সুমনা চৌধুরী

মাননীয় স্মৃতি ইরানিজী,

প্রথমত, আমি আপনার ভাষা হিন্দি বুঝি বা বুঝে নেই। আশা করি আপনিও আমার ভাষা বুঝে নেবেন বা কেউ না কেউ আপনাকে ঠিক আপনার ভাষায় ট্রান্সলেট করে দেবে। যাইহোক, যে কারণে আপনাকে উদ্দেশ করা সেটা হল, ‘সবরীমালা মন্দিরে প্রবেশ‘ নিয়ে আপনার মন্তব্য।

না, সবরীমালা মন্দিরে নারীরা ঢুকবে কী ঢুকবে না সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যাথা নেই। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি পৃথিবীর প্রত্যেকটা ধর্ম, ধর্মীয় প্রথা নারীর বিপক্ষে বানানো। নারী যেদিন ধর্মের বর্ম নিজের শরীর থেকে খুলতে পারবে সেদিন আলাদা করে আর কোনো লড়াই টড়াইয়ের প্রয়োজন পড়বে না। এবং এই যে নারীরা মন্দিরে প্রবেশাধিকার চাইছে সেটার সাথে আর যাই হোক নারীবাদ, নারী অধিকার কোনোভাবেই রিলেট করতে পারি না। ঠিক যেমন পতির মঙ্গল কামনায় করোয়া চৌথ বা সিঁদুর খেলায় মেতে থাকা নারীর নিজেকে বঞ্চিত মনে হওয়াকে বেমানান লাগে অথবা আপাদমস্তক হিজাবে ঢাকা ইসলামে গভীর বিশ্বাসী নারীর ‘খুলা বিয়ে‘বা ‘ইন্সট্যান্ট তিনতালাকে‘ নিজেকে বঞ্চিত মনে করাকে বেমানান লাগে। সুতরাং এসব মন্দির ফন্দিরে প্রবেশাধিকার নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা ট্যাথা নেই।

আমার সমস্যা অন্য জায়গায়। আপনি সম্প্রতি একটা মন্তব্য করেছেন,

“ঋতুস্রাবের রক্তে ভেজা স্যানিটারি ন্যাপকিন পরে কি আপনি বন্ধুর বাড়িতে যান? তাহলে, মন্দিরেই বা যাবেন কেন?”

তারপর আরোও বলেছেন,

“প্রার্থনার অধিকার প্রত্যেকের আছে, কিন্তু অসম্মানের অধিকার কারও নেই”।

মাননীয় স্মৃতি ইরানি, আপনি এই মন্তব্য এমন এক দেশে দাঁড়িয়ে বলেছেন যে দেশে ৬৮% মহিলা এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না, অপরিষ্কার কাপড়, ছাই, তুষ ইত্যাদি ব্যবহার করে জরায়ু ক্যান্সার থেকে প্রস্রাবের দ্বারের সংক্রমণে ভোগেন। আপনি বোধহয় শিক্ষা দফতরেও কিছুদিন ছিলেন। তাহলে আপনার জানার কথা ছিল এদেশে ঋতুকালীন ৬৪% মেয়েশিশু নিরাপত্তাহীনতা আর ‘লজ্জা’র কারণে স্কুল ড্রপআউট হয়। ৭৫%  নারী অপুষ্টি আর রক্তাপ্লতায় ভুগে। কেন? কারণ সমস্ত ভারতীয় সমাজ জুড়ে পিরিয়ডকে অশূচী, নোংরা, অপবিত্র, লুকানো জিনিশ ভাবা হয় বলে। আপনি এই ভাবনার মূকুটে আরেকটা পালক যোগ করলেন!

আপনি এমন একটা সময় এই মন্তব্য করেছেন, যখন কয়েকহাজার মেয়ে এবং ছেলে পিরিয়ড নামক সামাজিক ট্যাবুটাকে দূর করতে গ্রাম গ্রামান্তরে, চা বাগান থেকে স্কুলে কাজ করে যাচ্ছে। রোজ হাজারো প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়াচ্ছে এই কাজ করতে গিয়ে। এদেশের রাজনীতিতে অথবা ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়ার সুযোগ খুব কম সংখ্যক নারী পান। এবং যেসব নারীরা সেই সুযোগ পান তাদের দিকে আশায় চেয়ে থাকেন সমস্ত ভারতীয় শিক্ষিত-অশিক্ষিত নারী। আপনার এই মন্তব্যে বেশীরভাগ নারী নিজেকে হয়তো আরো অশূচী বলে মানবেন এবং এই যে কু-শিক্ষা আপনি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিলেন তার ফল ভোগ করবে তারা, যারা এই অশূচীতা দূর করার লক্ষ্যে সারাদেশ জুড়ে কাজ করছে এইমূহূর্তে।

আপনাকে মনে করিয়ে দিই, দেশটা একতা কাপুরের মেগা সিরিয়ালের কোন স্ক্রিপ্ট নয়, যে দর্শককে যা তা গিলিয়ে দেওয়া যায়। এবং আপনিও তুলসীর ভুমিকায় অভিনয় করছেন না আর। তাই তুলসী সিনড্রোম থেকে বেরিয়ে আসুন। আপনি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। আপনার দায়-দায়িত্ব রয়েছে এদেশের জনগণের প্রতি। এবং যে সংবিধান ছুঁয়ে আপনি শপথ গ্রহণ করেছেন, সেই সংবিধানেই সায়েন্টেফিক টেম্পারামেন্ট এর কথা লেখা। কুসংস্কারে ডুবে থাকা এই দেশকে আরো কুসংস্কারের দিকে নিয়ে যাওয়ার কোন অধিকার আপনার নেই।

মাননীয় স্মৃতি ইরানি,

শুনেছি আপনার সন্তানও আছে। তারমানে আপনারও পিরিয়ড হয়। তাহলে পিরিয়ড কী এবং কেন হয় সেটা আপনার জানার কথা। মাধ্যমিকের জীবন বিজ্ঞান বইয়েও কিছুটা ব্যাখ্যা আছে তার। পড়েছেন নিশ্চয়? যদি তুলসী সিনড্রমে আঁটকে সব ভুলে গিয়ে থাকেন তবে আপনাকে মনে করিয়ে দিই, যে সহজ স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াকে আপনি নোংরা ভাবছেন, যাকে অসম্মানের বলে আখ্যা দিচ্ছেন, সেটি না ঘটলে এই পৃথিবীতে বংশ বিস্তারের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতো! আপনার পৃথিবীতে আসা এবং সন্তানধারনও! নারী প্রতিমাসে রক্তাক্ত হয় বলেই এই পৃথিবী চলছে, এখনও মানুষ জন্মাচ্ছে৷ সুতরাং সেটাকে অশূচী এবং অসম্মানজনক বলে নিজেকে, নিজের শরীরকে এতোটা ছোট নাইবা করলেন!

আমি রক্তমাখা ন্যাপকিন নিয়েই স্কুল যাই। বাজার যাই। বন্ধুদের বাড়ি যাই। আড্ডা দিই। দূরপাল্লার জার্নি করি। হঠাৎ প্যাড প্রয়োজন পড়লে বন্ধুকে দিয়ে তা আনাতেও পারি। কিংবা পিরিয়ড চলাকালীন খুব হেভি ফ্লো হলে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে তাকে নিশ্চিন্তে বলতেও পারি, ‘চেইঞ্জ করবো‘। বন্ধুরা কিচ্ছু মনে করে না, বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। বন্ধুর বাড়িই সবচেয়ে কমফর্ট্যাবল জায়গা সব মেয়ের কাছে এক্ষেত্রে। আপনার বন্ধুভাগ্য দেখে আমার চুড়ান্ত দুঃখ হচ্ছে মাননীয় স্মৃতি ইরানি।

আশা করবো রোহিত ভেমুলা কেসে সংসদের সেই চূড়ান্ত ড্রামার মতো আর কোন ড্রামা (মুখ বাঁধা ছবি টবি দিয়ে) না করে, নিঃশর্ত ক্ষমা চাইবেন আপনার এই চূড়ান্ত লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্তব্যের জন্য।

#Menstruation_is_not_dirty_or_impure

#My_womb_is_home_to_the_divine.