অনুষ্ঠান ইত্যাদিকে আঁকড়িয়ে ধরে থাকাটা একেবারেই নির্বুদ্ধিতার পরিচয়।’ (পৃ-১৬০) স্বাধীন চিন্তা ও চেতনার অভাবে কীভাবে ইসলামি সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল তার বাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি  বলেছেন, ‘… একটি জাতির অস্থি ও মজ্জাকে অসাড় করে তুলতে মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত চেতনার অনুপস্থিতির যে প্রভাব, মুসলিম জাহান দশম খ্রিস্টাব্দের পর তা হতে আর নিষ্কৃতি লাভ করেনি। নচেৎ বাগদাদের খলিফাগণ যতই অপদার্থ হন, ওইরূপ অচিন্তনীয় শোচনীয় পরাজয় ঘটত না। বাগদাদ খলিফাগণ অনেক পূর্বেই স্বাধীন চিন্তা ও চেতনার সমধি রচনা করেছিলেন। তবু খেলাফত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ১০০০ হতে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এসেছিল। এই পর্যন্ত খলিফাগণ চালিত হয়েছিলেন কিছু ধর্মান্ধ মোল্লা দ্বারা।’  (পৃ-১৬০, ১৬১)  বলা বাহুল্য যে বিজ্ঞানের ঝলমলে আলোয় উদ্ভাসিত এই একবিংশ শতাব্দীতেও মুসলিম সমাজ চালিত হচ্ছে ধর্মান্ধ মোল্লাদের দ্বারা। আর তাই মুসলিম সমাজ আজও বিশ্বব্যাপী দারিদ্র, নিরক্ষরতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, সংস্কার ও কুসংস্কারের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে।

কোরানের বিধানগুলি আজ যে অপাঙক্তেয় সে কথা ড. গণী ব্যক্ত করেছেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে এই ভাষায়, ‘ধর্মের বিধি বিধানের সময় সীমা অনুপাতে, বর্তমান সামাজিক নানা সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে, বা সমাজের উত্থান পতনে, আবর্তনে-বিবর্তনে সময়ানুপাতিক বিচার-বিশ্লেষণে, পবিত্র কোরানের বহু জিনিষ আজ মুসলিম সমাজেও অপ্রয়োজ্য ও অপাঙক্তেও হয়ে পড়েছে। কেননা চলমান সমাজ বহুদূর এগিয়ে এসেছে।’  (পৃ-১৫৫) গণী তাঁর যুক্তিবাদী বক্তব্যের সমর্থনে অনেকগুলি দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করেছেন। এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো মাত্র।

দৃষ্টান্ত – এক). ‘চোরের হাত কাটাঃ পুরুষ বা নারী চুরি করলে তার হাত কেটে দাও। কোরানঃ সুরা মায়দাঃ ৫/৩৮  একমাত্র আরব দেশ ব্যতীত  কোনো মুসলমান দেশেও এ বিধান আর প্রচলিত নেই। … এখানে বর্তমান যুগে কোরানের বিধান রহিত হয়েছে।’   (পৃ-১৫৫, ১৫৬)

 দৃষ্টান্ত – দুই).  ‘ব্যাভিচারের শাস্তিঃ তাদের ঘরে আবদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হয়। কোরান, ৪/১৫। ব্যাভিচারিণী ও ব্যাভিচারী ওদের একশ’ ঘা বেত মারো। কোরাণ, ২৪/২। এতদ্ব্যতীত ব্যাভিচারের পাথর ছুঁড়ে প্রাণদণ্ড ইত্যাদি শাস্তিগুলো একমাত্র আরব ব্যতীত সকল দেশেই রহিত। মহাকালের কোলে চলমান সমাজ ও আগত মানব সমাজ কোনো যুগেই কোনো নীতি বা বিধানকে শাশ্বত বলে মেনে নেয়নি।’ (পৃ-১৫৬)

দৃষ্টান্ত – তিন). ‘সাক্ষীঃ তোমাদের মধ্য হতে  দুজন পুরুষ সাক্ষীকে সাক্ষী কর, কিন্তু যদি পুরুষ সাক্ষী না পাওয়া যায়, তাহলে সাক্ষীদের মধ্য হতে তোমরা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী মনোনীত কর। কোরানঃ ২/২৮২। এখানে সাক্ষীদানে কোরাণ নারীকে পুরুষের অর্ধেক মর্যাদা দান করেছে। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সাক্ষিদানে নারী ও পিরিষ সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। এখানে কোরানের ঐ আয়াত রহিত হল।’ (পৃ-১৫৬)

দৃষ্টান্ত – চার). ‘ক্রীতদাসীঃ যারা নিজেদের যৌন অঙ্গ সংযত রাখে। তবে নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণের ক্ষেত্রে অন্যথা কামনা করলে তারা নিন্দনীয় হবে না। কোরানঃ ২৩/৫-৭, ৭০/২৯, ৩০। কোরাণ অনুমোদন করেছে, মুসলমানগণ তাদের ক্রীতদাসীকে ইচ্ছা করলে স্ত্রীরূপে ব্যবহার করতে পারবে। চলমান সমাজে দাসপ্রথা রহিত। সুতরাং কোরানের অনুমোদন আজ অপাংক্তেয়।’  (পৃ-১৫৮)

দৃষ্টান্ত – পাঁচ). ‘তালাকঃ তালাক দুবার। অতঃপর তাকে নিয়মানুযায়ী রাখতে পার, অথবা সৎভাবে ত্যাগ করতে পার।  কোরানঃ ২/২২৭-২৪১, ২৮/৪-১২, ৩৩/৪, ৪৯, ৫৮’২, ৬৫/১-১২। মুসলিম সমাজে বহু নাম করা বড়ো বড়ো জামাতগোষ্ঠী কোরানের বিশুদ্ধ দু তালাককে লাটে তুলে মনগড়া তালাকের ফতোয়া জারি করে সমাজের সর্বনাশ তো করছেনই, অধিকন্তু কোরাণের বিধানটিকেও বোধ করেছেন।’ (পৃ-১৫৯)

দৃষ্টান্ত – ছয়). ‘ইদ্দতকালঃ তালাকপ্রাপ্তাগণ তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। … আল্লাহ্‌ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন, তা গোপন করা তাদের জন্য বৈধ নয়। কোরানঃ ২/২২৮-২৩২, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল প্রসব হওয়া পর্যন্ত। ৬৫/৪। দুজন মুসলিম নর-নারীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে, অন্য বিয়ের জন্য যে সময়টা অপেক্ষা করতে হয়, ওই অপেক্ষারত সময়টার নাম ইদ্দতকাল। … কোরান বলছে তার গর্ভে বাচ্চা আছে কীনা, জানার জন্য। ওই জিনিষতা জানার জন্য আজ বিজ্ঞানের যুগে তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে কেন। ওটা তো এখন যে কোনো ক্লিনিকে তিন ঘণ্টাতেই জানা যাবে। সুতরাং এ যুগে পরিত্যাক্ত নারীকে আর তিন মাস অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। … গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল তার প্রসবকাল পর্যন্ত। এখন প্রশ্ন উঠছে, এখন সন্তানের জননী আর গর্ভধারণ করছে না। অন্য নারীর ‘গর্ভ’ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং যে নারীর গর্ভে বাচ্চা নেই, তার প্রসবের প্রধ্ন নেই। তার ইদ্দতও নেই।’ (পৃ-১৫৯)

দৃষ্টান্ত – সাত). ‘ফারাজঃ আল্লাহ্‌ তোমাদের সন্তান সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান। কোরানঃ ৪/১১-১৩। মুসলিম ছেলে-মেয়ে, নিকট আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কোরানের নির্দেশ মতো জমি বণ্টনের নাম ‘ফারাজ’।  এ  ‘ফারাজ’ প্রথাও আজ লাটে উঠেছে। সমাজের পণপ্রথা ‘ফারাজ’ প্রথাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। পিতা কন্যার বিয়েতে দায়গ্রস্ত হয়ে পণের বিশাল টাকা মেটাতে জমি বিক্রি করছেন। পরে যেটুকু জমি থাকছে তা পুত্রদের নামে লিখে দিচ্ছেন। ফলে মুসলিম ঘরে ঘরে কোরাণের ‘ফারাজ’ আজ প্রয় কবরস্থ। এরই নাম পরিবর্তনশীল সমাজ। সে পরিবর্তন সুসংস্কারেই হোক, আর কুসংস্কারেই হীক চলছে, চলবে। সে চলমান।’     (পৃ-১৫৮, ১৫৯)

‘পবিত্র কোরানের বহু জিনিষ আজ মুসলিম সমাজেও অপাঙক্তেয় হয়ে গেছে’ – লেখক তাঁর এই বক্তব্যের চোদ্দটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করেছেন। এখানে উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র সাতটি। লেখক যে কথাগুলির সাহায্যে তাঁর প্রবন্ধ শেষ করেছেন সে কথাগুলির কিছুটা অংশও যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য। তিনি  লিখেছেন, ‘… উন্নতির নদীতীরে পাড়ি দিতে হলে যুগের আধুনিক তরিতে চাপতেই হবে। … নচেৎ জগতের বোঝারূপে পেছনে পড়ে থাকতেই হবে। এ কথাও কিছুতেই ভোলা উচিৎ হবে না যে, বিজ্ঞান ব্যতীত ধর্ম যেমন একটি অন্ধ মানুষ, ধর্ম ব্যতীত বিজ্ঞানও একটি বিপজ্জনক দুর্বৃত্ত মানুষ। … যারা হবে সমুন্নত বিদ্বান, তারা কেবল নাবালকের মতো স্বাধীন দেশের নাগরিকই হবে না, হবে চিন্তা ও চেতনায় স্বাধীন।’ (পৃ-১৬১)  ড. ওসমান গণী তাঁর প্রবন্ধে যা বলেছেন তার সারমর্ম এরূপঃ  এক). কোরানের বিধানগুলি সর্বকালের জন্য নয়, দুই). আজকের যুগে কোরানের বিধানগুলির অধিকাংশই অপাঙক্তেয়, তিন). আলেম সমাজ (মুসলিম ধর্মগুরুগণ) ধর্মান্ধ এবং তারা যুগে যুগে মুসলমানদের সর্বনাশ করেছে, চার). সমাজের পরিবর্তনশীলতার অমোঘ নীতি মেনে মুসলমানদের স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হতে হবে, এবং পাঁচ). কোরানের অপাঙক্তেয় আইন ও বিধি-নিষেধগুলি নির্মমভাবে বিসর্জন দিতে হবে এবং আধুনিক আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতিকে গ্রহণ করার সাহস  অর্জন করতে হবে। প্রবন্ধটির মূল সুর বা আহ্বানটি হলো –  মুসলিম সমাজের ব্যাপক সংস্কার সাধন জরুরী এবং তা করার সাহস অর্জন করতে হবে।

ড. ওসমান গণী পশ্চিমবঙ্গের একজন নাম করা বিদ্বান মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি একজন বিশিষ্ট লেখক ও বহু গ্রন্থের রচিয়তাও। তিনি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো ‘মহানবী’ এবং ছয়টি খণ্ডে লেখা ‘ইসলামের ধারাবাহিক ইতিহাস’। তাঁর সব চেয়ে বড়ো পরিচয় হলো তিনি একজন ভীষণ ধর্মভীরু মানুষ এবং আল্লাহ্‌ ও মুহাম্মদের বিশ্বস্ত অনুগামী। তথাপি তাঁর ওই নির্ভীক উচ্চারণে –   পবিত্র কোরানের বহু জিনিষ আজ মুসলিম সমাজেও অপাঙক্তেয় হয়ে গেছে এবং সেগুলি বর্জন করতে হবে – যুক্তিবাদী মানুষরা  যুগপৎ বিষ্মিত ও চমৎকৃত না হয়ে পারে না। কিন্তু মুসলিম সমাজের চিন্তাশীল ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের প্রচণ্ড হতাশ করেন। তাঁরা মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে বড়ো বড়ো কলাম লেখেন, কিন্তু কোরানের প্রতি অন্ধানুগত্য মুসলিম সমাজের কী ভয়ংকর সর্বনাশ করছে সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। বরং শরিয়তি আইনের বীভৎস চেহারা উন্মোচন করে মুসলিম সমাজের কোনো যুক্তিবাদী লেখক যখন মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত হন তখন ঐ বুদ্ধিজীবীরা আক্রমণকারী মুসলিম মৌলবাদীদেরই পাশে দাঁড়ান। বলেন, বাক-স্বাধীনতার নামে  মুসলিমদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেবার অধিকার কারো নেই। ‘ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত’ – এর অজুহাতে এটা তো বাক-স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা। এ বিরোধিতা তাঁরা করেন মুসলিমদের তুষ্ট ও তোয়াজ করার জন্যে। এটা আসলে মুসলিমদের সাথে এক প্রকারের প্রতারণা করা। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ এই বুদ্ধিজীবীদের এই প্রতারণা আমাকে ভীষণ হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমার মতো অনামি ও অখ্যাত ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী লোক যাঁরা আছেন, যাঁরা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ ও নিবেদিত প্রাণ এবং মোল্লাতন্ত্রের লাল চোখের ভয়ে যাঁরা ভীত-সন্ত্রস্ত নন, তাঁদের সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে একটা বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস করতে হবে।

গিয়াসুদ্দিন এর ব্লগ   ৫৬৭ বার পঠিত