অর্পিতা রায়চৌধুরী
মূল বইয়ের প্রচ্ছদ
বাংলা অনুবাদ বইয়ের প্রচ্ছদ

এখানে ক্লিক করে ডাউনলোড করুন

 

শিরোনাম: ইসলাম, সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

লেখক: ক্যারন আর্মস্ট্রং

অনুবাদ: শওকত হোসেন

 

ক্যারেন আর্মস্ট্রং জন্মসূত্রে রোমান ক্যাথলিক, অক্সফোর্ড থেকে আরবিতে ডিগ্রিধারী, এসোসিয়েশন অফ মুসলিম সোশ্যাল সায়েন্সের সম্মানিত সদস্য, বর্তমানে জুডাইজম বিষয়ের শিক্ষক।

বইটি মাত্র ২১১ পাতার হলেও এখানে মুসলিম ইতিহাসের মোটামুটি বর্ণনা পাওয়া যায়।

বইটিতে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে নবি মুহাম্মদ কুরানের প্রত্যাদেশ পাবার পর থেকে ২০০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একটা কালানুক্রমিক সূচি রয়েছে। যা থেকে ইসলামের ক্রমবিকাশের একটি কালানুক্রমিক ধারণা পাওয়া যাবে।

৬০০ শতাব্দী:

৬১০ খ্রিস্টাব্দে পয়গম্বর মুহাম্মদ কুরানের প্রত্যাদেশ পান, তারপর এই শতাব্দীতেই মক্কা, মদিনা, জেরুসালেম অধিকার, নব্য মুসলিমদের গৃহযুদ্ধ, শিয়া পন্থীদের উৎপত্তি, খলিফা তন্ত্রের উত্থান।

৭০০ শতাব্দী:

ইসলাম সাম্রাজ্যের বিস্তার, শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ, ধর্মান্তরকরণের সূচনা, হারুন আল রশিদের আবির্ভাব, বাগদাদ কেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশ।

৮০০ শতাব্দী:

বসরাতে শিয়া বিদ্রোহ, বিভিন্ন শিয়া শাসকদের শাসন।

৯০০ শতাব্দী:

খলিফাদের আস্তে আস্তে ক্ষমতাহীন হয়ে যাওয়া, সংস্কৃতি কেন্দ্র হিসেবে কর্ডোভার উত্থান।

১০০০ শতাব্দী:

ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যের আবির্ভাব, ক্রিশ্চিয়ান এবং মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষ, সেলজুক সাম্রাজ্য।

১১০০ শতাব্দী:

সালাদিনের আবির্ভাব, ক্রুসেড, দিল্লিতে মুসলিমদের প্রবেশ।

১২০০ শতাব্দী:

দিল্লিতে সুলতানি শাসন, মোঙ্গলদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, মঙ্গোল হানায় বাগদাদের ধ্বংস।

১৩০০ শতাব্দী:

তিমুর লং, অটোমান সাম্রাজ্যের ইউরোপ আক্রমণ।

১৪০০ শতাব্দী:

মুসলিমদের কন্সটান্টিনোপল দখল এবং ইস্তানবুলের জন্ম যা পরবর্তীকালে অটোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র, ক্যাথলিকদের গ্রানাডা জয়।

১৫০০ শতাব্দী:

সাফাভীয় সুফী গোষ্ঠীর ইরান জয়, ইরানে শিয়া রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে স্বীকৃত, খোরাসান শিয়াদের দখলে, অটোমান এবং সাফাভীয় সুফী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ, অটোমানদের হাঙ্গেরি জয়, ভারতে আকবরের রাজত্ব। রাশিয়ানদের মোঙ্গলদের ওপর আক্রমণ।

১৬০০ শতাব্দী:

অটোমানদের ভেনিস এবং ক্রিট জয়, শিয়াদের কাছ থেকে ইরাক পুনরুদ্ধার, ভিয়েনা আক্রমণ আবার ব্যর্থ, আওরঙ্গজেবের পরে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের শুরু।

১৭০০ শতাব্দী:

নাদির শাহের আবির্ভাব ও দিল্লি আক্রমণ। শিয়া সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, অটোমানদের শক্তি হ্রাস, ইউরোপের রাজ্য হাতছাড়া হতে শুরু, অটোমানদের বিরুদ্ধে গ্রিক বিদ্রোহ, ফ্রান্সের আলজেরিয়া দখল।

১৮০০ শতাব্দী:

অটোমানদের পতনের শুরু, ব্রিটিশদের সিন্ধু উপত্যকা দখল, অটোমান সাম্রাজ্যে সংখ্যালঘু ক্রিশ্চানদের নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপের শক্তিগুলোর সাথে বিরোধ, সিপাহী বিদ্রোহ, মিসরে ইসমাইল পাশার শাসন, অটোমানদের বিরুদ্ধাচারী ১০০০০-২০০০০ আর্মেনিয় খ্রিস্টান হত্যা। প্রথম জায়নিস্ট সম্মেলন।

১৯০০ শতাব্দী:

ইরানের শাহদের পতন, তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের আবির্ভাব। সৌদি আরবে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠা। ইন্তিফাদা বা প্যালেস্টাইনে গণ অভ্যুথান, সাদ্দাম হোসেন ও ইরাক যুদ্ধ।

২০০০ সাল:

আল কায়দার আমেরিকা আক্রমণ ও আফগানিস্তানে আক্রমণ শুরু।

ক্যারন আর্মস্ট্রং

বইটিতে উল্লেখ রয়েছে কী পরিস্থিতির মধ্যে নবি মুহাম্মদের আবির্ভাব হয়। দুটি প্রধান কারণে, একটি হচ্ছে সামাজিক অসাম্য, মুহাম্মদ লক্ষ করেছিলেন যে তাঁর নিজের কুরাইশ গোত্রের মানুষেরা (এবং সামগ্রিকভাবে আরবরা) গোত্রীয় মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছিল, আরেকটি কারণ হলো যে তাঁর মনে হচ্ছিলো বাইজেন্টাইন এবং পারসিয়ান সাম্রাজ্যের জুডাইজম এবং ক্রিশ্চিয়ান একেশ্বরবাদী দর্শন তৎকালীন আরবদের পৌত্তলিক ধ্যানধারণা থেকে বেশি উন্নততর।

প্রত্যাদেশ পাওয়ার প্রায় ২ বছর পর মুহাম্মদ তাঁর শাসনব্যবস্থা প্রচার করতে শুরু করেন। প্রথমে তিনি নিজেও জানতেন না যে তিনি একটি নতুন ধর্মের প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন। তিনি বরং আরবদের কাছে নিজেকে একজন পয়গম্বর হিসেবেই পরিগণিত হতে চেয়েছিলেন, যা আরবে এর আগে তাদের ছিল না। কুরানের মধ্যদিয়ে তিনি তাঁর বাণী প্রচার করতে শুরু করেন। কুরান বলে, প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস আর কাজ করছে না, কিন্তু কুরান একেশ্বরবাদের পক্ষে কোনো দার্শনিক যুক্তি তুলে ধরেনি; শুধু বলেছে এটাই সেই আদি ধর্মবিশ্বাস যা অতীতের পয়গম্বরগণ গোটা মানবজাতির কাছে প্রচার করে গেছেন।

আস্তে আস্তে নব্য মুসলিমদের সাথে অন্যদের বিরোধ শুরু হয় এবং মুহাম্মদ মক্কা থেকে সরে গিয়ে মদিনাতে থাকতে শুরু করেন, মুহাম্মদ তখনো পর্যন্ত জুডাইজমের সাথেই চলার পক্ষপাতি ছিলেন এবং এর জন্যে জুডাইজমের অনেক কিছু ইসলামে যোগ করেন যেমন শুক্রবারে প্রার্থনা (ইহুদিরা ওইদিন সাবাথ করে), তাছাড়াও নোয়া ও মোজেসের মতো পয়গম্বরের কাহিনী কুরানে উল্লেখ ইত্যাদি যাতে ইসলামকে জুডাইজমের সাথে আরো মেলানো যায়।

কিন্তু ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইহুদিরা ইসলামের সঙ্গে সমন্বয়ে আসবে না এবং তারা মুহাম্মদকে পয়গম্বর হিসেবে স্বীকারও করবে না। এই সিদ্ধান্তে তিনি দুঃখিত হন। এবং জানুয়ারি ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক সিদ্ধান্ত নেন- প্রার্থনার সময় সবাইকে উল্টোদিকে ঘোরার আদেশ দেন, ফলে জেরুজালেমের পরিবর্তে মক্কার দিকে ফিরে প্রার্থনা করে তারা, এখান থেকেই পৃথক ইসলাম ধর্মের শুরু হয় বলা যায়। যেখানে জেরুজালেমের পরিবর্তে কাবাই হয়ে ওঠে মুসলিমদের প্রধান তীর্থস্থান।

আরও কৌতূহলকর তথ্য হলো লেখক তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন- মুহাম্মদ জুডাইজম এবং খ্রিস্টান ধর্মের মূল বক্তব্যের সাথে একমত ছিলেন। তার মানে তিনি প্রথমদিকে নতুন ধর্ম প্রচার না করে জুডাইজমের সংস্কার করতেই আগ্রহী ছিলেন!

আরেকটা ভাবার বিষয় আছে, জেরুজালেম মুসলিমদের নিকট কী কারণে পবিত্র, তারও একটা ধারণা এখান থেকে পাওয়া যায়। কুরানে মুসলিমদের ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বিশ্বাসকে মর্যাদা দিতে বলা হয়েছে। যাদের বলা হয় আহলে আল কিতাব এবং জেরুজালেম এদের কাছে পূর্ব হতেই পবিত্রনগরী ছিল। তাই তা মুসলিমদের নিকটও পবিত্র বলে গণ্য হতে থাকে।

এরপর শুরু হয় ইসলামের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের অভিযান এবং মুহাম্মদের মৃত্যুর পর খলিফাতন্ত্রের উদ্ভব। তার সাথে গৃহযুদ্ধ, একজন খলিফার হাতে রাজনৈতিক এবং ধর্মনৈতিক ক্ষমতা থাকার কুফল এবং ইসলামের সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া, এই ব্যাপারগুলো এই বইটিতে বিস্তারিতভাবে লিখিত আছে।

বইটিতে লেখক অনেক বিতর্কিত ব্যাপার এড়িয়ে গেলেও কিছু উঠে এসেছে। যেমন বহুবিবাহ, বহুগামিতা তখনকার আরবে স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল, কিন্তু মক্কাতে থাকাকালীন মুহাম্মদ কেবল খাদিজাকেই বিয়ে করেন। পরে তিনি অনেক নারীকে পরিগ্রহ করেন যার রহস্যজনক। তিনি তাঁর পত্নীদের মর্যাদা দিতেন এবং তাঁদের পরামর্শও গ্রহণ করতেন, তবে মনে হয় সপত্নী কলহ তিনিও এড়াতে পারেননি।

বইটিতে ইসলামের উদ্ভবের আর্থ-সামাজিক কারণ এবং রাজনৈতিক কারণ মোটামুটিভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এছাড়াও মুসলিমদের মধ্যে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব শুরু হবার কারণ, যার ফলে শিয়া-সুন্নি বিরোধের শুরু; এবং আরো নানা অনেক গোষ্ঠীর উদ্ভবের কারণ, সুফী আন্দোলন ইত্যাদি ব্যাপারগুলোও উল্লেখ রয়েছে। কখন থেকে হাদিস লেখা শুরু হতে থাকে, হারুন অল রশিদের আমল থেকে শরিয়তের সংকলন এবং শরীয়ত আইনের ক্রমবিকাশ ইত্যাদি সম্পর্কেও জানা যায়।

আরও জানা যায় ইসলামের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কীভাবে ক্রমেই জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণে শাসকদের উৎসাহিত করে তোলে। কারণ ইসলাম সবসময়েই রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। প্রথমদিকের শাসকরা ছিলেন ধর্মগুরু এবং পরেরদিকে ধর্মগুরুরাই রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। তাই ধর্মান্তরিতকরণের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ হতো।

বইটির দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পাঠে জানা যাবে, কীভাবে ইসলামের নীতিমালা আর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়েছিল। কীভাবে ইসলামের সর্বসাম্য নীতি দেশ চালানোর পক্ষে কিছু বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করেছিল, খলিফারা সকলেই এই সমস্যায় ভুগেছেন, যারা ধার্মিকতা মেনে চলেছেন তাদের পক্ষে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল (দ্বিতীয় উমর ৭১৭-২০) আবার যারা বজ্রমুষ্ঠিতে শাসন করার চেষ্টা করেছেন (হিশাম ৭২৪-৪৩) তারা ধর্মীয়ভাবে অপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

তৃতীয় এবং চতুর্থ পরিচ্ছেদ পাঠে জানা যায় ইসলামের তুঙ্গ সময় এবং এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং বিজয় সম্পর্কে।

পঞ্চম পরিচ্ছদে রয়েছে আধুনিক পশ্চিমী সভ্যতার উদয় এবং ইসলামের প্রতিক্রিয়া। উল্লেখ্য যে, সেটা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের সময়, কিন্তু তৎকালীন কৃষিভিত্তিক ইসলামি সভ্যতার পেছনে হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস থাকা সত্বেও ইউরোপের প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। তাছাড়া কৃষিভিত্তিক সভ্যতা আর প্রযুক্তিভিত্তিক সভ্যতার সংস্কৃতিও হয়ে গেছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। এই প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতায় ধর্ম ক্রমশঃ পেছনের সারিতে চলে যেতে থাকে। এই শিল্পায়নকৃত অর্থনীতির দরকার ছিল নতুন নতুন বাজার এবং কাঁচামালের যোগান, তারজন্য পশ্চিমী আগ্রাসন শুরু হয় এবং নতুন নতুন উপনিবেশের পত্তন হতে শুরু করে। এই উপনিবেশ স্থাপন কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে অস্বস্থিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে এবং তার সাথে শুরু হয় ভয় এবং সন্দেহের উৎপত্তি।

এমন নয় যে, মুসলিম শাসকরা আধুনিকীকরণের চেষ্টা করেননি। যেমন মিশরের পাশা মুহাম্মদ আলী। কিন্তু তাতে প্রধানত বাধা আসতে থাকে উলামাগণের কাছ থেকে যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় পেতে শুরু করে। এর ওপর যোগ হয় ইউরোপিয়ানদের নানাবিধ প্রচার-প্রপাগান্ডা। তারা নিজেরদের সভ্যতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করে যেন ইউরোপ বরাবরই সভ্যতার পীঠস্থান ছিল। তারা ভুলে যায় যে, ইসলামিক সভ্যতার তুঙ্গকালে ইউরোপের কী অবস্থা ছিল। এইসময়ে মুসলিমদের উচিত ছিল নিজেদের অতীত গরিমায় আচ্ছন্ন না থেকে সেই সভ্যতার আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার ভালো দিকগুলো গ্রহণ করা। কিন্তু তা না হয়ে ইসলামি সভ্যতা ক্রমশ নিজেরদের গুটিয়ে নিতে থাকে এবং ধর্মকে ঢাল করে সবকিছু প্রতিহত করার চেষ্টা করতে থাকে।

মাঝে মাঝে কিছু সমাজসংস্কারক চেষ্টা করলেও তার কোনো দীর্ঘস্থায়ী সুফল হয়নি। পাশ্চাত্যরা ধর্মকে যতোই ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গেছে, মুসলিমরা ততোই সেটাকে সামাজিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আর এই সামাজিকতা কোনো দেশভিত্তিক নয়, মুসলিমরা নিজেদের দারুল ইসলামের সদস্য হিসেবেই ভাবে। এর ফলে যদিও সমগ্র মুসলিম সমাজে এক সর্বব্যাপী মানসিক ঐক্য বিরাজ করে, কিন্তু দেশভিত্তিক জাতীয় চেতনার পক্ষে সেটা সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে বলেই মনে হয়।

গণতন্ত্রও সমস্যার সৃষ্টি করে, পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ‘সরকার জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য‘ কিন্তু ইসলামে জনগণ নয় ঈশ্বর কোনো সরকারের বৈধতা দান করেন। তাই মানুষের উন্নত অবস্থান বহুঈশ্বরবাদ বলে মনে হতে পারে। সুতরাং ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফেলে দেবে এমন গণতান্ত্রিক জাতিরাষ্ট্র গঠন মুসলিমদের পক্ষে কঠিন। আর এই ব্যাপারটা সৃষ্টি করেছে আরো গোঁড়ামির, যেমন সৌদি আরবে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সংবিধান অপ্রয়োজনীয়; কারণ সরকারের ভিত্তি হচ্ছে কুরানের আক্ষরিক পাঠ, কিন্তু কুরানে আইনের পরিমাণ খুবই কম। তাই বাস্তবক্ষেত্রে নানারকম অসাম্য দেখা যায়, যেমন নারীদের বোরখার আড়ালে নিয়ে যাওয়া এবং নানান বিধিনিষেধ যা নবি মুহাম্মদের আমলে ছিলই না। তারপর শাসকদের বিপুল বিত্তও ইসলামের আদর্শের বিরোধী।

১৮০০ শতক থেকে পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থান এবং রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে মুসলিমদের আরো নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে শুরু করে। তারওপর মধ্য এশিয়াতে কোনো আধুনিক গণতন্ত্রভিত্তিক মুসলিম রাষ্ট্রই সফল হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার সৃষ্টি করতে থাকে, পরিণামে মুসলিম মৌলবাদের উত্থান।

বইটিতে মৌলবাদের ওপরেও একটি সম্পূর্ণ পরিচ্ছেদ আছে। যেখানে ইসলামি মৌলবাদের উৎপত্তির বিভিন্ন কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি এটাও দেখানো হয়েছে যে, এমন নয় যে, কেবল ইসলামেই মৌলবাদীদের আনাগোনা রয়েছে।

সকলে বইটি পড়তে পারেন। ধন্যবাদ।