জিয়া হাসান

 

যে কারণে আমি একজন ইস্লামিস্ট, বা একজন বুদ্ধিস্ট বা একজন গ্লোবালিস্ট বা যেকোন বিশ্বাসভিত্তিক ইজমপন্থীর সাথে তাদের ইজম নিয়ে বিতর্কে যাইনা, ঠিক সেই কারণে আমি মার্ক্সিস্টদের সাথেও মার্ক্সবাদ নিয়ে তর্কে যাই না।

কারণ, বেশকিছু সমস্যা আমি দেখতে পাই।

প্রথমত, যে কোন ব্যক্তি যার মধ্যে মানব সমাজে ব্যক্তির বিভিন্ন মুখি তাড়না যেমন, ধর্ম, জাতীয়তা, ইতিহাস, প্রেজুডিস, জিন, বিশ্বাস, সংস্কার, অর্থনৈতিক অবস্থান, সামাজিকতা, উপনবেশিকতাসহ বিভিন্নরকম বোধের জটিল মিশ্রণ সম্পর্কে ধারণা আছে তিনি জানবেন প্রতিটি দশকে, প্রতিটি বছরে, প্রতিটা রাষ্ট্রে, প্রতিটা সমাজে, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্কে এবং ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কে এমন সব জটিল জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তা ওই সময় এবং সভ্যতার জন্যে ইউনিক।

কেউ যদি মনে করেন,নির্দিষ্ট একটি সময়ে নির্দিষ্ট একটি সভ্যতার নির্দিষ্ট একটি সমস্যার সমাধানের উদ্ভুত ধারণা দিয়ে, বাকি বিশ্বের সকল সময়ের সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব সেটা হবে, বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি থেকে পালিয়ে, বিশ্বাসের স্তরে প্রবেশ করা।

ফেসবুকে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ধরনের আইডিয়া নিয়ে আলচনার সময়ে বাংলাদেশের যেসব মার্ক্সিস্টদের সাথে আমার ধারনার আদান প্রদান হয়েছে, তাদের অধিকান্সের মধ্যে এই বিশ্বাসের সমস্যাটি দেখতে পেয়েছি।

দ্বিতীয়ত, সমস্যাটা প্রথম সমস্যার একটা বাই প্রডাক্ট। একটা দৃষ্টিভঙ্গি যে সমাজ এবং রাষ্ট্র মূলত অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর দ্বারা তাড়িত এবং মালিক শ্রমিক সম্পর্ক বা শ্রমের উপাদানগুলোর সাথে শ্রমিকের সম্পর্কের ভিত্তিতে রাষ্ট্র এবং সমাজ খুবই সুনির্দিষ্ট এবং পূর্ব নির্ধারিত একটা অনিবার্য পরিণতির দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে – এই ধারণা যে ভ্রান্ত, বিগত ১০০ বছরে, বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন দশকে হাজার হাজার বার প্রমাণিত হয়েছে – উদাহরণ বাংলাদেশ, টেক এনি দশক যেইটা ভালো লাগে।

কিন্ত,সামাজিক পরিবর্তনের এই পূর্ব নির্ধারিত ধাপগুলোর, যার পাচটি ধাপে মার্ক্স চিহ্নিত করেছেন তার অনিবার্যতার প্রতি একটা অন্ধ বিশ্বাস একজন মার্ক্সিস্ট-এর যুক্তি এবং বোধকে ঢেকে দেয়। এবং তাকে বাধ্য করে রাষ্ট্রের সকল সমস্যাগুলোকে সুনির্দিষ্ট একটি লেন্স দিয়ে দেখতে।

অনিবার্যভাবে এই  মার্ক্সিস্ট লেন্স দিয়ে সে বর্তমান রাষ্ট্রের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান দেখতে ব্যর্থ হয়। তার ফলে সে সমাধান খোঁজার বদলে সমস্যাগুলোকেই, সে দায়ী করা শুরু করে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আধুনিক রাষ্ট্রে ধর্ম এবং জাতীয়তার প্রভাবে দ্বন্দ্ব এবং বিদ্বেষ বেড়ে যাওয়ার মার্ক্সিস্ট একটা ভিউ পয়েন্ট হচ্ছে – উভয় বোধকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

তার মার্ক্সিজম যখন সমস্যা সমাধান করতে পারেনা তখন সে হতাশ হয়ে পরে এবং হতাশ হয়ে নিজে একটা চরম বুর্জোয়া জীবন বেছে নেয়। কারণ, সে না পারে মার্ক্সিজমের ইউটপিয়াকে ছাড়তে, না পারে মার্ক্সিজমের ভেতরে বর্তমান সময়ের বাস্তব সমস্যাগুলোর কোন সমাধান অফার করতে – তার হতাশা থেকে সে চরম বুজোর্য়ায় পরিণত হয়, কিন্ত রেঠরিকালি সে মার্ক্সিস্ট থাকে।

এর একটা উদাহরণ, আপনারা বাংলাদেশের মার্ক্সিস্টদের বিপ্লব নিয়ে হতাশার মধ্যে দেখতে পারেন। তারা ক্রমাগত প্রশ্ন করতে থাকে, বিপ্লবের সকল সম্ভাবনা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বিপ্লব কেন হচ্ছেনা।

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে যে মার্ক্সিস্টদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে তাদের মধ্যে তৃতীয় যে সমস্যা আমি দেখি, তা হচ্ছে, মার্ক্সিজম বলতে কী বোঝায় সেটা একেক জনের কাছে একেক রকম।

যেভাবে, অনেক ইসলামিস্ট মনে করেন যে ইসলামের একটা পরিশুদ্ধ এবং সঠিক ভার্শন আছে এবং তার বাহিরে যা আছে তা বিদাত এবং তার নিজের পালন করা বিশ্বাসটিই সঠিক এবং শুদ্ধ ইসলাম। ঠিক তেমনি মার্ক্সিস্টদের মধ্যেই কে সঠিক মার্ক্সিজম এবং কে বিদাত মার্ক্সিজম তা বোঝা একটা সমস্যা।

এবং মূল সমস্যা হচ্ছে তারা সবসময়ে গোল পোস্টটা পরিবর্তন করতে থাকেন। আপনি যদি মার্ক্সিজমের এসেন্স নিয়ে প্রশ্ন করেন, তবে তারা সুনির্দিষ্ট টেক্সটকে হাইলাইট করেন। এবং যদি আপনি সুনির্দিষ্ট টেক্সটকে প্রশ্ন করেন, তবে তারা এসেন্স বা স্পিরিট বা চেতনাকে হাইলাইট করেন।

এবং এই তিনটা প্রবলেমের ফাইনাল রেজাল্ট হচ্ছে, আপনি যখন কোন মার্ক্সিস্টের সাথে আলোচনা করবেন তখন দেখবেন, আপনি কোন ধারনা বা আইডিয়া নয়, মুলত একটা ধর্মের আলোচনা করেছেন। যেখানে, প্রশ্ন করাটা একটা ব্লাসফেমি বা মূর্খতা এবং খুব অল্প সময়েই আপনার ক্রিটিকাল প্রশ্নের কারণে আপনি ব্যক্তি আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।

এবং মার্ক্সিস্টদের সাথে আলোচনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, মার্ক্সিজম তাদের কাছে প্রসেস। এন্ড ডেস্টিনেশান না। কিন্ত আমরা এন্ড ডেস্টিনেশানে যে মডেল আছে এবং রিয়ালি প্র্যাক্টিকালি যে মডেলগুলো মার্ক্সিজম থেকে উদ্ভূত হয়েছে তাকেই ক্রিটিক করি। কিন্ত তারা আমাদের প্রসেসের আলোচনায় নিয়ে আসতে চায়। এমনকী বাংলাদেশের কন্টেম্পরারি লেফট লিটারাচের দিস্তার পর দিস্তা খরচ হয় এই এন্ড ডেস্টিনেশানকে বাদ দিয়ে প্রসেসের এনালিসিস নিয়ে। কিন্ত এন্ড মডেলে মারক্সিজম কোথায় পৌছায় এবং তাকে নিয়ে যে বিশ্ব অভিজ্ঞতা সেটাকে তারা বার বার এড়িয়ে যান এবং মার্ক্সিজমকে একটা ইউটোপিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেন, যেটা তিনি নিজেই তার বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আর বিশ্বাস করেন না।

কিন্ত মার্ক্স এবং মার্ক্সিজম একবিংশ শতকের একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ধারনা। কারণ, মার্ক্স যে সাম্যের ধারণাকে মানুষের মনে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যে সমতাভিত্তিক সমাজকে প্রচলনের জন্যে লড়াইয়ের আহবান জানিয়েছেন তা মানবমুক্তির জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয়। এবং আমি মনে করি, মার্ক্সিজমের উল্টোমুখি ধাক্কা যদি না থাকতো বর্তমান বিশ্বের ক্যাপিটালিজ আরো অনেক বেশী নিষ্ঠুর এবং স্বার্থপর হতো। তাই মার্ক্সিজম চেতনার দিক থেকে, প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিন্ত, বিগত ১০০ বছরে বিভিন্ন ধরনের বিপ্লবীদের হাতে লিটারাল মার্ক্সিজম এবং কমিউনিজম এবং তার বিভিন্ন ধরনের বিবর্তিত রূপের প্রয়োগের ফলে বিশ্বের দেশে দেশে কোটি কোটি মানুষকে অমানবিক নির্যাতন, যাতনা এবং মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে।

বিগত একশো বছরে জেনারেশান থেকে জেনারেশান, রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে সংগ্রাম করে, বিপ্লবের মাধ্যমে মার্ক্সিজম কমিউনিজমের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে হয়েছে। এই মুহূর্তে এর কোন উদাহরণ দেয়ার দরকার নাই। কারণ এর অজস্র উদাহরণ রয়েছে, যাদের নাম বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিপীড়কদের সাথে তুলনীয় এবং যাদের হাতে নিপীড়িত মানুষের সংখ্যা এখন ইতিহাসের ফুটনোটে স্টাটিস্কটিস নয়।

অনেস্টলি মারক্সিজমের ক্রিটিক আমার আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। এই আলোচনা আমি একসময়ে বেশকিছু নোট এবং স্ট্যাটাসে করেছি।

কিন্ত মার্ক্সিজমের বিশ্বাস কেন ভ্রান্ত তার একটা ছোট্ট তুলনা করবো, একজন মানব মানবীর উদাহরণ দিয়ে। একটি বিয়ের ফলে একজন মানব এবং মানবীর যে সম্মেলন হয় তা সমাজের সবচেয়ে ছোট ইউনিট।

কিন্ত একটি যুগল যে বাই কন্ট্রাক্ট একসাথে জীবন কাটাতে সম্মত হয়, যে সন্তান জন্মের মধ্যে রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, যে সমাজের বিভিন্নমুখী সুতোয় একজন আরেকজনের সাথে বাধা পরে – কিন্ত তারপরেও একটি যুগল আজীবন একসাথে থেকে, একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষে জীবন কাটাতে পারেনা, বিভিন্নভাবে ডিভোর্সড হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আর আমরা মার্ক্সিজমে আশা করি, রাষ্ট্রের ১৬ কোটি জনগণ এবং বিশ্বের ৬০০ কোটি জনগণ একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষে ইতিহাসের পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে প্রিমিটিভ থেকে, দাস, দাস থেকে সামন্ততন্ত্র, সামন্ততন্ত্র থেকে ক্যাপিটালিজম এবং ক্যাপিটালিজম থেকে সোশ্যালিজম এবং সোশ্যালিজম থেকে কমিউনিজমে পৌঁছাবে যেখানে সবাই একটা স্টেটলেস ক্লাসলেস, প্রপারটিলেস ইউটোপিয়ায় বসবাস করবে।

টু বি অনেস্ট ঊনবিংশ শতকের ইতিহাসে এরচেয়ে বেশী উদ্ভট কোন ধারণা আর আসে নি।

প্রবলেম হচ্ছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মার্ক্সিস্ট এই ধারণায় ক্ষুব্ধ হবে। বলবে, মার্ক্সিজম এমন স্টেটলেস, প্রোপার্টিলেস, ক্লাসলেস সোসাইটির ধারণা তুমি কই পাইলা। ডায়ালেক্টিক ম্যাটেরিলিয়াজম বুঝো আগে, ডাস কাপিটালের ১৩২ নাম্বার পেজের চার নাম্বার প্যারায় কী আছে সেইটা বুঝো। তুমি যেইটা বলছো সেইটা মার্ক্স বলে নাই।

এবং আমি ঠিক এই কারণে মার্ক্স নিয়ে এবং মার্ক্সিজম নিয়ে অন্তত মার্ক্সিস্টদের সাথে কোন বিতর্কে যাই না।

জিয়া হাসান এর ব্লগ   ৫২০ বার পঠিত