নাজিম উদ্দিন

ধারাবাহিক অনুবাদ

(১ম পর্ব)

 

ভূমিকাঃ

একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগ একটি প্রয়োজনীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। তারপর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে প্রণীত প্রথম সংবিধানে গণতন্ত্র, শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ এর নিশ্চয়তা দেয়া হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের ওপর কোন রকমের হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং একের পর এক সরকারগুলোর অনিচ্ছার কারণে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটা অধরা থেকে যায়। তাছাড়া, নির্বাচিত সরকারগুলো, সেটা সামরিক স্বৈরাচার বা বেসামরিক সরকার যেই হোক না কেন, সবাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ব্যাপারে ছিল উদাসীন। সরকারগুলো কোনভাবেই বিচার বিভাগের ওপর শাসন বিভাগের অবৈধ হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা কমে আসুক এটা চাইত না। একইসাথে এটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ যে গত চার দশকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ সময়ে বিচার বিভাগে উঁচু মাত্রার প্রশিক্ষিত পেশাজীবীদের আগমন ঘটে, তার সাথে নতুন প্রযুক্তির অন্তর্ভূক্তি, নাগরিকদের সমানভাবে দেখার প্রবণতা, যুদ্ধাপরাধী এবং জাতির জনকের হত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়ার বাধা অপসারণ, নাগরিকদের আইনী স্বাধীনতা রক্ষা করা ইত্যাদি নানা বিষয়ে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

 

আমার জীবনে সেই ১৯৭৪ সালে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলার নিম্ন আদালতের আইনজীবী থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে বাংলাদেশের বিচার-ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বাধাগুলো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ ও সম্মান ঘটেছে। কিন্তু ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেবার পরে বর্তমান সরকার কর্তৃক আমাকে পদত্যাগ ও জোরপূর্বক দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা এবং নেতৃত্ব নিয়ে পর্যবেক্ষণসহ সর্বোচ্চ আদালত থেকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রকাশিত এ রায় দেশের আপামর জনগণ, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের দ্বারা আদৃত হয়। স্বাধীন বিচার বিভাগ নিয়ে এ রায় দেশে-বিদেশে নানা মিডিয়ারও নজর কাড়তে সক্ষম হয়। কিন্তু এটি ক্ষমতাসীন সরকারের রাগ আরো উসকে দেয়।

 বাংলাদেশে বিচার বিভাগ এবং শাসন বিভাগের মধ্যকার বিভেদ এবং যার কারণে একজন গদীনসীন প্রধান বিচারপতিকে অবৈধভাবে সরিয়ে দেবার মত এমন অভূতপূর্ব ও দূর্ভাগ্যজনক অবস্থার শুরু হয় ২০১৪ সালে, যখন জাতীয় সংসদে সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের দ্বারা উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিসংশনের ক্ষমতা দেয়া হয়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সদস্যদের দ্বারা বিচারকদের অপসারণের ব্যবস্থা তুলে দেয়া হয়। সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে অভিযুক্ত বিচারকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে এবং বিচার বিভাগের উপর রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ মুক্ত থেকে তাদের সেবা না করে জনগণের পক্ষে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত হয়। তাই ২০১৬ সালের ৫ মে হাই কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ থেকে বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হয়। এ রায় ঘোষণার পর পরই সংসদ সদস্যরা বিচারকদের হেনস্থা করে এবং আদালতের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন শুরু করেন। রাষ্ট্র এ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করে এবং সাত সদস্যের এক বেঞ্চে তার শুনানী হয়। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ৩ তারিখে আদালত সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপক্ষের আপীল খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। সে বছর আগস্ট মাসের প্রথম দিন আদালতের সর্বসম্মত রায় এবং পর্যবেক্ষণ জনগণের জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর সংসদে আদালতের রায় বাতিল করার জন্য আইনী ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী, তার দলের অন্যান্য সদস্যরা, মন্ত্রীরা আমাকে সংসদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় ভীষণভাবে তিরষ্কার করেন। তারপর প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার অন্যান্যরা আমাকে বিভিন্ন দূর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করেন। আমাকে নিজের সরকারি বাসায় অন্তরীণ করে রাখা হয়, সে সময় আইনজীবী এবং বিচারকদের আমার কাছে আসতে বাধা দেয়া হয়। মিডিয়াকে বলা হয় আমি অসুস্থ, আমি স্বাস্থ্যগত কারনে ছুটিতে আছি। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী বলতে লাগলেন আমি নাকী সরকারী ছুটি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাব, এবং এমতাবস্থায় অক্টোবরের ১৪ তারিখে আমাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। দেশ ছাড়ার আগে পরিস্থিতি কিছুটা পরিষ্কার করতে আমি জনগণকে জানাই যে, আমি মোটেও অসুস্থ নই এবং চিরতরে দেশ ছেড়ে যাচ্ছি না। আমি তখন ভেবেছিলাম আমার শারীরিক অনুপস্থিতি ও কোর্টের নিয়মিত ছুটি কাটানোর পরে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হবে এবং সবার মধ্যে শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। সরকারও বুঝতে পারবে যে এ রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত হবে এবং সেটা দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের জন্য ভাল হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (ডাইরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) এর মাধ্যমে আমার পরিবারকে ভয়-ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করার কারণে আমি বিদেশে অবস্থান করা অবস্থায় বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদ থেকে অবসর নিতে বাধ্য হই।

এ বইয়ে আমি আমার জীবনের প্রথম দিককার অস্তিত্বের সংগ্রাম, বিচারকের জীবন ও অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জঃ এর স্বাধীনতার সংগ্রাম, বিচার ব্যবস্থা ও রাজনীতিকদের মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও গনতান্ত্রিক শৈশব; বিভিন্ন বিষয়ে আমার বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গী, পাবলিক কৌশলীদের (পিপি) মামলা পরিচালনার ধরন নিয়ে ভৎর্সনা, পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার, জরুরী অবস্থা এবং ডিজিএফআই কর্তৃক ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজি, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করেছি। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বার কাউন্সিল এর ভূমিকাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা দলীয় বিভেদের জন্য আদালতের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে পারেনি যেটা বিচার ব্যবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সমতুল্য।   

এ বইয়ে আমি বাংলাদেশের আইন এবং শাসন বিভাগের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বিকাশের একটা ঘনিষ্ঠ বর্ণনা এবং বিচার বিভাগ থেকে আমাকে জোরপূর্বক অপসারণের বর্ণনা দিয়েছি। এ বর্ণনায় আমি আমার দীর্ঘ বিচারিক জীবনের অভিজ্ঞতা এবং ন্যায় পরায়ণতা থেকে বলার চেষ্টা করেছি, এতে দেশের সরকার ব্যবস্থা বা জাতির জন্য ভবিষ্যত কোন দিক-নির্দেশনা নেই। সেটা দেশের মানুষ ঠিক করবে, যারা স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার ও সাম্যের প্রশ্নে কখনও আত্মত্যাগ করতে পিছু হটেনি। এটা আমার অসমাপ্ত আত্মজীবনী যাতে আমি বলার চেষ্টা করেছি কীভাবে আমার মতো ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষ একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রধান বিচারপতি হতে পেরেছি। এছাড়া এ বই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় আমি কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছি তার বিবরণ। আমার এ ঝড়-ঝঞ্ঝাময় ভ্রমণ কাহিনী জাতীয় জীবনেরও ঘূর্ণাবর্তের কাহিনী। যার ফলে যারা সমসাময়িক বাংলাদেশ, এর কষ্ট ও দূর্দশাকে বুঝতে চান এ বই তাদের জন্য পাঠ্য। তাছাড়া যে কেউ উন্নয়নশীল দেশের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার মধ্যকার সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক শৈশবস্থায় বিচার বিভাগের চ্যালেঞ্জ সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী এ বই তাদেরও কাজে আসবে। এ বই স্বার্থক হবে যদি এর দ্বারা পাঠক অনুপ্রাণিত হোন, তিনি হতে পারেন আইনজীবী বা আইনের শিক্ষক, অথবা একজন সাধারণ মানুষ। বইটি যদি পাঠকের মধ্যে এ বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারে যে, আইন পেশা একটি সম্মানজনক পেশা যাতে সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রয়োজন, যেটা রাজনীতিক বা বিচারকের জন্যেও প্রযোজ্য। বইয়ের রেফারেন্সে কিছু ভুল-ত্রুটি আছে, সেটা আমার বইয়ের স্বল্পতা এবং দেশ থেকে বই আনাতে অপারগতার জন্য হয়েছে। কিছু রেফারেন্স স্মৃতি থেকে দিয়েছি, আশা করছি পরের সংস্করণে সেগুলো সংশোধন করব।

 

(চলবে…)

পরবর্তী পর্ব পড়তে পর্বের উপরে ক্লিক করুন এখানে-

A Broken Dream সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (২য় পর্ব)

A Broken Dream সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (৩য় পর্ব)

A Broken Dream সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (৪র্থ পর্ব)

A Broken Dream সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (৫ম পর্ব)

 

 

 

 

==================================

একটি স্বপ্নভঙ্গের কাহিনীঃ আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

প্রধান বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত), সুপ্রিম কোর্ট, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

 

নাজিম উদ্দিন এর ব্লগ   ২৪,৫৬৩ বার পঠিত