আলপনা তালুকদার

ঈশা মেয়েটার ছবি দেখে আমি হতবাক হয়ে গেছি! কী সুন্দর নিষ্পাপ মুখ! অথচ কী ভয়াবহ তার মানসিকতা, আচরণ! আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে এই মেয়ে এমন জঘন্য, নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে! সবাই ঢাবিতে পড়তে পারেনা। বাংলাদেশের প্রথমসারির মেধাবীরা এখানে পড়ার সৌভাগ্য লাভ করে। আর সেসব মেধাবীরা এভাবে সহপাঠীকে নির্যাতন করে বা সহপাঠীর দ্বারা নির্যাতিত হয়। ভাবা যায়!

এটা জানাই ছিল যে, মেয়েটির কোন শাস্তি হবেনা। বরং তাকে পুরস্কৃত করা হবে। এর আগে যেমন শায়লা বা এমন হাজারজনকে করা হয়েছে। তদন্তে তার কোন অপরাধ পাওয়া যায়নি। যাবার কথাও নয়। সব সরকারই নিজের গদি ঠিক রাখার জন্য মিথ্যাচার করে। বিএনপিও বলতো, বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। কিন্তু এশা মেয়েটির অপরাধের অজস্র সাক্ষী-প্রমাণ থাকার পরেও রাষ্ট্রীয়ভাবে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এত বড় নির্জলা মিথ্যা বাঙালি মেনে নেবে? ভুলে যাবে? এহেন রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচারের পরিণতি যে কী ভয়াবহ, তা কী এদেশের রাজনীতিবিদরা বোঝেন?

অন্যায়, অবিচার, মিথ্যাচার যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জরা হয়, তখন তার প্রভাব সমাজ ও মানুষের মনে অনেক অনেক বেশী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনিতেই নৈতিক অবক্ষয়ের শেষধাপে পৌঁছে গেছি আমরা। যার প্রমাণ দিয়েছেন বিউটির বাবা।

একটি কথা প্রচলিত আছে যে,

“পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী জিনিশ হলো, পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ।”

অর্থাৎ পৃথিবীতে বাবা-মার কাছে সবচেয়ে কষ্টকর অভিজ্ঞতা হলো, সন্তানের মৃত্যু। অথচ বিউটিকে তার আপন পিতা স্বয়ং খুন করিয়েছে তার চাচা ও খুনী ভাড়া করে। তারচেয়েও ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, খুনের সময় বিউটির বাবা স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে খুন করিয়েছে! এই ধরনের ঘটনা তখনই ঘটে যখন মানুষের মধ্যে ন্যূনতম মানবিকতাবোধ কাজ করেনা। আমাদের দেশ, সমাজ, মানুষ বিবেকবর্জিত পশুতে পরিণত হচ্ছে দিন কে দিন। যা ভয়াবহ।

সব রাজনৈতিক সংগঠনের ছেলেমেয়েরা নিজ নিজ দলের পক্ষে কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। সব সরকারের আমলেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো চরদখলের মত হলগুলোকে দখল করে রাখে, নিরীহ ছেলেমেয়েদেরকে নানাভাবে হয়রানী করে, হলে উঠতে দেয়না, ইত্যাদি ইত্যাদি। একইভাবে ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরাও তাই করেছে, করছে। তারা তাদের সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন ঠেকাবার চেষ্টা করেছে। সবাই তাই করে, অন্য যেকোন দল হলেও তাই করতো। তারাও করেছে। আমার বক্তব্যের বিষয় এটি নয়। আমার ভাবনার জায়গাটা আলাদা।

নানা ঘটনা থেকে জানা গেছে যে, মুখে যাই বলুক, আওয়ামীলীগ ও তার দলের নেতাকর্মীরা নীতিগতভাবে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে সমর্থন করেনি। করলে তারা আন্দোলনকারীদের ওপর বর্বর হামলা করতো না, রগ কাটতো না, দাবী মানার পর হল থেকে আন্দোলনকারী ছাত্রদের বের করে দিতনা। উল্টোদিকে, আওয়ামীলীগ কোটা সংস্কার না চাইলে তারা আন্দোলনকে সমর্থন করলো কেন? দাবী আদায় করেছে বলে বিজয় মিছিল করলো কেন? নাকী আন্দোলন ঠেকাতে না পেরে সমর্থন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এ আন্দোলন পছন্দ করেননি, করার কথাও নয়, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে তাঁর দাবী মানার বক্তব্যের ধরনে।

যারা আন্দোলন করেছে এবং যারা আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে (বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমিতিগুলো), তারা কী সবাই আওয়ামীলীগ বিরোধী? নাহ। তাই সবাইকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বললেই আন্দোলন থামবেনা। থামেওনি। কারণ মিথ্যা সবসময়ই মিথ্যা।

যেকোন গণতান্ত্রিক দেশের যেকোন নাগরিক (রাজাকার, শিবির বা যেকোন মতাদর্শের অনুসারী হলেও) তার বা তাদের নাগরিকত্ব বহাল থাকলে সে বা তারা যেকোন দাবী (অন্যায়, অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য, অপছন্দনীয় হলেও) সরকারের কাছে জানাতেই পারে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু সরকারের বা সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের অধিকার নেই যে তারা আন্দোলনকারীদেরকে নির্যাতন করবে। আসলে আওয়ামীলীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেনা। করলে তারা আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর এভাবে বর্বর হামলা করতো না, তাদের রগ কাটতো না, দাবী মানার পর হল থেকে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের বের করে দিতনা।

মাসখানেক আগে খবরে পড়েছিলাম, ছাত্রলীগ রাবির শহীদ মিনার চত্বর থেকে শিবিরের ক’জন ছেলেকে হলে ধরে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছে। কারণ তারা নাকি দলীয় মিটিং করছিল। করবেনা? আপনারা নিজের দলের পক্ষে কাজ (হামলা, রগ কাটা, সীট দখল করে রাখা, সাধারণ ছেলেমেয়েদের হলে উঠতে না দেয়া, হল থেকে বের করে দেয়া, নানা নির্যাতন) করতে পারলে তারা কেন পারবেনা? শিবির কী কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন? যতক্ষণ না আইন করে দলটিকে নিষিদ্ধ করছেন, ততক্ষণ আপনাদের মতই তাদেরও তাদের দলীয় যেকোন কাজ করার অধিকার আছে, কারো সেটা পছন্দ না হলেও। যদি মনে করেন, তারা রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধী, তাদের এদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই বা করতে দেবেন না, তাহলে দয়া করে আগে তাদেরকে আইনগতভাবে ‘নিষিদ্ধ’ করুন। জনগণ আপনাদেরকে বাহবা দেবে, যেমন দিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য।

আজ আওয়ামীলীগ শিবির বা বিএনপির সাথে যা যা করছে, কখনো শিবির বা বিএনপি ক্ষমতায় এসে আওয়ামীলীগের সাথেও একই আচরণ করলে তখন আওয়ামীলীগাররদের কেমন লাগবে? অতীতেও কি তাই হয়নি? ইতিহাস সাক্ষী আছে।

লীগের ছেলেরা শিবিরের ওই ছেলেগুলোকে মেরে আধমরা করার পর খবর পেয়ে পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যায়। খবরে এসেছে, ছাত্রলীগ তাদের ধরিয়ে দিয়েছে। তারা ধরিয়ে দেবার কে? ছাত্রলীগ কি পুলিশের সহযোগী সংগঠন? শিবিরের ছেলেগুলো কোন অপরাধ করে থাকলে ছাত্রলীগকেই যদি ধরিয়ে দিতে হয়, তাহলে পুলিশ আছে কী করতে? ধরে নিলাম, তারা অপরাধ করেছিল। তাহলে তাদেরকে ধরে পুলিশে দিত। হলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে মেরে আধমরা করবে কেন? এ অধিকার তাদেরকে কে দিল? এশার গলায় জুতার মালা দিলে কষ্ট লাগে। আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের অমানবিকভাবে মারলে, তাদের ওপর হায়েনার মত হামলা করলে, তাদের পায়ের রগ কাটলে লাগেনা? তাদেরকে অপমান করে হল থেকে বের করে দিলে কী তাদের খুব আনন্দ হয়?

পাঠকরা দয়া করে নিচের লিংক থেকে অডিওটি শুনে নিবেন –

অডিও ক্লিপস-এ যা আছে তার একটু নমুনা –

… ‘তোর মত শ্রাবণীরে এখানে দাঁড়ায়ে মারতে মারতে মেরে ফেলতে পারি’

‘শোন আমাদের কারো বাল উঠেনি, এমন না, তোমাদের যেমন বাল উঠেছে, আমারও বাল উঠেছে’

‘তোর আসলে হলে থাকার কোন ইচ্ছা নেই, একা তোরে মেরে পিটিয়ে বের করে দিলে সবগুলো টাইট হয়ে যাবে’

‘নদী কই? দে নদীরে ডাক দে, তুই আগে গিছিলি মিছিলে, নদী তোর পেছন পেছন ছিল, ওরে ডাক দে’

‘প্রোগ্রামের মিছিলে বললে তোমার কুড়কুড়ানি লাগে, রাত ১২ টার সময় মিছিলে যাও?

‘পপি কই, পপিরে ডেকে নিয়ে আয় ত…’।

এবার নিচের এই ভিডিওটায় চোখ বুলিয়ে নিন –

নিচের নিউজক্লিপসটাও দেখে নিন,

এশাকে আবার ফিরিয়ে আনা হলে অবস্থা কী হবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। সব অভিভাবকের মত আমিও আতঙ্কিত, সাধারণ ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। যারা সব বুঝেও এখন চুপ করে আছেন, মনে রাখবেন, একদিন এর দায় আপনাকেও শুধতে হবে।

আগে রগ কাটতো শিবির। এখন কাটে আওয়ামীলীগ। যারা কীনা নিজেদেরকে ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ দাবী করে। তাও আবার নারী নেত্রী! কী লজ্জা! কী লজ্জা! অবশ্য তাদেরই বা দোষ কী? তাদের আঁতে ঘা লাগলে রগ কাটবেনা? মারবেনা? হল থেকে বের করে দেবে না?

প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেবার জন্য যত কিছুই বলা হোক, করা হোক, জনগণ তা বিশ্বাস করেনা, করবেনা। করেওনি। ওই চারদিনের আন্দোলনে এ জাতির সাহসী সন্তানদের যে প্রাণের জোয়ার দেখেছি, কারো সাধ্য নেই তাদের দমিয়ে রাখে।