জোবায়েন সন্ধি

১৯৮৪ সালে ড. আহমদ শরীফ, কাজী নূর-উজ জামান, শাহরিয়ার কবিরদের নেতৃত্বে গড়ে উঠে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র’। এই সংগঠন থেকে ১৯৮৭ সালে প্রকাশ করা হয় ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ বইটি।

এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক ফজলুল বারী দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিনে ভ্রমণ করে একাত্তরের ঘাতক দালালদের সহযোগী ব্যক্তিদের অবস্থান ও পরিচয় প্রকাশ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফজলুল বারীই প্রথম প্রকাশ করেন একাত্তরে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর অপকর্মের ফিরিস্তি। এর আগে পর্যন্ত একাত্তরের কৃত অপকর্মের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাঈদীর নাম তেমন আলোচিত ছিল না। পরিণতি: ফজলুল বারীকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরকম আরও অনেককেই দেশ ছাড়তে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র থেকে ১৯৮৭ সালে প্রকাশ হওয়া ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ বইটি দেশব্যাপী তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়। তরুণ প্রজন্ম একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহচর আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনীর বিষয়ে অনুসন্ধান ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ পায়। তরুণ প্রজন্ম তাদের বিষয়ে জানার আগ্রহী হয়ে উঠে এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে মনোনিবেশ করে। অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের চেতনা শাণিত হতে শুরু করে।

সেসময় থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠতে শুরু করে। এই দাবি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে উঠেনি। মুক্তিযুদ্ধের ‘একক দাবিদার’ আওয়ামী লীগের কাছ থেকে তো নয়ই। ড. আহমদ শরীফ, কাজী নূর-উজ জামানদের উৎসাহী ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠন ও একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলন দ্রুত ব্যাপকতা পায়।

সেসময় জামায়াতে ইসলামীর ছত্রছায়ায় ড. আহমদ শরীফকে নাস্তিক-মুরতাদ আখ্যায়িত করে দেশব্যাপী ‘নাস্তিক-মুরতাদ’ ড. আহমদ শরীফের ফাঁসি দাবি করে ধার্মিক মুসলিমদের আহমদ শরীফের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। সে চেষ্টায় ওই সময়ের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। এতকিছুর পরেও ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র আন্দোলনকে দমানো সম্ভব হয়নি। বরং পরিস্থিতি এমনই হয়েছিল যে একাত্তরে রাজাকার বাহিনীর সাথে যুক্ত হওয়া প্রায় সকলেই নিজেদের পরিচয় দিতে মুখ লুকাতো।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ২৬ মার্চ ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ লক্ষ জনমানুষের উপস্থিতিতে গণআদালত পরিচালনা হয়। ওই আদালতে গোলাম আযমের অপরাধ মৃত্যুদণ্ডতুল্য হিসেবে রায় ঘোষণা করা হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওই অনুষ্ঠানে আমিও অংশ নিতে পেরেছিলাম বলে এখনো নিজেকে এই যুদ্ধের গর্বিত সৈনিক মনে করে শান্তনা পাই। সেদিন দেশের জনগণ ওই রায়কে অভিনন্দন জানান এবং তরুণ প্রজন্ম নতুন করে সংকল্প করতে থাকে যে এই দেশ থেকে রাজাকার ও মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে চিরতরে বিদায় করা হবে। বাংলাদেশ হবে একটি অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র।

১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনের কারণে বিএনপি সরকারের পতনের পরে প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। সরকারে টানা ৫ বছর থাকলেও আওয়ামী লীগ একবারের জন্যও একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচার করা হবে, এ বিষয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করেনি।

এরপর ২০০১ এ বিএনপি-জামাত জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে রাষ্ট্রক্ষমতা পায়। ক্ষমতা পেয়েই তারা একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবির সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের খুন, গ্রেফতার ও নানানরকম হয়রানি শুরু করে। এর পরও একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবি থেকে তরুণ প্রজন্ম পিছু হটেনি।

ইন্টারনেট ও ব্লগে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবি নিয়ে অসংখ্য পরিমাণ লেখালেখির কথাও নিশ্চয় ভুলে যাবার নয়। মূলত ইন্টারনেট ও ব্লগে তরুণ প্রজন্মের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ২০০৮ এর নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার’ করা হবে বিষয়ে ঘোষণা দেয়। ফলও হাতে নাতে– তরুণ প্রজন্ম মুড়ি-মুড়কির মতো আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসায়।

বর্তমান আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল চক্র দ্বারা তরুণ প্রজন্মের পিঠে ছুরি মারার সূচনাটা হয়েছিল ২০১৩ এর ফেব্রুয়ারিতেই। কীভাবে সেটা সকলেই জানি। প্রবল গণজাগরণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে, এখন আর কী দরকার সেসব কথা বার বার বলার!

এরপরে কেবলই ইতিহাস আর ইতিহাস। নদীর জল অনেক গড়িয়েছে। শুকিয়েও গেছে অনেক জল।

যে প্রজন্ম ‘রাজাকার’ শব্দটাকে উচ্চারণ করতেও ঘৃণা পেতো, আজকে হাইব্রিড আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে এখনকার প্রজন্ম নিজের বুকে-পিঠে ‘আমিই রাজাকার’ লিখতে ‘গর্ববোধ’ করছে! সেসব আবার ফেসবুকে ছবি দিয়ে ফলাও করে প্রচারও করছে তারা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি কী নির্মম পরিহাস!

ধর্মীয় মৌলবাদীদের তোষণ করে, তাদের আদরযত্ন করে, প্রশ্নপত্র ফাঁস করে প্রজন্মকে মেধাহীন বানিয়ে দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এখনো যারা বুঝতে চায় না-মানতে চায় না; তাদের জন্য কোনো রাগ বা ঘৃণা নয়, কেবলই করুণা হয়।

নোট: আমার এই নিবন্ধটি গত ১৪ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে চ্যানেল আই অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।

জোবায়েন সন্ধি এর ব্লগ   ৫৩৩ বার পঠিত