মাসকাওয়াথ আহসান

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি যে প্রতিশোধ স্পৃহা লক্ষ্য করা যায় এটা অত্যন্ত আদিম গোত্রদ্বন্দ্ব প্রকৃতির। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দৈন্যের কারণে এই হিংস্রতার উপশম হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

নব্বুই এর পরে কেবলমাত্র উভয়দলের শীর্ষ নেতাদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মানের ভিত্তিতে নেতা-কর্মী তৈরী হওয়ায়; অহিংসা-সহিষ্ণুতা-সংলাপ-সুরুচি-পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মতো বিষয়গুলো দলীয় সংস্কৃতিতে চর্চিত হতে পারেনি। ফলে দলগুলো বিকশিত হয়েছে নিম্নমানের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বোধের অস্থিধারণ করে। বাংলাদেশের গড় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মানের নীচে অবস্থান করছে এই দলদুটি। কারণ বাংলাদেশের নানা জায়গায় নানা মত ও পথের মানুষ বসবাস ও মেলামেশা করে। ভিন্নমত জীবনের সৌন্দর্য এটি মেনে নিয়েই এই সম্পর্কগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়।

মানুষ সামাজিক জীব এই মৌলিক জ্ঞানটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরের বাকি মানুষের রয়েছে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মনোজগত “পীর-সাহেবের সঙ্গে সব ব্যাপারে একমত পোষণের” অত্যন্ত প্রাচীন বৃত্তে মাথা ঠুকে চলেছে। তাদের সঙ্গে ইঞ্চি ইঞ্চি মিলিয়ে ১৬ কোটি মানুষ ‘সহমত’ পোষণ করবে; এই ভুল আর একগুয়ে চিন্তা নিয়ে দলদুটি রয়ে গেছে বিজন মধ্যযুগে।

ফলে কেবল সহমত পোষণ করবে কোন ভিন্নমত নয়; এই যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতা-কর্মী খুঁজতে গিয়ে; দুটি প্রায় চিন্তার জগতে বনসাই গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। দলদুটি যে তরুণদের দলে যুক্ত করেছে; তাদের জীবন বিকাশের দিকে কোন মনোযোগ দেয়নি। নেতারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের দেশ-বিদেশের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়িয়ে তাদের পরিবারতন্ত্রের পীরালী পরিচালনা ও গদিনশীন হবার মতো করে তৈরি করেছে। কিন্তু অন্যের যে সন্তানদের ফুসলিয়ে দলে নিয়েছে, তাদের শিক্ষা-পেশাগত দক্ষতা অর্জনের দিকে বিন্দুমাত্র নজর দেয়নি। এরাও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত জমিদারির লেঠেল হবে; ফলে বেশি যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন নেই; এই চিন্তায় তাদের ছেড়ে রেখেছে, যা করে খা। এই করে খাওয়া হচ্ছে পার্টির পেশি দেখিয়ে চাঁদা তুলে খাওয়া আর তৃতীয় শ্রেণীর ঠিকাদার হয়ে টেন্ডার সন্ত্রাস। অথচ এই তরুণদের প্রত্যেকের মাঝে বিকাশের সম্ভাবনা ছিলো; যে সুযোগ তারা পায়নি দ্বিদলীয় গ্যাং কালচারের ধারাবাহিক প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার শেকলে জড়িয়ে গিয়ে।

আবার দীর্ঘদিন ধরে চোখের বদলে চোখ-সন্তানের বদলে সন্তানের লাশ প্রকৃতির ক্রোধ ও হিংস্রতার চর্চায় মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে এই দুটি গোত্র।

সংলাপের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন; এদের এই প্রাণঘাতী প্রতিশোধ খেলা বন্ধ রাখবে উভয় পক্ষ। এইসব প্রতিশোধমূলক হত্যা-নির্যাতনে মানসিক পীড়নের মাঝ দিয়ে যাওয়াতে মানসিক স্থিতি ও ভারসাম্য হারিয়েছে অনেক নেতাই। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে তাদের মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদেরকে অনুধাবন করতে হবে; এই দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশে প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে সংলাপ ও জনগণের রায়ের প্রতি আস্থার আধুনিক রাজনীতির প্রচলন হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে গেছে। কিন্তু পিছিয়ে পড়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচকে। আর তা মানবাধিকার পরিস্থিতিতে ভয়ংকর অনিশ্চিত জায়গায় নিয়ে গেছে দেশটিকে। এ অবস্থার উত্তরণ জরুরি। প্রয়োজন সভ্যতার রাজনীতিতে পদার্পণ। অবশ্য ব্যতিক্রমী রাজনীতিক দুটি দলেই রয়েছেন। কিন্তু প্রতিশোধের উত্তাপে তাদের বোধের উষ্ণতা আদৃত ও অনুসৃত নয় দলীয় সংস্কৃতিতে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে দল দুটির ভি আইপি সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে পুরোনো চিন্তার ঘেরাটোপে বন্দী থেকে যাওয়া। রাজনীতিকরা হচ্ছেন জনসেবক; কাজেই জনগণের সামনে ভি আই পি হিসেবে আবির্ভুত হওয়া একেবারেই সমসাময়িক নয়। ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকার মতো দেশে এই ভি আই পি কালচার প্রায় বিদায়ের পথে। দেশগুলোর নাগরিক সমাজ রাজনীতিকদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও সামরিক কর্মচারীদেরকেও দেশগুলোর নাগরিক সমাজগুলো বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তারা সেবক; শাসক নয়।

বাংলাদেশের মানুষ সতত নদী মানুষ-গানের মানুষ-মিস্টিক কোমলতার মানুষ হওয়ায় আর “পীর প্রথা”র- শেকড় সমাজের গভীরে থাকায় “ভি আইপি কালচার”কে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে যেন। একারণেই বিজন গ্রমের ছেলেটি রাজনীতি-সরকারি চাকরিকেই সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্য অর্জন এবং অবশেষে ভি আইপি হবার একমাত্র পথ বলে মনে করে। এই মধ্যযুগীয় ভ্রান্ত স্বপ্নের কারাগার থেকে ভবিষ্যত প্রজন্মকে মুক্তি দিতে নাগরিক সমাজকে সক্রিয় হতে হবে । রাজনীতিক ও সরকারি চাকুরেদের প্রয়োজনের অধিক সম্মান ও মর্যাদা লাভের আকাংক্ষাকে না বলতে হবে।

রাজনৈতিক দলদুটির প্রতিশোধের খেলা বন্ধে তাদেরকে বাধ্য করতে হবে। তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে হবে, কেবল “রাজনীতির ছক্কা-পাঞ্জা” একটি জাতির জীবনের প্রধান বিষয় নয়। প্রধান বিষয়; দেশটিকে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ভয়ে বসবাসের উপযোগী করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুশিক্ষা , হাসপাতালে সুচিকিতসা নিশ্চিত করা; বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান; সর্বোপরি আইনের শাসন ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠা।

রাজনীতি আর এর লেজুড় বৃত্তি করে দুর্নীতির যে বুলবুলি আখড়াই দশকের পর দশক চলেছে; এটা আর চলতে পারে না। পাড়ার পার্টি অফিসে বা সরকারি অফিসে গোল হয়ে বসে থাকা লুন্ঠক মাস্তানতন্ত্র আর এভাবে চলতে পারে না।তাই আসন্ন নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এসব বিষয়ে ইতিবাচক সংস্কারের অঙ্গীকার প্রত্যাশা করি। এরপর যেহেতু জনগণের এখতিয়ার; তাই তারাই সিদ্ধান্ত নিক; আগামি পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার চাকরি তারা কাকে দিতে দিতে চায়।