নাজিম উদ্দিন

স্টিরিওটাইপ # রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে কে সেরা সেই বিতর্ক। বাংলাদেশী  বাঙালিরা এ নিয়ে এখনও শোনা কথার ভিত্তিতে তর্ক করে।

তাদের যুক্তি, রবীন্দ্রনাথ ছিল জমিদারের সন্তান, ওরকম আরামে থাকলে যে কেউ কবিতা লিখতে পারে। নজরুল ছিল এতিম, রুটির দোকানে কাজ করত, লেটোর দল করত, তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। নজরুলকে ঠেকানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং হিন্দু সমাজ অনেক চেষ্টা করেছে। তারা  নজরুলের দিকে মেয়ে লেলিয়ে দিয়েছে, তারপর কী খাইয়ে পাগল বানিয়ে ছেড়েছে।

=> অশিক্ষিত মানুষ তো বটেই, শিক্ষিত মানুষও এ ধরনের যুক্তি দিয়ে তর্ক করে। তারা রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল কাউকেই পড়ে না,  কেবল গুজব আর শোনা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তর্ক করে। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল দুজনেই একে অপরকে উৎসর্গ করে কবিতা লিখেছেন, তাদের মধ্যে ছিল গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক। নজরুল তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘সঞ্চিতা’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন।  নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকাকে আশীর্বাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/

দুর্দিনের এই দুর্গাশিরে, উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন/

অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভালে হোক না লেখা/

জাগিয়ে দে রে চমক মেরে, আছে যারা অর্ধচেতন।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম এদের দুজনের মধ্যে কোন সমস্যা না থাকলেও পাকিস্তান আমলে  নজরুলকে মুসলমান বানানোর অপচেষ্টা থেকে এ বিতর্কের  শুরু হয়। যারা এসব করে সে মানুষগুলোই আবার নজরুলের মানবতাবাদী,  সাম্যবাদী চিন্তা-চেতনা বা শ্যামা সঙ্গীত রচনার বিষয়টাকে আড়াল করার চেষ্টা করে। মজার ব্যাপার হল, জীবিত থাকাকালে এরাই  নজরুলকে হিন্দু বানানোর চেষ্টার কসুর করে নি।

 

স্টিরিওটাইপ # ইহুদি-নাসারারা মুসলমানের শত্রু, তাদের সব কার্যকলাপ মুসলমানদের খাটো করার জন্য, কোরানকে ভুল প্রমাণ করার জন্য। ইসলাম একমাত্র সত্য ধর্ম, তাই ইসলামের প্রথম থেকে তারা এর পেছনে লেগে আছে। তারা নিজেরা তো ভুল পথে গেছে, এখন মুসলমানদেরকেও ভুলপথে পরিচালিত করতে চায়। বিজ্ঞান কত চেষ্টা করেছে তাও কোরানে কোন ভুল বাহির করতে পারে নাই।

=> কাউকে খাটো করার দরকার নাই, আমরা সবাই কেন  তাদের মত করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করতে পারছি না।  তার ওপরে মুসলমান কোন জাতি নয়, রাশিয়ার, চিনের, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানের সাথে আমাদের এক ধর্ম ছাড়া কোন মিল নেই। জাতি গঠনের জন্য ধর্ম কোন উপাদান নয়, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ভাষা এবং সংস্কৃতিতে মিল থাকলে তাদের এক জাতি বলা যায়। ধর্মের ভিত্তিতে মিল ঘটালে কী হয় সেটা আমরা পাকিস্তান গঠনের উদাহরণ থেকে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মযুদ্ধের যুগ শেষ, মানুষ এখন সেসব পেছনে ফেলে অনেক এগিয়েছে। শিক্ষিত মুসলমান মাত্রেই ইসলামি সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্ন দেখে, তার মনঃশ্চক্ষে ভেসে ওঠে অতীতের বাগদাদ আর স্পেন। কিন্তু ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদ কোন্ কোন্ ভাবে বর্তমান সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে ভাল? জ্বলন্ত কড়াই থেকে লাফিয়ে আগুনে পড়ার কোন মানে হয় না। ধর্মের ভুল বের করা বিজ্ঞানের কর্ম নয়, তাদের পুরোপুরি আলাদা ডোমেইন। এসব না বলে আজকের বিজ্ঞানের  যুগে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় শামিল হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

স্টিরিওটাইপ # বাইবেল এখন আগের ফর্মে নেই, এতে মানুষ নিজের সুবিধামত অনেক পরিবর্তন করে নিয়েছে। ইহুদি, খ্রিস্টান খারাপ, তারা ইব্রাহিমী ধারার মানুষ হলেও ভুল পথে পরিচালিত, তাদের কোনভাবে সমর্থন দেয়া যাবে না, এমনকী ‘মেরি ক্রিসমাস‘ ও বলা যাবে না। বললে তাদের ভুলটাকে সত্যায়িত করা হবে।

=> সঠিক বাইবেল তাহলে কোনটা? সেরকম কিছু ছিল বা আছে কী? এটা ঠিক যে,  পুরাতন বাইবেল লেখা হয়েছে  কয়েকশত বছর ধরে। বাইবেলের সংখ্যাও অনেক, সেখান থেকে সংকলন করে কিছু গ্রন্থ বাইবেলে জায়গা করে নেয়। মানুষ হিসেবে যার যার বিশ্বাস তার তার কাছে। কে সঠিক পথে আছে আর কে ভুল পথে আছে সেটা বিচার করার অধিকার কারো নেই। বিশেষ ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এটা বলার কোন উপায় নেই, কারণ সত্য কোনটা সেটা কেউ বলতে পারে না। আর কেউ যদি জানেও সে সেটা বলতে পারে না।

“যেহেতু তাঁর সম্পর্কে কেউ তেমন কিছু জানে না,
যারা মনে করে জানে তারা আসলে
উত্তেজনা সৃষ্টিকারী।”

–তাপসী রাবেয়া বসরী

 

স্টিরিওটাইপ #  বাঙালি মুসলমানের কাছে হিন্দু খারাপ, তারা কাফের, দোজখে যাবে। সাকার উপাসনা তার মাথায় ঢোকে না,  মানুষ হয়ে কীভাবে সে মূর্তির কাছে মাথা নত করে। ওরা কচ্ছপ খায় সেজন্য সময়মত কচ্ছপের মত মাথা লুকিয়ে ফেলে। কচ্ছপ এজন্য আমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। ওদের মাথায় ষোল চুঙা বুদ্ধি, আমাদের মত মাছ-মাংস-পেঁয়াজ খায় না, মাথা ঠাণ্ডা থাকে, কোন দিক দিয়ে যে ফাঁসিয়ে দিবে বুঝা যাবে না।

সনাতন ধর্মের সাধক আদি শংকরাচার্য

=> প্রথমত, হিন্দু বলে কোন ধর্ম নেই, যা আছে সেটা সনাতন ধর্ম। সিন্ধু নদের পূর্ব পাশে যারা থাকে তাদের আরবি-ফারসি ভাষায় হিন্দু নামে পরিচিত করা হতো। ইংরেজরা ভারতে আসার পরে ভারতীয়রা  জানতে পারল যে তারা হিন্দু। আসলে হিন্দু বলে একক কোন ধর্ম বা চর্চা নেই। আর ভারতীয় ভাষায় ধর্ম মানে ‘ডিউটি‘ বা ‘কর্তব্য‘, এর সাথে ‘রিলিজিওন‘ বা ধর্মকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। ভারতে মানব জীবনের লক্ষ্যসমূহের মধ্যে ধর্ম জাস্ট একটা বাকিগুলো, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।  আধ্যাত্মিকতা নিয়ে দুনিয়াতে যতোরকম ধারণা আছে, সনাতন ধর্মে তার সবকিছুই রয়েছে। একেশ্বর, নিরীশ্বর, বহু ঈশ্বর, কোন কিছুই মানে না, হিন্দু বিশ্বাসে এরকম কোন  কিছুতেই সমস্যা নেই। মানুষই ভারতবর্ষে দেবতা,  যখন ভারতে ৩৩ কোটি মানুষ ছিল তখন তাদের দেবতা ছিল ৩৩ কোটি। বর্তমানে এক বিলিয়নের উপরে মানুষ তাই এখন বিলিয়নের ওপরে দেবতা।

 

স্টিরিওটাইপ # বৌদ্ধ খারাপ, তারা নাস্তিক, রোহিঙ্গাদের মারে, নির্যাতন করে।  কে বলেছে বৌদ্ধরা অহিংস?  অহিংস হলে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন করে কীভাবে?

বিহারের বুদ্ধগয়ায় বিখ্যাত মহাবোধি মন্দিরের বুদ্ধ মূর্তি

=> বখতিয়ার খিলজি বাংলায় আসার আগে আমরা হিন্দু-বৌদ্ধই ছিলাম। হিউয়েন সাং যখন বাংলায় আসেন তখন বাংলায় অনেক বৌদ্ধ বিহার ছিল, সেখানে জ্ঞানচর্চা হত। বৌদ্ধের আবির্ভাব না হলে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হত কী না, বা এত মর্যাদা পেত কী না তাতেও সন্দেহ আছে। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের লেখা। আমার মনে হয় এককালে বৌদ্ধ থাকার ফলে এখনও বাঙালির মধ্যে তার রেশ রয়ে গেছে। একটা-দুইটা উদাহরণ দিয়ে কাউকে খারিজ করে দেয়া কোন কাজের কথা নয়। তাহলে সারা দুনিয়ার মানুষ মুসলমানদের  যে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাতেও কোন সমস্যা নাই।

 

স্টিরিওটাইপ  # চিন, কোরিয়ান মানুষদের নিয়েও বাঙালির এলার্জি আছে। চিংকুরা এমন কিছু নাই যা খায় না, ‘দে ইট এভরিথিং দ্যাট মুভস‘। কোরিয়ানরা কুকুর খায়, ওদের কোন বাছ-বিচার নাই।

=> চিন আমাদের প্রতিবেশী, তাদের আছে কমপক্ষে সাত হাজার বছরের নিরবচ্ছিন্ন সভ্যতা, তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেককিছু শেখার আছে। বিদেশীদের কাছ থেকে খারাপ অভিজ্ঞতা পাওয়ায় তারা কখনই বাহিরের মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে নি। বাংলার সাথে তাদের ভাল সম্পর্ক ছিল। আমাদের কূপমণ্ডুকতার কারণে আমরা যদি নিজেদের পাশ্চাত্যের মত চিনের শত্রু বানিয়ে ফেলি সেটা কোনভাবেই ভাল কিছু হবে না।

 

স্টিরিওটাইপ # শাদারা খারাপ, নোংরা থাকে, বাথরুমে পানি ব্যবহার করে না, গায়ের থেকে গন্ধ আসে। ওরা শুয়োর খায়, শুয়োরের মত আচরণ করে, যৌনতায় কোন বাছ-বিচার নাই।

=> খাবার এবং নিত্যনৈমিত্তিক আচার ব্যবহারের ওপর মানুষের হাত নেই। এসবের জন্য  মানুষ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। আশে-পাশের পরিবেশে যা কিছু পাওয়া যায়, মানুষ তার ওপর নির্ভর করে তার জীবন-জীবিকা এবং সংস্কৃতি গড়ে তোলে। শুয়োর না খেলে ইওরোপের দীর্ঘ শীতে মানুষ বেঁচে থাকতে পারতো না, আর শুয়োর খাওয়া অনুমোদন না করলে শীতপ্রধান দেশের এসব মানুষ খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করতো না, তারা তাদের প্যাগান ধর্ম পালন করতো। কিন্তু ধর্মগুলো সবসময় দলে ভারী হতে চায়। সুতরাং এ ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

 

স্টিরিওটাইপ # হিন্দুরা কখনই মুসলমানদের ভাল চোখে দেখে নি, এজন্য তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোক সেটা চান নি। বঙ্কিম চন্দ্র তাঁর উপন্যাসে মুসলমানদের যবন বলে অবজ্ঞা করেছে। রবীন্দ্রনাথের লেখায় মুসলমান কোন ভাল চরিত্র উঠে আসে নি। যারা এসেছে তারা সবাই চোর, ডাকাত, চাকর-বাকর ইত্যাদি।

=>  হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের খাবারে বিস্তর তফাৎ। মাছ, গরুর মাংস, পেঁয়াজ, রসুন না খেলে তাকে ঠিক মুসলমান বলা যাবে না। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পুরুষদের দেখা-সাক্ষাত হলেও এ চারটে জিনিস হিন্দু-মুসলমানের হেঁসেল আলাদা করে রেখেছে, ফলে মেয়ে মহলেও জানাজানি সম্ভব হয় নি। খাবারের এ দেয়ালের কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করেও মুসলমানের অন্দরমহল সম্পর্কে হিন্দুরা জানতে পারে নি। কবি-সাহিত্যিকদের সাথে যাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে তারা তাদের লেখায় তাদেরকেই উপস্থাপন করেছেন। শিল্প-সাহিত্যে মুসলমানদের উপস্থাপন করার দায়িত্ব মুসলমানদের, অন্যের ওপর সে দায় চাপানো অন্যায়।  কাজী ইমদাদুল হকের ‘আব্দুল্লাহ‘ উপন্যাস লেখার পরে কে যেন বলেছিলেন, “এতদিনে মুসলমানের অন্দরমহল দেখতে পেলুম“।

 

স্টিরিওটাইপ  # আফ্রিকানদের নিয়েও বাঙালির সমস্যা আছে। বাঙালি নিজেকে কালো ভাবতে চায় না, কালোদেরকেও শুধু কালো বা আফ্রিকান নয়, কাউল্লা, কাইল্লা, পাতিলের তলা ইত্যাকার অসংস্কৃত ভাষায় সম্বোধন করে থাকে। বাংলাদেশে রঙ ফর্সাকারী প্রসাধনীর চাহিদা বা বিয়ের বর-কনে দেখার সময় এর সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়।

বিখ্যাত কালো বুদ্ধিজীবী দুবোয়া কালোদের মুক্তির সংগ্রামে বাদামী মানুষদের সাথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে চেয়েছিলেন

=> বাঙালি রক্তে আর্যের চেয়ে নিগ্রোবটু উপাদান কম নয়। আমাদের পূর্বপুরুষ আদিবাসী নানা জাতি, আদি অস্ট্রালয়েড মানুষেরা কালো। ঔপনিবেশিক শাসনে শাদাদের অধীনে থেকে বাঙালির ‘সাহেব পূজা‘ থেকে বাঙালির মধ্যে শাদা হয়ে যাবার প্রবণতা বাড়ে। না হলে কালোরা আমাদের সম্মান করে, তাদের মানুষ মনে করে। তাদের আন্দোলন সংগ্রামের নেতা আমাদের ‘মহাত্মা গান্ধী‘। নিজের চেহারা, সংস্কৃতি নিয়ে আত্মমর্যাদাবোধ না থাকলে কোন অর্জনই স্থায়ী হবে না।

 

স্টিরিওটাইপ # ভারত চায়নি পাকিস্তান অখণ্ড থাকুক, তারা সেজন্য আমাদেরকে ভেঙ্গে দু’টুকরো করে দিয়েছে।

=> বুঝলাম সব ভারতের ষড়যন্ত্র। তাহলে পাকিস্তান গঠিত হবার পরে সেই ১৯৪৮ সাল থেকে যে ভাষাগত বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য চলে এসেছে যার কারণে ছয় দফা আন্দোলন হল, সবশেষে বাঙালি হাতে অস্ত্র তুলে নিল তার কী হবে?

 

স্টিরিওটাইপ # বাঙালি মুসলমানের চোখে আরবের মুসলমানেরাও খারাপ, কারণ তারা ইহুদি-নাসারাদের দোসর, ব্যভিচার করে।  তারা মুসলমানের শত্রু, তার ওপর আমাদের মা-বোনদের ওপর অত্যাচার করে। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য থাকলে আজকে আমাদের এই দূর্দশা হত না।

=> আবারো একই যুক্তি, আরবের নেতারা মুসলমান ‘এক জাতি‘ সেটা ভাবে না। মুসলমানেও নানা ভাগ আছে,  আঞ্চলিক, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে। যার কারণে এক মুসলিম ধর্মাবলম্বী রাষ্ট্র আরেক রাষ্ট্রকে গুঁড়িয়ে দিতে দ্বিধা করে না। বর্তমানে যেমন ইয়েমেন নামক মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে তাতে কেউই বাধা দিচ্ছে না।

মূসা নবীর টেন কমান্ডম্যান্টস এবং উর-নাম্মুর আইন

 

স্টিরিওটাইপ # মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিত ইসলামি নিয়ম-কানুন মেনে চলা, না হলে সমাজে শৃঙ্খলা থাকবে না। পরকালের ভয় না থাকলে যে যা খুশি করতে থাকবে।

=> নীতি-নৈতিকতার সাথে ধর্মের সম্পর্ক নাই। এককালে থাকলেও এখন নাই, বা কমে গেছে। ধর্ম আসার অনেক আগে থেকে মানুষ নিয়ম নীতি বানিয়েছে, পালন করে আসছে। আদিম জাতিগোষ্ঠি, যাদের আমরা অসভ্য (!) বলি, তাদের সমাজেও অনেক নিয়ম-নীতি আছে, যেগুলো ওইসব সমাজ বা গোত্রের মানুষ পালন করে, এবং নিয়ম ভঙ্গকারীর জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা আছে। দুনিয়ার প্রথম আইন হল, বিয়ের আইন আর সম্পত্তির আইন। আদিবাসী সকল গোত্রে বিবাহ আইনের বিশদ বর্ণনা আছে, কাকে বিয়ে করা যাবে, আর কাকে করা যাবে না, আমাদের  ভারতবর্ষেও আট প্রকারের বিয়ে রীতিসিদ্ধ ছিল। কোনরকম ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে নয়, উত্তরাধিকার ব্যবস্থা বহাল রাখতেই  মানুষ প্রথম আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা করে। ধর্মীয় কারণে নয়, সমাজ বজায় রাখা এবং শাসনের প্রয়োজনে রাজা এবং গোত্রের প্রধানেরা আইন-কানুন এর প্রচলন করে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ সালের দিকে উর-নাম্মু এবং  ১৭৫০ সালের দিকে ব্যবিলনের রাজা হাম্মুরাবি তার আইন প্রণয়ন করেন, যার সাথে আরো  কয়েকশত বছর পরের ‘টেন কমান্ডম্যান্টস‘ এর অনেক মিল পাওয়া যায়।

 

স্টিরিওটাইপ # কামরূপ-কামাখ্যার দিকে ভুলেও যাওয়া যাবে না। সেখানে যাদু-টোনা চলে, সেখানে গেলে পুরুষের পুরুষত্ব থাকে না। সিংহের ডাকে অণ্ডকোষ খসে পড়ে। ডাইনীরা যাদু করে পুরুষদের গোলাম বানিয়ে রাখে।

=> এ স্টিরিওটাইপ থেকে পাহাড়ী মানুষেরা কীভাবে  নিজেদের বাঙালি আগ্রাসন থেকে সুরক্ষিত করেছিল সেটা বুঝা যায়।  মার্তৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং তান্ত্রিক সাধনার পীঠ কামরূপ মোটেই তেমন কোন ভয়ানক জায়গা নয়। কিন্তু কোন বাঙালি অর্বাচীন যাতে ওদিকে পা না বাড়ায় সেজন্য স্টিরিওটাইপের মাধ্যমে সাবধান করা  আছে।

বাঙালিদের  এরকম আরো অনেক স্টিরিওটাইপ আছে। অন্যান্য জাতির মধ্যেও এসব আছে কিন্তু আমরা খুব সহজে নিজেকে বিচারকের আসনে বসিয়ে ফেলি, গায়ে পড়ে অন্যকে বিচার করি। ইংরেজিতে একটা কথা চালু আছে, কারো সমালোচনা করার আগে তার অবস্থান বিচার করা উচিত, ‘Before you judge a man, walk a mile in his shoes’। অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের দিকে তাকানো উচিত। কারুর ধর্মবিশ্বাস, খাবার, সংস্কৃতির সমালোচনা করার অধিকার কারুর নেই। ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং  রাজনীতি বিষয়ে অজ্ঞতার  কারণে মানুষের মধ্যে এসব গুজব, শোনা কথা আসন গেঁড়ে বসে।

স্টিরিওটাইপেরও সামাজিক ব্যবহার আছে, একটা প্রাথমিক তথ্য হিসেবে সমাজে প্রচলিত কথা হিসেবে এর একটা গুরুত্ব আছে।  সমাজে গুজবের মনস্তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে স্টিরিওটাইপ তার একটা ভাল উদাহরণ। কিন্তু সেই গুজবটাকে যাচাই-বাছাই করে নেয়া, তাকে কতটা গুরুত্ব দেয়া যাবে সে জায়গায় ‘বিচারিক ক্ষমতার‘ প্রয়োগের দরকার। শিক্ষিত মানুষদের জন্য সেটা না করে, গুজবকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া মোটেই ভাল কিছু না, তাতে সত্যের অপলাপ হয়। গুজব, স্টিরিওটাইপের ভিত্তিতে কোন জাতি বা মানুষকে বিচার করে রায় দেয়াটা আরো জঘন্য কাজ। বাঙালির মত ধর্মপরায়ণ, আধ্যাত্মিক জাতির  হওয়া উচিত ছিল অন্যের ব্যাপারে আরো ‘নন-জাজমেন্টাল’ হওয়া, সেটা না করে সবাই বিচারক সেজে বসে আছেন।

একটা সময় ছিল যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল ছিল না,  শাসনকেন্দ্র থেকে লোকালয় অনেক দূরে ছিল, তখন মানুষের মধ্যে মুখে মুখে গুজব ছড়িয়ে পড়ত। শাসক গোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনে গুজব এবং স্টিরিওটাইপ উৎপাদন করত এবং তাদের কাজে ব্যবহার করত। ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টান এবং মুসলিম দু’শিবিরেই এ ধরনের গুজবকে কাজে লাগানো হত। গুজবের মাধ্যমে  সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খবর চলে যেত, চলার পথে অনেক অতিরঞ্জন হত, কিন্তু তাতে কোন ক্ষতি ছিল না,  মূল ম্যাসেজ শাসন ক্ষমতার, সাম্রাজ্যের পক্ষে থাকত।  সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখতে পাওয়ার মধ্যে আবারো গুজবের সেই শক্তি প্রত্যক্ষ করি । একইভাবে আগের যুগে অশিক্ষিত, আনপড় মানুষের মধ্যে আবেগ জাগিয়ে তুলতে, তাদের একতাবদ্ধ করতে এক সময় নানা জাতি সম্পর্কে স্টিরিওটাইপ চালু হয়েছিল। আজকের ডিজিটাল যুগে এসেও আমরা যদি সেসব স্টিরিওটাইপ নিয়ে পড়ে থাকি তাহলে সে দোষ আর কাউকে দেয়া যাবে না। কাজী নজরুল ইসলাম কম দুঃখে বলেন নাই-

“বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে

বিবি তালাকের ফতোয়া  খুঁজেছি কুরান-হাদিস চষে ৷”

নাজিম উদ্দিন এর ব্লগ   ১,৭২১ বার পঠিত