নাজিম উদ্দিন

গত কয়েক বছর যাবত জুন মাসের ২১ তারিখ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস, International Yoga Day পালন করা হয়। ভারতীয় গুরুদের কল্যাণে পাশ্চাত্য সমাজে যোগ ব্যায়াম এখন খুবই জনপ্রিয়। আমেরিকাতে অনেক বিখ্যাত যোগ গুরু আছেন, যারা সর্বসাধারণে যোগ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। বছর কয়েক আগে প্রয়াত হন বিখ্যাত যোগী বি কে এস আয়েঙ্গার,  আমেরিকাতে যোগ ব্যায়াম প্রসারে তাঁর অনেক অবদান আছে। গত শতকের সত্তরের দশকে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের জন্য যোগের পরিচালনা করেন এক বাংলাদেশী গুরু, আমাদের চট্টগ্রামের মানুষ, নাম তাঁর শ্রী চিন্ময় সেন।

বর্তমানে আমেরিকাতে যুবক সমাজ বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতন মেয়েরা যোগ ব্যায়াম আর যোগীদের বিশেষ  ভক্ত। আজকের আমেরিকার যে কোন শহরে গোটা কয়েক যোগ ব্যায়াম কেন্দ্র পাওয়া যাবে। ইয়োগা ম্যাট বগলে করে স্বাস্থ্য সচেতন মেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে এটা খুবই কমন চিত্র। এখন ভারতীয় গুরুরও প্রয়োজন পড়ে না, ককেশিয়ানরা এখন নিজেরা নিজেদের প্রশিক্ষণ দিতে পারে। ব্যবসা এবং ভিনদেশী সমাজ ব্যবস্থার কারনে যোগ ব্যায়ামেও নানা বৈচিত্র্য এসেছে। পাশ্চাত্যে  ডে-কেয়ার, কুকুর সেবা, সাইক্লিং ইত্যাদি নানা বিষয়ের সাথে মিশে যোগ ব্যায়াম সম্পূর্ণ ভিন্ন আকৃতি পেয়েছে।

 

যোগ ব্যায়াম শুধুমাত্র শারীরিক কসরত বা শরীর গঠনের জন্য নয়। যোগ শরীর এবং মন দুটোরই গঠন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু পাশ্চাত্যে কেবল শারীরিক বিষয়টাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। অবশ্য দীর্ঘদিন অভ্যাস করলে শরীরের সাথে মনেরও পরিবর্তন আসে, সচেতনভাবে না চাইলেও সেটা হতে পারে কারন শরীর এবং পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত।

 

যোগ ব্যায়ামের মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরের সক্ষমতা বাড়ানো, নানান আসনে কোনরকম শারীরিক অস্বস্তি ছাড়া দীর্ঘক্ষণ থাকার অভ্যাস করা। বিভিন্ন আসনের মাধ্যমে শরীরের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো। বিশেষ করে বয়সের সাথে কোমরের (লোয়ার ব্যাক) শক্ত হয়ে পড়ে ফ্লেক্সিবিলিটি হারায়। যোগ ব্যায়ামে মেরুদন্ডের মাধ্যমে সমগ্র শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, শরীরের নানা জায়গায় জমে থাকা ব্যথা বের হয়ে আসে।

 

যোগ ব্যায়ামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দম নিয়ন্ত্রণ, ব্রিদিং প্রাক্টিস। ‘দমের ভিতর আছে পাখি করিও যতন’, বাতাস দেহের প্রাণশক্তি তাই বাতাস নিয়ন্ত্রণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাতাসের অক্সিজেন আমাদের রেচন ক্রিয়ার জন্য খুবই দরকারী। ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরে অক্সিজেন গ্রহণের পরিমান বাড়ে। যোগ শাস্ত্র অনুযায়ী শরীরের বাতাস মোট পাঁচ প্রকার ‘প্রাণ’, ‘উদান’, ‘সমান’, ‘অপান’ ও ‘ব্যাণ’- বাতাস এই পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে দেহের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করে। এরমধ্যে গলায় ‘উদান’, হৃদয়ে ‘প্রাণ’, নাভি অঞ্চলে ‘সমান’, গুহ্যে ‘অপান’ এবং দেহের সব জায়গায় ‘ব্যাণ’ বাতাস কাজ করে। যোগ ব্যায়ামের প্রাণায়ামের মাধ্যমে এসব বাতাসের মধ্যে ব্যালান্স হয়।

যোগ ব্যায়ামকে আজকে শারীরিক উৎকর্ষের জন্যে ব্যবহার করা হলেও এটি আসলে ভারতীয় ষড় দর্শনের অন্যতম ‘যোগ দর্শনে’র একটা অংশ। নীচে আমার লেখা ‘আলকেমি’ বই থেকে যোগ দর্শন নিয়ে উদ্দৃতিঃ

 

“আধুনিক কালে ভারতীয় আলকেমি বলতে পন্ডিতেরা যোগদর্শনকেই বুঝিয়ে থাকেন, কারন যোগ দর্শনের অনুসারীরা ভারতীয় রসায়নের চর্চা করত। বিখ্যাত আরব পরিব্রাজক আল বেরুণী ও মার্কো পোলোর মত ইওরোপীয়ান ভ্রমণকারীদের বর্ণনায় যোগী-আলকেমিস্টের কথা জানা যায়। আলবেরুণির বর্ণনায় পাওয়া যায়ঃ ‘তাদের আলকেমির মত একধরণের বিজ্ঞান আছে। তারা একে বলে রসায়ন, যেখানে রস হল সোনা’। লা নুই বেঙ্গলি খ্যাত প্রাচ্যবিদ মির্চা এলিয়াদ  যোগদর্শনের উপরে তার লেখা বইয়ে ভারতের হঠ-যোগ এবং তন্ত্রের সাথে আলকেমির সম্পর্ক দেখিয়েছেন।  কিন্তু ভারতীয় ষড়দর্শনের কোনটাই পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সাংখ্যের সাথে যোগের সম্পর্ক আছে, কপিল প্রবর্তিত সাংখ্যদর্শনের ভিত্তিতেই যোগদর্শন গঠিত। কপিলের সাংখ্যসূত্র এবং পতঞ্জলির যোগসূত্র দুটোই একত্রে ‘সাংখ্য-প্রবচন’ নামে পরিচিত। যোগদর্শন তাই সাংখ্যেরই রুপান্তর।

উপনিষদের কাল থেকে ভারতবর্ষে অদ্বৈত মতবাদের পাশাপাশি দ্বৈতবাদী সাংখ্য, যোগ, বৈষ্ণব এবং শৈব ইত্যাদি ধারা চলে আসছে। দ্বৈতবাদী যোগদর্শনের দুটো দিকঃ পুরুষ আর প্রকৃতি। যোগ দর্শন তাই তাত্ত্বিক দর্শন এবং প্রায়োগিক ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে তত্ত্বের প্রমাণ।

উপনিষদের মধ্যে মৈত্রেয়ী উপনিষদে প্রথম সাংখ্যের ধারণা মিলে, সাংখ্য দর্শনে নির্গুণ পুরুষ অধরা এবং ত্রিগুণা প্রকৃতি তার আধার। পক্ষান্তরে বেদান্ত দর্শন প্রকৃতিকে মনে করে মায়া বা ভ্রম, পুরুষই একমাত্র সত্য। মৈত্রেয়ী উপনিষদের আগের উপনিষদ্গুলোতে দুনিয়াবি বিষয়ের বর্ণনায় যেখানে জগতকে বাস্তব এবং চুড়ান্ত বাস্তবতার ক্রমবিকাশমান সত্তা হিসেবে দেখা হয় সেসব জায়গায় সাংখ্যচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রথম দিকের টেক্সটে সাংখ্যের সাথে যোগের কোন সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র মুক্তির মাধ্যম হিসেবে ধ্যান বা যোগের ধারণা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে শ্বেতাশ্বাতর উপনিষদে প্রথম ধ্যানযোগ এবং সাংখ্যযোগ দর্শনের কথা জানা যায় এবং সাংখ্যের অধিবিদ্যার উপরে ভর করে যোগ একটা স্বতন্ত্র দর্শন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

শ্বেতাশ্বাতর উপনিষদে আছে অনেক পুরুষ আর একমাত্র প্রকৃতি কালো, সাদা আর লাল রুপে্র সংমিশ্রণে সজ্জিত। কালো মাটি, সাদা পানি এবং লাল আগুন আমাদের মনে করিয়ে দেয় তিনটি মৌলিক উপাদান দিয়ে দুনিয়া সৃষ্টি। এসব মৌলের সাথে আলকেমির নিগ্রেডো, আলবেডো আর রুবিডোর মিল লক্ষ্যণীয়।

তবে সাংখ্য দর্শন নিরেশ্বরবাদী হলেও যোগদর্শন আস্তিক ধারার দর্শন । সাংখ্যকর্তা কপিল ঈশ্বরকে অপ্রয়োজনীয় মনে করলেও যোগদর্শনের চুড়ান্ত উদ্দেশ্য ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। ঋকবেদে যোগ শব্দের প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায়, লাঙ্গলের ‘জোয়াল’ বা লাগাম বুঝাতে ‘যোগ’ এবং ভারবাহী পশুকে বলা হত ‘যোগ্য’। আজকাল আমরা যখন কাউকে যোগ্য বলে মনে করি সেটার উৎপত্তি আসলে যোগ দর্শন থেকে।

পরবর্তীতে এটি ইন্দ্রিয়কে জোয়ালে বাঁধা অর্থে ব্যবহৃত হয়। উপনিষদে ইন্দ্রিয়কে ঘোড়ার সাথে তুলনা করা হয় যারা কাম্যবস্তুর পেছনে ছুটে, মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঘোড়ার লাগাম নিয়ন্ত্রণ করাটাই যোগ।

যোগ দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্বশালী ব্যক্তি হলেন পতঞ্জলি। যার সম্পাদনার কারণে সাংখ্যের দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে যোগের সকল নিয়মাবলী একসাথে গ্রন্থভুক্ত হয়ে ‘যোগসূত্র’ নামে আধুনিক কালে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। পতঞ্জলির যোগ দর্শনের অস্টাঙ্গ যথাক্রমেঃ যম, নিয়ম, আসন,প্রাণায়াম, প্রত্যাহার,ধারণা, ধ্যান এবং সমাধি।  আল-বেরুণীর অনুবাদকৃত ‘কিতাব পতঞ্জল’ যোগসূত্র থেকে কিছুটা আলাদা, সেখানে মুক্তির উপায় হিসেবে পতঞ্জলির যোগচর্চা, বৈরাগ্য ও প্রার্থনার সাথে চতুর্থ উপায় হিসেবে ‘রসায়ন’ বা আলকেমির কথা জানা যায়।”

যোগ ব্যায়াম আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। আমরা ভারতবর্ষের অধিবাসীরা আমাদের চলাফেরা, ওঠা-বসায়, শোয়ায় নিজদের অজান্তেই অনেক যোগের আসনে অভ্যস্থ। যোগ ব্যায়ামকে তাই আমরা ‘ফর গ্রান্টেড’ হিসেবে নিয়ে একে ততো পাত্তা দিতে চাই না। কিন্তু যে জীবনে কখনও মাটিতে বা বিছানায় আসন পেড়ে বা উপুড় হয়ে বসেনি সে জানে ওভাবে বসে থাকাটা কত কষ্টের। অথচ আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে সেভাবে বসে থাকতে পারি।   আজকে বিদেশে যোগ ব্যায়ামের প্রসার হয়েছে, আমরা কত বিষয়ে পাশ্চাত্যের অনুকরণ করি, তাদের দেখাদেখি আমরা যোগ ব্যায়াম শুরু করলে তাতে আমাদেরই লাভ।