শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র

১. যুধিষ্ঠির হাজরা ও রণজিৎ গরাং লিখিত নবম ও দশম শ্রেণীর ‘আধুনিক ভূগোল’ বইয়ে পড়েছি যে, বিজ্ঞানীরা দূরবীণের সাহায্যে সৌরজগতের গ্রহগুলিকে সূর্য্যের চারদিকে ঘুরতে দেখেছেন।

সংশোধন: বাস্তবে গ্রহদের গতি খালি চোখে দেখতে হয়। দূরবীণে কোনো গ্রহকে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে দেখা অসম্ভব। এর কারণ হল দূরবীণ আকাশের একটু অংশকে অনেক বড় করে দেখায় এবং সূর্য্যের দিকে এলে গ্রহগুলি অদৃশ্য হয় বলে দূববীণে সূর্য্য ও গ্রহদের একসাথে দেখা যায় না। একটা উপমা দিতে গেলে বলব যে, গরু ঘাস খায়, এটা যেমন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখে প্রমাণ করা হয় না; তেমনি গ্রহগুলি সূর্য্যের চারদিকে ঘুরে, এটা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে প্রমাণ করা হয় না। আসলে শনি পর্যন্ত গ্রহগুলি খালি চোখেই দেখা যায়। খালিচোখে গ্রহগতি দেখেই কোপার্ণিকাস তাঁর সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্ব লিখেছিলেন। বহু ভূগোল লেখক কোনোদিন খালিচোখে গ্রহগুলি দেখেননি। তার ফলেই এই ভুল হয় এবং তারা শিক্ষার প্রকৃত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন। আমি এই ভুল আরো একাধিক বইয়ে দেখেছি।

২. শ্রীবৃন্দাবন রায় তাঁর ষষ্ঠ শ্রেণীর ভূগোল বইয়ে বলেছেন যে, পৃথিবীর আহ্নিক গতি না থাকলে পৃথিবীতে দিনরাত হত না।

সংশোধন: বাস্তবে তখন ৬মাস দিন, ৬ মাস রাত হত। সেটা হত পৃথিবীর বার্ষিক গতির জন্য। দিনরাত্রিতে পৃথিবীর বার্ষিকগতির ভূমিকা বহু ভূগোল লেখক ও শিক্ষক ঠিকমতো জানেন না বলে আমি লক্ষ করেছি। পৃথিবী ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে নিজ অক্ষে এক পাক খায়, তবু কেন ২৪ ঘণ্টায় এক দিন হয়, এই প্রশ্নটির উত্তর অনেকেই বলতে পারেন না। তার থেকেই এই ভুল হয়। সুভাষরঞ্জন বসু ও দেবাশীষ মৌলিকের মাধ্যমিক ভূগোল বইয়েও এই গোলমাল চোখে পড়ে।

৩. সুভাষরঞ্জন বসু ও দেবাশীষ মৌলিকের সপ্তম শ্রেণীর ভূগোল বইয়ে পড়েছিলাম যে, বুধ গ্রহে নাকি দিনরাত্রি হয় না।

সংশোধন: বাস্তবে বুধ গ্রহে দিনরাত্রি হয়।

৪. সুভাষরঞ্জন বসু ও দেবাশীষ মৌলিকের মাধ্যমিক ভূগোল বইয়ের জোয়ারভাঁটার অধ্যায়ে পৃথিবীর উপর চাঁদের আকর্ষণ ক্ষমতা সূর্যের দ্বিগুণ বলা হয়েছে।

সংশোধন: বাস্তবে পৃথিবীর উপর চাঁদের আকর্ষণ সূর্যের আকর্ষণের ১৮০ ভাগের একভাগ মাত্র। বসু-মৌলিকের বইয়ের এই ভুল হাস্যকর এবং লজ্জাজনক।

৫. বসু ও মৌলিকের মাধ্যমিক ভূগোল বইয়ে চান্দ্রজোয়ার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন একটি বাস্তববিবর্জ্জিত কথা বলা হয়েছে যা পড়লে চমকে যেতে হয়। ওরা বলেছেন যে, পৃথিবীর যেদিকটা চাঁদের দিকে সেদিকের জলরাশির উপর চাঁদের আকর্ষণ নাকি পৃথিবীর আকর্ষণের চেয়েও বেশী হয়!

সংশোধন: বাস্তবে সমুদ্রের জলকে পৃথিবীই বেশী টানে, আকাশের চাঁদ নয়।

৬. আমরা পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের পঞ্চম শ্রেণীর প্রকৃতি বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছিলাম যে শীতের ভোরে যে শুকতারা দেখা যায় তা আসলে শুক্রগ্রহ।

সংশোধন: বাস্তবে শুকতারাকে কেবল শীতের ভোরে দেখা যায় এমন নয়। গ্রীষ্ম, শরৎ — বছরবিশেষে যেকোনো ঋতুর ভোরেই দেখা সম্ভব। শুক্রের যুতিকাল ৫৮৪ দিন বলেই এটা হয়, যুতিকাল ৩৬৫ দিন হলে শুক্রকে একটি নির্দ্দিষ্ট ঋতুর (যথা শীতের) ভোরে দেখা যেত।

৭. সূর্য্যের চারদিকে এক পাক খেতে পৃথিবীর লাগে ৩৬৫দিন ৬ঘণ্টা ৯ মিনিট ৯.৫ সেকেণ্ড (নাক্ষত্রবৎসর)। রাজ্যের সব ভূগোল বইয়ে ঐ সময়টা ৩৬৫দিন ৫ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেণ্ড (ক্রান্তিবৎসর) বলা হয়েছে, যার সংশোধন আজও হল না। উভয় প্রকার বৎসরের মধ্যে প্রায় ২০ মিনিটের ফারাক থাকে, এটা হয় ক্রান্তিবিন্দুদ্বয়ের অয়ন চলনের জন্য (আমি অন্য একটি পোষ্টে এই নিয়ে বিশদে বলেছি)। বিষয়টি ভালো করে না বুঝার ফলেই এই ভুল। অয়ন চলনের মতো জটিল বিষয় ছাত্রছাত্রীদের না বুঝালেও পৃথিবী যে, ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা ৯ মিনিটে সূর্য্যকে এক পাক খায় (৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৯ মিনিটে নয়), এই সত্যি কথাটা তাদের বলতে হবে।

৮. বসু-মৌলিকের মাধ্যমিক ভূগোলে পৃথিবীর আহ্নিকগতির ফলে সৃষ্ট অপকেন্দ্র বল গৌণজোয়ার সৃষ্টি করে বলে বলা হয়েছে।

সংশোধন: পৃথিবীর আহ্নিকগতির ফলে সৃষ্ট অপকেন্দ্র বল আদৌ গৌণজোয়ার সৃষ্টি করে না। গ্রন্থকারদ্বয় পৃথিবী-চাঁদ জুড়ির সাধারণ ভরকেন্দ্রের চারদিকে ঘূর্ণনের (যার পর্য্যায়কাল ২৭.৩ দিন) ফলে সৃষ্ট অপকেন্দ্র বলের সঙ্গে (এই শেষোক্ত বল জোয়ার সৃষ্টি করে) বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছেন। তাদের বইয়ে জোয়ারভাঁটা নিয়ে এমন ভুল তথ্য ও তত্ত্ব পেয়েছি যা পড়লে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয় ! রাজ্যের লক্ষ-লক্ষ ছাত্রছাত্রী যে বছরের পর বছর এমন ভুল মুখস্থ করে আসছে তা বড়ই পরিতাপের বিষয়। সরকারের উচিত বিষয়গুলির চর্চ্চা করা এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া।

এমন নানা ভুল ভূগোল বইগুলিতে দেখা যায়। বাস্তবের সঙ্গে যোগসূত্র না থাকার ফলেই এই ভুলগুলি হয়। বহু ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকশিক্ষিকা আকাশ দেখেন না, এমনকি ধ্রুবতারাটিও চিনেন না। এমনি করে ভূগোল শেখা যায় কি?

আমার কাছে নতুন (২০১৮ সালের) ভূগোল বইগুলি নাই। ২০০৮ সালে আমি যখন ‘পাঠ্য বইয়ে ভুল’ পুস্তিকাটি লিখেছিলাম তখন সর্ব্বশেষ সংস্করণের পাঠ্যপুস্তকগুলিতে এই তথ্যগুলি পেয়েছিলাম। আজকের বইগুলিতে এইসব বিষয়ে কী আছে এবং ভুলগুলি কীভাবে সংশোধন করা যায়, আপনারা অনুগ্রহ করে সেই বিষয়ে কিছু বলুন।

যেসব ভুলগুলির কথা এখানে তুলে ধরেছি তেমন ভুল বহু বইয়েই আছে, যা খুবই লজ্জার বিষয়। এগুলি শুধু তথ্যগত ভুল নয়, বরং এই জাতীয় ভুলগুলি থেকে লেখকদের বিষয়ের বোধ, বাস্তব বুদ্ধি ও সাধারণ জ্ঞানের অভাব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে একজন ভুল করেন, বাকীরা টুকে যান বলে মনে হয়। তার ফলে একই ভুল নানা বইয়ে দেখা যায়।

শিক্ষকশিক্ষিকাদের প্রতি আমার অনুরোধ এই যে, বইয়ে যাই থাক না কেন, আপনারা ছাত্রছাত্রীদের ঠিকটা শেখান। সবাই এইসব ভুলগুলি নিয়ে আলোচনা করুন এবং নানা ভূগোল বইয়ের অন্যান্য ভুলগুলিও ধরুন। সবাই আকাশ দেখুন, বাস্তবের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করুন। শুধু কিছু মৃতপ্রায় তথ্য মুখস্থ করা নয়, বিষয়গুলি বুঝতে হবে।

আপনারা আপনাদের পরিচিত ভূগোল লেখক ও শিক্ষক এবং সকল আগ্রহী ব্যক্তিকে বিষয়গুলি জানাতে পারেন এবং ২০১৭-২০১৮ সালে মুদ্রিত বই থেকে নানা সম্ভাব্য ভুলের নমুনা এখানে পেশ করতে পারেন। রাজ্য়ের সমস্ত ভূগোল শিক্ষক এবং লেখককে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই। কারো ব্যক্তিগত সমালোচনা করা এই পোষ্টের উদ্দেশ্য নয়। আপনারা পোষ্টটি শেয়ার করতে পারেন যাতে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, লেখক, প্রকাশক, সরকার, বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকর্ম্মীদের কাছে এই তথ্যগুলি পৌঁছে যায়। সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।