অর্পিতা রায়চৌধুরী

অনেক গবেষক উল্লেখ করেন, নারীকে ‘আপন ভাগ্য’ জয় করবার অধিকার কেন দেয়া হবে না- এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ রবীন্দ্রনাথের এই প্রশ্ন উত্থাপনের বহু আগেই সমকালীন বাঙলার এক ঝাঁক বুদ্ধিজীবি ও মুক্তচিন্তার মানুষ নারীকে ‘আপন ভাগ্য’ জয় করবার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম ও তার চর্চা শুরু করেছিলেন।

ঊনিশ শতকের বাঙলায়, বিশেষত কলকাতা ও তার আশেপাশের এলাকাসমূহে প্রচলিত সামন্তমূল্যবোধের ওপরে মানবিক (Humanism) মূল্যবোধের চর্চা ও অনুশীলনের প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ন ওয়ালিশ তাঁর ‘পেট্রিঢাইং ফিউডালিজম’ কায়েম করার প্রয়াস পাওয়া সত্বেও ঊনিশ শতকের বাঙলায় মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ঊনিশ শতকের বাঙলায় কলকাতা ও তার আশেপাশের বুদ্ধিজীবি ও মুক্তচিন্তার মানুষজনদের শ্রেণিগত অবস্থান, কালিক সীমাবদ্ধতা, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি মুগ্ধতা ও আনুগত্যের দর্শন সত্বেও তাঁরা মানবিক চর্চার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।

সতীদাহপ্রথা, বাল্যবিবাহপ্রথা, বহুবিবাহপ্রথার বিরুদ্ধে ঊনিশ শতকের বাঙলার মুক্তচিন্তক বুদ্ধিজীবিরা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ধর্মসভাপন্থীরাও বাঙলার মুক্তচিন্তক বুদ্ধিজীবিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বেশিরভাগ সময়ই প্রচলিত সামাজিক অচলায়তন বজায় রাখার অভিপ্রায়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন। তবে নারী শিক্ষার বিষয়ে নত স্বীকার করতে বাধ্য হয় ধর্মসভাপন্থীরা।

ঊনিশ শতকে নারীর ‘আপন ভাগ্য’ জয় করার অধিকার প্রদানের অনুশীলনগত চর্চায় যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন- রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ।

রামমোহন রায়
লর্ড বেন্টিক

তবে একটা মজার তথ্য হলো- সতীদাহ প্রথা বিলোপের ব্যাপারে রামমোহনের কণ্ঠ উচ্চকিত হলেও, তিনি কিন্তু আইনের (সাংবিধানিকভাবে) মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছিলেন। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিক এই কুপ্রথা বেআইনি ঘোষণা করার ব্যাপারে রামমোহনের পরামর্শ চাইলে রামমোহন এই আইন প্রণয়নের বিরোধীতা করেন। এ বিষয়ে লর্ড ৮ নভেম্বরের মিনিটে বেন্টিক লিখেছেন-

“রামমোহনের মত হলো এই কুপ্রথা বিভিন্ন প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি ও পুলিশের পরোক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আস্তে আস্তে অবলুপ্ত হবে; এর জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই”।

এরপর ১৮২৯ এর ৪ ডিসেম্বর এই কুপ্রথা বেআইনি ঘোষণা ৪২ দিন পর রামমোহন অবশ্য এই প্রথারোধের জন্য বেন্টিককে ‘অভিনন্দনপত্র’ দিয়েছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

তেমনি বিধবাবিবাহ প্রথার প্রচলন, বহুবিবাহরোধ, স্ত্রীশিক্ষা প্রচলন প্রভৃতি বিষয়ে প্রধানত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অন্যরা তুমুল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। স্ত্রী শিক্ষার বিষয়ে ধর্মসভাপন্থী রাধাকান্ত দেবও ঐকমত্য পোষণ করে এই আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলেন।

সমকালীন সময়ে অনেক সম্ভ্রান্ত হিন্দু কিংবা মুসলিম নারী মুক্তচিন্তকদের অস্তিত্ব থাকলেও ইতিহাসে নারী নের্তৃত্বের কোন সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না মিলে না। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার ও সামন্ত মূল্যবোধের অন্ধকার কানাগলি থেকে বাঙলার নিপীড়িত নির্যাতিত নারীসমাজকে আলোর পথে আনার বিষয়ে উপরোক্ত মুক্তচিন্তক বুদ্ধিজীবিরা নিরলস সংগ্রাম ও পরিশ্রম করেছেন। এরা সকলেই পুরুষ।

 

সূত্র সহায়তা: 

১) প্রদীপ রায়, রামমোহন রায় এক ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসা, বুকট্রাস্ট প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৮১ সংস্করণ।

২) নিস্তারিণী দেবী, সেকেলে কথা, চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা, ২০১১ সংস্করণ।