সুরেশ কুণ্ডু

ধর্মের নির্দিষ্ট ভাষা আছে। নানা ধর্মের নানা ভাষা। নানা ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বরের ভাষাও ভিন্ন ভিন্ন। এক ধর্ম্মের ঈশ্বের স্বধর্ম্মের ভাষা ছাড়া অন্যান্য ধর্ম্মের ঈশ্বরদের ভিন্ন ভিন্ন ভাষা কি বুঝতে পারেন? না কি স্বধর্ম-নির্দিষ্ট ভাষাটিকেই শুধু বোঝেন?  উদাহরণ? বিশ্বাস এই যে – হিন্দুর ভগবানের ভাষা না কি সংস্কৃত; ইসলামের আল্লাহ না কি শুধু আরবীই বোঝেন; ইহুদীর জিহোভার ভাষা না কি শুধুই হিব্রু। ইত্যাদি।

ধর্মবিশ্বাসের সমূহ বিষয়-আশয় ওই নির্দিষ্ট ভাষাতেই না কি জানতে-বুঝতে হয়! এই ভাষা রজ্জুর পোক্ত বাঁধন ছেঁড়ার চেষ্টা অধর্মীয়, বিধর্মীয়, বা অশাস্ত্রীয় গর্হিত কাজ বলে বিবেচিত হয়। ধর্মগ্রন্থের টেক্সট অন্য ভাষায় অনুবাদেও ধর্মবাদীদের প্রবল আপত্তি। ধর্মগ্রন্থ ভাষান্তরের ইতিহাস থেকে এসব কথা জানা যায়।

ওল্ড টেষ্টামেণ্টের হিব্রু প্রথমে ল্যাটিন ও পরে ইংরেজী অনুবাদের সময় ধর্ম-সঙ্কটের আওয়াজ উঠেছিল। অ-আরবি ভাষায় কোরাণের অনুবাদেও বিস্তর বিতণ্ডা হয়েছিল। বেদ-পুরাণের ভাষান্তরে এই পোড়া দেশে অগ্নিবর্ষী আস্ফালনের দাপট কিছু কম ছিল না। কোরাণ অনুবাদে গিরিশচন্দ্র সেন উপযুক্ত কদর বা সমাদর কি পেয়েছেন? ঋগ্বেদের ভাষান্তরে ভাষিক ও বাচিক বিড়ম্বনা কম ভোগ করতে হয়নি অনুবাদকদের। হিন্দু-ধর্মগ্রন্থ বাংলায় অনুবাদকালে বাংলাভাষাবিদ্বেষী ধর্মভাবনা সেদিন বলেছে, ম্লেচ্ছভাষায় এসব হচ্ছেটা কী? আমার মায়ের ভাষাকে একদল বললেন, ম্লেচ্ছভাষা। অন্যদলের রায়, ওটা কাফেরের ভাষা।

ধর্মবাদী ভাষাবিদ্বেষীরা বলতে চান, মাতৃভাষা যার যাই হোক, সবাইকে স্ব স্ব ধর্মভাষায় ধর্মচর্চা করতে হবে। ধর্মভাষা আর মাতৃভাষার এই বিরোধ নিয়ে আলোকিত আলোচনা এখনও তেমন কিছু হল কি? খুঁজে দেখা হয়েছে কি – যুগে যুগে ধর্মভাষা মাতৃভাষাকে পেছন থেকে কতটা ছুরি মেরেছে? ধর্মভাষা ও মাতৃভাষাকে এভাবে লড়িয়ে দিয়ে মাতৃভাষাবিদ্বেষীরা কত বড় সর্বনাশ ঘটিয়েছে তা নিয়ে একটা আস্ত গবেষণা হতে পারে। এদেশে এমন প্রয়াস আজও  শুরুই হয়নি। কেউ কি এমনটা ভাববে্ন না?

ভাষান্তরের কতিপয় নমুনা

১৮৪৮ সাল। জার্মান ভাষায় অনুদিত হল সামবেদ। শুক্ল যজুর্বেদের অনুবাদও হয় ওই সালেই। ঋগ্বেদ ফরাসী ভাষায় ভাষান্তরিত হলো ১৯৪৮ থেকে ১৮৫১-এর মধ্যে। ১৮৪৯-১৮৭৩ সালের সময়-পরিধিতে ইংরেজীতে অনুদিত হয় সায়নভাষ্যসহ সমগ্র ঋগ্বেদ। অনুবাদ করেছিলেন ম্যাক্সমুলার। ১৮৮৫ সাল থেকে ১৮৮৭ সাল। রমেশচন্দ্র দত্ত বাংলায় ঋগ্বেদ অনুবাদ করেন। বাংলায় অনুবাদ পড়ে আগ্রহী বাঙালী ঋগ্বেদের সাথে পরিচয় গড়ে তুলেছেন। আলেফ-অক্ষর গোমাংস মুসলিম অনুরাগী পাঠক প্রথম কোরাণ জেনেছেন এই বাংলা অনুবাদ পড়েই। এখন তো দেখছি, বাইবেলের বাংলা ভাষান্তর সংস্করণ পথে ঘাটে বিলি-বণ্টন চলছে। ধর্মগ্রন্থ ভাষান্তরের এই বিবর্তনটাও একটা কৌতুহলী পাঠের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

মাতৃভাষা যখন বিজ্ঞানের ভাষা

ভাষার প্রশ্নে এবার বিপ্রতীপ অবস্থানটা নিয়ে কথা বলা যাক। বিজ্ঞানের কোন ভাষাবিদ্বেষ নেই। পৃথিবীর সবার সব মাতৃভাষাই বিজ্ঞানের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞান ভাষার বাঁধন ছেঁড়াতেই আনন্দ পায়। বিজ্ঞানভাবনা, বিজ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান পঠন-পাঠন, বিজ্ঞান গবেষণা যে-যার মাতৃভাষাতেই করতে পারেন। ব্যক্তির বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞান-আবিষ্কার  মাতৃভাষাতেই প্রকাশ-বিকাশ করা সম্ভব।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে বিজ্ঞানসাধক ও বিজ্ঞানকর্মী মাতৃভাষার ঋণ পরিশোধের প্রয়াস করতে পারেন। রাশিয়া, জার্মান, জাপানের মতো দেশের উচ্চকল্পের বিজ্ঞানীরা ইংরেজীবিদ্যা অনায়ত্ত রেখেই বিজ্ঞানের আঙিনায় পদচারণা করেন। নিজ নিজ মাতৃভাষায় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর শিরোপা লাভ করেন। বিজ্ঞান শিখতে গেলে ইংরেজী আবশ্যিকভাবে শিখতে হবে – এমন একটা ভাবনা উন্নত দেশে নেই, অনুন্নত দেশে আজও  আছে। কেন আছে? এর মূলে কি ঔপনিবেশিক ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ? উন্নত দেশের মতো এদেশেও এটা প্রতিহত করার জন্য দেশীয় অগ্রগামী ভাষাগুলোকে বিজ্ঞান-ধারণ ও পোষণের উপযোগী করে গড়ার প্রয়াস নেওয়া হয়নি কেন?

মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা

ওপরের কথাটা উঠলেই অনেক বাঙালী বলেন, বাংলাভাষা বিজ্ঞানের বাহক হতে অপারগ। এমন ধারার একটা কথা বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সামনেই বলেছিলেন জনৈক পণ্ডিত। বলেছিলেন, বাংলাভাষা উচ্চশিক্ষা দেবার পথে অন্তরায় হতে পারে। কথাটা শুনে বক্তার মুখের ওপর জবাব দিলেন বিজ্ঞানী বসু।

“যাঁরা বলেন বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।“

বাংলায় বিজ্ঞানের পরিভাষার কথাও উঠেছিল। এবং যুৎসই জবাব দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছিলেন,

“বাঙলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষা অসম্ভব, ওটা অক্ষমের; ভীরুর ওজর। কঠিন বৈকি, সেজন্য কঠোর সঙ্কল্প চাই।“

সতেন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন, ‘বাংলাভাষা বলিষ্ঠতায় ফরাসীভাষার সঙ্গে তুলনীয়’। সত্যেন্দ্রনাথ তো এম-এস-সি ক্লাসেও বাংলাতেই পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। কঠিন গবেষণার বিষয়ও বাংলাতেই আলোচনা করতেন।

একুশের আলোচনায় আটাশ নেই কেন?

ফেব্রুয়ারী একুশ। বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। ফেব্রুয়ারী আটাশ। বিজ্ঞান দিবস। প্রথমটি ভাষার দিন। পরেরটি বিজ্ঞানের দিন। দুটো দিনকেই এখনও দূরত্বে রাখা হয়। অথচ ওপরের আলোচনায় আমরা বুঝলাম যে, মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান, দুটোই আলোচনায় সংযোজী সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ। একের অগ্রগমনে অন্যের ভূমিকা রয়েছে।

মাতৃভাষা হল বিজ্ঞানের ভাষা। এবং বিজ্ঞান হলো মাতৃভাষার বিজ্ঞানসাহিত্যের মনন-প্রকাশ। এতদিন বিষয়টাকে এভাবে ভাবাই হয়নি কেন, সেটাই তো এক মৌলিক প্রশ্ন। মাতৃভাষা ও বিজ্ঞানের যৌথ অভিযান ও অগ্রগতিতে সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হবে সব ভাষাভাষী মানুষের অস্তিত্বের শিকড়, জাতিসত্তা। জাতিসত্তাটা তো দাঁড়িয়ে থাকে ভাষাবন্ধনের ওপরে। এটাও ভাবনার আরেকটা দিক।

মাতৃভাষা + বিজ্ঞান = জাতিসত্তা ˃ tends to মৌলিক মানবতা। এমন এক সমীকরণে গোটা বিষয়টা ভাবতে চাইছি। তিনটে বিষয় নিয়ে ভাসাভাসা অবস্থান আমাদের কোথাও পৌঁছে দেবে না। একুশে ফেব্রুয়ারীর এই অনন্য তাৎপর্য্যটা এবার প্রচার-প্রসার এবং প্রয়োগে রূপায়িত করতে হবে।

সুরেশ কুণ্ডু এর ব্লগ   ৮৩৯ বার পঠিত