শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র

 

বাঙালী তার ভাষাকে ভালোবাসে। শুদ্ধ ভাষা ও শুদ্ধ বানান আমাদের মনকে শুদ্ধ করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে সম্প্রতি বাংলা বানান নিয়ে নানা সমস্যা চলছে এবং তার ফলে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির যারপরনাই ক্ষতি হচ্ছে। সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাংলা অ্যাকাডেমী দুটির কর্ত্তারা নানা রকম নিয়মনীতি চালু করেছেন। বাংলাদেশে ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বেশ ভালো রকম চালু হয়ে গেছে। কিন্তু এসব করেও সমস্যাগুলির সমাধান হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই যা নয় তাই করা হয়েছে এবং তার ফলে সমস্যা আরও বেড়েছে বলে আমি লক্ষ করেছি। অনেক ক্ষেত্রেই পুরাণো বানানগুলি পাল্টে ব্যাকরণের নিয়ম অমান্য করে ভুল আধুনিক বানান করা হয়েছে, যা যুক্তির নিরিখে গ্রহণযোগ্য নয়। বানানসংস্কার অবশ্যই করা যেতে পারে, তবে সেটা করতে হবে ভাষার নিয়ম বুঝে। সেই সঙ্গে আরও বলি যে ভাষা ও সংস্কৃতি দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় নয়। সব কিছুকে পৃথক পৃথক করে দেখার মধ্যে (যেটা আজকের খণ্ডজ্ঞানীরা করেন) অবক্ষয়ের বীজ থেকে যায়। শব্দের বানান ও শব্দার্থ, দেশের ইতিহাস (যা ভাষার মধ্যে ধরা থাকে) ও সংস্কৃতি —- সব অখণ্ড দৃষ্টিতে বুঝার চেষ্টা করা যায়।

প্রথমে বানান কথাটার ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ বলি। যা দিয়ে শব্দ বানানো হয় তাকেই তার বানান বলে। অর্থই শব্দের প্রাণ এবং শব্দের বানান সেই অর্থকে ধরে রাখে। শব্দের বানান থেকেই তার অর্থ হয়, তাই শুদ্ধ বানান লেখার সময় শুধু উচ্চারণ নয়, শব্দের অভিধার্থ বা আক্ষরিক অর্থের দিকে নজর দেওয়া খুবই দরকার। বাংলা অভিধানগুলিতে শব্দের যুক্তিপূর্ণ বানান এবং ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক অর্থ প্রদান করাই বাংলা ভাষার পরম ক্ষয় রোধ করার রাজপথ বলে আমি মনে করি। বানান ও অর্থের সম্পর্ক বুঝাতে একটা উদাহারণ দিই। কার্ত্তিক বানান ‘কার্তিক’ লিখলে ভুল হয়। কার্ত্তিক বানানে যে দুটি ত হবে তা কৃত্তি, কৃত্তিবাস, কৃত্তিকা ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে তুলনা করলে বুঝা যেতে পারে। কৃত্তিকা থেকেই কার্ত্তিক নামটি এসেছে। তাই কার্ত্তিক বানান কোনো মতেই ‘কার্তিক’ হতে পারে না। কেউ লিখলে সেটা যে ভুল হবে, সে ব্যাপারে কোনো সংশয় নাই। এ ব্যাপারে আরও মনে রাখতে হবে যে কৃত্তিকা মানে ‘যে ছিন্ন করে’। কৃত্তি মানে পশুর চামড়া, যা পশুর গা থেকে ছিন্ন করা হয়। কৃত্তিবাস মানে যিনি কৃত্তিতে (বাঘের চামড়ায়) বাস করেন, যথা শিব। পুরাণে কার্ত্তিকের জন্মকাহিনী ভারতে সেনাবাহিনীর জন্মের রূপক বলে কেউ কেউ মনে করেন এবং সে বক্তব্য সঠিক বলেই মনে হয় (এই বিষয়ে আমি অন্যত্র বিস্তারিত বলেছি)। কৃত্ত, কৃত্তি, কৃত্তিকা, কৃত্তিবাস, কার্ত্তিক প্রভৃতি শব্দগুলি গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ। হঠাৎ করে কার্ত্তিক বানান ‘কার্তিক’ করে দিলে অনর্থ ঘটবে। আপনাদের অনুরোধ করব কেউ ভুল করে ‘কার্তিক’ লিখবেন না। অ্যাকাডেমীর কর্ত্তারা রেফের নীচে দ্বিত্ব বর্জ্জনের পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। সেই ভুল সিদ্ধান্তের বশবর্ত্তী হয়েই তারা কার্ত্তিক বানান কার্তিক লিখতে চান, যা অর্থের বিচারে মেনে নেওয়া যায় না।

আজকাল বর্দ্ধমান বানানটিকেও অনেকে ‘বর্ধমান’ লিখতে শুরু করেছেন। এটা কি ঠিক হচ্ছে? বর্ধমান মানে যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি বানানে যেমন দ্ধ, এখানেও তেমনি দ্ধ হবে। চিরকাল তাই হয়ে আসছে। আজও বর্দ্ধমান ষ্টেশনের বোর্ডগুলিতে ‘বর্দ্ধমান’ বানানই আছে। আমার বাবা চিরকাল ‘বর্দ্ধমান’ লেখেন, আমিও তাই লিখছি। আপনারা কী করছেন এবং এই বিষয়ে কী ভাবছেন? এখানে আরও বলে রাখি যে বর্দ্ধমান জেলা ও বর্দ্ধমান শহর ছাড়াও বর্দ্ধমান হল জৈনদের বিখ্যাত তীর্থঙ্করের নাম। হতে পারে তিনি বর্দ্ধমান জেলার উক্ত স্থানে ধর্ম্মপ্রচারে এসেছিলেন বলেই স্থানটির নাম বর্দ্ধমান হয়েছিল। শব্দের বানান লেখার সময় এই ধরণের ঐতিহাসিক তথ্যও মাথায় রাখা দরকার।

শব্দের বানান কীভাবে তার অর্থকে ধারণ করে সেইটা বুঝে বানান লিখলে বানান নিয়ে বহু সমস্যার সমাধান পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আজকাল বহু বাঙালী বিদ্বান পাশ্চাত্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের নিরুক্তের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিস্মৃত হয়ে মনে করেন যে শব্দার্থ যাদৃচ্ছিক (Word meanings are arbitray)। এর ফলেই শব্দের অর্থের সঙ্গে তার বানানের সম্পর্কটি তাঁরা স্পষ্ট করে বুঝতেই পারেন না এবং ভাষা ও বানান নিয়ে সৃষ্ট সমস্যাগুলির সমাধানের রাজপথটিও দেখতে পান না। ব্যাকরণ ও নিরুক্তের নিয়ম লঙ্ঘন করে যাদৃচ্ছিক বানান লেখার ফলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং সেগুলিকে সামাল দিতে গিয়ে ব্যাকরণবিদেরা বারে বারে বেসামাল হয়েছেন। সমস্যাগুলিকে সামাল দিতে হলে রোগের মূল কারণটি বুঝে নিয়ে সেটি দূর করতে হবে। একটি লোক কাদায় ডুব দিলে ঘটির জল দিয়ে তার কানের কাদা, মুখের কাদা, পায়ের কাদা ইত্যাদি আলাদা আলাদা করে ধুয়ে দেওয়া খুব কষ্টকর। সেক্ষেত্রে কাদা উপযুক্ত কাজ হবে তাকে একবার গঙ্গাস্নান করিয়ে দেওয়া, যাতে করে সব কাদা একসাথে দূর হয়ে যায়। তেমনি বাংলা বানানের অধুনাসৃষ্ট সমস্যাগুলি দূর করার সহজতম উপায় হল আর দেরী না করে শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ এবং দেশিকোত্তম শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ গ্রন্থে প্রদত্ত বাংলা বানানে ফিরে যাওয়া। আমি এই কথা বলছি তার কারণ হল ওই দুই অভিধানে প্রদত্ত বানান ব্যাকরণের নিয়মানুসারী, কিন্তু পরবর্ত্তি কালে প্রণীত অভিধানগুলিতে বারে বারে ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা বানানের সরলীকরণের কথা বলেছিলেন বটে, কিন্তু তাতে যদি ব্যাকরণের নিয়মে খুব একটা সমস্যা না হয় তবেই তিনি তা করতে বলেছিলেন। তিনি নিজে যে ব্যাকরণে কাঁচা সেকথাও তিনি বারে বারে স্বীকার করেছিলেন। আমি মনে করি যে বাংলা বানানের ব্যাপারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কী বলেছে বা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি কী বলছে তা বিনা বিচারে মেনে নেওয়া যায় না এবং এইসব বিষয়ে সবরকম গোঁড়ামি ও দ্বিধা বর্জ্জন করে ব্যাকরণের যুক্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বানান সরলীকরণ করতে গিয়ে আমরা নাানা ঝামেলায় পড়েছি। ব্যাকরণ বুঝলে ব্যাকরণসম্মত বানান লিখতে কোনো অসুবিধা, জটিলতা হয় না। ব্যাকরণ ও নিরুক্ত চর্চ্চা করলে বিষয়গুলি শুধু সহজ হয়েই যাবে না, রসপূর্ণও হবে। ব্য়াকরণ ও নিরুক্ত যে অগাধ রসের শাস্ত্র সেটা যারা এইসব শাস্ত্র চর্চ্চা করেন তারাই জানেন। অবশ্য না বুঝে মুখস্থ করলে ব্যাকরণ অত্যন্ত নীরস লাগে। আজকালকার বাংলা অভিধানগুলি যে শব্দের ক্রিয়াভিত্তিকতাকে ভুলে সম্পূর্ণ ছন্নছাড়া প্রতীকী অর্থের সংগ্রহ হয়ে মাখনতোলা দুধের মতো হয়ে যাচ্ছে, প্রমিত বাংলার কর্ত্তারা এই বিষয়ে কী ভাবছেন? সব কিছু দেখেশুনে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে আমি ইদানীং বানানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-কে অনুসরণ করতে শুরু করেছি। আমার মতো আরও কেউ কেউ সেটা করছেন। আমি লক্ষ করেছি হরিচরণবাবুর প্রদত্ত বানানগুলি যথেষ্ট যুক্তিপূর্ণ। হরিচরণবাবুর বানানের আর কোনো পরিমার্জ্জন করা সম্ভব নয়, তা কিন্তু বলছি না। কিন্তু সেজন্য প্রচুর গবেষণা দরকার, যার নিতান্ত অভাব। এখন আপনারা কী করবেন তা আপনারা ভেবে দেখুন।

কিছুদিন আগে কলকেতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে জনৈক ভাষাবিদ মন্ত্রিগণ শব্দটির বানান ‘মন্ত্রীগণ’ করার কথা বলছেন। দুই বাংলার অ্যাকডেমীর কর্ত্তারা এই ব্যাপারে কি বলেন তা আমি ঠিক জানি না। তবে এই বিষয়ে আমার বক্তব্য হল শশী, কালী, মন্ত্রী ইত্যাদি শব্দে ঈ-কার কিন্তু শশিবাবু, শশিভূষণ, কালিদাস, মন্ত্রিগণ ইত্যাদি শব্দে ই-কার হয়। চিরকাল তাই হয়ে এসেছে এবং কেন হয়েছে তার কারণও আছে ( কারণটা ব্যাখ্যা করার অবকাশ এখানে নাই)। সেই কারণটা বুঝে সেটা মেনে চলাই শ্রেয়, তাহলেই আর এই জাতীয় সমস্যায় পড়তেই হয় না। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই যুক্তি (যথা কালী বানানে ঈ-কার আর কালিদাস বানানে ই-কার হয় কেন) আজকাল অনেকে বলতেই পারেন না। কোনো ভাষাবিদ হঠাৎ করে মন্ত্রিগণ বানান ‘মন্ত্রীগণ’ করার কথা বললেই তা মানতে হবে কেন ? এর পশ্চাতে উপযুক্ত যুক্তি কি কেউ দিতে পারবেন?

দুর্গাপূজা, কালীপূজা, কার্ত্তিক পূজা, ঈদ — এগুলিও বঙ্গসংস্কৃতির অঙ্গ। এগুলির প্রকৃত তাৎপর্য্য বুঝতে গেলে দুর্গা, কালী ইত্যাদি শব্দের বানান ও অর্থ জানা দরকার। কিন্তু কত জন জানেন যে দুর্গা মানে দুঃখে প্রাপ্যা, দুর্গা মানে যিনি অপশাসকের দুর্গ জয় করেন? কত জন জানেন যে কালী ঈ-কার আর কালিদাস বানানে ই-কার কেন হয়? সরস্বতী মানে যে সরসবতী (সরস জ্ঞানের নদী), তাই বানানটা স্বরসতী না হয়ে সরস্বতী হয়, সেটাই বা কটা স্কুলপাঠ্য বইয়ে লেখা আছে ? কতজন বাঙালী জানেন আস্তিকতা, নাস্তিকতা, ব্রহ্ম, ঈশ্বর প্রভৃতি শব্দগুলির ভিতরের ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ? অর্থই শব্দের প্রাণ সেটা ভুলে গেলে চলবে না। শব্দার্থ না বুঝলে ধর্ম্মদর্শনেরও সঠিক মানে বুঝা যাবে না। আর শাস্ত্রে বলে মানে না বুঝে ধর্ম্মাচরণ পশ্বাচারমাত্র। আধুনিক বাংলা অভিধানগুলি ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ সরবরাহ না করে কেবল ছন্নছাড়া প্রতীকী অর্থের সংগ্রহ হয়ে উঠেছে। সেগুলি থেকে শব্দের ব্যাকরণসম্ম্ত বানান এবং নিরুক্তসম্মত অর্থ সহজে পাওয়া যায় না। এর ফলে সেগুলি মাখনতোলা দুধে পরিণত হয়েছে। সাধারণ বাঙালী পাঠক অভিধান পড়ে রস পাননা, শব্দের শুদ্ধ বানান এবং তার ব্যাখ্যা বুঝতে পারেন না, শব্দার্থের দর্শনও বুঝতে পারেন না। এইসব খুবই দুঃখের ব্যাপার এবং এইসব সমস্যার সমাদানের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা আশু প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রমিত বানানের কর্ত্তারা তৎসম, তদ্ভব ও বিদেশী শব্দের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বানানরীতি মেনে নিয়েছেন বলে শুনতে পাই। পশ্চিমবঙ্গের দশাও একইরকম বলে আমি লক্ষ করেছি। এই বিষয়ে আমার বক্তব্য হল ব্রাহ্মণ ও বাউরীকে একত্রে পংক্তিভোজন করাতে যেমন কোনো অসুবিধা নাই (জাতপাত পরিত্যাগ করাই ভালো) তেমনি তৎসম তদ্ভব বিদেশী ইত্য়াদি সব ধরণের শব্দের ক্ষেত্রে একই বানানবিধি মেনে চলতে সেরকম কোনো সমস্যা নাই। সেটা করলে বানান নিয়ে বহু ফালতু জটিলতা এড়ানো যায় এবং সমগ্র পরিকল্পনাটি সরল ও যৌক্তিক হয়। তা নাহলে যুক্তিপূর্ণ বানান লেখার পরিকল্পনাটি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষতি হয়, ভাষাকে অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

কিছু দিন আগে একটি স্কুলপাঠ্য বইয়ে দেখলাম দ ও ধ-এর যুক্তাক্ষরটার (যা ‘দ্ধ’ লেখা হয়) চেহারাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে। দ-এর নীচে একটা আস্ত ধ লেখা হয়েছে যা দেখতে বিশ্রী ও লিখতে অসুবিধাজনক। আরও অনেক যুক্তাক্ষরের চেহারা পাল্টে দেওয়া হয়েছে, যা আপত্তিজনক।

কেউ কেউ আবার বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঋ, ণ, ষ ইত্যাদি বর্ণগুলিকে বাদ দিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন বলেও শুনতে পাই। এটা করলে আমার পূর্ব্বপুরুষদের অর্জ্জনকে হেলায় হারাব। শ,ষ,স-এর সবগুলিকেই চাই। স্বজন মানে আত্মীয় আর শ্বজন মানে কুকুর, আপন মানে নিজের আর আপণ মানে দোকান — এসব মনে রাখলে সুবিধা হবে। বানান যে অর্থের ধারক, শুধু উচ্চারণের নয় — অ্যাকাডেমীর কর্ত্তারা এসব কবে বুঝবেন?

আজকাল বিদেশী শব্দে ন্ড লেখা হচ্ছে (যেমন পেণ্ডুলাম বানান ‘পেন্ডুলাম’ লেখা হচ্ছে)। এই ব্যাাপারে আমার বক্তব্য হল পণ্ড, পণ্ডিত প্রভৃতি শব্দে যেমন ণ্ড হয়, তেমনি পেণ্ডুলাম বানানে ন্ড না লিখে ণ্ড লেখাই শ্রেয়। এর কারণ ণ ও ড একই বর্গে আছে। একইভাবে ন ও ত একই বর্গে আছে বলে ওদের যুক্তাক্ষর (ন্ত) হয়, যথা দন্ত প্রভৃতি বানানে। দন্ত বানানে যেমন ন্ত (ণ চলে না) হয় সেই তুলনায় লণ্ডন বানানে ণ্ড হবে ( ন্ড না লেখাই শ্রেয়)। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে আমরা কি London বলার সময় ণ্ড-এর উচ্চারণ করি? তার উত্তরে বলা চলে বানান সবসময় উচ্চারণানুসারে হয় না, যার বহু উদাহরণ আছে। যেমন আমরা লিখি ‘ঘড়ি’ কিন্তু উচ্চারণ করি ‘ঘোড়ি’। উচ্চারণানুসারে ‘ঘোড়ি’ লেখার কথা কেউই বলেন না। বানান হয় শব্দের বুৎপত্তি ও অর্থানুসারে, শুধু উচ্চারণানুসারে নয়। একইভাবে অষ্টম, কষ্ট, মাষ্টার, ষ্টীমার ইত্যাদি সর্ব্বক্ষেত্রে ষ্ট ব্যবহার করাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি। শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় মাষ্টার, ষ্টীমার ইত্যাদি বানানই লিখেছেন এবং সেটা ওরা ঠিকই করেছেন বলে আমি মনে করি। আজকাল অনেকে ‘মাস্টার’,স্টীমার ইত্য়াদি বানান লেখেন; এগুলি পরিত্যাগ করাই ভালো। আমরা মাষ্টার, ষ্টীমার ইত্যাদি শব্দে ষ-এর সঠিক উচ্চারণ করি কিনা অথবা ইংরেজরা ওই শব্দগুলি ঠিক কীভাবে উচ্চারণ করেন বাংলায় বানান লেখার সময় সেটাই সবচেয়ে বড় কথা নয়। বাঙালায় ব্যবহৃত ইংরেজী শব্দের উচ্চারণ সর্ব্বদা ইংরেজীর টানে করতে হবে বলে মনে করি না, বরং বাংলা কায়দায় বা বাংলা শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে করাই ভালো বলে মনে করি। বঙ্গমানসকে ইংরেজীর শাসন থেকে মুক্ত করা দরকার। দুই বাংলার অ্যাকাডেমীর কর্ত্তারা এই ব্যাপারে কী ভাবছেন?

কোনো স্থান বা রাস্তার নামকরণের ক্ষেত্রেও যা নয় তাই চলছে, যা আমাদের শব্দচিন্তার বর্ত্তমান দুরবস্থাকে তুলে ধরে। যেমন ধরুন সাম্প্রতিক কালে ‘বিশপ লেফ্রয় রোডে’-এর নামকরণ করা হয়েছে ‘সত্যজিৎ রায় ধরণী’। এটা ধরণী না হয়ে সরণী হতে হত। এই ব্যাপারে আর একটি অত্যন্ত হাস্যকর উদাহরণ হল কলকাতার মেট্রোস্টেশনগুলির পুরাণো নামগুলি পাল্টে নানা অভিনেতা, বিপ্লবী ইত্যাদির নামে সেগুলির নামকরণ। এইসব হাস্যকর নামকরণকে পাল্টে মেট্রেস্টেশনগুলিকে তাদের পুরাণো নাম ফিরিয়ে দিতে কী ভূমিকা নিয়েছেন বাংলা অ্যাকাডেমীর কর্ত্তারা? কলকেতায় একটি রাস্তা আছে, তার নাম ছিল ‘ধর্ম্মতলা ষ্ট্রীট’। বর্ত্তমানে সে নাম পাল্টে করে দেওয়া হয়েছে ‘লেনিন সরণী’। কেন এটা করা হল? ধর্ম্মতলা বাংলার নানা গ্রামেই থাকে, কলকাতাতেও আছে। সেখানে যাওয়ার রাস্তাটির নাম ‘ধর্ম্মতলা ষ্ট্রীট’ হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল। পশ্চিমবঙ্গ প্রায় ৩৩ বছর বামশাসনে ছিল। বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা কেন যে রাস্তাটিতে তাঁর পুরাণো নাম ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি, তা আমার মাথায় ঢুকে না। শুধু মার্কসবাদে মজে না থেকে বাংলার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির দিকেও মন দিতে হবে, তাই না? লেনিন কোনোদিন ধর্ম্মতলায় আসেননি। তাই ধর্ম্মতলা ষ্ট্রীটের নাম পাল্টে ‘লেনিন সরণী’ করার কোনো কারণই নাই। এখানে বলে রাখি যে আমি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী, রাজনৈতিক বাম বা ডান পন্থার প্রতি আমার কোনো অসূয়া নাই।

সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত শ্রীকলিম খান ও শ্রীরবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ ও ‘বঙ্গতীর্থে মুক্তিস্নান’ গ্রন্থে বাংলা বানান সমস্যার যুক্তিপূর্ণ সমাধানের রাস্তা দেখানো হয়েছে। মৎপ্রণীত ও সদ্য প্রকাশিত ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক পদ্যাভিধান ‘বর্ণসঙ্গীত’ গ্রন্থে আমিও অর্থানুসারী এবং যুক্তিপূর্ণ বাংলা বানান নিয়ে কিছু কিছু আলোচনা করেছি। আমি সমস্ত বাঙালী ব্যাকরণবিদদের এবং ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের বাংলা আকাদেমির কর্ত্তাদের অনুরোধ করব হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ও খান-চক্রবর্তীর অভিধানে এবং মৎপ্রণীত পদ্যাভিধানে প্রদত্ত নিরুক্তসম্মত বানানরীতি যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে। এর থেকে শুধু বানানের নৈরাজ্য দূর করতে সুবিধা হবে তাই নয়, শব্দকে ভেঙে স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক অর্থ নিষ্কাশনের (নির্ব্বচনের) নিয়মটিও বুঝা যাবে এবং বাংলা ও বিশ্বের সাংস্কৃতিক সঙ্কট মোচনের পথটিও পাওয়া যেতে পারে।

কবি শঙ্খ ঘোষ বলেন, ”শব্দের এই পরম ক্ষয় তাঁদের হাতেই ঘটল বেশী যাঁদের উপর ছিল এর সম্ভাবনা আবিষ্কারের দায়। তাঁরা লেখক বা শিল্পী, সাংবাদিক বা অধ্যাপক, দেশের চিন্তানায়ক বুদ্ধিজীবী নামে তাঁদের মহার্ঘ পরিচয় (‘শব্দ আর সত্য’, শঙ্খ ঘোষ, পৃষ্ঠা নং ৩৬)। ” আমি এখানে শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে সহমত। তবে সেইসঙ্গে এই কথাও বলি যে ভাষার অবক্ষয়ের স্বরূপ এবং তার প্রতিকারের উপায় তাঁর ‘শব্দ আর সত্য’ বইয়ে বা অন্যান্য রচনায় ফুটে উঠেনি। তাঁর নিজের মতেই তাঁর ‘শব্দ আর সত্য’ বইয়ে আছে শব্দ ও ভাষা নিয়ে কতকগুলি প্রশ্নের ইতস্ততঃ স্ফূরণ। শব্দের পরম ক্ষয়ের সঙ্গে সংস্কৃতির ক্ষয়ের সম্পর্কটাও তিনি পরিস্ফূট করেননি, যা আমাদের ভালো করে ভেবে দেখা দরকার। ভাষাকে শুদ্ধ করলে আমাদের চিন্তা ও সংস্কৃতি কিছুটা শুদ্ধ হতে পারে। সঠিক বানানে শব্দ লিখলে এবং তার ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক অর্থ ভালো করে হজম করলে আমাদের চিন্তা সঠিক দিশা পায়। ধর্ম্মের ভিত্তিতে বাংলা দুই ভাগ হয়ে গেলেও আজও এক ভাষা দুই বাংলার মধ্যে অনেকটা সম্প্রীতি বজায় রেখেছে। বাংলা ভাষার সংস্কার সাধনের চেষ্টা দুই বাংলার বহু বাঙালীকে একসূত্রে গেঁথে দিতে পারে। বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির অবক্ষয় রুখতে দুই বাংলার ব্যাকরণবিদ, কবি, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে। আরও বলি যে বাঙালীরা বাংলাকে ঠিক মতো বাঁচাতে পারলে সারা বিশ্বকে বাঁচানোর পথও দেখাতে পারবেন বলে আমি মনে করি। পরিশেষে বলি যে আমি পেশায় একজন চিকিৎসক, ভাষা বা সাংস্কৃতিক জগতের লোক নই। আমার চিন্তায় কোনো ভুল থাকলে আপনারা সেগুলি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং অনুগ্রহ করে ভুলগুলি সংশোধন করে দিবেন। যারা বাংলাকে ভালোবাসেন তাদের সকলের মতামত কাম্য। বাংলার জয় হোক।