আলমগীর হুসেন

সম্প্রতি মুশফিক প্রধান সাহেব মুক্তমনা ও ভিন্নমত ওয়েবসাইটে বিচরণকারী মানবতাবাদী নাস্তিকদেরকে জারজ আখ্যা দিয়ে যার-পর-নাই আনন্দ পেয়েছেন। তিনি বলেনঃ

“যারা ইসলাম/ধর্ম নিয়ে অযৌক্তিক, মন-গড়া, ধার করা, অহেতুক সমালোচনা করেন, তাদের বলছি: ধর্মের পবিত্র মন্ত্র পড়ে আপনাদের বাবা-মার বিয়ের পর যখন আপনার জন্ম হয়, তখনি শুধু আপনার জন্ম সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। ধর্মীয় প্রথাকে পাশ কাটিয়ে নারী-পুরুষের মিলনে যে সন্তান জন্ম নেয়, তাকে সমাজ জারজ হিসেবে ডাকে। তাই বলছি: ধর্মকে গাল দিয়ে নিজের জন্মকে কলংকিত করবেন না।”

ধর্মকে গাল দিয়ে নিজের জন্মকে কলঙ্কিত করবেন না” বাক্যটি লক্ষণীয়। মুশফিক সাহেব স্পষ্টই বলতে চান: ধর্মকে গাল দিলে সেসব নাস্তিক-সংশয়বাদীরা জারজে পরিণত হয়ে যাবেন।

প্রথমেই বলে রাখা আবশ্যক যে, ধর্মের ক্ষতিকর ও দূর্বল দিকগুলোর সমালোচনাকে মুশফিক প্রধানের মত ধার্মিকেরা ‘ধর্মকে গালি দেওয়া’ গণ্য করেন। যাই হোক, জারজ বলতে মুশফিক সাহেব ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত রীতিনীতি মুতাবেক বিয়ে-বহির্ভূত যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে জাত সন্তানদেরকেই জারজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সন্তানের বৈধতার জন্য যদি ধর্ম-অনুমোদিত বিয়েরই দরকার পড়ে, তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে, যেখানে ধর্মের অনুমোদন দরকার সেখানে স্রষ্টার অনুমোদনটিও আপনা-আপনি চলে আসে। কাজেই ওইসব বিবাহই বৈধ, যার পিছনে সত্যিকার স্রষ্টার তথা সত্যধর্মের অনুমোদন রয়েছে। যে ধর্ম সত্য নয়, সে ধর্মের সৃষ্টিকর্তাও সত্য নয়। কাজেই সে ধর্মের অনুমোদন বা আশীর্বাদ কোন বিয়ের বৈধতা দান করতে পারে না, কেননা মিথ্যা স্রষ্টার আশীর্বাদ বিয়েকে মৌলিক অর্থে বৈধ করতে পারে না। বরং সত্যিকার স্রষ্টা যে ওইসব মিথ্যা ধর্মকে ধর্ম বলে দাবী করায় বা বিয়ের মতো পবিত্রকর্মের বৈধতা দানের প্রচেষ্টায় সাতিশয় রাগান্বিত হবেন, সেটাই যুক্তিযুক্ত।

যেহেতু মুশফিক প্রধান সাহেবের পবিত্র ইসলাম ধর্ম সত্যধর্মের দাবীদার এবং সম্ভবত ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মকে স্বীকৃতি দেয় না, কাজেই কোনক্রমেই বিশ্বের ৩০০ কোটিরও বেশী হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের মানুষের বিয়ে অবৈধ। সে সূত্রে বিশ্বের সকল হিন্দু-বৌদ্ধরা মৌলিক অর্থে জারজ।

এখানে এটাও বিবেচনা করা আবশ্যক যে, ইসলামের মহানবীর জন্ম হয়েছিল মক্কার পৌত্তলিক ধর্মানুসারী পরিবারে। তাদের সে ধর্ম কোন ধর্ম ছিল না, বরং সেটা বোধ হয় ছিল চরম অধর্ম। কেননা পৌত্তলিকতা আল্লাহর নজরে এতোটাই চরম অধর্ম এবং তার প্রতি তিনি এতোটাই ক্ষুব্ধ যে, তিনি এমন-সব ধর্মকে সমূলে ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন মহানবী মুহাম্মদ (সঃ) তথা মুসলিম জাহানকে।

উল্লেখ্য, তৎকালে পৃথিবীর বহু দেশে শত শত মিথ্যা ধর্ম প্রচলিত ছিল। সেগুলোর মধ্যে ভারতসহ অন্যান্য জায়গায় বহু পৌত্তলিক ধর্মও বিদ্যমান ছিল। অথচ আল্লাহ তা’লা একমাত্র মক্কার পৌত্তলিক ধর্মকে সমূলে বিনাশ করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ (সঃ)-কে। তার মানে দাঁড়ায় – মক্কার পৌত্তলিক ধর্ম শুধু মিথ্যা ধর্মই ছিল না, সে ধর্ম আল্লাহ তা’লার কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্যতম ধর্ম ছিল। অথচ ইসলামের বহু কৃতিপুরুষ, যেমন মহানবী মুহাম্মদ (সঃ), এবং হযরত ওমর, আলী, উসমান, ও আবুবকর (রাঃ) প্রমুখদের পিতামাতার বিয়ে হয়েছিল সেই চরম মিথ্যা ও জঘন্যতম পৌত্তলিক ধর্মের নীতিরীতি মোতাবেক। কাজেই, ওইসব বিয়ে কোনক্রমেই বৈধ বিয়ে ছিল না, বরং ছিল চরম অবৈধ। সে সূত্রে মহানবী মুহাম্মদ (সঃ), তাঁর প্রিয় সহচর ওমর, আলী, উসমান ও আবুবকর (রাঃ) – এঁরা সবাই জারজ গণ্য হবেন কীনা, সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

জারজ বিষয়ে ধর্মের অবস্থান

এবার জারজ সম্পর্কে বিভিন্ন ধর্ম কী রায় দেয়, সেটা আলোচনা করা যাক। মৌলিক বিবেচনায় ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ইত্যাদি ধর্মগুলোর ভিত্তিই হছে জারজত্ব, অর্থাৎ জারজত্ব দিয়েই হয়েছে এসব ধর্মগুলোর শুভাযাত্রা। যেমন ইসলাম ধর্মকে একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যায় যে, জারজত্ব দিয়েই ইসলামের ভিত্তি রচিত। ইসলাম বলে, আল্লাহ আদমকে প্রথম মানব ও পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেন এবং পরবর্তীতে আদি-রমণী হাওয়াকে সৃষ্টি করেন মূলত আদমকে মনোরঞ্জন দানের জন্য। হাওয়াকে নাকী সৃষ্টি করা হয়েছিল আদমের পাজরের হাড় থেকে। তার মানে হাওয়া ছিলেন জৈবিক ও জিনেটিকভাবে আদমের অনুরূপ। কাজেই আদম-হাওয়ার মাঝে যৌন প্রণয় ‘অযাচার’ বা ‘ইনসেস্ট’ গণ্য হবে এবং তাদের হাওয়ার গর্ভে প্রসূত সন্তানরাও হবেন জারজ।

শুধু তাই নয়, কলেমা পড়িয়ে আদম-হাওয়ার মাঝে বিয়ে হওয়ার কথা কোরান-হাদীসে কোথাও বলা নেই। কাজেই আদম-হাওয়ার মাঝের সম্পর্ক বৈধ কীনা, সেটাও বিবেচনার বিষয়। কোন কোন কাহিনী মতে, আদম-হাওয়া নাকী ৭১৯ জন পুত্র-কন্যার জন্ম দিয়েছিয়েল। আরেক কিচ্ছামতে আদম-হাওয়া ২৩৯ জন পুত্র-কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন। আদম-হাওয়ার ছেলেমেয়েদের (অর্থাৎ ভাইবোনের) মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক, তথা অজাচারের মাধ্যমে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি হতে থাকে। আদম-হাওয়া তাদের সন্তানদেরকে জোড়া বাঁধিয়ে বিয়ে দিয়ে থাকলেও ভাই-বোনের মাঝে দৈহিক সম্পর্ক অবশ্যই অযাচার, যাকে আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা ঘৃণার চোখে দেখে। এবং অযাচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া আদম-হাওয়ার নাতি-পুতিরা অবশ্যই জারজ বলে গণ্য হবেন। কাজেই অবৈধ যৌন-সম্পর্ক ও জারজত্বের ওপরই ইসলামের ভিত্তি রচিত। আর সে কারণেই আজকের মানবজাতি পৃথিবীতে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছে।

খ্রিস্টধর্মের কাহিনীও ঠিক ইসলামেরই অনুরূপ: আদি নারী-পুরুষ অ্যাডাম ও ঈভ, ঠিক যেমনটি আদম ও হাওয়া। তবে কোন কোন কিচ্ছামতে খ্রিস্টধর্মে স্বীকৃত যৌন সম্পর্ক আরও আশ্চর্যজনক ও গ্রহণ-অযোগ্য। এক কাহিনীতে শোনা যায়: অ্যাডাম ও ঈভের ঔরসে নাকী মাত্র দু’জন ছেলে-সন্তানের জন্ম হয়েছিল। সেটা সত্যি হলে ছেলে আর মায়ের মাঝে ঘটিত জঘন্যতম অযাচারের মাধ্যমে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি হয়েছে এবং সে আশীর্বাদেই আজ আমরা এ সুন্দর ধরণীতে আগমনের সুযোগ পেয়েছি। এ কিচ্ছা সত্যি না হলেও অ্যাডাম ও ঈভের ঔরসে জন্ম নেওয়া ছেলেমেয়ে অর্থাৎ ভাইবোনদের মাঝে ঘটিত অযাচার থেকেই মানবজাতির শুভাযাত্রা। ইহুদি ধর্মানুসারেও আদি মানব-মানবী আদম ও লুসি, এবং তাদের সন্তানদের মাঝে অযাচারের মাধ্যমেই মানবজাতির বংশবৃদ্ধি হয়েছে। ইহুদি ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা (পেট্রিয়ার্ক) ও ইসলামের মহানবী ইব্রাহীমের (আব্রাহামের) পুত্র ইসমাইল (রাঃ), যাকে ইসলাম ধর্ম একজন উঁচুদরের নবী হিসেবে সম্মান দেয়, তিনিও ‘হাযার বা হাযেরা’ নামক এক ক্রীতদাসীর গর্ভে জন্মানো জারজ সন্তান ছিলেন।

এটাও এখানে বিবেচনা করা প্রয়োজন যে, বিজ্ঞানমতে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যীশুখ্রিস্টের জন্মও অবৈধ গণ্য হবে, কেননা মানব পুরুষের বীর্য ও নারীর রজঃ – এ দু’য়ের সমন্বয় বিনা মানব সন্তানের সৃষ্টি সম্ভব নয়। অথচ কপট খ্রিস্টধর্ম ঈশ্বরকে যীশুর পিতা বলতে চেয়েছে। বস্তুত বিজ্ঞানানুসারে যীশু জারজ সন্তান। সে কারণেই হয়তো যীশু জারজ সন্তানদেরকে ঘৃণা করাকে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। খ্রিস্টধর্মের কোন কোন গোষ্ঠী আজও জারজ সন্তানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে – যেমন পাদ্রি নিয়োগে। অর্থাৎ খ্রিস্টধর্মের ভিত্তিই শুধু অযাচার ও জারজত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তার প্রাণপুরুষও জারজত্বেরই প্রতিফল। জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীর ও পারস্যের ‘জরাথুষ্ট্রবাদ’ (জরোঅ্যাস্টারিজম) ধর্মের প্রবক্তা জরোঅ্যাস্টার-এর জন্ম সম্পর্কেও যীশুর জন্মের মত কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। কাজেই, জৈন ও জরাথুস্ট্রবাদ ধর্ম দু’টিও মূলত জারজত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে, পারস্যের জরাথুস্ট্রবাদ ধর্মে অযাচার, অর্থাৎ ভাইবোন, বাপ-মেয়ে বা মা-ছেলের মাঝে বিয়েকে বেশ সম্মানের চোখেই দেখা হতো। অনেক রাজ-পরিবার অযাচারেরই ফসল ছিল। তবে সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ এ ধরনের সম্পর্ক বর্জন করতে থাকে।

হিন্দু ধর্মে অযাচার ও জারজত্ব

অযাচার শুধুমাত্র আব্রাহামীয় ধর্মগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়, হিন্দু ধর্মের ভিত্তিও মূলত অযাচার ও জারজত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কেননা হিন্দুধর্মে আদিপুরুষ হলেন মনু। কাজেই, মনু ও আদি নারী থেকে যেসব মানব সন্তান জন্মে, সেসব ভাই-বোনদের মাঝে অযাচারের মাধ্যমেই মানব সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়। হিন্দুধর্মে অজাচারের আরও ঘটনা রয়েছে। যেমন, যম ও যমী ভাইবোন, অথচ যমী যমের সাথে দৈহিক সম্পর্ক কামনা করেছে। ‘দশরথ জাতক’-এ বর্ণিত আছে যে, রাজা দশরথ ও রাণী কৌশল্যার মধ্যে ভাই-বোনের সম্পর্ক ছিল, তথাপি তাদের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল। ঋগ্বেদ-এ দেখা যায়, দম্ভ নিজ বোন মায়াকে, লোভ নিজ বোন নিবৃত্তিকে, ক্রোধ নিজ বোন হিংসাকে এবং কলি নিজ বোন নিরুক্তিকে বিয়ে করেছিল। কাজেই হিন্দু ধর্মেও ঘৃণ্য অযাচারের ছড়াছড়ি দেখা যায়। বৌদ্ধ-জাতকে এবং জৈন সাহিত্যেও ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ের কথা উল্লেখ আছে।

শুধু ভাই-বোন নয়, হিন্দু ধর্মে মা-ছেলে (ইদিপাস কমপ্লেক্স) বা পিতা-কন্যার (ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স) মধ্যে দৈহিক সম্পর্কের স্বীকৃতিও দেখা যায়। ঋগ্বেদ-এ উল্লেখ আছে: পূষণ তার বিধবা মাকে বিয়ে করে দ্বিধিষু অর্থাৎ বিধবার স্বামী হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র ‘মৎস্য পুরাণ’-এ বর্ণিত আছে যে, ঈশ্বর ব্রহ্মা নিজ কন্যা শতরূপার প্রতি প্রণয়াশক্ত হন এবং হিন্দুদের আদি মানব মনুর জন্ম হয় ব্রহ্মা আর শতরূপার মিলন থেকেই। হিন্দু পুরাণে জারজত্বের আরও ঈঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তি ও মাদ্রি ‘দেবতা’দের বীর্যে সন্তানবতী হন। সে দেবতারা যে মর্ত্যলোকেরই মানুষ ছিলেন, সেটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

ইসলাম ধর্মে জারজত্ব

ওদিকে ইসলাম ধর্ম তো জারজ সন্তানদেরকে রীতিমত স্বীকৃতি দিয়েছে। বিয়ে সম্পর্কে পবিত্র কোরানে বলা হয়েছেঃ

“…তোমাদের পছন্দের মেয়েদের মধ্য থেকে ২, ৩ বা ৪ জনকে বিয়ে কর। কিন্তু যদি সুবিচার করতে অপারগ হবে মনে কর, তবে কেবল একটা বিয়ে কর অথবা তোমার দক্ষিণ হস্তে যা আছে, তা নিয়েই সুখী হও।” (কোরান ৪.৩)

এখানে ‘‘দক্ষিণ হস্তে যা আছে’’ বলতে তৎকালীন প্রথানুযায়ী ক্রীতদাসীকে বুঝানো হয়েছে। এ পবিত্র আয়াতটি ইসলাম ধর্মে মালিককে তার দাসীদের সাথে অবাধ যৌন-মিলনের অধিকার দিয়েছে সুস্পষ্টভাবে। এ অধিকার দেওয়া হয়েছে কোরানের অন্যান্য আয়াতেও, যেমন ৭:২৯-৩০, ২৩:৫-৬, ৩৩:৫০, ৪:২৪ ইত্যাদি। আর সে সূত্র ধরে বাংলাদেশসহ গরীব দেশগুলো থেকে যে প্রচুর সংখ্যক যুবতী মেয়েরা আরব দেশে শেখদের বাড়িতে কাজ করতে যায়, তাদের সিংহভাগকে মালিকের সাথে যৌন-মিলনে শামিল হতে বাধ্য করা হয়, যদিও কিছু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত শেখরা এ ধরনের বর্বর অনুশাসন চর্চা থেকে বিরত থাকছে।

ইসলামের মহানবীকেও ক্রীতদাসীদের সাথে যৌন-মিলনে প্রবৃত্ত হতে দেখা যায়। যেমন মহানবী মুহাম্মদ (সঃ) মদীনায় গমনের সমরশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠলে একে একে আরব জনগোষ্ঠিগুলোকে ইসলামের পদতলে নিয়ে আসে। এক পর্যায়ে মহানবীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী সেনাদল যুদ্ধ-কর্মে এতই বলীয়ান ও উৎফুল্ল উঠে যে, মহানবী দূত প্রেরণ করেন পারস্য, রোম, মিশর, সিরিয়া ও অন্যান্য রাজার কাছে ইসলামের কাছে মাথানত করতে ও ইসলামে দীক্ষিত হতে আহবান জানিয়ে। তা না করলে যুদ্ধের হুমকি দেওয়া হয়। এতে পারস্য, রোম ও সিরিয়ার শক্তিশালী রাজাগণ নবীর আহবান অগ্রাহ্য করেন। কিন্তু মিশরের রাজা ভয় পেয়ে যান ও মহানবীকে খুশী করার জন্য দুইজন অতি-সুন্দরী ক্রীতদাসী বোনকে দূতের সাথে প্রেরণ করেন। মহানবী বোনদ্বয়ের মধ্য থেকে মারিয়া নামক অধিক সুন্দরী বোনটিকে নিজের জন্য চয়ন করেন। আর সে কারণেই হয়ত তিনি জীবিত থাকাকালে মিশর আক্রমনের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন নি, অথচ রোম-সাম্রাজ্যাধীন সিরিয়ার মুতা ও তাবুকে অভিযান চালিয়েছিলেন। মুতা আকমণে মুসলিম বাহিনী ব্যাপক মার খেয়ে ফিরে আসে। তাবুক আক্রমণে আগাম খবর পেয়ে শক্তিশালী গ্রীক সৈন্যরা সীমান্তে প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং মহানবী ভয়ে সেখান থেকে পিছ-পা হয়ে ফিরে আসেন।

এর পূর্বে নবি যখন মদিনার ও আরবাঞ্চলের অন্যান্য ইহুদী জনগোষ্ঠিকে আক্রমণ করে তাদেরকে নিজস্ব বাসভূমি থেকে বিতাড়িত বা রক্তপাতের মাধ্যমে নির্মূল করছিলেন, তখন তিনি প্রতিটি ইহুদী গোত্রকে পরাজিত করার পর তাদের সব নারী-শিশুকে ক্রীতদাস বানিয়ে সবচেয়ে সুন্দরী যুবতীটিকে নিজের যৌন-দাসী হিসেবে কব্জা করতেন এবং ঐ রাত্রিতেই তাকে শয্যাসাথী করতেন। এভাবে যৌন-দাসী হিসেবে তিনি কব্জা করেছিলেন বনি কোরাইজা গোত্রের সুন্দরী যুবতী রেহানাকে, খাইবার ইহুদী গোত্রের সাফিয়াকে, ও বনি মুস্তালিক গোত্রের অতিব সুন্দরী জুবেইরিয়াকে (শেষোক্ত দু’জনকে পরে তিনি স্ত্রী বানান)।

পরবর্তীতে ক্রীতদাসী মারিয়ার গর্ভে মহানবী এক পুত্র সন্তান লাভ করেন, যার নাম রাখা হয়েছিল ইব্রাহীম। কিন্তু ঐ পুত্রটি খুব বেশীদিন বাঁচে নি। সন্তানটির মৃত্যুতে মহানবী বুক চাপড়ে ও মাটিতে গড়াগড়ি গিয়ে বেমালুম কান্নাকাটি করেন। বিবি খোদেজার গর্ভে জাত মহানবীর অনেকগুলো সন্তান অকালে মারা যায়। কিন্তু সেসব সন্তানদের মৃত্যুতে তিনি এমন কান্নাকাটি বা আহাজারি কখনো করেছেন বলে নজীর পাওয়া যায় না।

এখানে বিবেচ্য বিষয়টি হল, যুদ্ধবন্দী দাসী বা ক্রীতদাসীর সাথে মালিকের যৌন সম্পর্ক বিয়ের বৈধতা বহির্ভুত। কাজেই, দাসী মারিয়ার ঔরসে জাত মহানবীর ঐ সন্তানটি অবশ্যই জারজ গণ্য হবে। অথচ সেই জারজ সন্তানের প্রতি নবি মুহাম্মদ (সঃ) এমন পিতৃত্ব দেখিয়েছেন, যেটা তিনি নিজের বৈধ সন্তানদের অকাল মৃত্যুতেও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবি (সঃ) শুধু জারজ সন্তানকে স্বীকৃতিই দেন নি, তিনি স্বয়ং অন্তত এক জারজ সন্তানের জন্মও দিয়েছিলেন। আর সে সূত্র ধরেই হয়ত মুসলিম আইনে জারজ সন্তান ‘ওয়ালদুযযিন’, অর্থাৎ শুধু তার মায়ের ও মাতৃ-সম্পর্কিত ব্যক্তিদেরই উত্তরাধীকারী হতে পারে। যেমন এক হাদীসে আছে, একজন হানাফী স্ত্রী মৃত্যুকালে তার স্বামী ও বোনের মিলনজাত একটি জারজ সন্তানকে রেখে যান। এক্ষেত্রে সন্তানটি উক্ত হানাফী স্ত্রীর রেখে যাওয়া অর্ধেক সম্পত্তির মালিক হয়, বাকী অর্ধেক যায় স্বামীর ভাগে। শিয়া ইসলাম মতে, জারজ ব্যক্তির স্ত্রী কিংবা স্বামী ও তার বংশধররা যথারীতি উত্তরাধীকারী হবে।

মুসলিম আইনে শুধুমাত্র জারজদেরকে স্বীকৃতিই দেওয়া হয় নি, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার উচ্চাসনেও বসিয়েছে অনেক জারজ সন্তানকে। এমনকি ইসলামের অনেক খলীফাও জারজ ছিলেন, যাদের কয়েক জনের নাম এখানে উল্লেখ করা হল প্রখ্যাত ইসলামী ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদ প্রফেসর মাসুদুল হাসানের ‘‘ইসলামের ইতিহাস’’ গ্রন্থ থেকে (খন্ড ১, পৃ. ২৪৮-২৬২):

১) খলীফা মুতাজিদ, শাসনকাল ৮৯২-৯০২ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি সায়াব নামক এক গ্রীক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

২) খলীফা মুক্তাফি, শাসনকাল ৯০২-৯০৭ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি জিজাক নামক এক তুর্কী দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৩) খলীফা মুক্তাদির, শাসনকাল ৯০৭-৯৩২ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি সা’আব নামক এক তুর্কী দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৪) খলীফা আল-কাহির, শাসনকাল ৯৩৩-৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি ফিতনাহ নামক এক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৫) খলীফা আল-রাদি, শাসনকাল ৯২৪-৯৪০ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি দালুম নামক এক গ্রীক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৬) খলীফা মুত্তাকি, শাসনকাল ৯৪০-৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দ, যিনি জোহরা নামক এক দাসীর গর্ভে জন্মেছিলেন।

৭) খলীফা মুস্তাকফি, শাসনকাল ৯৩৩-৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দ। তার মা ছিলেন আমলাহ-উন-নাস (জগতের সবচেয়ে সুন্দরী) নামক এক ক্রীতদাসী।

কাজেই ইসলামের ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন, ইসলামের মহানবীর জীবনী, ইসলামি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইন এবং ইসলামের ইতিহাসের পরতে-পরতে জারজ সন্তানের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সুস্পষ্ট। সুন্নী ইসলাম মতে তিনিই শ্রেষ্ঠ মুসলিম, যিনি কোরান ও আদর্শ মহামানব মহানবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর জীবন ও কার্যক্রমকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। সুতরাং আমাদের সুন্নী মুসলিম ভাই মুশফিক প্রধান সাহেব যদি ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ মুসলিম হতে চান, তাহলে তাকে মহানবির জীবনের অনুকরণে অন্তত একজন জারজ সন্তানের জন্ম দিয়ে তাকে সম্মান, স্নেহ ও আদরের সাথে লালন করতে হবে। অথচ মুশফিক সাহেব তারই প্রাণপ্রিয় ইসলাম ধর্ম ও ইসলামের প্রাণপুরুষ মহানবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর দর্শন ও আদর্শকে লাথি মারলেন জারজদেরকে ঘৃণ্য ও অবজ্ঞার পাত্র আখ্যা দিয়ে। এর মাধ্যমে মুশফিক প্রধান সাহেব পরকালে জাহান্নামের আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরার ব্যবস্থা করলেন মাত্র।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অজাচার ও জারজত্ব

আলোচনার এ পর্যায়ে এটা সুস্পষ্ট যে, হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ইত্যাদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মগুলোর মতে অজাচার ও জারজত্বকে আশ্রয় না করে মানবজাতি আজকের এ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে নি। অথচ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অজাচার ও জারজত্বকে আশ্রয় না করেও মানবজাতি আজকের এ পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। এ প্রস্তাবটিকে ব্যাখ্যা করার পূর্বে কিছু আনুসঙ্গিক বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন। মহাবিজ্ঞানী ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুযায়ী আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে নিচু স্তরের প্রাণীদের থেকে অত্যন্ত ধীর-গতিতে বিন্দু বিন্দু পরিবর্তনের মাধ্যমে। আমরা নিচু-স্তরের প্রাণীদের মাঝে পিতা-মাতা ও তাদের সন্তানদের মাঝে যৌন মিলনকে অজাচার হিসেবে গণ্য করি না, করি না এমন যৌন-সম্পর্ক থেকে জাত সন্তানদেরকে জারজ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ আজকের যুগের মানবেতর প্রাণীদের মাঝে অজাচার বা জারজ বলে কিছু নেই; অন্য কথায় মানবেতর প্রাণীকুলের মাঝে অজাচার বা জারজত্ব বৈধ বা জায়েজ। বিজ্ঞানমতে, আমাদের সুদূর অতীতের পূর্ব-পুরুষরা যখন মানবেতর প্রাণীকুলের জ্ঞান-গরিমা, নৈতিকতাবোধ ও প্রবৃত্তির কাছাকাছি ছিল, তখন তাদের মাঝে অজাচারের মত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল বা থাকতে পারে। আজ থেকে ৫০,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে বিদ্যমান আমাদের পূর্ব-পুরুষদের যেসব ‘ফসিল’ বা ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, তাদের দেহাকৃতি আমাদের আধুনিক মানুষের দেহাকৃতি থেকে ভিন্ন ছিল। এবং স্পষ্টত তাদের মেধা, চিন্তা-চেতনা ও মানবিক প্রবৃত্তি আধুনিক মানবের থেকে অনেক নিচু-স্তরের বা পশু-প্রবৃত্তির কাছাকাছি ছিল। আমাদের ঐসব আদি পুরুষদের মাঝে অজাচারের মত ঘটনা ঘটে থাকতেও পারে। কিন্তু সেটাকে অজাচার বলা যাবে না, যেমন করে আজকের যুগের মানবেতর প্রাণীদের মাঝের অনুরূপ যৌন-সম্পর্ককে অজাচার বলা হয় না। কিন্তু ঐ আদি-পুরুষেরা যখন ক্রমেই আধুনিক সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে থেকে, তারা নিকটাত্মীয়দের মাঝে যৌন সম্পর্ককে বর্জন করতে থাকে।

বিবর্তনবাদ অনুসারে আজকের যুগে মানুষের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় হচ্ছে গরিলা। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে: শিকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আটককৃত এক গরিলা দু’টি সন্তানের জন্ম দেয় – যাদের একটি পুরুষ, অপরটি নারী। উক্ত গরিলা সন্তান দু’টি যখন বড় হয়ে যৌবনে পদার্পণ করে, তখন বোনটি তার ভাইয়ের প্রতি প্রণয়াসক্তি প্রকাশ করে কিন্তু ভাইটি প্রত্যাখ্যান করে। এটা নিয়ে গবেষকগণ বিশেষ চিন্তায় পড়ে যান। পরবর্তী সময়ে সেখানে অন্য আর একটি মেয়ে গরিলাকে আনা হলে এবার পুরুষ গরিলাটি নূতন আগন্তুকের প্রতি প্রণয় প্রকাশে পাগল হয়ে উঠে। আপন বোন হওয়ার কারণে পুরুষ গরিলাটি নিজ বোনের প্রণয়কে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এভাবেই হয়ত মানুষ ক্রমান্বয়ে অজাচারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই আজকের পৃথিবীতে ধর্মে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সুসভ্য-অসভ্য, সকল মানুষই সাধারণত অজাচারকে বর্জন করে। আর বিজ্ঞান তো রীতিমত অজাচার প্রকৃতির সম্পর্ককে বর্জনীয় আখ্যা দিয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণেই। কেননা অজাচার জাতীয় সম্পর্ক জিনেটিক ত্রুটি বা রোগকে ত্বরান্বিত করে, যা মানব বংশলতিকার জন্যে ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য: সৌদি আরবে রাজপরিবারে বৈবাহিক সম্পর্ক আজ পর্যন্ত নিকট আত্মীয়দের মাঝে সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং তার প্রতিফল হিসেবে আজ সৌদি-রাজপরিবারের সদস্যদের মাঝে কিছু কিছু জিনেটিক রোগের লক্ষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সুতরাং জিনেটিক তত্ত্বের ভিত্তিতে বিজ্ঞান অজাচারকে আশ্রয় দেয় না। ইসলাম, ইহুদি, খ্রিস্টান ইত্যাদি ধর্মগুলো যদিও মানবজাতির সূচনাকে কেন্দ্র করে অজাচারকে সমর্থন করে, তথাপি এ সব ধর্মগুলোও অজাচারকে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কাজেই, আজকের এ সভ্য জগতে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সকলেই অজাচার জাতীয় যৌন-সম্পর্ককে বর্জন করেছে। তথাপি এ ধরনের যৌন-বিকৃতির ঘটনা কদাচিৎ ঘটে থাকে প্রত্যেক সমাজেই, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে। যেমন, বাংলাদেশের মত ধর্মশীল সমাজেও সত্তরের দশকের শেষ দিকে ঢাকার পত্র-পত্রিকায় এরূপ একটা ঘটনার খবর ছাপা হয়েছিল, যাতে দুই কন্যা পিতাকে অভিযুক্ত করেছিল। অন্যান্য সমাজেও এ ধরনের ঘটনার খবর মাঝে-মধ্যে ঘটে এবং পত্র-পত্রিকায় তার খবর আসে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে এক অত্যন্ত ধার্মিক মুসলিম (হুজুর), যার ছিল চার জন স্ত্রী, তিনি তার বড় মেয়েটিকে স্ত্রীদের সহায়তায় বিয়ে করেন, এবং বড় হয়ে উঠা তার অন্যান্য কন্যাদেরকেও একই পথে আনার প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু বড় মেয়েটি এভাবে পিতার দ্বারা গর্ভবতী হয়ে পড়লে, ঘটনাটি ফাস হয়ে যায় এবং তাকে সুদীর্ঘ কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। অপরাধী পিতা আদালতকে জানান: কোরানের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আপন কন্যাকে বিয়ের সূত্র খুঁজে পান।

এটা সুস্পষ্ট যে, আজকের যুগে ধার্মিক-অধার্মিক সবাই সাধারণত অজাচারকে গ্রহণ-অযোগ্য বিবেচনা করে বা ঘৃণা করে নৈতিক বিচারে, এবং আধুনিক বিজ্ঞানও সেটাকে সমর্থন করেছে যথার্থ বৈজ্ঞানিক কারণেই। কাজেই, অজাচারের মাধ্যমে জাত সন্তানদেরকেও বিজ্ঞান একদমই সমর্থন করে না, যদিও মৌলিক বিচার-বিশ্লেষণে বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই অজাচারকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে এবং অজাচার-জাত সন্তানদেরকে আধুনিক মানব-সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে রায় করে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলেও ‘‘অজাচারের মত ঘটনা’’ মানব সভ্যতার ভিত্তি; কিন্তু প্রকৃত বিচারে ঐ সব ‘অজাচারের মত ঘটনা’কে অজাচার বলা যায় না। কেননা সেই সুদূর অতীতে যখন আমাদের আদি-পুরুষদের মাঝে অজাচার ঘটেছে, বৈজ্ঞানিক বিবর্তনবাদ মতবাদানুসারে সে সময়ে মানুষ বর্তমান যুগের মানুষের তুলনায় অসভ্য প্রাণীদের কাছাকাছি ছিল, যাদের মাঝে ঘটিত অজাচারকে প্রকৃত বিচারে অজাচার বলা যায় না। কিন্তু ধর্মীয় দর্শন বলে স্রষ্টা যে প্রথম মানব সৃষ্টি করেছিলেন – আদম ও হাওয়া, ঈভ বা লুসি – তারা সুসভ্য ছিল; অর্থাৎ তাদের নৈতিক দায়-দায়িত্ব আধুনিক যুগের মানুষের অনুরূপ ছিল। প্রথম মানবদের জন্যে বিশ্বাসীদের কথিত স্রষ্টা যে ধর্মীয় ও নৈতিক বিধান প্রণয়ন করেছিলেন, ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সেসব নৈতিক বিধি-বিধানকেই ধার্মিকরা বর্তমান যুগের মানব জাতির নৈতিক বিধি-বিধান মনে করে। কাজেই আল্লাহ, গড, জেহোবা (ঔবযড়াধ, ইহুদি ঈশ্বর) প্রথম মানব-মানবী আদম-হাওয়ার জন্য যে নৈতিক বিধান প্রণয়ন করেছিলেন, সে বিধানই যদি আজকের আধুনিক মানুষের জন্য প্রযোজ্য হয়, তাহলে আদম-হাওয়ার সন্তানদের মাঝে, বা মা ঈভ ও তার দু’টি মাত্র ছেলে সন্তানের মধ্যে (খ্রিস্ট ধর্মমতে) যে অজাচার জাতীয় যৌন-সম্পর্ক ঘটেছিল ও যাকে বর্তমান মানব সভ্যতার ভিত্তি ধরা হয় তা অবশ্যই অজাচার বলে বিবেচিত হবে।

পুরুষতন্ত্র সৃষ্ট জারজতত্বনারীর জন্য অভিশাপ

সন্তান সৃষ্টির ক্ষেত্রে পুরুষ কেবল ক্ষণিকের দৈহিক মিলনে শুক্রদাতা বা বীজ বপনকারী। বীজ বপন করেই পুরুষের দায়িত্ব শেষ, কিন্তু নারী দশ মাস সে বীজকে পেটে ধারণ করে প্রসব করেন তার সন্তানটি। সেখানেই মায়ের দায়িত্ব শেষ হয় না; ভূমিষ্ঠ করার পরও মাকে দীর্ঘ সময় বুকের দুধ পান করিয়ে সে সন্তানকে লালন করতে হয়। অথচ যখন সন্তানের পরিচয়ের বিষয়টি আসে, তখন পিতা হয়ে যান মুখ্য; সন্তান মায়ের নামে পরিচিত হয় না সমাজে। অথচ মানব বংশবৃদ্ধিতে মায়ের গরিষ্ঠ ভূমিকা শুধু দশ মাস পেটে ধারণ ও ভূমিষ্ঠ-পর লালন-পালনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে সন্তানের জন্মদানে নারীর জেনেটিক অবদানও বেশী। কেননা, জীবনের জন্য অপরিহার্য মাইটোকন্ড্রিয়ার উঘঅ আসে কবলই মায়ের ডিম্বাণু থেকে (পিতা ও মাতা সম-পরিমাণ নিউক্লিয়াসের উঘঅ দান করেন) অথচ যখন সে সন্তানের পরিচয়ের পালা আসে, পিতা পান একচ্ছত্র অধিকার; মায়ের কোনই ভূমিকা নেই সন্তানের পরিচয়ে। যাহোক, না হয় সেটাও মানা গেল। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজ এর ব্যতিক্রম করেছে: মাকে সন্তানের পরিচয়ে একচ্ছত্র অধিকার দিয়েছে কেবলমাত্র বিয়ে-বহির্ভূত বা তথাকথিত ‘জারজ সন্তান’-এর ক্ষেত্রে। এবারে পিতৃতন্ত্র সন্তানের পরিচয়ের দাবি করতে দৌড়ে আসে নি, না দেখিয়েছে ঐ সন্তানের পিতৃ-পরিচয় খোঁজার জন্য আগ্রহ; ওসব সন্তানদের পরিচয় ও সকল দায়-দায়িত্বের ভার বর্তিয়েছে মায়ের উপর। নারীর প্রতি চিরাচরিতভাবে নির্মম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এ ব্যতিক্রমটুকুকে কেউ কেউ পুরুষের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি করুণার আভাস হিসেবে দেখার প্রয়াস পেতে পারে। কিন্তু সেটা সত্যি নয়, বরং আসল ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

জারজের ধারণা সম্পূর্ণরূপে পিতৃতন্ত্র কতৃক সৃষ্ট এবং নারীকে সামাজিকভাবে আরেক ধাপ অবদমিত করার ও তাকে কেবলমাত্র পুরুষের হাতের পণ্য বা পুতুলে পরিণত করার এক মর্মঘাতী ব্যবস্থা মাত্র। আসলে জারজের ধারণা নারীকুলের জন্য এক মহা-অভিশাপ। জারজ সন্তানের পুরো দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ মায়ের এবং পুরুষতন্ত্র জারজ সন্তানকে করেছে অবজ্ঞা ও ঘৃণা, দিয়েছে ধিক্কার; সে সাথে সমাজে প্রচণ্ডভাবে ধিকৃত ও নিগৃহীত, এমনকি নির্মমভাবে নির্যাতিত ও শাস্তিপ্রাপ্ত, হয়েছে জারজ সন্তানের মা। পিতৃতন্ত্র জারজ সন্তানের পিতা কে, তা নির্ণয় করতে আগ্রহী হয়নি, না তেমন কোন প্রয়াস করেছে পিতার উপর সে তথাকথিত অপকর্মের দায়ভার চাপানোর। জারজ সন্তান ও তার মা সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত, অবাঞ্ছিত ও ধিকৃত। শুধু তাই নয়, পুরুষতন্ত্র নারীর প্রতি তার নগ্ন নির্মমতা দেখাতে আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। যেমন, ইসলামের মৌলিক আইন ‘শরিয়ত’ মতে, জারজ সন্তানের মাকে পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে : জারজ সন্তানকে দুধ পানের পর্ব অতিক্রম করার পর তার মাকে বর্বর ও নির্মমভাবে পাথর ছুড়ে জনসমক্ষে জ্যান্ত মেরে ফেলার রায়ও দিয়েছে ইসলাম ধর্ম। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, নাইজেরিয়াতে সম্প্রতি আলোড়ন জাগিয়েছিল ‘‘আমিনা লাওয়াল’’ নামক এক জারজ মা, যাকে শরিয়ত অনুসারে পাথর ছুড়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ইরানে এক তের বছরের অবুঝ মেয়ে ঝিলা গর্ভবতী হয়ে পড়লে সে সন্তানকে তার কুমারী মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ঐ তের বছরের অবুঝ মাকে পাথর ছুড়ে জ্যান্ত মেরে ফেলার রায় দেওয়া হয়েছে। জারজ মাকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলার এ ইসলামি রায় সৌদি আরব, ইরান ও আফগানিস্তানসহ বহু মুসলিম দেশে বা অঞ্চলে নিয়মিত কার্যকর করা হয়।

জারজের ধারণাটি পুরুষতন্ত্র কতৃক নারীর কায়-মনের উপর একচ্ছত্র অধিকার অর্জনের এক নির্মম চক্রান্ত মাত্র, যার মাধ্যমে সে নারীকে কেবলমাত্র তার বিবাহিত স্বামীর ভোগ্য-পণ্য হওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বিবাহের পর স্বামী বিনা অন্য পুরুষের সাথে নারীর কায়-মনের সাহচর্যকে পুরুষতন্ত্র ব্যভিচার বা সেই ব্যভিচারের ফসলকে জারজ নামে আখ্যা দিয়েছে।

ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মগুলো এ ক্ষেত্রে পুরুষকে তিরস্কৃত করার ক্ষীণ প্রয়াস দেখিয়েছে মাত্র। যেমন, পুরুষকে কেবলমাত্র অন্যের বিবাহিত স্ত্রীর দিকে নজর দিতে বা আসক্ত হতে নিষেধ করেছে, এবং সেক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। একজন পুরুষ – হোক সে বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত – অন্যের বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া অন্য যে কোন অবিবাহিত নারীর সাথে দৈহিক সাহচর্যের সুযোগ পেয়েছে, কেননা সেক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও সেটা নমনীয়। পুরুষতন্ত্র আসলে এখানেও হঠকারিতা করেছে মাত্র। কেননা, পুরুষতন্ত্র রাখতে চেয়েছে তার বিবাহিত স্ত্রীর কায়-মনের উপর একচ্ছত্র অধিকার এবং সেখানে অন্য পুরুষের আগমনের শংকায় সে শংকিত হয়েছে, হয়েছে ঈর্ষান্বিত। তাই সে নিজের ‘মাল’ বা ‘পণ্য’-এর উপর হস্তক্ষেপকারী অন্য পুরুষকেও হুঁশিয়ার করে দিয়েছে উপরোক্ত বিধানের মাধ্যমে। স্বামীর প্রতি ভালবাসা থাক না থাক নারীকে তার কায়-মন একমাত্র স্বামীকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করতে হবে। আর যদিও পুরুষের প্রতি কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত নারী-সাহচর্যের ক্ষেত্রে শাস্তি কথা বলা হয়েছে পুরুষতন্ত্র প্রণোদিত ধর্মগ্রন্থে, সেক্ষেত্রেও পুরুষ রেহাই পেয়ে গেছে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে; কিন্তু নারীর রেহাই পাওয়ার উপায় নেই, কেননা নারীকেই সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত যৌন-সাহচর্যের দৃশ্যমান ফলাফল বহন করতে হয় সন্তান পেটে ধারণ করে; কিন্তু সে অপকর্মে যুক্ত পুরুষকে ধরার জন্য এ ধরনের কোন আলামত বা প্রমাণ নেই। অপরাধী পুরুষটির দিকে আঙ্গুল তুললেও, শুধুমাত্র অস্বীকার করেই সে মুক্তি পেয়ে যায়।

পুরুষতন্ত্র-কর্তৃক নারীর দেহ-মনকে একচ্ছত্রভাবে কুক্ষিগত করার নগ্ন ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ হল: পুরুষতন্ত্র প্রণোদিত হিন্দু, ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্রে পুরুষকে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অধিকার দান। বাইবেল মুতাবেক, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের বহু আদি প্রাণ-পুরুষ বহু স্ত্রী এবং সেইসাথে যত পার রক্ষিতা গ্রহণ করেছে। যেমন, খ্রিস্ট-ইহুদি ধর্মের এক মহিমান্বিত পুরুষ ও ‘জুদা’ শহরের রাজা রেহোবোয়াম-এর ১৮ জন স্ত্রী এবং ৬০ জন রক্ষিতা ছিল। অন্য দিকে রাজা সোলোমান (ইসলামে নবী সুলায়মান)-এর ৭০০ স্ত্রী ও ৩০০ রক্ষিতা ছিল; এর বাইরেও তিনি অনেক বিদেশী নারীকে ভালবাসতেন। ইসলামও একজন পুরুষকে চার-চার জন স্ত্রী ও সে সাথে যত পার ক্রীতদাসী (রক্ষিতা) গ্রহণের অধিকার দিয়েছে। এরপরও ইসলামের প্রাণ-পুরুষ মহানবি মুহাম্মদ (সঃ) নিজেই সে চার স্ত্রীর নিয়ম ভঙ্গ করে একসঙ্গে নয় জন বা তারও অধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন।

এখানে বিবেচ্য বিষয়টি হল: বিবেকহীন কপট ও কামুক পুরুষ সমাজ বুঝতে পেরেছে যে, একই সময়ে একাধিক নারীর সাহচর্য কামনা পুরুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। আর সে প্রবৃত্তিকে জায়েজ করার প্রয়াসে সে নিজেরই সৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রে এ ধরনের একপেশে নিয়ম-নীতির অনুমোদন দিয়েছে। পুরুষতন্ত্র এটাও আন্দাজ করতে পেরেছে যে, একাধিক সঙ্গীর সাহচর্য নারীরও কাম্য হতে পারে। তাই সে নিজের সৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রের মাধ্যমে নারীকে একটির বেশী স্বামী গ্রহণের অধিকার দেয় নি। ওদিকে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র তো অকালে-মৃত স্বামীর ফেলে যাওয়া স্ত্রীকেও অন্য স্বামী গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছে। আর  মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া স্ত্রী যাতে কোনক্রমেই আরেক পুরুষের কাছে তার দেহ-মন সমর্পণ করতে না পারে সে প্রত্যাশা বাস্তবায়িত করতে হিন্দু শাস্ত্র বিধবা নারীকে মৃত স্বামীর সাথে শ্মশানে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার নির্মম ও বর্বর বিধান দিয়েছে। কত অসংখ্য (হয়ত লাখ লাখ) বিধবা নারীকে যে এভাবে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে হিন্দুতন্ত্র তার ইয়ত্তা নেই। যে নারী অকালে তার স্বামীকে হারিয়ে এমনিতেই সর্বস্বান্ত, তার প্রতি যেখানে মানব সমাজের দেখানো উচিত ঢের করুণা ও সহমর্মিতা, সেখানে তথাকথিত স্রষ্টা (পুরুষতন্ত্র?) সে নারীকে আর একটি দিন বাঁচার অধিকারটিও দেয় নি। শুধু তাই নয়, সে বর্বর স্রষ্টা বিধান দিয়েছে ঐ হতভাগ্য নারীকে চরম অসভ্য ও বর্বর পদ্ধতিতে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার।

জারজ সম্পর্কে মানবতাবাদ

একজন নিষ্পাপ শিশুকে জারজ আখ্যা দিয়ে তার জীবন ও ভবিষ্যৎকে চিরতরে বিনষ্ট করে দেওয়ার অপপ্রয়াসে বিশ্বাসী নয় মানবতাবাদ। উপরে ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে যে, তাবৎ ধর্মশাস্ত্র মতে অজাচার ও তার মাধ্যমে সৃষ্ট জারজ সন্তান হচ্ছে আধুনিক মানব সমাজের ভিত্তি। যদিও মানবতাবাদ এ ধরনের মতবাদে বিশ্বাসী নয়, তথাপি সেটা মেনে নিলেও যে জারজত্ব বিনা আধুনিক মানব সমাজের আবির্ভাব কখনোই সম্ভব হত না, আমাদের উচিত তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাকে ঘৃণ্য ও ধিক্কারজনক জারজ আখ্যা দিয়ে কলংকিত করা কোন বিচারেই গ্রহণযোগ্য নয়, সেটা বর্বরতা। মানবতাবাদী সুশিক্ষিত সভ্য সমাজ কোনক্রমেই সেটা মেনে নিতে পারে না। মানবতাবাদের অভিধানে ‘জারজ’ বলে কিছু নেই। তেমন কিছু থেকে থাকলেও, মানবতাবাদের রায়ে তা হবে মহিমান্বিত ও প্রশংসিত, ঘৃণ্য ও ধিক্কারজনক নয়। মানবতাবাদ সমাজে প্রচলিত বিধি-বিধান মেনে নিলেও, পিতামাতার অপকর্মের দায়-দায়িত্ব ও অপবাদ নিষ্পাপ সন্তানের উপর চাপিয়ে সে সন্তানের জীবনকে বিনষ্ট করে দেওয়াকে চরম অবিচার, অসভ্যতা ও বর্বরতা বলে রায় দেয়।

বৈজ্ঞানিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিতে জারজ বলে কিছু নেই। বিজ্ঞান বলে মায়ের পেটে (গর্ভাশয়ে) একজন বৈধ সন্তানের সূচনা ও পরিপুষ্টি যেভাবে হয়, ঠিক তেমনিভাবে একজন তথাকথিত জারজ সন্তানের সূচনা ও পরিপুষ্টি হয়। অথচ ধর্মশাস্ত্র-ভিত্তিক নিষ্ঠুর মানব সমাজ তাদের একজনকে বসিয়েছে সম্মানের আসনে বৈধতার লেবাস দিয়ে, আর একজনকে জারজ আখ্যা দিয়ে নিক্ষেপ করেছে ঘৃণা ও ধিক্কারের অন্ধকূপে। পুরুষতন্ত্র জারজের ধারণা সৃষ্টি করে মানবতাকে চরমভাবে পদদলিত করেছে। পুরুষতন্ত্র তথাকথিত ধর্ম-নির্দেশিত বিয়ে প্রথার সৃষ্টি করেছে নারীর দেহ-মনের উপর পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে, আর জারজের ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে নারীর বশীভূতকরণকে সে আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। নারীই শুধু সে নিষ্ঠুর প্রথার অন্যায় শিকার হয়নি, এর বড় শিকার হয়েছে তথাকথিত জারজ, অথচ নিষ্পাপ সন্তানেরা। এইতো কিছুদিন আগে ঢাকার কোন গলিতে ছ’টি সদ্য প্রসূত নিষ্পাপ সন্তানকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেল কে জেন। ওরা নিঃসন্দেহে ছিল অবাঞ্ছিত জারজ সন্তান। ধর্মশাস্ত্র-ভিত্তিক সমাজ ও সংস্কার ঐ নিষ্পাপ শিশুগুলোকে একটি দিনও বাঁচার অধিকার দিল না এ সুন্দর ধরণীতে। পৃথিবীজুড়ে প্রতিদিন না জানি কত হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুকে এরূপে হত্যা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অথচ ধর্ম-ভিত্তিক সমাজ ও সংস্কার যদি ওদেরকে অবাঞ্ছিত জারজ আখ্যা না দিয়ে তাদের আসল পরিচয় ‘‘মানব সন্তান’’ বলে আখ্যা দিত, তাহলে ওদের অনেককেই এ সুন্দর ধরণীর বুকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হত; ওদেরকে এভাবে অকালে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হত না। জারজত্বের বিধান মানবতার জন্য এক চরম অবমাননা ও অভিশাপ।

এটাও বিবেচ্য যে, যে তথাকথিত জারজদেরকে মানব সমাজ এভাবে ঘৃণা করেছে ও করছে, তাদর কাছেই আজকের এ মানব সভ্যতা ব্যাপকভাবে ঋণী হয়ে আছে। জারজ হয়ে জন্ম নেওয়া অনেক ব্যক্তি মানব-দর্শন, সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিকে যথেষ্ট পরিপুষ্ট করেছে। চীনা মহাদার্শনিক কনফুসিয়াস, টলেমি, প্লেটো ও সেনানায়ক জুলিয়াস সিজার-সহ বহু বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি পিতৃ-পরিচয়হীন ছিলেন।

এখন প্রশ্ন হছে: বিয়েই কি সন্তানের বৈধতা দানের একমাত্র সনদ? পিতৃতন্ত্র সে রায়ই দিয়েছে, যার মাধ্যমে নারী সন্তানের জন্ম দিবে কি না দিবে সে অধিকারও পিতৃতন্ত্র কুক্ষিগত করেছে। সন্তানের জন্মদানে পুরুষের ভূমিকা নগণ্য। অথচ নারীকে দীর্ঘ সময় সন্তান পেটে ধারণ ও পরিপুষ্ট করতে হয়; তদুপরি প্রচণ্ড প্রসব যন্ত্রণা ভোগ করে মা সে সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন; তার উপর দীর্ঘদিন ধরে তাকে লালন-পালনের ভার তো আছেই। অথচ সে সন্তানের জন্ম হবে কী বা হবে না, সেটা নির্ণয় করার একচ্ছত্র অধিকার পুরুষের, এরূপ বিধান কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং সেটা অন্যায়, অবিচার। সন্তানকে দীর্ঘ সময় পেটে ধারণ ও প্রসব যন্ত্রণা ভোগের দায়িত্ব যেহেতু নারীর, তাই নারী সন্তান ধারণ করবে কি করবে না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অগ্রাধিকার দিতে হবে নারীকেই। বিয়ে আসলে কোনক্রমেই সন্তানের বৈধতা দানের দলিল নয়। সব মানব সন্তানেরই পরিচয় হবে নিষ্পাপ মানব সন্তান হিসেবে। নির্মম ও বর্বর জারজ প্রথার অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে হবে মানবতাবাদী সুসভ্য সমাজ থেকে। বিয়ে নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের মাঝে ভালবাসার ভিত্তিতে মিলনই হবে সন্তান জন্মদানের আদর্শ ভিত্তি। পিতামাতা জোর করে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিল, কিন্তু স্বামীকে ঐ মেয়েটি কোনদিন হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে পারল না। স্বামী শুধু মেয়েটির দেহকে উপভোগ করল, কিন্তু তার মন ও ভালবাসার নাগাল পেল না। সে বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে যে সন্তানের জন্ম হবে, সে সন্তানটির জন্মের ভিত্তি আদর্শ ভিত্তি নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভালবাসার ভিত্তিতে বিয়ে হওয়ার পরও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক বিষাক্ত হয়ে উঠে। এমন অনেক বিয়েই আছে, স্বামী তার স্ত্রীকে বেদম প্রহার ও তার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করে। ঐ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সুষ্ঠ ভালবাসার সম্পর্ক লোপ পায়। কিন্তু নারী আমাদের সমাজে অসহায় গণ্য হওয়ায় এরূপ বিয়ে কোন রকমে টিকে থাকে, মূলত স্ত্রীর ত্যাগ ও সহনশীলতার কারণে। এ ধরনের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও সন্তান ধারণের জন্য আদর্শ নয়। এ ধরনের সন্তানের লালন-পালনে ও আদর-সোহাগ দানে পিতামাতার একাগ্রতায় শিথিলতা আসতে পারে, যা সন্তানের মানবীয় বিকাশের পরিপন্থী। তথাপি এ ধরনের সম্পর্ক থেকে জাত সন্তানও অবাঞ্ছিত হয়ে যায় না; সে কেবলই মানব শিশু। এটাও বিবেচনা করা আবশ্যক যে, মানুষের প্রবৃত্তিই এ রকম যে, সব সন্তানের জন্মের ভিত্তি আদর্শ হবে না। মানব সমাজে ধর্ষণের মত জঘন্য ঘটনা ঘটতে বাধ্য নানা কারণে। যেমন ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অসভ্য পাক সৈন্যদের দ্বারা অসংখ্য বাংগালী নারী ধর্ষিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধের সময় বর্বর জার্মান সৈন্যদের ধর্ষণ থেকে কেবলমাত্র ফ্রান্সে দুই লক্ষাধিক সন্তানের জন্ম হয়। মানবতাবাদের রায়ে এ ধরনের পাশবিক ধর্ষণ থেকে জন্ম নেওয়া ঐসব সন্তানেরাও হবে শুধুই মানব সন্তান – না অবাঞ্ছিত, না জারজ।

মানবতাবাদের অভিধানে জারজ বা ঘৃণিত বলে যদি কোন মানুষ থাকে, তারা হবে ঐসব মানুষ পৃথিবীতে যাদের আগমন হয়েছে মানব সভ্যতার জন্য অভিশাপ। ওরাই জারজ, ওরাই ঘৃণিত, যারা সমাজে খুন, ধর্ষণ আর অবিচার করে বেড়ায়। ওরা জারজ, যারা ক্ষমতার বলে মানুষের উপর অত্যাচার করে বেড়ায়, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎকে লুটে-পুটে খায়। জারজ ছিল হিটলার, মুসোলিনি, পল পট, আয়াতুললাহ খোমেনী, সাদ্দাম – যারা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে ধূলিসাৎ করেছে। ওরা জারজ, তবে জন্ম-সূত্রে নয়, কর্ম-সূত্রে। ওদের জন্মও ছিল অন্যান্য মহৎ বা সাধারণ মানুষের মতই নিষ্পাপ, কিন্তু কর্ম বানিয়েছে ওদেরকে জারজ, ঘৃণিত ও ধিকৃত।

আশার ঝলক

আজকের দিনে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বহু দেশে নারীরা এগিয়ে আসছে সন্তানের জন্মদানে তাদের ভূমিকাকে হস্তগত করতে। তারা আজ ভালবাসার ভিত্তিতে আপন পছন্দের ছেলেদের সাথে দেহ-মনের সম্পর্ক গড়ে তুলছে এবং সে সম্পর্কের ভিত্তিতে সন্তানও নিচ্ছে বিয়ে-টিয়ের ধার না ধেরে। ঐ সন্তানদেরকে রাষ্ট্র ও সমাজ নিষ্পাপ মানব সন্তান হিসেবে গ্রহণ করছে, ওরা জারজ নয়। সেসব সন্তানেরা অন্যসব তথাকথিত বৈধ সন্তানদের মতই বড় হয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার অগ্রগতিতে নিজ নিজ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। যেমন, আধুনিককালের দুই সুবিখ্যাত টেনিস তারকা স্টেফি গ্রাফ ও তার প্রিয় পাত্র আন্দ্রে আগাসীর মাঝে ভালবাসার সম্পর্ক থেকে দু’টি সন্তানের জন্ম হয়েছে বিয়ের আগেই। সে সন্তান দু’টি হয়ত একদিন বাপ-মায়ের মতই বিশ্ববিখ্যাত টেনিস তারকা হবে; আনন্দ দেবে সারা দুনিয়ার মানুষকে। কিংবা ওরা হবে কোন বড় বিজ্ঞানী, ডাক্তার বা সমাজ-সেবক; মানব সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে রাখবে বিরাট ভূমিকা। মানবজাতি ধন্য হবে ওদের অবদানে। ওরা হবে আদর্শ মানুষ – না জারজ, না অবাঞ্ছিত।

শুধু তাই নয়, আজ মানবতাবাদী সমাজগুলোতে সন্তানরা পরিচয় পাচ্ছে তাদের মায়ের নামে, পিতার নামে নয়। নারী যে চরম কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে মানব সন্তানকে ধরণীতে নিয়ে আসে, সে সন্তানের পরিচয়ের প্রকৃত দাবিদার হলেন মা। নারী আজ তার প্রাপ্য অধিকার ও কৃতিত্ব উপভোগ করতে শুরু করেছে মানবতাবাদী সমাজে। সে সাথে ওসব সমাজ থেকে উঠে যাচ্ছে তথাকথিত জারজের ধারণা।

সূত্রঃ

  • ইনসেস্ট, নারীকোষ, মাহমুদ শামসুল হক, পৃষ্ঠা ৫৫
  • ইদিপাস কমপ্লেক্স, নারীকোষ, পৃষ্ঠা ৫২
  • ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স, নারীকোষ, পৃষ্ঠা ৫৪
  • জারজ, নারীকোষ, পৃষ্ঠা ৯৭
  • History of Islam (Part-1), Prof. Masudul Hasan, pp. 248 to 262
  • The Holy Qur’an, Translated by Yusuf Ali, Verse – 004.003
  • খায়রুল হাসর বা কেয়ামতের আলামত, শাহ রফীউদ্দিন মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ) (অনুবাদঃ মওলানা মোহাম্মদ আবুল খায়ের সিদ্দিকী)
  • Zoroastrianism – by Mary Boyce.

————

(ধন্যবাদ মোহাম্মদ আসগর, আবুল কাসেম ও অভিজিৎ রায়কে, যাদের মন্তব্যে রচনাটি সমৃদ্ধ হয়েছে। রচনাটি ২০০৪ সালের অক্টোবরে মুক্তমনা ও ভিন্নমত নামক ওয়েবসাইটে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।)

আলমগীর হুসেন এর ব্লগ   ১,৩৫০ বার পঠিত