দীপ্ত সুন্দ অসুর

ভাবছিলাম খেয়ে বই পড়তে বসব।সোহেল ল্যাপটপে কিসের একটা পিডিএফ পড়ছে।ও ইতিহাসের ছাত্র যদিও কিন্তু অন্যান্য বিষয়েও জ্ঞান রাখে।লেখার হাত ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।
খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা সবাই একঘরে বসলাম।হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এলো। বললাম,একটা বড় টেবিল আর চারটি চেয়ার কিনতে হবে।
আসলে চৌকির পরে বসে পড়া যায় এটা ঠিক, তবে চারজনে একসাথে পড়ালেখাটা চেয়ার-টেবিলেই বেশ হবে।আর বললাম,আমাদের সবাইকে কম বেশি লিখতে শিখতে হবে। সোহেল বলল,”দাদা,আমি একটা কবিতা লিখেছি।”
আমি বললাম,”হ্যা,গল্প, কবিতা, ছড়া,প্রবন্ধ,নাটক, উপন্যাস সব কিছুই আমাদের লিখতে হবে।আসলে অনেকে ভাবে আমি তো লিখতে পারি না, কিভাবে লিখবো।এটা মোটেই ঠিক নয়।যারা পরীক্ষাতে লিখতে পারে,ডায়রিতে এক আধটু লেখে তারা কলম ধরলে আস্তে আস্তে লেখা শিখে যাবে।”
নয়ন ওর ব্যাগ থেকে কতকগুলো বই নিয়ে এলো। শিক্ষা বিষয়ক বই।কিভাবে ছেলে মেয়েদের শিক্ষা দিতে হয় -বিশেষত এই ধারনার উপর বইগুলো।আমি বললাম,আমরা চারজন প্রথমদিকে এভাবেই কয়েকটি বিষয় নিয়ে এগোতে হবে।হ্যা,এটা ঠিক যে যার যা ভালো লাগে সে তাই পড়বে।তবে নির্দিষ্টভাবে তাকে একটি বা দুটি বিষয়ের উপর গবেষনা করতে হবে। জানতে হবে গভীরভাবে এবং রাত্রে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ বিষয় অপর কয়জনকে শেখাব,নানা ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিবে।সবাই একমত হলো।
“আমাদেরকে এখন ঠিক করে ফেলতে হবে কে কোন বিষয় নিয়ে কাজ করবে।”নয়ন বলল।
সজীব এতক্ষণ আমাদের কথা শুনছিল।বেশ ধীর সুস্থির ছেলেটা।বেশ সুক্ষ্ম চিন্তা করে।তবে পড়ার অভ্যেসটা ওর নেই।ওর সাথে কথা বলেই বুঝেছিলাম-ও কিন্তু চিন্তা করে যৌক্তিকভাবেই।স্বাভাবিক ভাবেই কোন কিছু মেনে নেয় না।তাছাড়া যে কোন বিষয়ে প্রশ্ন তোলার দারুণ ক্ষমতা আছে ওর।আমি জানি,ওর পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠতে বেশি সময় লাগবে না।ও যে একেবারে পড়ে না তা নয়।বলছি,পাঠ্যবইয়ের বাইরের বইয়ের সাথে তেমন কোন স্পর্শ নেই ওর।তবুও চিন্তায় ও কিন্তু অনেকটা এগিয়ে।ও বলল,”ঠিক, আমরা এখনই ঠিক করে ফেলি কে কোন দিক নিয়ে এগোবো।”
ওর কথায় সবাই সহমত হলো।
আর বললাম, আমরা কিন্তু মুক্ত। স্বাধীন। কোন বিধিনিষেধ নেই।তোমাদের দায়িত্ব তোমার।তবে দিন শেষে কে কতটা পড়লে তার হিসাব কিন্তু প্রত্যেকে প্রত্যেককে দিতে হবে।
আমি বললাম, “নয়ন, তুমি শিক্ষা দিকটা দেখো।অর্থাৎ শিক্ষার নানাবিধ দিক নিয়ে গবেষণা করা তোমার প্রধান কাজ।এটা ঠিক যে,আমরা এখানে কেউ প্রথাগত গবেষক নই।তবে গবেষণা করার একটি মৌলিক দিক অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, সব কিছুকে দার্শনিক স্তর তথা উৎপত্তিগতস্তর থেকে জানতে হবে।পূর্বের আবিষ্কারগুলোর স্বাদ নিতে হবে।আর সেই স্বাদে স্বাদে নতুন কিছুর জন্য পরিশ্রম করতে হবে।”
নয়ন বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “দাদা,শিক্ষার কোন কোন দিক নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে?”

সজীব উত্তর দিল,”বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ কোথায়, কেনই বা সেগুলো আর কিভাবেই বা তা দূর করা সম্ভব?”
আমি সজীবের কথাকে সমর্থন করে বললাম,”সজীব একেবারে ঠিক কথা বলেছে।আসলে এটা আমরা সবাই জানি যে, আমাদের দেশে,যাবতীয় সমস্যার মূলেই কিন্তু এই শিক্ষায় সমস্যা।এই সমস্যা যদি দূর করা যায় তবেই আমরা অন্যান্য সমস্যা খুব সহজেই দূর করতে পারব।”
সোহেল পড়েও যেমন,প্রশ্নও ছোড়ে তেমন।আর আমাদের মাঝে আগে থেকেই বলা আছে কোন সিদ্ধান্তে কারো কোন সন্দেহ মনে হলে সাথে সাথে সেটা জানাবে।কারণ, এমনো হতে পারে যে তার সেই প্রশ্ন বা সংশয় আমাদের চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিল।আর সোহেলের কথায় তাইই হল।ও বলল,”দাদা,আমার মনে হয় আমরা সবাই প্রথমে শিক্ষা নিয়েই কাজ করি।আর আমাদের এখানে আসার মূল উদ্দেশ্যও তাই।নয় তো আমরা পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যাবো।তাছাড়া সবাই মিলে সব বিষয়ে এগোলেই আমার মনে হয় ভালো হবে।এতে সবার প্রতিটি বিষয়ে বোঝাটা গভীরতা পাবে।”
সোহেলের কথা পুরোপুরি যুক্তি সংগত মনে হল।তারপর সবাই মিলে আবার সিদ্ধান্ত নিলাম,আমরা শিক্ষা নিয়ে চারজন একসাথে গবেষনা করব।তাতে করে খুব দ্রুত এগোনো যাবে।
আর কি কি বিষয় নিয়ে গবেষণা করব তার একটা খসড়াও ল্যাপটপে লিখে ফেলল সোহেল।
মূলত তিনটি ধাপে ভাগ হল আমাদের শিক্ষা বিষয়ক গবেষণাঃ(১)শিক্ষা সমস্যা চিহ্নিত করা
(২)সমস্যাগুলোর কারণ অনুসন্ধান এবং
(৩)সমস্যা দূরীকরণ কৌশল অনুসন্ধান

এদিকে কথা বলতে বলতে স্নানের টাইম হয়ে গেল।আমি ভাবলাম সবাইকে একটু চা করে দেওয়া যাক।তাছাড়া ওরা তো সকালে রান্না করেছে।আমি বললাম, তোমরা কথা বলতে থাকো,আমি একটু চা করে আনি।সজীব ওঠে এলো।বলল,একটু আদা পেলে বেশ হতো।
আমি বললাম,”বিকালে বাজার থেকে আনতে হবে।”