নাজিম উদ্দিন

বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ধারাগুলোর মধ্যে হীনযান এবং মহাযান উল্লেখযোগ্য। এছাড়া  বজ্রযান নামে আরেকটি ধারা এক সময় প্রভাবশালী ছিল। আধুনিক সময়ে মহাযানী ধারার অনুসারী বেশি (~৬০%)।  মহাযানী বৌদ্ধ ধর্মের বিখ্যাত এক গ্রন্থের নাম ‘পদ্ম সূত্র’ বা ‘লোটাস সূত্র’।  পদ্মসূত্র থেকে মহাযানী ধারা এবং বুদ্ধের শিক্ষা নিয়ে কিছু রূপক-কাহিনীঃ

 

পুড়ন্ত বাড়ির গল্পঃ

 

এক লোকের অনেকগুলো সন্তান ছিল। তারা সবাই একটা বড় বাড়িতে বাস করত। একদিন লোকটা বাড়ির বাইরে থেকে দেখতে পেল বাড়িতে আগুন ধরেছে। লোকটা বাড়ির ভেতরে তাকিয়ে দেখল তার ছেলেরা মনোযোগ দিয়ে খেলতেছে, তারা আগুন লাগার ব্যাপারটা টের পায়নি। সে তাদের বলল, বাড়িতে আগুন লেগেছে, তোমরা তাড়াতাড়ি বাইরে চলে আসো। কিন্তু ছেলেরা গড়িমসি করতে লাগল। তারা বলল, আগুন কোথায়? আমরা এখানে মজা করছি, এখন বাইরে যাব না। লোকটা তখন ছেলেদের বলল, আমার কাছে নতুন খেলার কার্ড আছে, তোমরা বাইরে আসলে সেগুলো দিয়ে খেলতে পারবে। ছেলেরা তা শুনে নতুন খেলার উত্তেজনায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। বাইরে এসে তারা বাবার কাছে কার্ড দেখতে চাইল। তখন বাবা তাদের বলল, খুব ভাল যে তোমরা পোড়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ, কিন্তু আমার কাছে আসলে কার্ড নেই। তবে আমার কাছে এর চেয়ে ভাল জিনিস আছে, একটা শাদা বলদে টানা গাড়ি। গাড়িতে চড়ে বস, চল আমরা কোথাও ঘুরে আসি।

 

এ নীতি গল্পে বাবা হলো বুদ্ধ, তার ছেলেরা হলো সাধারণ অচেতন মানুষ যারা বাড়ি পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু তাও  আনন্দ-ঠাট্টায় মশগুল। বুদ্ধের প্রস্তাবিত খেলার কার্ড হলো ‘হীনযান’, কোন কোন গল্পে কার্ডের বদলে তিনটি ছোট বাহনের কথা বলা আছে। যারা সংসারের আগুনে দগ্ধ হচ্ছে তাদেরকে বাইরে আনার জন্য প্রলুব্ধ করতে ঐসব কার্ড বা ছোট বাহনের দরকার। কিন্তু একবার তারা পুড়ন্ত বাড়ি থেকে বাইরে আসার পরে বুদ্ধ তাদের জন্য আরো ভাল এবং সুন্দর বাহনের ব্যবস্থা করেন যেটা হলো ‘মহাযান’ ।

 

ভুতুড়ে নগর এবং গুপ্তধনের গল্পঃ

একদল লোক গুপ্তধনের খোঁজে ৫০০ যোজন ভ্রমন করে দূর্গম এক নগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তাদের দলনেতা ছিল জ্ঞানী, অভিজ্ঞ এবং সেই পথ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তি। কিন্তু রাস্তা ছিল খুবই খাড়া এবং বিপদ সংকুল যার ফলে তারা মধ্যপথে উদ্যম হারিয়ে ফেলে ফিরে যেতে চায়। পরিস্থিতি দেখে দলনেতা প্রায় ৩০০ যোজন দূরে তার ক্ষমতা দিয়ে একটা মায়াবী নগর তৈরি করেন যাতে সেখানে বিশ্রাম নিয়ে চাঙা হয়ে দলের সবাই আবার মনোবল ফেরত পায় এবং দূর্গম রাস্তা দিয়ে তারা আবার যাত্রা শুরু করতে দৃঢ় সংকল্প করে। দলনেতা যখন বুঝল যে দলের সবাই যাত্রার ধকল সামলে উঠেছে তখন সে তার মায়াবী নগর ধ্বংস করে ফেলে, আর সবাইকে জানায় গুপ্তধন খুবই সন্নিকটে।

গল্পে মায়াবী শহর হলো যার দ্বারা বুদ্ধ মানুষকে বৌদ্ধত্বের পথে আহবান করেন, আর তাদের গন্তব্য  গুপ্তধনের শহর বৌদ্ধত্বের পথে যাত্রার একমাত্র বাহন। দলনেতা যেভাবে গুপ্তধনের উদ্দেশ্যে যাবার পথে দলের লোকদের জন্য মায়াবী নগরের সৃষ্টি করেন, তেমনি বুদ্ধ মানুষদের এক যানে চড়াবার জন্য প্রথমে তিনযানের কথা বলেন।

 

বিজ্ঞ চিকিৎসক এবং তার অসুস্থ সন্তানদের গল্পঃ

এক চিকিৎসকের অনেকগুলো সন্তান ছিল। একদিন লোকটা যখন বাড়িতে ছিল না তখন তারা  ভুল করে বিষপান করে ফেলে। চিকিৎসক বাড়ি ফিরে সন্তানদের মাটিতে শুয়ে ব্যথায় কাতরাতে দেখে দ্রুত তাদের জন্য সুন্দর বর্ণ,গন্ধ এবং স্বাদের ঔষধ তৈরি করেন। তার কয়েক সন্তান ঔষধ খেয়ে সাথে সাথে ভাল হয়ে যায়। কিন্তু অন্যদের উপর বিষ কাজ করায় তাদের যুক্তি ভোঁতা হয়ে যায়, এবং তারা প্রচন্ড ব্যথা সত্ত্বেও ঔষধ খেতে অস্বীকার করে।  তাদের বাবা তখন একটা কৌশলের আশ্রয় নেয়,তাদেরক ‘আমি এখানে ঔষধ রেখে গেলাম’ বলে দূরে কোথাও রওনা হয়ে যায়। চিকিৎসক  সেখান থেকে তার সন্তানদের কাছে লোক মারফত তার নিজের মৃত্যুর খবর পাঠায়। এরকম ভয়ানক শোকের খবর পেয়ে সন্তানদের চেতনা ফিরে আসে এবং তারা তাদের বাবার রেখে যাওয়া ঔষধ সেবন করে সাথে সাথে আরোগ্য লাভ করে। চিকিৎসক লোকটাও তখন বাড়ি ফেরত আসে।

শাক্যমুনি বলেন,বুদ্ধ হলো ঐ চিকিৎসকের মত। তিনি যদি সব সময় আমাদের নিকটে থাকেন, তাহলে মানুষ তার মর্ম বুঝে না এবং তার শিক্ষাও গ্রহন করে না। তাই বুদ্ধ নিজে নির্বান লাভ করলেও তার মৃত্যুকে মানুষের নির্বানের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

 

তিন প্রকারের ভেষজ উদ্ভিদের গল্পঃ

 

একবার বিশাল এক মেঘের স্তম্ভ সারা দুনিয়াকে ঢেকে ফেলে,তারপর বৃষ্টি হয়ে নেমে নির্বিচারে ঘাস, লতা-পাতা, গুল্ম, বৃক্ষ সবাইকে জীবনদায়িনী পানি দিয়ে সঞ্জীবিত করে। যদিও বৃষ্টি সবার জন্য সমান, কিন্তু বৃক্ষ, গুল্ম আর ঔষধি গাছেরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সেটা শোষণ করে তাদের প্রকৃতি অনুযায়ী ছোট থেকে বড় নানা আকার ধারণ করে। তেমনি ভাবে বুদ্ধ নিরপেক্ষভাবে সবার জন্য তার শিক্ষাকে বর্ণনা করেন, কিন্তু প্রত্যেকে তার নিজস্ব ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী সেটা গ্রহন করতে পারে।

 

গল্পের তিন ধরনের ভাল,মাঝারি আর নিম্নমানের ঔষধি গাছের কথা বলা আছে। আর বড় এবং ছোট এ দু’জাতের গাছের কথা বলা আছে। এক ব্যাখ্যা মতে নিম্নমানের ঔষধি গাছ হলো সাধারণ মানুষ এবং জড় বস্তু, মাঝারি গাছ মানে দুই যানের যাত্রী। আর ভাল ঔষধি গাছ, ছোট ও বড় গাছ হলো বোধিসত্ত্ব।

 

ধনী লোক এবং তার গরীব সন্তানের গল্পঃ

 

এক বিরাট বড়লোকের ছেলে ছোটবেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যায়।  তারপর পঞ্চাশ বছর সে চরম দারিদ্র্যের মাঝে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, কায়িক শ্রমের মাধ্যমে  তার জীবিকা নির্বাহ করে।  ঘটনাক্রমে  একদিন সে তার বাবার প্রাসাদে এসে হাজির হয়। বৃদ্ধ বাবা ছেলেকে দেখে চিনতে পেরে খুব খুশি হয়, তাকে তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে যেতে চান। ছেলে কিন্তু বাবাকে চিনতে পারে না, উলটো বৃদ্ধের ধন-সম্পত্তি, প্রভাব-প্রতিপত্তি  দেখে সে ভয়ে পালিয়ে যায়। ছেলেকে ফিরিয়ে আনার জন্য বৃদ্ধ দূত পাঠান। কিন্তু দূতকে দেখে ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে, সে  মনে করে দূত তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে এসেছে। এটা শুনে বৃদ্ধ নতুন ফন্দি আঁটেন, ছেলেকে মেথড়ের কাজ করার প্রস্তাব দিয়ে তার বিশ্বস্ত দুই ভৃত্যকে ছদ্মবেশে পাঠান। ছেলে স্বচ্ছন্দে সে কাজ গ্রহন করে। কিছুদিন পরে বৃদ্ধ নিজেও ময়লা কাপড় পরে ছেলের সাথে মিশেন। তাকে বলেন সে চাইলে তার এখানে যতদিন খুশি কাজ করতে পারবে, তিনি তার সাথে নিজের ছেলের মত ব্যবহার করবেন। এভাবে ক্রমাগত বিশ বছর ছেলের তার বাবার বাড়িতে মেথড়ের কাজ করে এবং ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।

 

ধনী লোকটা তখন তাকে তার সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন, এবং সে আস্তে আস্তে বৃদ্ধের ব্যবসা-বাণিজ্য বুঝে ওঠে। তারপরে এক সময় বৃদ্ধের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে। বৃদ্ধ তখন সবাইকে ডেকে নিয়ে এসে ঘোষণা করেন তার বাড়ির এ চাকর আসলে তার নিজের সন্তান এবং সবার সামনে ছেলেকে তার সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করেন।

এ গল্পে বৃদ্ধ ধনী লোকটি হলো বুদ্ধ, যার ইচ্ছা হলো সবাই যাতে তার মত নির্বাণ লাভ করে, বৃদ্ধ যেমন চায় তার ছেলে যেন তার সকল সম্পত্তির মালিক হয়। গরীব ছেলেটি হলো সাধারন মানুষের প্রতীক, যারা কোন যানে না চড়ে যথেচ্ছা ঘুরাফিরা করে সময় নষ্ট করছে। তাদেরকে আলোর পথে আনার জন্যে বুদ্ধ তাদের যথোপযুক্ত কাজে নিয়োজিত করেন, বৃদ্ধ যেমন তার ছেলেকে ছোট কাজ দিয়ে শুরু করিয়ে পরে বড় দায়িত্ব দেন। বুদ্ধও তেমনি যথাক্রমে উচ্চতর শিক্ষা এবং জ্ঞানের মাধ্যমে পদ্ম সূত্রে বর্ণিত বুদ্ধত্বের দিকে পরিচালিত করেন।

 

কোটের ভেতরে লুকানো মণির গল্পঃ

 

এক গরীব লোক তার এক ধনী বন্ধুর বাড়ীতে দেখা করতে যায়। সেখানে মদপান করে সে মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ধনী বন্ধুটিকে ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হবে, যাবার আগে সে তার বন্ধুর গায়ের জামার সেলাইয়ের ফাঁকে এক মূল্যবান মণি গেঁথে দেয়। গরীব লোকটা ঘুম থেকে উঠার পর তার জামায় লাগানো মূল্যবান মণি সম্বন্ধে কিছুই না জেনে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করে। বাড়িতে ফিরে সে আগের মত অনেক কষ্ট সহ্য করে খাবার-দাবার, পোষাক-আশান জোগাড় করে। সব সময় দারিদ্র্যের মধ্যে থাকায় তার যা সহায়-সম্বল ছিল তাতেই সে সন্তুষ্ট ছিল।  কিছুকাল পরে আবার তার ধনী বন্ধুর সাথে দেখা হলে সে তখনও তার দারিদ্র্য দেখে খুব তাজ্জব হয় এবং তাকে তারা জামার সেলাইয়ে লুকানো মূল্যবান মণিটি দেখায়। গরীব লোকটি প্রথমবারের মত মণিটির মালিক হওয়ায় তার খুব আনন্দ হয়।  এ গল্পের ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়, গরীব লোকটি যেমন তার কাছে সম্পদ সম্পর্কে অজ্ঞান ছিল তেমনি বুদ্ধের শিষ্যেরা জানে না যে বুদ্ধ তাদের মধ্যে অসীম সম্পদের এক চারা রোপন করে দিয়েছেন, কিন্তু তারা ছোট-খাট শিক্ষা এবং সাময়িক মুক্তির স্বাদেই সন্তুষ্ট হয়ে আছে।

 

খোঁপার ভেতরে লুকানো মণির গল্পঃ

 

এক যুদ্ধের পরে কোন এক চক্রবর্তী রাজা তার যোদ্ধাদের বাড়ি, ফসলী জমি, সোনা, রুপা ইত্যাদি বিভিন্ন কিছু দিয়ে পুরষ্কৃত করেন। কিন্তু রাজার চুলের খোঁপায় থাকা এক উজ্জ্বল মণি ছিল সেটা রাজা কাউকে দেননি। সবার শেষে রাজা তার চুল থেকে মণিটি বের করে সবচেয়ে সাহসী সৈন্যকে সেটা দেন। শাক্যমুনি রাজার খোঁপার মণিটিকে পদ্ম সূত্রের সাথে তুলনা করেন যেটা প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষার সময়  বুদ্ধ নিজের কাছে লুকিয়ে রাখেন।