অংশুমালী শব্দের অর্থব্যাখ্যার আগে ‘অংশ’, ‘অংশু’ শব্দদু’টির ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক অর্থ জেনে নেওয়া দরকার।

অংশ (১)

“অংশ = অস্তিত্বের রহস্যরূপের শয়ন। শব্দটির প্রকৃত রূপ হল ‘ংশ’। কিন্তু উচ্চারণের সুবিধার জন্য যেমন ‘অ’-এর আগম হয়, বাস্তবেও তেমনি তেজ মাত্রেরই আধার-এর প্রয়োজন হয়। যে তেজকে নিয়ে বাস্তবের কারবার, তার চেহারা না থাকলে তাকে নিয়ে কিছুতেই কোন কাজ-কারবার চলেনা। তাই ‘ংশ’-এর সামনে আসে ‘অ’। ‘অংশ’-এর প্রাথমিক অর্থ হল অস্তিত্বের রহস্যরূপ [ অংরূপিণী বা তেজ ] শায়িত থাকে যাহাতে।”

“অংশ শব্দটি সম্পর্কে শব্দকোষকারগণের অভিমত এইরূপ যে এর ভিতরে বিভাজন বা পৃথকিকরণ ক্রিয়াটি রয়েছে। ইংরেজীতে একে ‘ডিভিশন’ করা বা ‘সেপারেট’ করা বলে। কিন্তু যাকে বিভাজন বা অংশন করা হয়, সেটি ধানচালের মত কঠিন, দুধের মত তরল, সুগন্ধীর মত বায়বীয় হতে পারে; কিংবা তাপ বা আলোর উৎস, এমনকি ক্ষমতার কেন্দ্রও হতে পারে। পাঁচ জনে বসে যে আগুন পোহায়, তারা প্রত্যেকেই সেই আগুনের অংশী। পাঁচজন বিভাগীয় কমিশনার যে রেলব্যবস্থা চালান, তাঁরা প্রত্যেকে ওই রেল-পরিচালন ক্ষমতার ‘অংশী’ বা ‘অংশাবতার’। এই বিবেচনায় ‘অংশ’ ক্রিয়াটিকে তার অতি-সীমিত দৃশ্যরূপ থেকে অপরিমেয় অদৃশ্যরূপ পর্য্যন্ত বিস্তারিত করে সর্ব্বক্ষেত্রে উপলব্ধি করতে হয়। এই বিচারে ‘অংশন্‌’ করা তাই বহুরূপী। তবে কিনা, বহুরূপী মাত্রেই একই সঙ্গে তার বহুরূপ দেখায় না, এক এক সময় এক এক রূপ দেখায়। ‘অংশ’ও সেরকম। বাক্যে প্রযুক্ত প্রেক্ষিতের বিবেচনায় ঠিক হয়, ‘অংশ’ শব্দটি বাক্যে কথিত হয়ে তার কোন রূপটিকে দেখাচ্ছে।

যতদূর বোঝা যায়, এই ‘অংশ’ শব্দ-পরিবারের পশ্চিমী উত্তরাধিকার রয়েছে ল্যাটিন ‘ansa’ এবং ইংরেজী ‘once’ ও ‘ounce’ প্রভৃতি শব্দগুলিতে, যা যথাক্রমে স্থান, কাল, ও পাত্রের অংশকে বোঝায়।”

অংশ (২)

“অংশ = ং < ংশ < অংশ। / অংশ্‌+অ (অচ্‌) – ভাববাচ্যে। – (বঙ্গীয় শব্দকোষ)।

অং [ গতির/শক্তির অণু ] শায়িত [আছে] যাহাতে। কিংবা, অংশনের আধার অর্থাৎ যাহা [ অখণ্ড বা পূর্ণকে ] বিভাজন ক’রে বা অংশন ক’রে [ উপলব্ধ বা বর্ত্তমান রূপে স্থিত হয়েছে ] আছে। / যাহাকে বিভাজন করা যায় বা বিভাজন করে পাওয়া যায়। প্রতীকী অর্থসমূহ – ভাগ, বিভক্ত দ্রব্য, বস্তুর একদেশ, খণ্ড, টুকরো, কশ্যপ ও অদিতির পুত্র ‘অংশ’, ইনি দ্বাদশ আদিত্যের অন্যতম।

বর্ত্তমানে টুকরো বা ‘শেয়ার’ অর্থে প্রচলিত।”

“কশ্যপ ও অদিতির থেকে [ বা আদিম সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিচালক ও পরিচালিতদের থেকে ] অংশের জন্ম হয়। পরবর্ত্তী কালে যৌথ সামাজিক সম্পত্তি ও তার দেখভালকারী গোষ্ঠীর যে বারোটি বিভাজন ঘটে বা যে দ্বাদশ আদিত্যের উদ্ভব ঘটে, ‘অংশ’ তাদের একটি। শাস্ত্রানুসারে এ পর্য্যন্ত ছয়টি যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে এবং বর্ত্তমানে সপ্তম যুগটি চলছে। সাত যুগে সাতরকম মনু বা মানুষ জগতে বাস করেছে। সপ্তম কালটি হল বর্ত্তমান কাল। এখন ‘আইনবোঝা মানুষদের কাল’ [ নাগরিক মানুষদের কাল ] বা “বৈবস্বত মন্বন্তর”। [ ‘এখন বৈবস্বত মন্বন্তর চলিতেছে’ – পঞ্জিকা দ্রষ্টব্য ]; কদর্থে বর্ত্তমান যুগ হল ‘আইনবাজ মানুষদের যুগ’। এর আগে ছিল ষষ্ঠ যুগ অর্থাৎ “চাক্ষুষ মন্বন্তর”, বা এমন মানুষদের যুগ, যারা আর্থ-সামাজিক সম্পর্কগুলিকে প্রথম চাক্ষুষ করতে শিখেছিল। তখন যা দিয়ে বিভিন্ন সমাজসদস্য বা গোষ্ঠীকে ‘তুষ্ট’ করা হত তাই ছিল ‘তুষিত’ বা অংশ। একালের ‘রুরাল ডেভেলপমেণ্ট ব্যাঙ্ক’ ও তার কর্ম্মচারীরা যেমন রাষ্ট্রীয় পুঁজির অংশ তেমনি সেকালে যে সামাজিক গোষ্ঠী যৌথ সম্পত্তির একটি বিশেষ ভাগের দেখভাল করত তাদেরও ‘অংশ’ বলা হত। আরও উল্লেখ্য যে ‘অং’ বা ‘অম্‌’ [দ্রষ্টব্য – অংরূপিনী] বা তেজ [বা গতি] যার ভিতরে শক্তিরূপে শায়িত নেই তাকে অংশ বলা যায় না। [দ্রষ্টব্য – আদিত্য]।”

অংশু

“অংশু= অশ্‌ + উ – ক। অংশের অত্যন্ত বিকাশসাধন করে যে। / যাহা ব্যাপ্ত করে। প্রতীকী অর্থসমূহ – কিরণ, কর, প্রভা, দীপ্তি, সূত্র, সুতা, সূত্রাদির সূক্ষাংশ, আঁশ, লেশ, অণু, কণ, সূর্য্য, প্রকাশ, বেগ। বর্ত্তমানে নামরূপে প্রচলিত।”

“অস্তিত্বের [ ধরা যাক সূর্য্যের ] সর্ব্বদিকগামী কিরণরেখাগুলিকে অংশু বলা হয়, প্রেরণের অংশ তাতে বহুদূর পর্য্যন্ত প্রসারিত, বিকশিত। একে অস্তিত্বের রহস্যরূপের [ অং-এর ] অতি বিকাশ [ শু] বলা যেতে পারে। কিন্তু ‘ং’কে বাদ দিলে সূর্য্য বাদ পড়ে যায়, শুধু কিরণরেখাগুলি থেকে যায়। সেক্ষেত্রে সেই সূর্য্যবিহীন শুধুমাত্র কিরণরেখাগুলিকে বলতে হত ‘অশু’। অমরকোষ তা সঠিক বলে মনে করেন নি। কার্য্যত কিরণরেখাগুলি সূর্য্যের [ পূর্ণের ] অংশমাত্র। তাই ‘অশ্‌’ ক্রিয়াটিকে মূল ধরলেও তা দিয়ে নিষ্পন্ন শব্দটিকে ‘অংশু’ বলাই যুক্তিসঙ্গত মনে করেছেন অমরকোষ। [ দ্রষ্টব্য – অংশুধর। ল্যাটিন uncio [ উন্‌কিয়া বা উন্‌সিয়া = অংশীয় ] যার মানে এক-দ্বাদশাংশ ]।”

অংশুধর, অংশুপতি, অংশুভর্ত্তা এবং
অংশুমালী

“অংশুধর, অংশুপতি, অংশুভর্ত্তা এবং অংশুমালী = -ধর, -পতি, -ভর্ত্তা, -মালী = ধৃ, পা, ভৃ, লা = ধারণ, পালন, ভরণ, অভিষ্ঠদান। যিনি অংশু [ কিরণ ] সমূহকে ধারণ করেন, যিনি অংশুর [ কিরণসমূহের ] অধিপতি, যিনি অংশুর [ কিরণের ] ভর্ত্তা, যাহার অংশুমালা [ কিরণমালা ] আছে। কিরণসমূহের ধারক, কিরণের অধিপতি, সূর্য্য, [ সূর্য্যের সংখ্যা অনুসারে ] ১২ সংখ্যা।”

“মাকড়সার জালের কেন্দ্র যেমন, সেইরকম সম্পর্কসমূহের বা সূত্রসমূহের কেন্দ্রীয় নির্দ্দেশক বা ‘সেণ্ট্রাল কম্যাণ্ড’। যৌথ, সরকারী বা রাষ্ট্রীয় সম্পর্কসূত্রসমূহের কেন্দ্রীয় নির্দ্দেশকের আসনটি এইরূপ চরিত্রের। রাজকোষ পরিচালকও এইরকম। রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রীয় নির্দ্দেশকও হতে পারে। সেই সুবাদে একে সূর্য্য বলা হয়েছে।”

সংক্ষেপে –

“অংশু = অংশ নবরূপে উত্তীর্ণ যাহাতে; অথবা, অখণ্ডের যে অংশ [খণ্ড] নবরূপে বা সূক্ষ্ম রূপে দেখা দেয়; কিংবা, রাষ্ট্রের শাসনতাপ তাহার বাহক-এ বা সরকারী করণিক-এ উত্তীর্ণ যাহাতে; অথবা [সাদৃশ্যে] সূর্য্যের আলোতাপ তাহার বাহক-এ বা কিরণে উত্তীর্ণ যাহাতে। সরকারী কর্ম্মী। (সাদৃশ্যে) – সূর্য্যকিরণ, সূত্রাদির সূক্ষ্মাংশ, আঁশ।

“অংশুমালী = যাহার অংশুমালা [কিরণমালা] আছে। রাষ্ট্র, (সাদৃশ্যে) সূর্য্য, সূত্রাধিপতি।”

-[ কলিম খান এবং রবি চক্রবর্ত্তী প্রণীত “বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ” এবং “সরল শব্দার্থকোষ” থেকে উদ্ধৃত। ]

বঙ্গযান এর ব্লগ   ১৮২ বার পঠিত