শামসুজ্জোহা মানিক

পাশ্চাত্য পাণ্ডিত্যের মূর্খতা কিংবা বদমায়েশী এবং উপমহাদেশীয় পাণ্ডিত্যের দাসত্ব

 

বহুদিন পর্যন্ত আমি এ কথা ভেবে অবাক হতাম যে পাশ্চাত্যের অত বড় বড় পণ্ডিত কীভাবে ঋগ্বেদের সহজ সত্যকে বুঝতে পারেন নাই! প্রথম দিকে ভাবতাম যে হয়ত ভিন্ন সমাজের এবং ভাষার মানুষ বলে হয়ত ঋগ্বেদের খুব সহজবোধ্য হলেও বিষয়গুলি তাদের নিকট দুর্বোধ্য হয়েছিল, যে কারণে ঋগ্বেদের এই ভ্রান্ত ব্যাখ্যা। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত থেকেও এই সিদ্ধান্ত চলে আসে যে পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা যত জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান হোক ইতিহাসের অনেক সহজ সত্য বা ঘটনাও তারা বুঝতে পারেন না। এমনকি একটা লিখিত গ্রন্থের সহজ অর্থও তারা বুঝতে পারেন না। তখন এই প্রশ্ন আসে তাহলে তাদের সব কথাকে আমাদের অন্ধভাবে কিংবা ভক্তিবশে মেনে নিতে হবে কেন?

একইভাবে ভারতীয় সেই সব বেদজ্ঞ পণ্ডিত কিংবা ঋগ্বেদ পড়েছেন এমন পণ্ডিতদের বুদ্ধিবৃত্তির উপরও অনাস্থা আসে এই ভেবে যে ভারতীয় এবং বেদ পণ্ডিত হবার কিংবা বেদ পড়বার পরেও তারা কী করে পাশ্চাত্য কয়েক জন পণ্ডিত প্রবর্তিত এমন হাস্যকর, উদ্ভট এবং ভ্রান্ত ঋগ্বেদ ব্যাখ্যাকে নত মস্তকে মেনে নিলেন? এবং আজ অবধি মেনে চলেছেন?

এ কথা বলতে হয়ত খারাপ লাগে তবু সত্যটা বলা উচিত। আমার ক্রমে মনে হল, পাশ্চাত্য পণ্ডিতবর্গ এত মূর্খ বা মূঢ় হলে তারা কি আধুনিক সভ্যতার অধিকারী হতে পারত এবং সেই সঙ্গে তাকে ব্যবহার করে পৃথিবী ব্যাপী তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারত? বিশেষত পাশ্চাত্য পণ্ডিতবর্গের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ যোগাযোগের প্রক্রিয়া থেকে আমার যে উপলব্ধি জন্মালো তা অনেকের কাছে খুব রূঢ় ঠেকবে।

আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে যে সত্য বুঝেছি তা হল জ্ঞানের জগতও রাজনীতির বাইরে নয়। সুতরাং স্বার্থ এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ধারণা জ্ঞানের জগৎকেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। আমার কাছে এখন এটা স্পষ্ট যে, ঋগ্বেদের ব্যাখ্যায় অন্তত শুরুতে যে উদ্দেশ্য কাজ করেছিল সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক — আরও রূঢ়ভাবে বললে অপরাজনৈতিক। অর্থাৎ এটা নেহাতই বদমায়েশী। তা না বলতে চাইলে পাশ্চাত্যের ঐ পণ্ডিতদেরকে মূর্খ বা মূঢ় বলতে হবে। এখন মূর্খ বা বদমায়েশ যাই বলা যাক ঐসব পণ্ডিতের কাছ থেকে আমাদের শিখবার এবং তাদেরকে মেনে চলবার কোনও কারণ কি থাকে?

প্রশ্নটা উঠতে পারে যে, সত্যটাকে মানতে পাশ্চাত্যের পণ্ডিতদের সমস্যা কোথায়? বস্তুত সমস্যাটা উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে। এটা সহজবোধ্য যে মানুষকে শুধু গায়ের জোরে দীর্ঘ কাল পদানত করে রাখা যায় না যদি না তার চেতনা তথা বুদ্ধিবৃত্তিকে পদানত তথা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সুতরাং সব আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে অধীনস্থদের চেতনা বা বুদ্ধিবৃত্তিকে অধীনস্থতার উপযোগী করা। ভারতবর্ষে আর্য আক্রমণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠাও ব্রিটিশ শাসকদের জন্য তেমন একটা প্রয়োজনীয় করণীয় ছিল যে কাজে সহায়ক হয়েছিল ব্রিটিশ এবং সেই সঙ্গে তার আধিপত্যের সহায়ক পশ্চিম ইউরোপীয় প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিতবর্গ। এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্সমুলারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই তত্ত্ব দ্বারা ব্রিটিশ শাসকরা শাসিত ভারতীয়দেরকে এটা শিখিয়েছিল যে, ভারতবাসীদের জন্য বৈদেশিক আক্রমণ, আধিপত্য এবং শাসনই চিরন্তন নিয়তি। ব্রিটিশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগে হাজার বৎসরের অধিককাল যাবৎ ছিল বহিরাগত মুসলমানদের আক্রমণ এবং শাসন। অষ্টম শতাব্দীতে সিন্ধু-পাঞ্জাবে আরব মুসলমানদের আক্রমণ এবং কিছু কালের শাসন এবং একাদশ শতাব্দীর শুরুতে গজনীর সুলতান মাহমুদের ১৭ বার ভারত লুণ্ঠন অভিযানের কথা বাদ দিলেও ১২০৪ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত প্রায় লাগাতার সাড়ে পাঁচ শত বৎসর বহিরাগত মুসলমানরা ভারতের অন্তত বেশীর ভাগ অঞ্চল শাসন করেছে। তার আগে আছে সাইথিয়ান বা শক, আহির, কুশান, হুন ইত্যাদি বর্বর যাযাবরদের ভারতবর্ষে আক্রমণ অভিযানের ইতিহাস। খ্রীষ্টপূর্ব প্রায় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে খ্রীষ্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যাযাবর পশুপালক এবং বর্বর উপজাতিসমূহের আক্রমণ অভিযানের ঢেউ পশ্চিম-উত্তর দিক দিয়ে ভারতবর্ষের উপর আছড়ে পড়েছিল। তারা উত্তর-পশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে বসতি স্থাপন করেছিল। ক্রমে তারা হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ভারতবর্ষের জনসমাজের মূলধারায় বিলীন হয়ে যায়।

সুতরাং ব্রিটিশদের পক্ষে এটা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়েছিল যে বৈদিক আর্যরাও ভারতবর্ষে বহিরাগত এবং ঋগ্বেদে যে সব যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে সেগুলি মূলত অনার্য ভারতবাসী বিশেষত সিন্ধু এবং পাঞ্জাব অঞ্চলের অধিবাসী কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বহিরাগত পশুপালক এবং শ্বেতকায় যাযাবর আর্যদের যুদ্ধের বর্ণনা। ১৯২০-এর দশকে হরপ্পা নগর তথা সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কারের পর পাশ্চাত্য এবং সেই সঙ্গে তাদের অনুগত ভারতীয় পণ্ডিতদের পক্ষে এটা বলা আরও সহজ হল যে, ঋগ্বেদে শত্রুদের যেসব পুর বা নগর ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে সেগুলি হচ্ছে সিন্ধু সভ্যতার (প্রত্নতত্ত্বের ভাষায় হরপ্পান সভ্যতা) নগর।

এর আগে অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কারের আগে বলা হত যে, আর্যরা আসবার আগে ভারতবাসী ছিল অসভ্য এবং বর্বর এবং বহিরাগত পশপালক আর্যরা এসে এখানে প্রথম সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই সঙ্গে দান করেছে বৈদিক ভাষা, যেটা ঋগ্বেদের ভাষা এবং সংস্কৃতের আদি রূপ। যে সকল ভাষায় ভারতবর্ষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কথা বলে সেগুলি যেহেতু বৈদিক বা সংস্কৃতের পরিবর্তিত কিংবা বিবর্তিত রূপ সেহেতু বহিরাগত পশুপালক আর্যরা ভারতবর্ষকে আধুনিক ভাষাগুলিকেও দান করেছে।

সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের পর ব্যাখ্যাটা একটু বদলাল। এখন বলা হল যে, সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করলেও তার সঙ্গে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আর্যরা ভারতবর্ষকে নূতন সভ্যতা এবং সংস্কৃতি দান করেছে। বিশেষত ভাষার ক্ষেত্রে বহিরাগত আর্যদের ভূমিকার উপর জোর দেওয়া হল। কারণ বাংলা, হিন্দীসহ ভারতবর্ষের বিপুল গরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষার উৎসে যেতে হলে বৈদিক বা সংস্কৃত ভাষায় যেতে হয়। এছাড়া যেহেতু বেদ হচ্ছে হিন্দুদের আদি ধর্মগ্রন্থ সেহেতু বলা হল যে, হিন্দুদের মূল ধর্মটাও বহিরাগত বিজয়ী আর্যদের দান।

অথচ সমগ্র ঋগ্বেদের কোথায়ও তার রচয়িতা ঋষিরা একটি বারের জন্যও নিজেদেরকে বহিরাগত বলেন নাই। বরং ঋষিরা বারবার সপ্তসিন্ধুকে নিজেদের আবাসভূমি হিসাবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ঋগ্বেদের ঋষিদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণাকে অস্বীকার করেই পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা তাদেরকে সপ্তসিন্ধু অঞ্চল তথা ভারতবর্ষের ভূমিতে বহিরাগত বানিয়েছিলেন। এটাকে তামাশার চূড়ান্ত ছাড়া আর কী বলা যায়?

এভাবে ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষের জন্য বহিরাগত আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে তাদের উপনিবেশিক এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য একটি চমৎকার সহায়ক জ্ঞানতাত্ত্বিক হাতিয়ার হিসাবে দেখতে পেল। এটা এমন এক তত্ত্ব যা দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশবাসীর আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণকে অনেক সহজেই দমিত করা যায়।

এ তত্ত্ব দিয়ে ব্রিটিশ শাসকরা সহজেই এ কথা বুঝাতে পারল যে পরাধীনতা বা পরদাসত্ব যেহেতু ভারতবাসীদের চিরন্তন ইতিহাস সেহেতু তাদের পরাধীন থাকতে অসুবিধা কোথায়? সবচেয়ে বড় কথা অসভ্য ভারতবাসীকে তারা যে সভ্য করবার ব্রত নিয়ে এসেছে সেই কথাটাও তারা তখন বড় গলায় বলবার সুযোগ পেয়েছে। আর তারা তো সারাক্ষণ চীৎকার করে সবাইকে বলত যে, তারা পৃথিবী ব্যাপী তাদের উপনিবেশ বা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে লুণ্ঠন করবার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, বরং অসভ্য পৃথিবী এবং বিশেষত অসভ্য প্রাচ্যকে সভ্য করবার মিশন নিয়েই তাদের এই উপনিবেশ বা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা। যেন তাদের এই মহান ব্রত (!) নিয়েই উপনিবেশের ‘অসভ্য’ জাতিগুলিকে উৎসাদন অথবা লুণ্ঠন করেছে। সুতরাং ভারতবর্ষের জন্য বহিরাগত আর্য আক্রমণ তত্ত্বের এই প্রচার ছিল খুব জরুরী। বিশেষত ভারতবর্ষ যখন ছিল ব্রিটিশ রাজমুকুটের মধ্যমণি। ব্রিটিশদের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উপনিবেশ হিসাবে তারা ভারতবর্ষকে এই পদবীই দিয়েছিল। এমন কামধেনু বস্তুত ব্রিটিশদের জন্য সারা পৃথিবীর আর কোথাওই ছিল না।

আর্য আক্রমণ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের জন্য আর একটি কারণে অত্যাবশ্যক ছিল। সেটা হচ্ছে ঋগ্বেদের সঠিক ব্যাখ্যা ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার মর্মে আঘাত করে। এবং এটা সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় ইউরোপের বিশেষ ভূমিকার দাবীদার হবার কোনও জায়গাই রাখে না। কারণ তখন এই সত্য বেরিয়ে আসে যে, আর্য বা যে নামই দেওয়া যাক মূলত সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরাই সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের পর্যায়ে হোক আর ধ্বংসের অব্যবহিত পরবর্তী কালে হোক মধ্য এশিয়া এবং সমগ্র ইউরোপে অভিগমন করে সেখানে নূতন সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করে। তার প্রমাণ হল সমগ্র ইউরোপ ব্যাপী ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবার হিসাবে কথিত বৈদিক তথা সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত ভাষাগুলির আধিপত্য। যেমন গ্রীক, লাতিন, ফরাসী, ইংরাজী, স্পেনীয়, রুশ ইত্যাদি। এ থেকে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের একাংশ সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত অভিগমন করে সেখানে তাদের মূল তথা বৈদিক ভাষার সঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে নূতন নূতন ভাষার বিকাশ যেমন ঘটায় তেমন সিন্ধু সভ্যতার অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে গ্রীক এবং রোমান সভ্যতার মত সভ্যতাগুলিকেও প্রতিষ্ঠা করে। সুতরাং ঋগ্বেদের সঠিক ব্যাখ্যা ইউরোপের বর্ণবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী দম্ভকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। তখন যে ভারতবর্ষকে তারা পদানত করে এখানকার মানুষদেরকে সভ্যতা শিখাবার দম্ভ করছিল সেই ভারতবর্ষের কাছে তাদের নিজেদেরই সভ্যতার ঋণ স্বীকার করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, সভ্যতায় ভূমিকা রাখবার বিচারে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠত্বকে মেনে নিতে হয়। কারণ সে ক্ষেত্রে তাদের নিজেদেরকেই বরং ভারতীয় সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসাবে মেনে নিতে হয়। এরপর এই উপমহাদেশকে পদানত করে রেখে সভ্যতা শিখাবার যুক্তি কিংবা নৈতিক জায়গাটা থাকে কোথায়?[1]

ব্রিটিশ এবং পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী পণ্ডিতরা ঋগ্বেদের অপব্যাখ্যা করে আর্য তত্ত্বকে তাদের ‘বর্ণ’ ও ‘জাতি’গত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার সপক্ষে জ্ঞানতাত্ত্বিক হাতিয়ার করল। সুতরাং ঋগ্বেদের কদর্থ করে তারা আর্যদেরকে শ্বেতাঙ্গ ‘রেস’ (Race)  বা রক্তগত ও বর্ণগত জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইল। অথচ বৈদিক বা ভারতীয় ঐতিহ্য সে কথা বলে না। শুধু বৈদিক এবং হিন্দু সাহিত্য নয়, জৈন কিংবা বৌদ্ধ সাহিত্যও এটা স্পষ্টভাবে বুঝায়, আর্য শব্দটি মূলত একটি মর্যাদা সূচক সম্ভাষণ কিংবা পরিচিতি মূলক শব্দ। সাধারণত সভ্য, ভদ্র, ন্যায় বা নীতি নিষ্ঠ, সম্মানিত, শ্রেষ্ঠ কিংবা কখনও ধার্মিক বুঝাতে বেদের কাল থেকেই আর্য শব্দের ব্যবহার ছিল। অর্থাৎ জাতি অর্থে নয়, বরং গুণবাচক অর্থে আর্য শব্দের ব্যবহার ছিল। অথচ ইউরোপীয় পণ্ডিতরা এটাকে ‘রেসিয়াল’ (Racial)  অর্থে ব্যবহার করা শুরু করল। তারা তো বিজয়ী। কাজেই পরাজিত এবং পরাধীন ভারতের আর সব সম্পদের মত তাদের নিজেদের প্রয়োজনে ঋগ্বেদেরও দখল নিয়ে যেমন খুশী ব্যাখ্যা দিল।

সুতরাং তাদের নিকট একটা জনগোষ্ঠীর সভ্যতা, ভদ্রতা এবং মর্যাদা সূচক আর্য (সংস্কৃত উচ্চারণ আরিয়) সম্বোধন কিংবা পরিচিতি তাদের নিকট হয়ে গেল রেসিয়াল পরিচয়ে চিহ্নিত ‘এরিয়ান’ (Aryan)। এবং এভাবে আর্যত্বের দখলদার হয়ে তারা নিজেদেরকে প্রকৃত ‘এরিয়ান’ বা খাঁটি আর্য ঘোষণা করল। এক সময় পশ্চিম ইউরোপে এই আর্যত্বের অনেক দাবীদার হল। এবং শেষ পর্যন্ত হিটলারের নেতৃত্বে ‘একমাত্র বিশুদ্ধ আর্য রক্তের’ দাবীদার হল জার্মান জাতি। জার্মানির রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে নিয়ে হিটলার এই তত্ত্বকে তার হাতিয়ার ক’রে এবং ‘বিশুদ্ধ এরিয়ানদের’ বিশ্বব্যাপী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ঘোষণা ক’রে একটা বিশ্বযুদ্ধই বাধিয়ে দিলেন। বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতার পর অবশ্য এরিয়ান রেস নিয়ে ইউরোপীয়দের মাতামাতি বন্ধ হয়েছে। কিন্তু তাতে কী? ভারতবর্ষের জন্য তাদের বহিরাগত আর্য আক্রমণ তত্ত্ব বহাল রইল।

সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের পর থেকে প্রায় শতাব্দী কাল পূর্ণ হতে চলেছে। নূতন নূতন আবিষ্কারগুলি আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে চলেছে। বস্তুত প্রত্নতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের নিকট বর্তমানে এই ধরনের কোনও আক্রমণ তত্ত্বের কিংবা পাশ্চাত্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঋগ্বেদের হাস্যকর ব্যাখ্যারও কোনও মূল্য নাই। হয়ত তারা সবাই ঋগ্বেদের ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। তবে ঋগ্বেদের ব্যাখ্যার কাজটা মূলত বেদ পণ্ডিত এবং বিশেষত উপমহাদেশের সমাজতত্ত্ববিদ কিংবা ঐতিহাসিকদের। কিন্তু উপমহাদেশের বিশেষত ভারতের মূল ধারার তথা প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিতরা ঋগ্বেদের হাস্যকর পাশ্চাত্য ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে আজ অবধি ইতিহাস ব্যাখ্যা দিয়ে চলেছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হল এখনও প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যপুস্তকসমূহে হাস্যকর এবং উদ্ভট আর্য আক্রমণ তত্ত্ব লিখা হচ্ছে।

এটা নিশ্চয় বিস্ময়কর যে, ভারতীয় পণ্ডিতরা আজ অবধি এই তত্ত্বকে জ্ঞানচর্চার মূলধারা তথা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জায়গা থেকে বিদায় দিতে পারেন নাই। ফলে আজ অবধি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ভারতে আর্য আক্রমণ তত্ত্বের মত একটা উদ্ভট এবং হাস্যকর তত্ত্ব জাঁকিয়ে বসে আছে। অথচ কোনও ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই তত্ত্বের সমর্থনে কোনও কালে যেমন ছিল না তেমন আজও নাই।

প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিবৃত্তির এমন দৈন্যদশা। এটা নিশ্চয় লক্ষ্যণীয় যে, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সাবেক মহাপরিচালক বি বি লালের মত প্রত্নতাত্ত্বিকরা আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে নূতন দৃষ্টি থেকে ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন তুলে ধরছেন।[2]  কিন্তু সেগুলি ভারতীয় মূলধারার পণ্ডিতদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে বলে মনে হয় না। ইদানীং কালে মাইকেল ড্যানিনোর মত পাশ্চাত্য প্রত্নতাত্ত্বিক পণ্ডিতরা আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে নাকচ করছেন অখণ্ডনীয় তথ্য-প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ধারালো এবং কখনও কখনও আক্রমণাত্মক ভাষাতেই।[3],[4]  সত্যকে তুলে ধরবার জন্য কিছু সংখ্যক মানুষের যে অদম্য মনোবল, তেজ, সাহস এবং বলিষ্ঠতা পাশ্চাত্যকে এক সময় বড় করেছে এরা হলেন তার যথাযথ উত্তরাধিকারী। এরা হলেন পশ্চিম ইউরোপের সত্যান্বেষী জ্ঞানচর্চার প্রকৃত উত্তরাধিকারী, যারা পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী তথা মূলধারার প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গীর নিকট আত্মসমর্পণ করেন নাই। এরা ভারতের মাটি খুঁড়ে যে অতীতকে খুঁজে পেয়েছেন তাকে তাদের বলিষ্ঠ লেখনীতে যেভাবে তুলে ধরছেন তা থেকেও মূল ধারার তথা প্রাতিষ্ঠানিক ভারতীয় পণ্ডিতরা বিশেষ কিছু শিখছেন বলে মনে হয় না। আজও মূলধারার তথা প্রাতিষ্ঠানিক ভারতীয় পণ্ডিতরা আর্য আক্রমণ তত্ত্বের মত একটা হাস্যকর এবং ফালতু তত্ত্বকে শিরোধার্য করে রেখে নিজেদের দৈন্যদশাকে প্রদর্শন করে চলেছেন।

পুনরায় প্রশ্ন আসা উচিত কেন তাদের এই দৈন্যদশা। ইতিপূর্বে যে কথা বলেছিলাম সেটারই জের ধরে বলতে হয়, এরা ব্রিটেনের উপনিবেশিক দাস বুদ্ধিজীবীদের উত্তরাধিকারী মাত্র, যারা উত্তর উপনিবেশিক কালে উপনিবেশিক ব্যবস্থার জ্ঞানতাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পাহারাদার এবং একই সঙ্গে এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। অর্থাৎ এরা স্বাধীন মানুষ নয়। কারণ প্রভুরা যা শিখিয়েছে তাকে বিরোধিতা করার তো প্রশ্নই উঠে না এমনকি তার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে বিচার করবার ক্ষমতাও এদের নাই। এরা হল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের তৈরী চাকরবাকর শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী। এই চাকরবাকররাই আজ অবধি উপমহাদেশের সর্বত্র যেমন জাঁকিয়ে বসে আছে তেমন বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। রাষ্ট্রটা যেমন পরাধীনতার উত্তরাধিকারী, বুদ্ধিবৃত্তি বা পাণ্ডিত্যেরও তেমন একই দশা। আসলে সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের আউটপোস্ট বা ফাঁড়ি রক্ষায় এখানকার মূলধারার সাধারণ বুদ্ধিজীবী-পণ্ডিতরা হল পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সেনা। যেহেতু এদের ভূমিকা পাশ্চাত্যের অধস্তনের বা অধীনের সুতরাং এদেরকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক বা ইনটেলেকচুয়াল ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদী প্রভুদের এ দেশীয় পদাতিক সৈনিক বা ‘নেটিভ ফুট সোলজার্স্’ বলতে পারি। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এরা এখানে সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী ব্যবস্থা রক্ষার জন্য লড়াই করে। এরা এ দেশে উপনিবেশিক বিদ্যাচর্চা তথা উপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বের প্রচারকে অব্যাহত রাখে। এভাবে উপনিবেশিকতার ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী রাষ্ট্রের সহায়ক হিসাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে এরা এ দেশের অভ্যন্তরে উপনিবেশিক ব্যবস্থা সংরক্ষণের লক্ষ্যে চিন্তার জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে।

আমার এই আলোচনায় অনেকে ভাবতে পারেন যে, আমি সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের নামে পাশ্চাত্যের সবকিছুকে নাকচ করছি। সেটা আমি করি না। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যে অগ্রগতি তারা ঘটিয়েছে কিংবা আজও ঘটিয়ে চলেছে সেখান থেকে আমাদের যেমন শিখবার এবং নিবার অনেক কিছু আছে তেমন তাদের জ্ঞানচর্চার আরও যেসব শাখা আছে সেগুলি থেকেও আমাদের অনেক কিছু নিবার আছে। পাশ্চাত্য মানবিকতার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা বা অবদান রেখেছে সেগুলি থেকেও আমাদের শিখবার কিংবা নিবার আছে। কিন্তু আমাদের সর্বদা রাখতে হবে বিচারশীল মন, ‘ক্রিটিক্যাল মাইন্ড’। বিশেষত মানুষ এবং সমাজ সম্পর্কে, মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে পাশ্চাত্যের মূলধারার জ্ঞানতত্ত্বের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী যে ধারা কখনও নগ্ন এবং কখনও সংগুপ্ত থাকে সে সম্পর্কে আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া সামাজিক প্রেক্ষিতগত কারণে তাদের জ্ঞানতত্ত্বের অনেক কিছুই আমাদের জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং এমনকি ক্ষতিকর হতে পারে। তবে পাশ্চাত্যের জ্ঞানতত্ত্বকে বিচারের সময় বিশেষত এই কারণে আমাদের আরও বেশী করে সদাসতর্ক থাকতে হবে যেহেতু পাশ্চাত্য আজও তার সাম্রাজ্যবাদী এবং উপনিবেশবাদী বিশ্বব্যবস্থার সংরক্ষক হয়ে আছে। একদা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি অস্ত্রের বলে যে বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল আজও তারা সেই ব্যবস্থার উত্তরাধিকারকে ধারণ করে আছে। অন্যদিকে, আমরাও আজ অবধি তাদের তৈরী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছি তাদের রাষ্ট্র এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ এবং রক্ষা ক’রে। এভাবে আমাদের উভয়ের মধ্যকার প্রভু এবং ভৃত্যের সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

মনে রাখতে হবে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সম্পর্কের প্রশ্নে আজও আমাদের পৃথিবীটা মোটা দাগে ‘আমরা আর তারা’ হয়ে আছে। একদিকে প্রাচ্য এবং অপর দিকে পাশ্চাত্য এই বিভাজনটাকে অস্বীকার করবার কোনও উপায় নাই। পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একদা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়েছিল তার সমাপ্তি ঘটেছে এটা মনে করবার কোনও বাস্তবতাই নাই। এ কথা ঠিক যে, পাশ্চাত্যের দেশ বা শক্তিগুলির মধ্যে প্রকৃতির নিয়মেই বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ যেমন আছে তেমন প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ বা শক্তিগুলির মধ্যেও বিভিন্ন দ্বন্দ্ব ও বিরোধ আছে। কিন্তু এই সকল দ্বন্দ্ব ও বিরোধকে বড় করে দেখতে গিয়ে আমরা যেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব ও বিরোধকে ঝাপসা করে না ফেলি। বস্তুত বিশ্ব পরিসরে আজও দ্বন্দ্বটা প্রধানত পাশ্চাত্যের সঙ্গে তথা পশ্চিম ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মত দেশগুলির সঙ্গে বাকী পৃথিবীর দেশগুলির দ্বন্দ্বকে ঘিরে আবর্তিত।

চীন-ইন্দোচীনের মত কিছু সংখ্যক দেশ পাশ্চাত্যের আধিপত্যের জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে এলেও আমাদের মত অধিকাংশ দেশই এই আধিপত্যের জালে আবদ্ধ হয়ে আছে। এর নেতৃত্বে এক সময় ব্রিটেন থাকলেও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে এর নেতৃত্বে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী এই আধিপত্যের জাল ছিন্ন করবার প্রথম শর্ত হচ্ছে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সাম্রাজ্যবাদী এবং উপনিবেশবাদী আধিপত্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। পাশ্চাত্যের তৈরী করে দেওয়া যে বৃত্তের মধ্যে এখানে জ্ঞানচর্চা আবদ্ধ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে সেই বৃত্তকে ভেঙ্গে ফেলা। এর জন্য অপরিহার্য হল যে চাকরবাকর শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এবং পণ্ডিতরা বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে আছে তাদের আধিপত্যকে অস্বীকার এবং উৎখাত করা। কারণ আগে আমাদের চেতনাকে মুক্ত করতে হবে। দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রথম শর্ত হচ্ছে দাসত্বের চেতনা থেকে মুক্তি।

আবার বলি এর অর্থ এই নয় যে, পাশ্চাত্যের সবকিছুকে নাকচ করতে হবে। অন্যদিকে স্বদেশ অভিমুখী হতে গিয়ে, অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্যের উপর দাঁড়াতে গিয়ে অতীতের সবকিছুকে আমরা যেন বিনা প্রশ্নে গ্রহণ না করি। অতীতের অনেক জঞ্জালকেই ঝেড়ে ফেলতে না পারলে আমরা যেমন মানসিক এবং বাস্তব স্বাধীনতা অর্জন করতে পারব না তেমন আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে আমাদের নিজস্ব উন্নত সভ্যতাও গড়তে পারব না। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপ্লব সংগঠনের যা একদিকে যেমন বর্তমানের উপনিবেশিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে আমাদের ছেদ ঘটাবে অপর দিকে তেমন অতীতের পশ্চাৎপদতা এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার উত্তরাধিকারের সঙ্গেও ছেদ ঘটাবে।

 

চলবে…

 

সূত্র:

[1] ঋগ্বেদ কিংবা সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলি নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ না থাকায় এখানে সেই বিষয়গুলি নিয়ে সেভাবে আলোচনা করি নাই। বাংলা ভাষায় শামসুল আলম চঞ্চল এবং আমার যৌথভাবে লিখা গ্রন্থ ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’য় এসব বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও ব্যাখ্যা আছে। এটি ২০০৩-এর জানুয়ারীতে মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ব-দ্বীপ প্রকাশন কর্তৃক। কিন্তু আমার সম্পাদনায় ব-দ্বীপ প্রকাশন থেকে ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামে ইংরাজী থেকে বাংলায় অনূদিত একটি প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশের কারণে ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ এনে ব-দ্বীপ প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে পুলিশ আমাকে ২০১৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারী তারিখে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় গ্রেফতার করে এবং কম্পিটার, মোবাইল ও দলিলপত্রসহ বিপুল সংখ্যক বই জব্দ করার পাশাপাশি ব-দ্বীপ প্রকাশনের কার্যালয় এবং বিপণন কেন্দ্র সিলগালা করে দেয়। আমি সাড়ে আট মাস জেল হাজত বাসের পর আদালতের নির্দেশে ২০১৬ খ্রীষ্টাব্দের ৩১ অক্টোবর জামিনে মুক্ত হই। এখানে উল্লেখযোগ্য যে ব-দ্বীপ প্রকাশনের সঙ্গে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও শামসুল আলম চঞ্চলকেও পুলিশ ব-দ্বীপ প্রকাশনের বিপণন কর্মকর্তা হিসাবে দেখিয়ে গ্রেফতার করে। এই লেখার সময় পর্যন্ত তিনিও জামিনে মুক্ত আছেন এবং আমার মত নিয়মিতভাবে মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন। অবশ্য ইসলাম বিতর্ক গ্রন্থের মুদ্রকও একই মামলায় কারাবন্দী হয়েছিলেন। তিনিও বর্তমানে আমাদের মত জামিনে থেকে মামলার অভিযুক্ত হিসাবে আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন। যাইহোক, দেড় বৎসরেরও অধিককাল পর আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব-দ্বীপ প্রকাশনের কার্যালয়ের সিলগালা করা তালা খুলে দিলেও প্রকাশন বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য জব্দ করা বইপত্র, কম্পিউটার এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র শাহবাগ থানা জব্দ করে রেখে দিয়েছে। কাজেই এখন আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা বাজারে পাবার উপায় নাই। তবে এটির অনলাইন সংস্করণ ‘বঙ্গরাষ্ট্র’-এ গ্রন্থাগার বিভাগে দেওয়া আছে। আগ্রহী পাঠক সেটি পাঠ করতে পারেন। – লেখক

[2] B. B. Lal, Let not the 19th Century Paradigms Contunue to Haunt Us. Publshed in, Puratattva, November 37, 2007, Bulletins of the Indian Archaeological Society, New Dellhi.

[3] Michel Danino, Flogging a Dead Horse. In, Puratattva, November 37, 2007, Bulletins of the Indian Archaeological Society, New Dellhi.

[4] আরও দ্রষ্টব্য:Michel Danino, Email: [email protected], The Harappan Heritage and the Aryan Problem.  In, Man and Environment, vol.xxviii (2003) no. 1. pp. 21-32