আলপনা তালুকদার

 

ফেনী ক্যাডেট কলেজের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল তুবা (বয়স ১৩)। বলা হচ্ছে, সে আত্মহত্যা করেছে। যদিও সন্দেহ করা হচ্ছে, তুবাকে নির্যাতন করে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। বা তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়ে থাকতে পারে। এসব সন্দেহের কারণ তিনটি। এক, ময়নাতদন্তের আগে তুবার বাবামাকে তুবার লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি। দুই, কলেজের হোস্টেল তাড়াতাড়ি করে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে তুবার বাবামা তুবার সাথে হোস্টেলে কি ঘটনা ঘটেছিল, তা তারা কারো কাছ থেকে জানতে না পারেন। তিন, লাশ ধোয়ানোর সময় তুবার হাতের চারটা আঙ্গুলে এবং তার শরীরের পিছনে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

তুবা অনেকবার বাবামার কাছে সিনিয়রদের দ্বারা নির্যাতিত হবার কথা বলেছিল। কিন্তু বাবামা উভয়ে ক্যাডেট কলেজের (কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ) শিক্ষক হবার কারণে এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারেননি। করলেও যে বিশেষ কোন লাভ হতো, তা মনে হয়না। কারণ ক্যাডেটে সিনিয়রদের দ্বারা জুনিয়রদের নির্যাতিত হবার ঘটনা খুবই কমন। এটা জেনেশুনেই সব বাবামা ভবিষ্যতে সন্তান ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, সেই লোভে নানা কাঠখড় পুড়িয়ে সন্তানকে ক্যাডেটে দেন। দিয়ে তারা নিশ্চিন্ত হন ও গর্ববোধ করেন।

একজন মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে আমি বলছি, আপনার সন্তানকে স্বেচ্ছায়, জেনেশুনে ক্যাডেটের মত ওরকম বৈরী পরিবেশে পাঠাবেন না। এতে আপনার সন্তানদের নানা ক্ষতি হয়। যেমন –

১। ক্যাডেটে ভর্তি হয়ে ছেলেমেয়েরা প্রথমে তারা নিজেরা সিনিয়রদের দ্বারা (শারীরিক, মানসিক, কখনও কখনও যৌন) নির্যাতনের শিকার হয়। এই নির্যাতনের তীব্র অপমান ও প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে তারা দিন কাটায় ও অপেক্ষা করতে থাকে, কবে তারা সিনিয়র হবে। পরে তারা নিজেরা সিনিয়র হয়ে গেলে নতুন যারা ক্যাডেটে ভর্তি হয়, সেসব শিক্ষার্থীদেরকে তাদের নিজেদের উপর হওয়া নির্যাতনের চেয়ে বেশী নির্যাতন করে নিজেদের নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়। এটি অসুস্থ্য মানসিকতার চর্চা।

২। ক্যাডেটে পড়তে গিয়ে ছেলেমেয়েরা নানা জটিল সমস্যায় পড়ে। তারা তাদের বয়োঃসন্ধিকালে বাবামার নিয়ন্ত্রণহীন থাকে। ফলে এ বয়সের স্বাভাবিক যৌন কৌতুহল থেকে তারা নানা বিকৃত যৌনাচারে আগ্রহী হয়। ফলে তারা কেউ কেউ রেপিস্ট বা সমকামী হয়। এই একই সমস্যা দেখা দেয় এতিমখানা, মাদ্রাসার হোস্টেল বা আবাসিক হাফেজিয়া মাদ্রাসাগুলোতে। এরকম পরিবেশে থাকা অনেকে (এমন কি, কোন কোন হাফেজও) সমকামী ও রেপিস্ট হয়।

৩। তারা কলেজ পাশ করে ভার্সিটিতে পড়তে এলে অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে মিশতে পারেনা। ফলে তারা ক্যাডেট থেকে পাশ করেছে, শুধুমাত্র এমন ছেলেমেয়েদের সাথেই মেশে। এটি তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে নানা জটিলতা ও অশান্তি সৃষ্টি করে।

৪। তারা কোন দোষ না করেও অন্যায়ভাবে সিনিয়রদের দ্বারা নির্যাতিত হয়, যার কোন প্রতিকার তারা নিজেরা করতে পারেনা। ফলে তারা দীর্ঘ সময় অসহায়, একাকী ও কষ্টকর জীবন পার করে।

নির্যাতন ছাড়াও ক্যাডেটের শিক্ষার্থীরা হোস্টেলে বাবামার স্নেহবঞ্চনা, পারিবারিক ভালোবাসাময় পরিবেশের অভাবে কষ্টকর দিন কাটাতে বাধ্য হয়, যা মোটেই কাম্য হতে পারেনা। আপনার সন্তান আপনার আদর-শাসনে বড় হবে – এটি তার অধিকার। কোন অজুহাতেই এ অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা অনুচিত। এতে সে ভয়াবহ মানসিক কষ্ট পায়। আমির খানের “তারে জমিন পার” ছবিতে হোস্টেল জীবনের কষ্টের কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে। ভারতেও বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ হোস্টেলে সিনিয়রদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।

৫।  প্রায় সবক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের ক্যাডেটে পড়তে আসার পেছনে দায়ী তাদের মা-বাবার লোভ। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বল্পতম সময়ে (উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলেই) সন্তান গেজেটেড অফিসার হয়ে যায়। ছয় বছরের ক্যাডেট জীবনে অনেক সুযোগ আসে এখান থেকে চলে যাওয়ার। কিন্তু বাবামা রাজি হননা। ছেলে-মেয়েদের নীরব কান্না তাদের মন গলাতে পারেনা। তাই বাধ্য হয়ে ছেলেমেয়েরা এখানে থাকে। যদিও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, এতে শেষ পর্যন্ত অবধারিত ক্ষতিটা হয় বাবামারই। তারা তাদের সন্তানকে সারা জীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেন। কারণ প্রায় সব ক্যাডেট ব্যক্তি জীবনে হয় চরম অসামাজিক, ডিপ্রেসনের রোগী, মা-বাবার প্রতি প্রতিশোধ-পরায়ণ, এলকোহলিক ইত্যাদি। বয়োঃসন্ধিকালের সময় থেকেই তারা মা-বাবাকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। ক্যাডেটে পড়তে আসার ফলে বাবামার সাথে সন্তানদের যে দূরত্ব তৈরী হয়, তা আর সারাজীবনেও ঘোচেনা। বাবামার প্রতি সেই টান তারা আর কখনোই অনুভব করেনা। বাবামা যখন এটা বুঝতে পারেন, তখন আর কিছু করার থাকেনা। ‘তারে জমিন পার’ ছবিতে এ দিকটিও উঠে এসেছে।

৬। গবেষণা বলছে, শৈশব-কৈশোরে বাচ্চাদের উপর শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতন তাদের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকারক।

শারীরিক নির্যাতনের ফলে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আহত হয়। মানসিক নির্যাতনের ফলে শিশুরা কষ্ট, হতাশা, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, স্নেহবঞ্চনা, দুশ্চিন্তা… এসবে ভোগে। এর ফলে শিশুদের মনে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা থেকে নানা মানসিক সমস্যা, যেমন – দূর্বল ব্যক্তিত্ব, পরনির্ভরশীলতা, নানা পরিবেশ ও মানুষের সাথে সঙ্গতিবিধানের অক্ষমতা, কাউকে বিশ্বাস করতে বা ভালবাসতে না পারা, ভঙ্গুর মানসিকতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি হতে পারে। মানসিক নির্যাতন থেকে অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতা, যেমন – ট্রমা, বিষন্নতা, এংজাইটি, আর্থারাইটিসের মত কঠিণ অসুখও হতে পারে।

যেসব শিশুরা (বাবামা, আত্মীয়, শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র বা অন্য যে কারো দ্বারা) নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করে বড় হয়, সেসব শিশুরা বাবামা, শিক্ষক বা বড়দের কাছ থেকে ওসব আচরণ অনুকরণ করে। পরবর্তী জীবনে তারাও স্ত্রী, সন্তান, কাজের লোক বা অধীনস্তদের সাথে একই আচরণ করে। এভাবে বংশ পরম্পরায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের প্রভাব চলতে থাকে চক্রাকারে।

শিক্ষার্থীদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করলে শিশুদের যে সীমাহীন ক্ষতি হয় তা আমরা অনেকেই জানিনা। শিশুদের উপর শারীরিক ও মানসিক শাস্তির প্রভাবগুলো হলঃ

১. শাস্তির প্রভাবে শিশুদের আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মানবোধ, আত্মশ্রদ্ধা বা self esteem হ্রাস পায়। ফলে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে শিশুর মনে তীব্র হতাশা সৃষ্টি হয়।

২. পাঠে শিক্ষার্থীদের উদ্যম, মনোযোগ ও আনন্দ হ্রাস পায়। তারা অপমানের দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেনা। ফলে তারা সবসময় মানসিক অস্বস্তি, কষ্ট, দুশ্চিন্তায় ভোগে।

৩. নির্যাতিত শিশুদের মনে স্কুল বা পাঠ্য বিষয়ের প্রতি ভীতি বা অহেতুক ভয় (ফোবিয়া) সৃষ্টি হতে পারে। এ ভয় সাপেক্ষীকরণের ফলে সব শিক্ষক, সহপাঠী, সব মানুষ বা সব বিষয়ের প্রতি স্থানান্তরিত হতে পারে। ফলে সব শিক্ষক, সহপাঠী, সব মানুষ বা সব বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর ভয় ও বিরক্তি সৃষ্টি হয়। ভীতি বা মানসিক কষ্ট থেকে মানসিক রোগও হতে পারে।

৪. শিক্ষক বা সহপাঠীদের কাছে নির্যাতিত শিশুদের মধ্যে তীব্র অপমানবোধ বা লজ্জাবোধ তৈরী হয়।

৫. নির্যাতিত শিশুদের মনে পাঠে তীব্র অনীহা সৃষ্টি হয়। কখনও কখনও তারা কষ্ট পেয়ে স্কুল বা পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। কেউ কেউ মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করে।

৬. বাজে কোন নামকরণের ফলে (যেমন- আদুভাই, লুজার, গাধা,..) এসব নির্যাতিত শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্টে ভোগে।

৭. নির্যাতনকারী শিক্ষক বা সহপাঠীদের প্রতি নির্যাতিত শিশুদের চরম অশ্রদ্ধা তৈরী হয়। তারা সব শিক্ষক, সিনিয়রদেরকে অবিশ্বাস, সন্দেহ করে। ভয় পায়। পরে সংসার জীবনেও নির্যাতিত শিক্ষার্থীরা কাউকে বিশ্বাস করতে না পারার কারণে অসুখী হয়।

৮. এসব নির্যাতিত শিক্ষার্থীরা অসামাজিক ব্যাক্তিত্বের অধিকারী হয়। তারা কারো সাথে সহজভাবে মিশতে ও মানিয়ে চলতে পারেনা। এসব নির্যাতিত শিশুরা পরবর্তী জীবনে সামান্য সমস্যায় পড়লেই তাদের মানসিক প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে। ফলে তারা চাপমূলক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারেনা। ইত্যাদি।)

সব জেনেশুনে প্রিয় সন্তানকে ক্যাডেটের মত জেলখানায় দেবার একটি বড় কারণ হলো, বাংলাদেশে ভালো চাকরীর অনিশ্চয়তা। তা হলেও আপনার সন্তানের মেধা থাকলে সে কোথাও না কোথাও নিজেকে ঠিকই প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবে।

আমাদের জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষুদ্র জীবনে প্রতিষ্ঠার চেয়ে বাবামার ভালবাসার মধুর সান্নিধ্যে বেঁচে থাকাটা অনেক অনেক বেশী জরুরী। তাই সব বাবামার প্রতি আমার অনুরোধ, আপনার সন্তানকে ক্যাডেটে দেবেননা। এদেশের প্রতিটা সন্তান থাকুক সবধরণের নির্যাতনমুক্ত। তারা সবসময় থাকুক বাবামার বুকজুড়ে। তারা থাকুক দুধেভাতে!!!