ক্রিয়াভিত্তিক নিয়মে পৌরাণিক মদনভস্মের কাহিনীর তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করছি। এজন্য –
রতি, সুরত, আরতি, মদন, কাম, কামসূত্র ইত্যাদি শব্দগুলির ক্রিয়াভিত্তিক অর্থ বুঝতে হবে। সুরত মানে শুধু যৌন মিলন নয়, যেকোনো কাজে ভালভাবে রত হওয়াই সুরত। আরতি মান চলমান সুরতি, কর্ম্মে রত কর্ম্মী। পূজায় যে আরতি করা হয় তা ভালবাসা ও শ্রদ্ধা সহকারে কর্ম্মে রত হওয়ারই প্রতীক। মদন মানে যা কর্ম্মে প্ররোচিত করে, মত্ততা দেয়। কর্ম্মে নিরত কর্ম্মীদের রতি বলা যেতে পারে। রতি ও মদন কামসূত্রে গ্রথিত। এখানে কামসূত্র মানে কাজের সূত্র ( প্রসঙ্গত, ‘বাৎসায়নের কামসূত্র‘ বইটি প্রকৃতপক্ষে একটি Management-এর বই, যদিও ক্রিয়াভিত্তিক ভাষা না বুঝে কোনো কোনো আধুনিক পাঠক এটিকে যৌনতা বিষয়ক বই বলে মনে করেন)। সমস্যা হল শ্রমিক যদি উৎপন্ন দ্রব্যের উপর অধিকার দাবী করে বা সেগুলিকে কামনা করে তাহলে তা পণ্যে পরিণত হতে পারে না। তাই প্রাচীন ভারতে পণ্য উৎপাদনের জন্য উৎপন্ন দ্রব্যের উপর কর্ম্মীর ভালবাসা বা মদনকে ভস্ম করার দরকার হয়েছিল। এখন পদ্যভিধান ‘বর্ণসঙ্গীত‘ থেকে বিষয়টি বর্ণনা করা হচ্ছে :

 

মদনভস্ম

রত হওয়া যদি সক্রিয় হয়, তাহা হয়ে যায় রতি;
কর্ম্মীদিগকে রতি বলি যদি তাতে নাই কোনো ক্ষতি।
কর্ম্মে সুরত কর্ম্মীর দল অতিশয় মায়াবতী;
রতি নামে ছিল দক্ষকন্যা, মদন তাহার পতি।

মনে মত্ততা দান করে যাহা মদ বলা হয় তায়,
মদ আর অন জুড়ে দাও যদি মদন হইয়া যায়।
কর্ম্মীর মনে বসিয়া মদন ক’রে চলে প্রমদন;
সে যে কামদেব আর মন্মথ, করে মন মন্থন।

মদন তাহার ফুলধনু থেকে ছুড়িল পুষ্পশর,
তাই দেখে রতি সুরত হইয়া করিল তাহার ঘর।
রতির মনেতে বসিয়া মদন কাড়িল তাহার মন;
রতি ও মদন সুরত হইল, বাড়িল উৎপাদন।

সুরত মানে তো ভালভাবে রত পুরুষ-প্রকৃতি মিলে,
রতি ও মদন সুরত হইয়া কর্ম্ম করিয়া চলে।
কর্ম্মতে রতি আশ্রয় পেলে তাহাকে আরতি কয়,
পুরুষ-প্রকৃতি কামসূত্রতে হয়ে যায় তন্ময়।

কর্ম্মীর দল দ্রব্য বানিয়ে কামনা করিলে তাহা,
কেমন করিয়া সে উৎপাদন পণ্য হইবে আহা!
মালিক বলিল,’’শোনো কর্ম্মীরা, করো না ফলের আশ।
তোমরা এখন বেতন লইয়া কাজ কর বার মাস।’’

গেল কর্ম্মের প্রতি মাদকতা, অর্থাৎ ভালবাসা;
নিষ্কাম রতি শুরু হয়ে গেল, পণ্য মিলিল খাসা।
কর্ম্মীরা হল যন্ত্রের মতো, মদন হইল ছাই;
ওরা আর শ্রম ভাল নাহি বাসে, দেখে যে বেতনটাই।

মদনভস্ম বেদনাদায়ক, বড় যন্ত্রণাময়!
কেমন করিয়া এ মহান দেশে হেন কুকর্ম্ম হয়?
কেহ কেহ বলে মহাদেব নাকি ভস্ম করেছে কাম,
ওরা কুকর্ম্ম ঢাকা দিতে চায় লইয়া শিবের নাম।

মদনভস্ম একটি কুকর্ম্ম। এই কুকর্ম্মকে বৈধতা দিতে বলা হয় শিবই নাকি মদনভস্ম করেছিল। মদনভস্মের পর শুরু হয় নিষ্কাম রতি, যা প্রেমহীন দাম্পত্যের সঙ্গে তুলনীয়। যে উৎপন্ন দ্রব্যকে পণ করে বিক্রয় করা হয় তাকে পণ্য বলে। শ্রমিকেরা উৎপন্ন দ্রব্য না পেলে তাদের কাজ নিষ্কাম রতিতে পরিণত হয়। নিষ্কাম রতি প্রেমহীন দাম্পত্যের সঙ্গে তুলনীয়। ব্যাপারটি বড়ই যন্ত্রণাদায়ক। যেসব চাকুরীজীবী গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য একঘেয়ে কাজ বছরের পর বছর ধরে করে যেতে বাধ্য হন, অথবা যারা চার্লি চ্যাপলিনের ‘মডার্ণ টাইমস’ চলচ্চিত্রটি দেখেছেন তারা নিষ্কাম রতির বিষয়টি ভাল বুঝবেন।

আজও বহু মানুষ মদনভস্মের যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছেন। এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে হলে মদনকে বাঁচাতে হবে, কর্ম্মের প্রতি কর্ম্মীদের ভালবাসা ফিরিয়ে আনতে হবে। সকলের কর্ম্মজীবন আনন্দময় হোক, কামদেবের কাছে আমরা এই কামনা করি। মদনভস্মের বিষয়ে আরও জানতে হলে খান-চক্রবর্তীর ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থের অভিধান ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ পাঠ করুন।