নাজিম উদ্দিন

অধ্যায় ১২

আইনি সংস্কার (প্রথম অংশ)

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে জিনিসগুলো করা উচিত তার অন্যতম হল বিচারের গুনগত মানের উন্নয়ন, যা কিনা মানুষের অস্তিত্ব ও সমাজের উন্নতির মৌল উপাদানগুলোর একটি। এটি পৃথিবীর যে কোনো সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক লক্ষ্যগুলোর একটি। জাতি হিসেবে আমরা বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি সেই ঔপনিবেশিক শাসনের সময় থেকে, দেশভাগ এমনকি পরের চব্বিশ বছর পাকিস্তানি শাসনামলে। আমরা বঞ্চিত হয়েছি মানবাধিকার, মানবিক মূল্যায়ন, আইনের শাসন, জনপ্রশাসনের সেবা, ব্যবসা বাণিজ্যের অধিকার আর অতি আবশ্যিক গণতন্ত্রের অধিকার থেকেও—যার সবই একটা সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। পাকিস্তান আমলে বঞ্চিত হয়েছি রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজ, কল-কারখানা স্থাপন থেকে, অথচ আমাদের এ অঞ্চল থেকে দেয়া হচ্ছিল বেশিরভাগ রাজস্ব। আমরা একটা সংখ্যালঘু শাসকগোষ্ঠী দ্বারা সাম্রাজ্যবাদীদের মত আচরণের শিকার হয়েছি।

স্বাধীনতার পরও বিচার বিভাগকে অবহেলা করা হয়েছে পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে যদিও সীমিত ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ে বিচারবিভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছে আইনের শাসন বলবৎ রাখতে। প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগের সাথে যদি তুলনা করি তাহলে দেখব, বিচার বিভাগের প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধার অংশভাগ প্রায় সর্বনিম্ন স্তরে। এরমাঝেই বিচার বিভাগ উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে দেশ ও তার নাগরিকের জন্য, ফলে এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাতে সাধারণ নাগরিক ভরসা করে। সুলভে নিরপেক্ষ, সার্বিক এবং সঠিক আইনের সুবিধা পাওয়া বিশ্বের সব মানুষের অধিকার। গত ক’দশকে পৃথিবীতে মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে বিচারবিভাগে নানান আইনগত সংস্কার করা হয়েছে অথচ এ সময়ে কোনো প্রয়াস নেওয়া হয়নি বাংলাদেশে।পৃথিবী ব্যাপী এটা স্বীকৃত ও গৃহীত যে গণতন্ত্রের সঠিক প্রয়োগের জন্য আইনের শাসন আবশ্যক আর শাসনবিভাগের সংস্কারও আবশ্যিক।

এমনকি উন্নত দেশগুলোর একটি ব্রিটেন, তাদের বিচারব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। সংবিধান সংশোধন আইন বা Constitutional Reforms Act, ২০০৫ সালে অনুমোদন করা হয়, যে পরিবর্তনকে ১২১৫ সালের ম্যাগনা কারটার পরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়। এই সংশোধন লর্ড চিফ জাস্টিস মানে প্রধান বিচারপতিকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস এর বিচারালয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রচলিত হাউস অফ লর্ডসকে প্রতিস্থাপন করা হলো সুপ্রিমকোর্ট দ্বারা, যার ফলে বিচারবিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে হাজার বছরের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে, প্রথম প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিভাগ বলে স্বীকৃত হল, যার নিজস্ব রীতি নীতি, বাজেট, কর্মকর্তা, ও স্থাবর সম্পত্তি যেমন ইমারতাদি সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

একইভাবে চীন, ব্রাজিল ও কিছু লাতিন আমেরিকার দেশে এ ধরনের সংস্কার করা হয়, যার মধ্যে প্রথম দুটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অত্যন্ত দ্রুত বেগে হয়ে আসছে। চীনে দা স্টেট কাউন্সিল অফ দা পিপল’স রিপাবলিক অক্টোবরের ৯ তারিখে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে ‘চীনের বিচার ব্যবস্থার সংস্কার‘ এর উপর। গত দশকে চীনের বিচার বিভাগীয় সংস্কারে নেয়া পদক্ষেপগুলোকে আর সংস্কারের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করা ও এর যাবতীয় কার্যাবলী ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ উপযোগ সাধনের লক্ষ্যকে তুলে ধরে শ্বেতপত্রটি। একই সঙ্গে মানবাধিকারের উন্নতি ও বিচারিক প্রয়োগ ক্ষমতা বাড়ানো এবং ‘মানুষের জন্য বিচার’ এই নীতির প্রতিপালন আর বিচারব্যবস্থা ডিজিটাল করার কথা ঘোষণাও এই শ্বেতপত্রে বলা হয়।

অন্যদিকে, দ্রুত উন্নয়ন অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের বিচার ব্যবস্থা ছিল বেসামরিক আইনের, ঐতিহ্যের দিক থেকে। তা the doctrine of stare decisis অনুসরণ করত না। কিন্তু ২০০৪ সালের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দেশের সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি মেনে চলা শুরু করে যার উদ্দেশ্য ছিল মামলার পরিমাণ কমিয়ে বিচার ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও সম্মান বাড়ানো। নতুন আইনের নীতিমালায় ফৌজদারি বিষয়ের কার্যকরী বিধান প্রায় প্রস্তুত হয়েছে যাতে বিচারের রায় ও প্রয়োগ সময় কমিয়ে আনা যায়। এর প্রয়োগ হলে আশা করা যায় ব্রাজিলের পক্ষে এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। একই ভাবে কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, চিলি, মেক্সিকো, পেরু, গুয়েতেমালা ও পানামা তাদের বিচার ব্যবস্থার তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করেছে।

এশিয়ার কিছু দেশ যেমন ভারত বা শ্রীলংকাও ইতিমধ্যে তাদের বিচারব্যবস্থা ডিজিটাল করেছে আর তাদের বিচার ব্যবস্থা এখন উন্নত দেশ মানে যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। যদিও এসব দেশ এমনকি সাউথ আফ্রিকা প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে কাজের ক্ষেত্রটি ডিজিটাল করে ফেলেছে। রাশিয়া এবং চীন সফরে গিয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই দেখে যে, দেশগুলোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিজিটাল পদ্ধতি পৌঁছে গিয়েছে। রাশিয়ান অফিসার আমাকে হতচকিত করে দেয় যখন সে বোতাম টিপে সাত হাজার মাইল দুরের জেলা বিচারালয়ে চলতে থাকা কাজ দেখায় আর বিচারবিভাগের প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপ করিয়ে দেয়!

চীনে সুপ্রিমকোর্টে এক বিশাল হলঘরের দেয়ালে রাখা মনিটরগুলোতে সারাদেশের বিচারবিভাগের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও দেখা যায়। একটি মামলার নথিপত্র তৈরি থেকে শুরু করে তার নিষ্পত্তি—সমস্তই করা যায় ডিজিটাল উপায়ে। সাক্ষীদের জেরা করা হয় ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে, চায়না ও রাশিয়া দুদেশেই। দুটি দেশের বিচার বিভাগের নানা স্তরের কর্মচারী ও আধিকারিকদের মধ্যে ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য আন্তরিক আগ্রহ লক্ষ্য করি। তাদের মতে, যদি বিচারব্যবস্থা উন্নত দেশের সমকক্ষ না হয় তা হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাহত হবে। কারণ হিসেবে তারা আইনগত সমস্যায় বিদেশী  বিনিয়োগের অর্থ আটকে যাওয়া বা বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতায় সমস্যার সমাধান না হওয়াকে ওই বিদেশীদের মূল দুশ্চিন্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আর এটি দূর করতে সচেষ্ট।

চীনা কর্তৃপক্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রধান বিচারপতিদের ও অন্যান্য বিচারকদের নিয়ে নানান সম্মেলন আয়োজন করে অন্যান্য দেশগুলোর অগ্রগতির উপর ধারণা নিতে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদাধিকার বলে দুবার এতে আমন্ত্রিত হই। প্রথমবার আমাকে তারা সুযোগ দেয় সম্মেলনের উদ্বোধনী ও নির্ণায়ক ভাষণ দেওয়ার সম্মান দিয়ে। দ্বিতীয়বারে প্রতিনিধি হিসেবে আমি ফয়েজ সিদ্দিকীকে পাঠাই। তার থেকে জানতে পারি চীন আমার আসার আগাম ধারণা করে বিশাল এক বৈদ্যুতিক প্রতিকৃতি সম্মেলন স্থলে টাঙিয়ে রেখেছিল।

বাংলাদেশে বিশাল সংখ্যক মামলা পড়ে থাকে বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতার জন্য। এর প্রধান কারণগুলো হলঃ

১। অনুপযোগী আইন

২। বিচারকের অপ্রতুলতা

৩। বিচারালয়ের সংখ্যা কম

৪। বিচারকদের কাজের উপর কোনো নিরীক্ষণ বা নজরদারির ব্যবস্থা না থাকা

৫। উকিলদের ক্রমাগত বাড়তি সময় নেওয়ার আবেদনে বিচারকদের উদারভাবে অনুমোদন ও

৬। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের দীর্ঘ অনুমোদিত ছুটির ব্যবস্থা।

মামলাজটের নিষ্পত্তি যদি করতে চাই, তবে ছুটির দিন কমানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরেই যে ছুটির দিন কমানোর বিষয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলাম, এমন নয়। আমি হাইকোর্ট ডিভিশনে থাকার সময়ে, যখন সৈয়দ মুদাসসির হোসেইন প্রধান বিচারপতি ছিলেন, সব বিচারকদের ছুটি কমিয়ে মামলাজট নিষ্পত্তিতে একটি সার্বিক বিচার বিভাগীয় মিটিং ডাকার আবেদন করেছিলাম ব্যক্তিগত চিঠি লিখে। একমাত্র সৈয়দ মাহমুদ হোসেইন বাদে একজনও সমর্থন করেননি। বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায় আলোচনা ছাড়াই।

ভারতীয় উপমহাদেশে লম্বা ছুটির প্রথা শুরু করে তৎকালীন ব্রিটিশ বিচারকরা, ঊনবিংশ শতকের শুরুতে যখন ব্রিটেন আর ভারতের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল বোম্বে (মুম্বাই) থেকে সমুদ্রপথে। সমুদ্রযাত্রায় প্রায় একুশ দিন চলে যেত আর বিচারকরা শরৎকালে লম্বা ছুটি নিয়ে তাদের বাড়িতে যেতেন ব্রিটেনে। তখন উচ্চতর আদালতে মামলার সংখ্যা অনেক কম ছিল ফলে জমে থাকা মামলার সমস্যা তখন ছিল না। এখন মামলা সংখ্যা লাখে লাখে। আর তখনকার তুলনায় এখন অন্য বিভাগের থেকে বিচারবিভাগের সুযোগ সুবিধা অনেক ভাল। এই আর্থিক বা অন্যান্য সুবিধা আসছে নাগরিকদের কর থেকে। তাই লম্বা ছুটির প্রথা নাগরিকদের প্রতি বঞ্চনার সমান। প্রসঙ্গত বলা যায় দক্ষিণ কোরিয়াতে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের বিচারকদের বাৎসরিক ছুটির সংখ্যা মাত্র ২১দিন। অন্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোও তাদের এই ছুটির সংখ্যা অতীব হ্রাস করেছে। আমাদের ছুটির গণনাও ভুল, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো মাসে টানা ছুটির ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ধরা হয় না। এক সাথে ১৫ দিন ছুটি নিলে সাপ্তাহিক ছুটি বাদে গণনা হয় তেমনি ধরুন যদি গোটা জুন মাসে ছুটি নেন তা হলে ছুটির সংখ্যা হয় ২২ দিন আর তাতে সাপ্তাহিক ছুটি ধরা হয় না। এই গণনা ভুল, সাপ্তাহিক ছুটি গণনায় নেওয়া উচিত।

আরো লক্ষণীয় হলো আমরা সরকারী তালিকাভুক্ত ছুটির দিনগুলো আলাদা করি যদি এই টানা ছুটি নেওয়া হয়। লক্ষণীয়, ঊর্ধ্বতন বিচারপতিরা পরের বছরের ছুটির গণনা শুরু করে দেন নভেম্বর মাস থেকেই। তারা তখন থেকেই ছুটির দিন কত হবে তার হিসেব করতে থাকেন, অর্থাৎ কত দিন অনুপস্থিত থাকবেন। ফলে মামলা নিষ্পত্তি ছাড়াই থেকে যায় মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর। এই ব্যবস্থা কোন দেশেই নেই। প্রচলিত পদ্ধতি হওয়া উচিত কতদিন তারা ওই বছরে কাজ করবেন। এভাবেই গণনা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং অন্যান্য দেশে। এ কারণে আমি ২০১৫ সালে বিধিবদ্ধ ফুল কোর্ট মিটিং এ ২০১৬ সালের জন্য ২০১টি কর্ম দিবসের তালিকা রাখি।

সমস্ত উচ্চতর বিচারকরা মোঃ আব্দুল ওয়াহাব মিঞার নেতৃত্বে আমাকে দায়ী করে কেন তাদের সাথে পরামর্শ না করে কাজটা করলাম, তার কৈফিয়ত চায়। আমি তাদের এ ব্যবস্থা যে সর্বত্র প্রচলিত ওটা দেখাই, একপর্যায়ে তাদের অন্তত ১০ দিনের ছুটি কমানোর অনুরোধ করি। আব্দুল ওয়াহাব মিঞা, নাজমুন আরা সুলতানা, মোহাম্মদ ইমান আলী ও আরো অনেক হাইকোর্টের উচ্চপর্যায়ের বিচারপতিরা সংগঠিত হয়ে তীব্রভাবে অপমান করে। আমার অধীনস্থ কর্মকর্তারা এতে স্তম্ভিত হয়ে যায়, বিশেষত সর্বোচ্চ বিচারপতির প্রতি শালীনতা ছাড়া আচরণে। আমি তাদের বলি, একে ব্যক্তিগত আঘাত মনে হয়নি কারণ কাজটি নিজের জন্য করিনি বরং সার্বিক বিচার ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ছুটির সময় কমাতে চেয়েছি। বরং তাদের প্রতি করুণা হয়েছে যে তারা পদাধিকারের প্রতি অবিচার করেছেন। তারা ভুলে গিয়েছেন তারা বিচারক আর এও ভুলে গেছেন যে, কেন তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

খেয়াল করলাম যে উচ্চ আদালতের কিছু বিচারক কোর্টে সময়ে আসতেন না এমনকি অনেকে বৈকালিক বিরতির পর এজলাসে আর ফিরতেন না। তাদের সময় মেনে চলতে বলি কারণ তারা নিজেরাই যদি নিয়মানুবর্তী না হন তবে নিম্ন আদালতের বিচারকদের আর ওই আদালতের শৃঙ্খলা কি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। বিচারপ্রার্থীর বা আদালত সম্বন্ধেই ধারণা কি হবে। তারা কর্ণপাত করেননি। আদালতে যে কোর্ট মিটিং হয় তাতেও বিষয়টি উত্থাপন করি আর তাদের অনুরোধ জানাই আদালতের সময় মেনে চলতে। আমি দুপুর ২:৩০ এ অনির্ধারিত ঝটিকা সফর করে দেখলাম অধিকাংশ বিচারক এজলাসে নেই। আরো দেখলাম আদালত সকাল ১০:৩০ এ শুরু হলেও অনেক বিচারক আসেন ১১টার পরে।

উপায়ন্তর না দেখে রেজিস্টার জেনারেলকে উচ্চতম আদালতের সদর দরজা সাড়ে দশটার পর বন্ধ করে দিতে বললাম। কিছু বিচারক প্রতিবাদ শুরু করলেও তাদের আপত্তিতে কর্ণপাত করিনি। আইনজীবীরাও এ সময়ের পর দরজা বন্ধ করলে তাদের ঢুকতে অসুবিধে হচ্ছে বলেন। তাদের বুঝিয়ে বলি, এ ব্যবস্থা সাময়িক, এছাড়া বিকল্প দুটো সড়কপথ যা শীর্ষ আদালতের সাথে যুক্ত ছিল ঐগুলো তারা এই সময়ে ব্যবহার করতে পারেন। আজকের ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়ন আর উদারনীতির যুগে ব্যবসা দেশীয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বিনিয়োগের জন্য সরকারের উপর আইনি সংস্কারের চাপ বিদ্যমান। এই কারণে আইন এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে অচল পুরোনো মামলার সুরাহা এবং সকল মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

এই দীর্ঘসূত্রতার কারণ উপরের বিষয়গুলো ছাড়াও আরো যে কারণে হয় তা হলো:

১। নিম্ন আদালতগুলোর অপ্রতুল পরিকাঠামো

২। সহায়ক কর্মচারীর অভাব

৩। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কম্পিউটার বা ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাব

৪। মামলার প্রকৃতি নির্ণায়ক প্রযুক্তি ব্যবস্থার অভাব

৫। পরিকাঠামো বা অচল মামলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অভাব

৬। ভিডিও ধারণ বা ভিডিও কনফারেন্স সুবিধার অভাব

৭। বিচার ব্যবস্থার পরিচালনা ব্যবস্থার অভাব

৮। খালি পদগুলোর পূরণের দীর্ঘসূত্রতা

৯। মামলার ঘন ঘন স্থগিতাদেশ

১০। বিচারকদের প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা

তাছাড়া, বর্তমান জনবল নিয়ে যাবতীয় বকেয়া মামলা, নিষ্পত্তি করা আগামী ৫০ বছরেও সম্ভব না। যদি নূতন মামলা নাও বিবেচনাতে নিই। তাই, অবিলম্বে পরীক্ষিত বিকল্প ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি প্রয়োজন। যেমন আইনি সালিশি বা মধ্যস্থতার ব্যবস্থা, প্রয়োজনে আইনের সংশোধন করে হলেও করা উচিত। সরকার নিজেই যখন বকেয়া মামলার বৃহত্তম অংশীদার তাই এর দরকার আরো বেশি। আরো দেখা প্রয়োজন মামলার সত্যতা নির্ণয় বা এপিলের পদ্ধতি যেন সঠিক হয়। আজকাল একটি অভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে সরকার, আধা-সরকার বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো নিম্ন আদালতে মামলা হেরে অনেক দেরিতে পুনর্বিচারের আর্জি পেশ করে। এবিষয়ে আইনজীবীদের অনেককে প্রশ্ন করেছি, যেমন মামলার পুন:বিচারের দাবি ও দেরিতে কেস ফাইল করা ইত্যাদি। তাদের উত্তর ছিল সহজ ছিল: কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা পর্যালোচনা করতে চেয়েছিল রিভিউ আবেদন দাখিল না করার আগে। এই সব পদাধিকারীদের বোঝা উচিত যে তাদের ওই পদের দায়িত্ব এবং তাদের কর্তব্য কি, তারা মোটেই সরকারের অহেতুক ব্যয় বৃদ্ধি বা বিচারালয়ের বোঝা বাড়ানোর জন্য নেই।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত প্রতিবেশী দেশগুলোর নির্ধারিত বিচারবিভাগীয় নির্ণায়ক নীতিগুলোর মতোই। একটি কার্যকর আইন এবং বিচার ব্যবস্থা দ্রুত বিচার সুবিধা পৌঁছে দিলে মানুষের আইনের শাসনের উপর ভরসা আসে। এতে বিনিয়োগের বৃদ্ধি, সম্পদের সৃষ্টি, উন্নত বিচার সুবিধার প্রসারণ ও মানবাধিকারের মৌলিক বিষয় গুলোর পালন, সার্বিক দায়বদ্ধতার এবং গণতন্ত্রের প্রসার ঘটে। একই সঙ্গে উচ্চতর বিচারবিভাগের বিচারকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাও আশু প্রয়োজন।

বর্তমান ব্যবস্থায়, উচ্চতর বিচারবিভাগের কোনো আইনগত প্রশিক্ষণ বিভাগ নেই যার মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। প্রধান বিচারপতি হিসেবে, প্রধানমন্ত্রীকে এই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে জমি ও গৃহাদি নির্মাণের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করে চিঠি লিখি। ব্যক্তিগত ভাবে তাকে অনুরোধ করি অন্তত ২৫ একর জমির ব্যবস্থা করতে। প্রধানমন্ত্রী এত জমি চাওয়ায় আশ্চর্য হলে, তাকে বুঝিয়ে বলি প্রতিবেশী নেপালে বা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে একই কাজে চল্লিশ একরের বেশি জমি বণ্টনের উদাহরণ দিয়ে। ওই অঞ্চলগুলো পাহাড়ি ও সমতল জমির অপ্রতুলতা থাকলেও তা করা হয়েছে, এমনকি এই বাবদ জমি ঢাকার বাইরে মানে কেরানীগঞ্জ, সাভার বা গাজীপুরে করতেও অনুরোধ করি।

বিগত বহু বছর একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে বিচার বিভাগের ব্যক্তিদের আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না। কারণ ভাবা হত, তারা আগেই এই বিভাগে বিশেষ শিক্ষা নিয়ে আসেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা আইনগত কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। বর্তমানে প্রায় অর্ধশতক বছর ধরে ওই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে উল্লেখ করার মত। পরিবর্তনের সূচনা হয় ফরাসী সরকারের এ ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের স্থাপনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের অনুসরণ করে। বর্তমানে ভারত সহ প্রায় সব দেশই প্রশিক্ষণ বা উন্নয়নের উপরে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিচ্ছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে বিচার ও আইনের যে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন হচ্ছে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বিচারক্ষেত্রের অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের বিকাশ ও তথ্যভাণ্ডার তৈরির কাজ সর্বাগ্রে করা উচিত।

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে ইউসিএল বলে বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান, একটি গবেষণা কেন্দ্র যা বিচার ব্যবস্থার উপর গবেষণা ও এর সক্ষমতা সৃষ্টির গুরুত্বকে তুলে ধরে। এই সংস্থা বিচার ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটি ল অফ স্কুল এর সাথে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছে বিচার বিভাগীয় বিষয়ের অধ্যয়নের জন্য ইন্সটিটিউট অফ জুডিশিয়াল স্টাডিজ। আইন একটি বহুধা সম্পন্ন ও নিত্য পরিবর্তনশীল একটি বিষয়। একারণে বিচার বিভাগীয় শিক্ষাকে বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত করতে এধরনের প্রতিষ্ঠানের আবশ্যিক।

অন্টারিও কোর্ট বিচারকদের চলমান শিক্ষা-প্রশিক্ষণ বা ওই দেশের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ইন্সটিটিউট এবং বিচারবিভাগীয় শিক্ষাদান কর্মসূচির প্রসারণ বা চালনা হয় নতুন ও অভিজ্ঞ বিচারকদের জন্য। প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদান কর্মসূচিগুলো মূলত তিনটি উদ্দেশ্য মাথায় রেখে করা হয়। পেশাগত উত্কর্ষ বজায় ও বৃদ্ধিতে,  সামাজিক সচেতনতা বজায় ও বৃদ্ধিতে আর ব্যক্তিগত উন্নতি ত্বরান্তিত করতে। সামগ্রিকভাবে, বিভাগীয় শিক্ষাদান কর্মসূচি বিচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজকে আরো উন্নত করে, শিক্ষাদান, আত্মিক উন্নতি, উপকরণের সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির ব্যবস্থা করে বিচারকদের বিভাগীয় সিদ্ধান্তকে আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ করে।

আমি যখন জেলা আদালতে প্র্যাকটিস করছিলাম, তখন দেখলাম জেলা ও সেশন বিচারকরা নানান ধরনের পিটিশন বিবেচনার জন্য দৈনন্দিন কাজের মধ্যে নেয়। জামিন আবেদন, ফৌজদারি, দেওয়ানি আবেদন সকালের সেশনে নিয়ে দ্বি-প্রাহরিক সময়ে নিয়মিত জটিল বিচার নিয়ে বা এ সংক্রান্ত আপিল নিয়ে কাজ করতেন। আমার কার্যকালের মধ্যে শেষ ১০ থেকে ১২ বছরের মেয়াদে জেলা বা সেশন জজরা খুব কম সময়ই দ্বিপ্রাহরিক বিরতির পর শুনানির কাজ করতেন। ঘটনাটা বিভিন্ন জেলা কোর্টের পরিদর্শনের সময় বারবার লক্ষ্য করেছি। তাদের গোটা দিন ধরে শুনানিগুলো রাখতে উপদেশ দিলেও তারা আমার কথা কর্ণপাত করেনি, কারণ আমার রিপোর্টগুলো তখনকার সময়ের প্রধান বিচারপতি বা আইনমন্ত্রীর কাছে পাঠালেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই আইনজীবীদের ক্রমাগত দাবি মাথায় রেখেই আমি চকিতে জেলা আদালতগুলো পরিদর্শনের কাজ শুরু করি।

এর কারণ মূলত দুটি: ১) ২০০৭ সালে ম্যাজিস্ট্রেসিকে পৃথকীকরণের পর দেওয়ানি বিচারের কার্যালয় তৈরির কাজটি অতীব ধীরে হচ্ছিল আর কোন কোন জেলায় জমি বরাদ্দই চূড়ান্ত হয়নি। আদালত হিসেবে যে বাড়িগুলো নির্ধারিত হয়েছিল তার নির্মাণ পিছিয়ে যাচ্ছিল বছরাধিক কাল। আইন মন্ত্রণালয় থেকে দেখভালের অভাব ও ঠিকাদার প্রকৌশলীদের সাথে যোগসাজশে দুর্নীতি ইত্যাদির কারণেও কাজটা আটকে ছিল। এর ফলে, ভারপ্রাপ্ত বিচারকদের কোর্ট ও এজলাস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছিল। খুব অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল ভারপ্রাপ্ত মহিলা বিচারকদের জন্য, যেহেতু তাদের পুরুষ সহকর্মীদের সাথে চেম্বার ভাগ করে নিতে হচ্ছিল কিছু জায়গায়, আর ২) বিচার বিভাগে বিচারকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ ও পুরনো কেসে গুরুত্ব দেয়া প্রচলন করতে এই কাজ করতে হয়েছিল।

আমি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের অনুরোধ করি তাদের দু’তিনটি ঘর বিচারবিভাগকে ব্যবহার করতে দেয়ার জন্য। এগুলো আগে ফৌজদারি আদালতের জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা ব্যবহার করতেন। কিছু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমার অনুরোধের সম্মান দিলেন, কিছু ম্যাজিস্ট্রেট অপারগতা জানালেন নানান কারণ দেখিয়ে। আমি একটি বিচার বিভাগীয় সম্মেলন আয়োজন করি যাতে পাবলিক প্রসিকিউটর, সরকারী আইনজীবী, বার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিভিন্ন ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্টরা, বিজিবি সেক্টর কমান্ডাররা, ৱ্যাব কমান্ডাররা, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা, সমস্ত বিচারকবৃন্দ, বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটরা অংশ নেন। তাদের সমস্যাগুলো শুনি আর এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রদান করি। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর বাকিরা সমস্যার সমাধানের রাস্তা চেয়েছেন, যেখানে সম্ভব হয়েছে সেগুলো তাৎক্ষণিক সমাধান দিয়েছি। বিচারকরা বিচারের অসামঞ্জস্য নিয়ে দ্বিধাভক্ত ছিলেন। আমি আইনের সঠিক অবস্থান তাদের সামনে তুলে ধরি।

এছাড়াও, ফৌজদারি অপরাধের মামলা নথিভুক্ত করার সময়ে ডাক্তারি প্রমাণের ক্ষেত্রে অনেক ত্রুটি থাকত। সিভিল সার্জেনদের নির্দেশ করে বলি, যারা ময়নাতদন্ত করেন সেইসব চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন যাতে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট এ থাকা ভ্রান্তিগুলো তুলে ধরেন। চিকিৎসকরা মূলত নাবালিকা মেয়েদের অপহরণ বা ওই সংক্রান্ত ক্ষেত্রে ভুল করে থাকেন। তাঁরা বয়স নির্ণয়ের সঠিক ডাক্তারি রিপোর্ট, বিশেষত বয়স নির্ণয় পরীক্ষার ক্ষেত্রে ন্যূনতম নিয়মতান্ত্রিক পন্থা মেনে নির্ণায়ক রিপোর্ট দেওয়ার পথে যান না। কোন মারাত্মক শারীরিক আঘাতের বিষয়ে আন্দাজে কাজ করার মাধ্যমে এই রিপোর্ট দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এক্সরে ইত্যাদির মাধ্যমে সমস্যা নির্ণয়ের ধার ধারেন না তারা। অনেকক্ষেত্রেই ভোঁতা বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতের রিপোর্টে মিথ্যা রিপোর্ট দেওয়া দেখতে পাওয়া যায়।

বিজিবি সীমান্ত বা প্রত্যন্ত অঞ্চল টহল দেবার সময় যে চোরাচালান বাজেয়াপ্ত করে, সেক্ষেত্রে তারা আইনগত ১০০ থেকে ১০৩ ধারার ফৌজদারি বিধি মেনে চলে না। তাদের এ বিষয়ে বুঝিয়ে বলি যে, বাজেয়াপ্ত করার তালিকা সঠিকভাবে তৈরি না করার কারণে চোরাচালানকারীরা অহেতুক আইনের ফাঁক দিয়ে সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ অফিসারদের প্রমাণ সংক্রান্ত আইনে সঠিক জ্ঞান না থাকায় ত্রুটিযুক্ত অনুসন্ধান রিপোর্ট দেখি অনেক চাঞ্চল্যকর মামলাতে। অনেকক্ষেত্রে নিম্ন বা উচ্চ আদালতে সাজা হওয়ার পর উচ্চতম আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের মামলায় ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্ত। মূলত আইনগত নথি সংগ্রহে ত্রুটি বা সাক্ষীদের সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে তদন্তকারীর দেরির কারণে খালাস পেয়ে যায় অপরাধী বা দোষী ব্যক্তি। এই ত্রুটিগুলো তাদের সামনে তুলে ধরে আবেদন করি, তারা যেন তদন্তকারীদের এ ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে বলেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা তাঁদের উপর প্রদান করা বিশেষ ক্ষমতাবলে ফৌজদারি অপরাধের ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ধারা ১০৭, ১৩৩, ১৪৪ আর ১৪৫ এ বলীয়ান। অথচ তাদের অধিকাংশ মামলা সংক্রান্ত কার্যাদি ত্রুটিযুক্ত দেখা যায়। তাদের বিষয়গুলোতে সচেতন করি এবং সংশোধন করতে বলি। তাদের আইনের অবস্থান বুঝিয়ে বলি। এ কারণেই বিচার বিভাগীয় আলোচনা সভা সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা হয়ে থাকত। আগাগোড়াই এ ধরণের আলোচনাসভা উপভোগ করতাম আই। বাস্তবে প্রয়োগ বিষয়ক জ্ঞানের বিনিময় বা ত্রুটি নিয়ে আলোচনা আর প্রয়োগগত ত্রুটি সংশোধনের প্রয়াসের কারণে বিচারকরা তাদের সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। এরফলে তারা উপকৃত হতেন আর এরকম জানার সুযোগ যে আগে পাননি ওটাও জানাতেন।

এই মিটিংগুলোতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর বিচারক প্রকৌশলীদের কোর্টের নির্ধারিত বাড়ি বা সে সংক্রান্ত নির্মাণ কাজ দ্রুত করার জন্য নির্দেশ দিতাম। ফলে প্রভূত গতি লাভ হয় নির্মাণ কাজে। কিছু জেলাতে চাপ প্রদানের পরে দ্রুততার সাথে নির্মাণ হয়ে যাওয়া বাড়িগুলোর উদ্বোধনের তারিখ ঠিক করাতেও দেরি হতে দেখা যায়। চিটাগাং, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও আরো কিছু জেলাতে এই ঘটনা দেখা যায়।

এমনই এক ঘটনার কথা বলি। একবার কনফারেন্স শেষে মৌলভীবাজার জেলা থেকে যখন রাত একটার সময় ফিরছি, তখনও শ্রমিকদের কাজ করতে দেখি। খুব দুঃখিত হয়ে আমি প্রধান জেলা দায়রা ম্যাজিস্ট্রেট আর নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ারকে অমানবিক কাজের জন্য ভৎসনা করি। তারা অকপট স্বীকার করে, আমার চাপে আর বাড়িগুলো নির্মাণ বা উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করার কারণে তাদের এ কাজ করতে হচ্ছে। একবার আরো এক জেলাতে, খুব সম্ভবত যশোরে, কাজ বন্ধ হয়ে ছিল বছর দুয়েক। কারণ জানতে পারি স্থানীয় ঠিকাদার যে দরে কাজ করার চুক্তিতে কাজ শুরু করেছিল তাতে বর্তমানে আর লাভজনক হচ্ছে না এই অজুহাতে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমি স্থানীয় প্রশাসনকে ঠিকাদারের গচ্ছিত রাখা সিকিউরিটি মানি বাজেয়াপ্ত ও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে ওই কাজ হয়ে যায়। জানতে পারি আমার চাপের কারণে ঠিকাদার কাজ শেষ করতে বাধ্য হয়েছিল।

মৌলভীবাজারে একবার এ ধরণের কাজে নির্মাণ অনুমোদনের পরও জমি নির্ধারণে দেরির কারণে নির্মাণ শুরু হচ্ছিল না। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুখলেসুর রহমান বলেন, আমার হস্তক্ষেপ ছাড়া আগামী এক দশকেও কাজ শেষ হবে না। তিনি আমার গ্রামের বাড়িতে রাত এগারোটা নাগাদ দেখা করতে আসেন। সাধারণত আমি সার্কিট হাউস ব্যবহার করতাম না, কাজের বা ব্যক্তিগত কারণে এ জেলাতে নিজের বাড়িতেই কাজ করতাম। গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে কর্মরত অবস্থায় এক বা দু রাত্রি সার্কিট হাউজে অতিবাহিত করেছি তাও মধ্যরাত পর্যন্ত কার্যক্রম চলার কারণে। যাহোক, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যখন দেখা করতে এলেন সে সময় আমি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। অতঃপর তাকে বলি পরদিন সকাল দশটায় বাড়িটি তৈরি উদ্বোধনের অনুষ্ঠান করতে, আমি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করব যদি রাজনৈতিক দলগুলো সহযোগিতা করে। ম্যাজিস্ট্রেট দশ মিনিট সময় নেন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দর সাথে কথা বলতে। কথা বলে জানান, সব রাজনৈতিক দলের নেতারা আমার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।

সে অনুযায়ী, তাকে সকাল নয়টায় মিটিং আয়োজন করতে বলি আর উদ্বোধনের সময় সকাল ১০টায় স্থির করতে বলি। তাকে আরও বললাম নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানিয়ে রাখতে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম জোগাড় রাখার জন্য। এ প্রসঙ্গে বলা ভালো, বর্তমান ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যবহৃত বাড়ি আসলে কোর্টের সম্পত্তি ছিল তবে তাতে স্থান সংকুলান হত না। এর উত্তরে একটি খাসজমি ছিল কিন্তু রাজনৈতিক চাপে ওই জমি সরকারের একটি সংস্থাকে বণ্টন করা হয়েছিল। আর ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য বাড়ির জায়গা করা হয়েছিল ওই জায়গা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। এর উপর তিনখানা মামলা এবং বেশ কিছু ইনজাংশন জারি হয়েছিল। আইনজীবীরা এই দূরে স্থান সংকুলানের বিষয়ে রাজি ছিলেন না আর দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ছিলেন। এ কারণে সব আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে মিটিং করি, তাতে সকলের কাছে এর জন্য মতামত চাই। তারা আমার সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত মেনে নিয়ে ঐক্যমত্যে প্রকাশ করেন।

সিদ্ধান্ত নিলাম, বর্তমান নির্ধারিত জায়গাতেই মানে ম্যাজিস্ট্রেট ভবনের উত্তরে ভাগের জমিতেই ওই নির্মাণ হবে। আগের শিশু একাডেমির জন্য জমির ধার্য করা বাতিল করে কাজটি করলাম আর দূরের জমিটি হস্তান্তর করে দিলাম। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে এ বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলাম। মিটিঙে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আগামী সাতদিনের মধ্যেই জমি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। এ প্রেক্ষিতে  সাতদিন পর জমিতে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করি। এ সময় অনেকেই বললেন, ওই জমির উপরে ইনজাংশন জারি থাকার কথা। বিষয়টা আগেই জানা ছিল। এ পর্যায়ে আইনজীবীরা আগ্রহী হয়ে উঠলেন মামলা প্রত্যাহারের জন্য, ৪৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা সদলে পায়ে হেঁটে জমিতে যাই আর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি। পরবর্তীতে জানতে পারি, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চাহিদার থেকে বেশি জমিই নির্মাণের জন্য দিয়েছিলেন। আজ বিচার বিভাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি স্থাপনা ওই জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে।

আরেকটি সমস্যা উপলব্ধি করলাম, আইন মন্ত্রণালয়ের নজরদারির অভাব। এছাড়া কিছু জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের জমি নির্ধারণের কাজে অনীহা বা অসহযোগিতা। এছাড়া নির্মাণকাজে দুর্নীতি। সাধারণত নির্মাণের কাজের বরাত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দেওয়া হয় যার এ ধরণের কাজের অভিজ্ঞতা নেই। কাজ পাওয়ার পরেই ওই ব্যক্তি নিজের পরিচিত ঠিকাদারের কাছে কাজ দিয়ে বিনিময়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দের টাকা কেটে রাখে। ঠিকাদারকে আবার নানান প্রতিষ্ঠানকে অলিখিত টাকা দিতে হয়। ফলে নিজের লভ্যাংশ কমে আসে কাজ তুলতে গিয়ে। এজন্য ঠিকাদার অন্য রাস্তা নেয়, উপর মহলে তদবির, দেন দরবার করে প্রকল্পে বাড়তি টাকা বরাদ্দের জন্য। মজুরি বা সরঞ্জামের দাম বেড়ে গিয়েছে এ অজুহাতে চলে টাকা বাড়ানোর দাবি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালু প্রকল্পের টাকা জোগাড় করতে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীদের সহযোগিতায় চালু দুই বা তিনটি বিলের টাকা আদায় করে ওই টাকা নিজের অন্য প্রকল্পে লাগিয়ে দেয়। ফলে উল্লেখ্য প্রকল্প বন্ধ বা বিলম্বিত হয়ে যায়। আইন মন্ত্রণালয় একজন পরিচালকের পদ সৃষ্টি করেন কাজগুলো নজর রাখার জন্য। সাধারণত বয়োজ্যেষ্ঠ কোন বিচারক স্তরের কর্মচারী, জেলা জজ সম-স্তরের কাউকে নিয়োগ করা হতো।

প্রধান বিচারপতি থাকার সময়ে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক তার কাজ থেকে অবসর নিয়েছিলেন আর ওই পদে নতুন পরিচালক নিয়োগ হয়নি যদিও সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি দাবি ছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের কাজ বস্তুত চালাচ্ছিলেন একদল নতুন পদাধিকারী, অভিজ্ঞ অফিসারের অভাব ছিল মন্ত্রণালয়ে। সবচেয়ে অভিজ্ঞ বিচারক, যিনি ভারপ্রাপ্ত ছিলেন, তাকে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার করা হয়। দ্বিতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ বিচারক আবু সালেহ মোহাম্মদ জহিরুল হক ছিলেন আইনমন্ত্রীর সচিব। তাকে ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োজিত করা হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। এর কয়েকদিনের মধ্যেই তার পদোন্নতি হয় জেলা ও সেশন জজ হিসেবে। সচিবের বেঞ্চে উত্তরণের পরও আগের পদে অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে উন্নীত করা হয়নি। আবু সালেহ মোহাম্মদ জহিরুল হক, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারির কাজ সামলাতেন আর অধীনস্থ বিচারকরা ঘুরে ফিরে পরবর্তী পদগুলোর কাজ সামলাতেন। একই অবস্থার প্রতিফলন দেখতে পাই মন্ত্রণালয়েও। একইভাবে মন্ত্রণালয় পদ পূরণ বা বদলি আর পদোন্নতির সুপারিশ করত দেশের বিভিন্ন স্থানের কোর্টের পদাধিকারীদের। আমি দেখলাম, চট্টগ্রামের ব্যস্ত কোর্ট গুলোয় দুজন জেলা জজ পাঁচ থেকে সাতজনের কাজ করছেন আবার লক্ষ্মীপুরের মতো জেলাতে তিন বা তার বেশি সহকারী জজ কাজ করছেন।

আমি আরো দেখলাম ৬/৭ জন দায়রা ম্যাজিস্ট্রেট ও ১৭ জন এমএলএসএস (নিম্ন-বিভাগের কর্মচারী) খাগড়াছড়িতে কর্মরত যেখানে এক বা দুজন ম্যাজিস্ট্রেট ওই অঞ্চলের মামলা বা কাজ সামলানোর জন্য যথেষ্ট। বাড়তি কর্মকর্তাদের চট্টগ্রামে নিয়োজিত করা যায় যেখানে চার থেকে পাঁচ জন দায়রা ম্যাজিস্ট্রেটের দরকার। যে পদ্ধতিতে বিচারকদের পদবন্টন বা কাজের ক্ষেত্রে পাঠানো হত তাতে সার্বিক মূল্যায়ন ছিল না। মন্ত্রণালয় একজন অফিসারের ট্রান্সফারের প্রস্তাব এলে তা পূরণ করতেও ব্যর্থ হতো। যদি একসাথে একাধিক বদলি পদ্ধতি নেওয়া হত তাহলে এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হতো না। মন্ত্রণালয়কে দেখানও হয় যে এ ধরণের আলাদা বদলির প্রস্তাবগুলো বিলম্বিত হয় তিন থেকে চার মাস, ফলে বকেয়া মামলা অচল থাকে। যে পরিমাণ মামলা শুনানির জন্য নির্ধারিত হয় তারও অচলাবস্থা তৈরি হয় একই কারণে। এছাড়া মামলাগুলো সে সময়ের সম্যক ভারপ্রাপ্ত অফিসারের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে ওঠে, স্বাভাবিকভাবে তার নিজের পূর্ব নির্ধারিত কাজ করেই বাড়তি মামলা দেখার কাজ করতে হত।

প্রচলিত পদ্ধতিতে কখনোই সমস্যার সমাধান করতে পারবো না। কারণ বদলির নির্দিষ্ট পদ্ধতি মানা হত না। যে সমস্ত কর্মকর্তা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা বা সিলেটে অর্থাৎ তথাকথিত ভালো জায়গায় কর্মরত ছিলেন তারা বাইরে যেতে চাইতেন না। অন্যদিকে দূরবর্তী স্থানের কর্মকর্তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা বা সিলেটে কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। সাধারণত একজন কর্মকর্তা একটি স্থানে তিন বছরের বেশি কাজ করার অধিকার রাখেন না। তাদের স্থানান্তর হওয়া স্বাভাবিক আর বদলির পদ্ধতি হওয়া উচিত নিরপেক্ষ ও নিয়মিত। দেখতাম নির্দিষ্ট কিছু বিচারকদের ঢাকাতে পোস্টিঙের প্রস্তাব আসতো। এর বিরোধিতা করি আর মন্ত্রণালয়কে ঢাকাতে কাজ করে যাওয়া বিচারকদের আবার ঢাকাতেই রাখার কাজ না করতে বলি।

যখনই এই প্রস্তাবনার পরিবর্তন করতাম তখনই পরিবর্তনের সরকারি আদেশ আর জারি হতো না। ফলে আদালতে পদের শূন্যতা থেকে যেত মাসের পর মাস। এমনই একটি পদ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পূরণে দেরি হয়েছিল ছয় মাস। মন্ত্রণালয় এমন এক বিচারককে সুপারিশ করেছিল যার কাজের সুনাম ছিল না। প্রস্তাবের বিরোধিতা করে রেজিস্ট্রারকে মন্ত্রণালয়ে লিখিত বার্তা পাঠাই পরবর্তীতে সুপ্রিমকোর্ট এমন কোন জেলা পর্যায়ের বিচারক, সেশন জজ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রধান দায়রা ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদির নিয়োগ অনুমোদন করবে না যার পূর্বে কাজের কোনো সুনাম নেই বা সততার উপর প্রশ্ন আছে। একমাত্র সৎ ও যোগ্য মানুষকেই ওই পদে নিয়োগ করা হবে।

ঢাকায় আমার প্রস্তাবিত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ও সেশন জজ হিসেবে কাজ করছিলেন। তাকে এই পদে বসানোর সরকারি আদেশনামা ফেলে রাখা হয় ছয় মাস যদিও প্রস্তাব নাকচ করার অধিকার মন্ত্রণালয়ের ছিল না এবং অবশেষে ওটা করতেই হয়। একই ঘটনা ঘটে প্রধান বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের সময়। যখনই আইন মন্ত্রীর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করতাম তখনই বলতেন সরকার সে সমস্ত বিচারকদের ওই পদে দেখতে চায় যাদের ভাবনা সরকারের সাথে সমভাবাপন্ন। তাকে পরিষ্কার করে বলি, সততা বা কর্মদক্ষতা ছাড়া কাউকে ওই পদে বসতে দিতে রাজি না। উপরে বলা অতিরিক্ত জেলা ও সেশন জজকে ঢাকাতেই নিজের পদে সফলভাবে কাজ করার পরও কেন উন্নীত করা হচ্ছে না, জিজ্ঞাসা করি। মন্ত্রী এ বিষয়ে নীরব থাকেন। তার বক্তব্য ছিল, সরকারের ভাবনার সাথে না চলা কাউকে নিয়োগ দিলে সরকারের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাকে বোঝাবার চেষ্টা করি, কর্মকর্তারা ছাত্রাবস্থায় যে রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাস করুক, দশ থেকে পনেরো বছরের বিচার বিভাগীয় কাজের মধ্যে থাকার পরে তাদের ঐভাবে দলীয়করণ করার নীতি থাকা উচিত না। আরো পরামর্শ দিলাম, যেভাবে জেলা ভিত্তিক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের পুলিশের ডেপুটি কমিশনার বা সুপারিন্টেনডেন্ট পদের তালিকাভুক্ত করা হয় ঠিক সেভাবেই সেরা বিচারকদের বিচারব্যবস্থার পদে আসীন করার পদ্ধতি চালু করি। তিনি একমত হননি। তবু তার সামনে তুলে ধরি, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ করা ঢাকা বা চট্টগ্রামের পদগুলোতে অধিকাংশ বিতর্কিত ব্যক্তিদেরই নাম থাকে।

বিচারব্যবস্থার অচলাবস্থার অবসান যখন মন্ত্রীর নজরে এনেও হলো না তখন আমার কার্যালয়কে নির্দেশ দিলাম আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সাক্ষাৎকারের চিঠি দিতে। চিঠির প্রাপ্তি স্বীকারের পরেও সচিব রাজশাহী যান সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিকে কিছু না জানিয়ে। বিষয়টা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে নিই এবং বেশ কিছু ক্যাবিনেট মন্ত্রীর কানে তুলি। তারা সব শুনেও বিশ্বাস করেননি বরং তাদের কাছে আইন-সচিব এতটাই বিশ্বস্ত ছিল যে তারা মানতেই চায়নি ওই ব্যক্তি প্রধান বিচারপতিকে এরকম অসম্মান করতে পারে। এ নিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বিচারকদের সাথে আলোচনা করি আর এক পর্যায়ে বিষয়টা যখন সাধারণের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় তখন আইন সচিব এক সন্ধ্যায় দেখা করতে আসেন। তাকে বলি, তার অসৌজন্য ক্ষমার অযোগ্য, তাকে স্মরণ করিয়ে দেই, বিষয়টা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথেই নিয়েছি। এ পর্যায়ে বুঝতে পারেন পরিস্থিতি সঙ্গিন এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাকে বলি, আইন সচিব স্রেফ একজন বিচার বিভাগীয় কর্মচারী আর তার কাজে প্রধান বিচারপতির আদেশ অমান্য করা হয়েছে। তাকে লিখিত কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেই। পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লিখিত চিঠিতে ক্ষমা প্রার্থনার পর বিষয়টির সমাধান হয়।

এই আইন সচিব পরবর্তীতে আমার কাছে আসেন আর বলেন, তাকে সচিবদের নির্ধারিত আসনে বসতে দেওয়া হচ্ছে না কোনো বৈঠকে, বরং অন্য সচিবরা তার সাথে যুগ্ম সচিবের মত ব্যবহার করছে। তিনি অনুরোধ করেন তার নাম যেন সচিব হিসেবে স্বীকৃতি দান করি। এই ধরণের বিচার বিভাগীয় বিচারকদের ঊর্ধ্বতন সচিবদের কাছে বৈষম্য বা তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিরোধিতার ক্ষেত্রে এমনিতেই এর অবসানের ও তাদের সমানাধিকারের লড়াই করেছি, তাই তাকে স্বীকৃতি দান করেছিলাম। আমার সুপারিশই তাকে আইন-সচিব হতে সাহায্য করেছিল।

আমি আরো লক্ষ্য করলাম বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের কোন ক্রমানুসারে তালিকা ছিল না। ফলে অভ্যন্তরীণ তদন্তের সময়ে একজন কর্মকর্তার উপর তদন্তকারী অপর বিচারক নিযুক্ত করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছিলাম। কারণ কনিষ্ঠ বিচারক একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অফিসারের কাজের তদন্ত করতে পারে না। আইন মন্ত্রণালয়কে তালিকা তৈরি করতে বলে চিঠি লিখলেও তারা অপারগ হয়। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ বিভিন্ন দফতরে তালিকা আগেই ছিল। ফলে নিজেই উদ্যোগী হয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিকে তালিকা তৈরির জন্য আদেশ করি। রেজিস্ট্রি সরকারি নির্দেশাবলী জারি করে প্রত্যেক বিচারকদের অবস্থান সম্বন্ধে অবগত করেন। পরবর্তীতে তালিকাটি বিশদ পরীক্ষা করে প্রকাশ করা হয় বার্ষিক বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে। তালিকা তৈরি হওয়ার পরে বিচারকেরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। মন্ত্রণালয় এখন সে তালিকা অনুসরণ করছে। এছাড়া বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নির্দেশাবলীর প্রচার ও বলবৎ করেছিলাম, যার একটি ছিল জেলা ও সেশন জজদের বিচার বা এ সংক্রান্ত আপিল, সকালের আদালতের সময়ে আর বিকেলের দ্বিতীয় ধাপে ফৌজদারি বা দেওয়ানি প্রস্তাবনা ও জামিন সংক্রান্ত বিষয়গুলো রাখতে। এই পদ্ধতি প্রচলন করি কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ বিচারকের সাথে কথা বলে, তারা বলেন যে দ্বিতীয় ভাগে আইনজীবীরা উপস্থিত থাকেন না। ফলে কাজও এগোয় না। আমি নিজেই যাচাই করে দেখলাম ওটা সত্য, আইনজীবীরা সকালের ভাগেই জামিন বা অন্য কাজে আগ্রহী, দুপুর আড়াইটা বা তিনটের সময়ে আমি নিজেই ফোনে তাদের পাইনি বা অনেকক্ষেত্রে পিওনরা ফোন তুলে বলেছে, তারা চলে গিয়েছেন। আমি যখন সার্কুলার প্রকাশ করি তখন কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ আইনজীবী ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন কারণ এই জামিন পিটিশন বা ইনজাংশন তারা সকালেই করতে আগ্রহী ছিলেন। তারা মামলা, সেশন মামলা ও আপিলের বিচারের জন্য উপস্থিত হতে আগ্রহী ছিলেন না।

একবার নরসিংদী সফরের সময়ে সব বয়োজ্যেষ্ঠ আইনজীবী আমার সাথে দেখা করে ফরমান প্রত্যাহার করার কথা বলেন। তাদের বক্তব্য ছিল সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে তারা সকালের সেশনে কাজ করতে আগ্রহী আর দুপুরে বাড়ি গিয়ে খেয়ে তারা বিশ্রাম করেন। আমি তাদের বলি যে বরং চিকিৎসকরা যে পরামর্শ দেন বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে কম খেয়ে কাজ করার জন্য, ওটাই তাদের হার্টের জন্য উপকারী। তাদের বলেছিলাম, সিনিয়র আইনজীবীদের স্বার্থেই সার্কুলার জারি করেছি, যারা সাধারণত বাড়ি ফিরে আসেন আর ভারী খাবার খান, ফলে অনেক সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দ্বিতীয়ত, যদি তারা মামলার বিচারে অংশ নেন, তাহলে জুনিয়র আইনজীবীরা তাদের কাছ থেকে সাক্ষীদের জেরা করার বিষয়ে দক্ষতা হবে। এটি এমন এক বিষয়, যা আমি নিজেই জেলা আদালতের সিনিয়র থেকে শিখেছি। আইনজীবী দরকারি বার্তা পেয়ে গিয়েছিলেন আর এবিষয়ে তারা আর আগাননি।

এছাড়াও বিচারকদের রায়ের প্রত্যয়িত লিপি সময়মত প্রকাশ, বিভাগীয় পরিদর্শনকে নিয়মিত করা, মাসিক বিচার বিভাগীয় বৈঠক ইত্যাদি করার উপর নির্দেশ জারি করি। এই নির্দেশ ও নিয়মাবলী নতুন গতি এনেছিল নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক কাজে। পরিদর্শনের সময়ে জেলা বিচার বিভাগ বলেছিল যে কর্মচারীর অভাব খুব বাজে প্রভাব ফেলছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমতির অভাবে তারা নিয়োগের কাজে এগোতে পারছেন না। আমাকে জানানো হয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা নিয়োগপ্রাপ্ত হয় অন্য জেলা থেকে। ফলে তারা সাধারণত বৃহস্পতিবার বিকেলে কাজ ছেড়ে চলে যায় আর অনেকেই রবিবার বা সোমবার কাজে ফেরে না নানান অজুহাতে। আমি নিজেই দেখলাম সতের জন নিচের সারির কর্মচারী আছে যাদের খাগড়াছড়িতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা সবাই রংপুর বা রাজশাহী জেলার। জেলা জজ আমাকে বললেন, এরা মাসে পনেরো থেকে ষোল-দিন অনুপস্থিত থাকে। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল বলে তাদের সমন জারি করে ডেকে আনাও হয়ে ওঠে না।

এই কারণে আমি আরো একটি নির্দেশাবলী জারি করি যাতে জেলা এবং সেশন জজ, মেট্রোপলিটন সেশন জজ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং প্রধান বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের নিজ জেলার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকেই নিয়োগের আদেশ জারির কথা বলি এবং এজন্য আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমতির দরকার নেই ওটা ঘোষণা করি। আমাকে দেখানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ব্যতীত নিয়োগ কার্যকর না করার বিষয়ে আগেই নির্দেশাবলী জারি করেছে। এ এক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। সহায়ক কর্মীদের ঘাটতির জন্য বিচারকরা সহজেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি। বিজ্ঞপ্তিটি মূলত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা হয়েছিল। এই আদেশ সরকারি বিভাগ ও সেক্টর কর্পোরেশনের জন্য ছিল, যাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনও নিয়োগ করা যাবে না। এই সার্কুলার জেলা আদালতের জন্য প্রযোজ্য ছিল না কারণ জেলা আদালতগুলি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে রয়েছে। সরকার বা আইন মন্ত্রণালয় কেউই এটি নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে না বা তত্ত্বাবধানও করতে পারে না। স্থানীয় বারগুলির অভিযোগ ছিল যে বহিরাগতদের বিভিন্ন বিভাগে নিযুক্ত করা হচ্ছে এবং তারা নিয়মিত উপস্থিত হত না। ফলস্বরূপ, প্রতিলিপি গ্রহণ ও অন্যান্য কাজগুলিতে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি হয়।

এমনি আরেকটি ঘটনার সম্মুখীন হই, যেখানে কিছু কর্মচারী পাঁচ বছর ধরে টাঙ্গাইলে কাজ করছিল। এদের এক জায়গা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। এদের বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ তাদের নিয়োগ হয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়ের  নির্ধারিত সময়ের পেরিয়ে যাওয়ার পর। নির্বাচনের দেরি স্রেফ সাতদিনের জন্য হয়েছিল। যখন বিষয়টা শুনানির জন্য উঠল, তখন রাষ্ট্রের তরফে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি পেশ করেন। এই বিজ্ঞপ্তি নিম্ন আদালত স্তরের কোনো নিয়োগের জন্য প্রযোজ্য কিনা তা জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দিতে অক্ষম হন। এই প্রজ্ঞাপনের কথা বলে আইনমন্ত্রী একজন কর্মকর্তাকে পাঠাতেন তালিকা সহকারে, নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার সময়ে আর অভিযোগ ওঠে, তালিকা ধরে পরীক্ষা ও নিয়োগ করা ছাড়া জেলা জজের অন্য কোনো উপায় ছিল না। এ ছাড়াও অভিযোগ ওঠে তালিকা বহনকারী কর্মকর্তা প্রত্যেক নিয়োগের সময়ে পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ টাকা নিত ও অন্য জেলার মানুষকে নির্বাচন করা হতো।

ওই নির্দেশিকা বাতিল ঘোষণা করি ও জেলা জজকে নির্দেশ দেই এরপর শূন্য পদে  নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রনালয়ের অনুমোদনের দরকার হবে না। এরপর থেকে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও স্থানীয় মানুষের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মচারী নির্বাচন শুরু হয় আর কারিগরি বা বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন পূরণে স্থানীয় প্রার্থী না থাকে তবে আসেপাশের জেলা থেকে নিয়োগ করার প্রথা শুরু হলো। রায় ঘোষণার পর এবং নিয়োগের পদ্ধতি নিয়মিতকরণের পর আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হুমকি দেয় যে অবসর গ্রহণের পরে তাদের অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। আইনমন্ত্রী এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে একদিন আমার অফিসে আসেন আর বলেন তার দুতিনজন রাজনৈতিক সমর্থককে আগে নিয়োগ করতে পারতেন কিন্তু রায়ের কারণে প্রচুর অসুবিধে হয়েছে। তাকে বলি একশ্রেণীর কর্মকর্তার কারণে নিয়োগ ব্যবস্থা অতীব দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে গিয়েছে, বিচার ব্যবস্থার প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে, ফলে প্রধান বিচারপতি হিসেবে হস্তক্ষেপ করতেই হয়েছে, যাতে বিচার বিভাগে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত একটি নিয়োগ পদ্ধতি চালু থাকে।

নিম্ন আদালতের বাজেটের বরাদ্দ পুরোটাই দেওয়া হয় আইন মন্ত্রণালয়কে। অথচ প্রধান বিচারপতি হিসেবে দেখতে পাই বিচারকরা প্রমাণের নথি হাতে হাতে রাখছেন ও প্রত্যয়ন লিপি দেওয়ার জন্যও হাতে লেখা নকল দেওয়া হচ্ছে, কারণ টাইপরাইটারের সংখ্যা অপ্রতুল ছিল। যদিও ইউনিয়ন পরিষদের পর্যায়েও টাইপ রাইটারের বদলে কম্পিউটার দেওয়া হচ্ছিল কিন্তু তা কোনো জেলা আদালতে দেওয়া হয়নি। এ কারণে প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিষয়টির সাথে যুক্ত সচিবদের একটি বৈঠকে ডেকেছিলাম যাতে কাজটি সহজ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ক্যাবিনেট সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, যিনি ভূমি মন্ত্রণালয়েরও সচিব ছিলেন, আরো কিছু সচিব ও স্বয়ং আইন মন্ত্রী এতে উপস্থিত ছিলেন। দিনব্যাপী বৈঠকে নানান বিষয়ে আলোচনা হয়। সবাই উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিম্ন আদালতের উন্নতি সাধনের জন্য একমত হন। এক পর্যায়ে কম্পিউটার দেওয়ার বিষয়ে আইন সচিবের কাছে আবেদন করি ও এর অভাবে কিভাবে কাজের ব্যাঘাত হচ্ছে তা দেখাই। তাকে ৭০০ কম্পিউটার দিতে অনুরোধ করি ও বাকি কম্পিউটার প্রধান বিচারপতির নিজস্ব বাজেট থেকে দেওয়ার কথা বলি। আইন সচিব রাজি হন তবে একটি কম্পিউটারও দেওয়া হয়নি। সময়ে সময়ে যখনি জেলা কোর্ট পরিদর্শনে যেতাম, পাঁচ-সাতটি কম্পিউটার নিয়ে যেতাম, এভাবেই দফতরের কম্পিউটারগুলো সুপ্রিম কোর্টের বাজেট থেকে আমি দিয়েছিলাম।

সমস্ত সরকারি অফিস ডিজিটাইজেশন প্রোগ্রামের অধীনে গৃহীত হয়, কিন্তু বিচার বিভাগ বিবেচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমি এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ আমার অনুরোধ মনোযোগ দেননি। তারপরে ইউএনডিপির সহায়তায় পরীক্ষামূলক ভাবে ডিজিটাইজেশন কর্মসূচী গ্রহণ করি ও সিলেট ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে শুরু হয়। ডিজিটালকরণের অল্পসময় পরে লক্ষ্য করেছি, ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষেত্রে মামলা নিষ্পত্তি অন্য আদালতের চেয়ে চারগুণ বেশি। কাজের গতি দ্বারা উত্সাহিত হয়ে সব আদালতে ডিজিটালকরণ শুরুর সিদ্ধান্ত নেই। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও অন্যান্য বড় আদালতে প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী জনাব আহমেদ পালককে আমি যোগাযোগ করি। তাকে আমার কাছে অত্যন্ত উদ্যমী, প্রফুল্ল তরুণ রাজনীতিবিদ হিসাবে মনে হয়েছিল।

যখনই আমি সমস্যাটি উত্থাপন করি, তিনি আনন্দের সাথে প্রস্তাব গ্রহণ করেন আর  ডিজিটাইজেশনের প্রক্রিয়ায় দুর্দান্ত আগ্রহ প্রদর্শন করেন। এ বিষয়ে মত বিনিময়ের জন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে পাঠান এবং আমার অফিসের প্রয়োজনীয়তা গুলি মূল্যায়নের পর বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজ করার জন্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানান। পরবর্তীতে জুনায়েদ আহমেদ পালককে আমি আমন্ত্রণ জানাই আর যখন আমার অফিসে আসেন, তখন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পর্কে জানতে পারেন। তার সাথে পরামর্শের পর, পরিকল্পনামন্ত্রী এএইচএম মোস্তফা কামালকে এক কাপ চা জন্য আমন্ত্রণ জানালাম আর যখন আমার অফিসে ছিলেন তখন উন্নয়নের বাজেট থেকে ৪০০ কোটি টাকা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি সম্মত হন এবং প্রাক-একনেক সভায় এটি অন্তর্ভুক্ত করেন আর সুপ্রিমকোর্ট রেজিস্ট্রিকে ওই বৈঠকে একজন কর্মকর্তা পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এটাই প্রথমবার যখন সুপ্রিমকোর্টের একজন কর্মকর্তা প্রাক-একনেক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তারা লক্ষ করেন, আইন মন্ত্রণালয়ের ছয় কর্মকর্তা সভায় প্রকল্পটির বিরোধিতা করেন। তাদের প্রধান আপত্তি ছিল, মন্ত্রণালয় নিজ নিজ ডিজিটাইজেশন প্রোগ্রাম পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করবে। সরকারের সবচেয়ে খারাপ মন্ত্রণালয় আইন মন্ত্রণালয়। এমনকি নয় বছর ধরে ম্যাজিস্ট্রেসি ভবন নির্মাণেও এটি ব্যর্থ হয়েছে এবং আমাকেও কিছু জেলায় সাইট নির্বাচন পদ্ধতিতে ব্যক্তিগতভাবে জড়িত হতে হয়েছিল। ডিজিটাইজেশন প্রোগ্রামের জন্য আইটি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অন্যান্য সেক্টরে প্রকল্পটি পরিচালনা করেছিল ও তার প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ছিল, তবে আইন মন্ত্রণালয়ে কোন বিশেষজ্ঞ ছিল না। পরিকল্পনা কমিশনের সচিবের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে–যিনি মন্তব্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের বিকাশে খুব সক্রিয় ও উদ্যমী ছিলেন আর এজন্য অনেক কিছু করেছেন—প্রকল্পটি প্রাক-একনেক বৈঠকে অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে একনেক এ এটি পাস করতে পারিনি। যখন এ সম্পর্কে জানতে পারলাম তখন খুব অবাক হয়ে গেলাম যে আইন মন্ত্রণালয় বিচার বিভাগের পরিবর্তে বিচার ব্যবস্থার স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

 

চলবে…

==================================

নবযুগ সম্পাদকের নোট: তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে দীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতিহাস মাথায় রেখে যারা বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করে তারা আসলে কেউই মনে রাখেননা, দিনশেষে তারা সামরিক শাসক নন, জনগণের নির্বাচিত সরকার। পর্দার আড়ালে ঘটে যাওয়া ঘটনা সামনে আসবার নজির খুব কম বলেই, আমরা সম্পূর্ণটা কখনো জানতে পাই না। তাই রূপকথার মতো মনে হয় আমাদের বাস্তবতাগুলো, সেই জাদুবাস্তবতার বাংলাদেশের জন্য সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র আত্মজীবনীমূলক বই ‘একটি স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী: আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র’ একটি মোক্ষম চপেটাঘাত, আমাদের ঘুমন্ত নাগরিকদের জেগে ওঠার আহ্বান।

বইটি দ্রুত বাংলা ভাষান্তরের জন্য ড. নাজিম উদ্দিন-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী গবেষক ও লেখক আদিত্য রাহুলকে। আশাকরি অনেকেই বইটি পাঠ করে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে একটা ধারণা পাবেন। এই পর্ব, অর্থাৎ ১২ অধ্যায় (প্রথম অংশ)-এর ‘আইনি সংস্কার‘ (..)  অংশটি অনুবাদ করেছেন আদিত্য রাহুল।