রামায়ণবার্ত্তিক মানে হল রামায়ণের বার্ত্তিক। রামায়ণ মানে ‘আনন্দের পথ‘, রামায়ণ নামক মহাকাব্য। বার্ত্তিক শব্দের মানে হল ‘অনর্থবারণোপায়‘। আজকাল রামায়ণ নিয়ে নানা রকম অপব্যাখ্যা চলে। হিন্দুত্ববাদীরা রাম, রাবণ, সীতা ইত্যাদিকে ঐতিহাসিক চরিত্র বলে মনে করে এবং রামায়ণ নিয়ে নানা রকম রাজনীতি করে। ওদের বিপরীতে বহু যুক্তিবাদী ও নাস্তিক মানুষ রামায়ণকে ইতিহাস বলে মানতেই চান না, রামায়ণ থেকে রস এবং রসদও ঠিকমতো নিতে পারেন না। এমনকি অনেকে রাময়ণকে উল্টা বুঝেন, যথা রামকে ভিলেন আর রাবণকে হিরো বানানোর চেষ্টা করেন। রামায়ণ নিয়ে সবরকম ভুল ধারণা (অনর্থ) দূর হোক, ‘রামায়নবার্ত্তিক‘ নিবন্ধ রচনার মূলে এই আমার উদ্দেশ্য। আমি এখানে রামায়ণের অনর্থ বারণ করার চেষ্টা করেছি, তাই এই রচনার নাম দিয়েছি ‘রামায়ণ বার্ত্তিক‘। এই রচনাটি পয়ার ছন্দে লিখিত এবং তার সাথে গদ্যে লিখিত আলোচনাও আছে। পয়ারগুলি মৎপ্রণীত ‘ক্রিয়াভিত্তিক রামায়ণ‘ গ্রন্থ (গ্রন্থটি এখনও মুদ্রিত হয়নি) থেকে সঙ্কলিত হয়েছে। এই পয়ারগুলিতে ভাষাবিদ কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীকে অনুসরণ করে ব্যাকরণ ও নিরুক্তের আলোয় রামায়ণের প্রকৃত মর্ম্ম উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা যুক্তিবাদী মানুষদের রামায়ণের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। প্রথম দুটি পয়ার বাদ দিলে বাকী সবকটি পয়ার মৎপ্রণীত ‘ক্রিয়াভিত্তিক রামায়ণ‘ গ্রন্থের উপসংহার ভাগে আছে।

রামায়ণ বুঝতে গিয়ে মনে কিছু প্রশ্ন আসে। বাল্মীকি কারা? তারা রামের জন্মের আগে রামায়ণ লিখলেন কী করে? ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসক রাবণকে রাম বধ করলেন কেন? রাম ও রাবণ কী ঐতিহাসিক চরিত্র? আজকের দিনে বাল্মীকিরা মেথরের কাজ করেন কেন? বর্ত্তমান ‘রামায়ণ বার্ত্তিক‘ রচনায় আমি এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করছি। পাঠক এই প্রশ্নগুলি মাথায় রেখে ‘রামায়ণবার্ত্তিক‘ পড়ুন।

বল আর কীক জুড়ে দাও যদি তাকে বল্মীক কয়,
বলপূর্ব্বক খাত মৃত্তিকা বল্মীকে জমা হয়।
উহা কৃমি আর মুষিকের দ্বারা কৃত মৃত্তিকাচয়;
উইঢিবিকেও বল্মীক বলি, উইপোকা সেথা রয়।

বাল্মীকি মানে বল্মীকভব, বল্মীক থেকে হয়;
সেই বল্মীক বল দিয়ে করা মৃত্তিকাস্তূপ নয়।
ঘটনার পর ঘটনা জমিয়া হয়ে যায় স্তূপাকার;
বাল্মীকি থাকে তাহার ভিতর, ইতিহাস গড়ে তার।

আদি কবি ওই বাল্মীকিগণ ইতিহাস লিখে যায়,
ওরা তমসার তীরে বসে বসে রামায়ণ গান গায়।
রাম আসিবার পূর্ব্বেই ওরা লিখেছিল রামায়ণ;
তার ফলে গেল রাবণের রাজ, এল পরিবর্ত্তন।

ভারত সমাজে বৈদিক যুগ হলে অধঃপতিত
বৌদ্ধযুগেতে রামরাজত্ব করেছিল বহু হিত।
ধীরে ধীরে ওই সরযূ নদীতে বয়ে যায় বহু জল;
বৌদ্ধরা যায়, হিন্দুরা আসে, হয় বিপরীত ফল।

হিন্দুয়ুগেতে রামলক্ষ্মণ হয়ে যায় হরিজন,
‘’হরেরাম, হরেকৃষ্ণ’’ বলিয়া করে ওরা কীর্তন।
আদি কবি ওই বাল্মীকিগণ করে মেথরের কাম;
উহাদের একি দুর্গতি হল, হায় হায়, রাম রাম !

গঙ্গা-যমুনা-গোদাবরী দিয়ে বয়ে যায় আরও জল;
রামকাহিনীও মানুষের মনে বয়ে যায় কলকল।
উচ্চ ও নীচ সব লোক মিলে “জয় সীতারাম” গায়,
বাল্মীকিদের দুর্দশা তবু আজিও কাটে না হায়।

রামচন্দ্রকে আজও ভালবাসে রাজনীতিবিদগণ,
ধর্ম্মগুরুরা করেছেন তাকে ব্যবসার মূলধন।
বাল্মীকিগণ ক’রে চলে তবু মলবহনের কাজ;
ব্যাকরণ ভুলে এ মহান দেশে কত দুর্গতি আজ !

শুন মোর প্রিয় রামপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাগণ,
রামমন্দির গড়া ছেড়ে পড় সংস্কৃত ব্যাকরণ।
ফিরাইয়া দাও বাল্মীকিদের হৃত মানসম্মান,
সকলের সুরে সুর মিলাইয়া গাও রামায়ণ গান।

বল ধাতু আর কীক প্রত্যয় জুড়ে বল্মীক শব্দটি নিষ্পন্ন হয় (বল + কীক = বল্মীক) । বল ধাতুর সঙ্গে কীক জুড়তে গেলে মাঝে একটি ম আসে, একে বলে বর্ণের আগম বা বর্ণাগম। বল্মীক মানে শুধু উইঢিবি নয়, এখানে বল্মীক মানে সংগৃহীত ঘটনাপরম্পরার স্তূপ।

বাল্মীকি মানে বল্মীকভব। বাল্মীকি কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। রামায়ণও একজনের লেখা নয়। বাল্মীকি হল একটি পদবী এবং বাল্মীকি পদবীর লোকেরা ভারতের মুক্তিসংগ্রামের কাহিনী লিখেছেন। বর্ত্তমানে ওরা মেথরের কাজ করেন।

বলা হয় যে বাল্মীকি রাম জন্মের আগেই রামায়ণ লিখেছিলেন। আধুনিক যুক্তিবাদী পাঠকেরা এই কথাটা সহজে বুঝতে পারেন না।কথাটা কিন্তু সত্যি বলেই মনে হয়। আপনি বাড়ী তৈরীর আগে যেমন তার প্ল্যানটা তৈরী করে নেন এও সেই রকম ছিল বলে ভাবা যায়। রামায়ণের কাহিনী আসলে ভারতের মানুষের মুক্তিসংগ্রামের কথা। রামায়ণে আছে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্ত্তনের কথা, মৌলবাদী প্রাচীন শাসককে তার ক্ষমতার কেন্দ্র (লঙ্কা) থেকে বের ক’রে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার কাহিনী। এখানে রামরাজত্ব মানে বড় রাজত্ব বুঝতে হবে যে রাজত্বে লক্ষ্মীপুঁজির বিকাশ হয়েছিল এবং প্রজারা আরামে ছিল। লঙ্কা মানে শ্রীলঙ্কা দেশ নয় বরং ‘রাক্ষসের রমণস্থান‘ (রাক্ষস মানে দুষ্ট শাসক/ যে জনগণের সম্পদ রক্ষা করার নামে ভক্ষণ করে) তথা দেশের তৎকালীন শাসনকেন্দ্র। নিম্নবর্ণের মানুষ যেমন চণ্ডাল, শবর প্রভৃতিরাও রামরাজত্বে সম্মান পেয়েছিল। বাল্মীকিরা ছিলেন এই পরিবর্ত্তনের হোতা। সবাই জানেন কয়েক বছর মাত্র আগে বাঙালী কবি ও বিদ্বজনেরাও শ্লোগান তুলেছিলেন ‘পরিবর্ত্তন চাই’। তারপর আমাদের রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছিল। তেমনিভাবে বাল্মীকিরা রামায়ণ রচনা করার পর এই দেশে রামরাজত্ব এসেছিল বলে ভাবা যায়। কবিরা শুধু বসে বসে কবিতা লেখেন না, তাঁরা যে সমাজপরিবর্ত্তনের কারিগর হতে পারেন সে কথা বলাই বাহুল্য।

বাল্মীকিরা রামায়ণ লিখে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসনের অবসান ঘোষণা করেন। তারপর আসে বৌদ্ধযুগ। বৌদ্ধযুগে বর্ণভেদের তীব্রতা হ্রাস পায়। রামচন্দ্রকে আমরা চণ্ডালের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে এবং তার বাড়ী গিয়ে খাবার খেতে দেখি। নিম্নবর্ণের শবর প্রভৃতিদেরও তিনি বন্ধুরূপে চিত্রিত। শম্বুক হত্যা একটি বিছিন্ন ঘটনা এবং কেবল মাত্র তাই দিয়ে রামচন্দ্রের বিচার করা চলে না। হতে পারে এই ঘটনা রামায়ণে প্রক্ষিপ্ত অথবা বেদবাদীদের চাপে এই কাহিনী রামায়ণে ঢুকানো হয়েছিল।

বৌদ্ধয়ুগ ভারতে সহ্স্রাধিক বছর চলে। তারপর খ্রীষ্টীয় নবম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্য্যের নেতৃত্বে বৈদিক ধর্ম্ম পুনরায় জেগে ওঠে, সেটিই হিন্দুযুগ। এই সময়েই (বৌদ্ধয়ুগের অবসানে) উচ্চবর্ণের হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে বাল্মীকিদের নীচু জাত বলে ঘোষণা করেছিলেন কি? বরেণ্য ভাষাবিদ অধ্যাপক শ্রীরবি চক্রবর্তী মহাশয়ের মতে এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আজ যখন উচ্চবর্ণের লোকেরাও রামচন্দ্রের জয়জয়কার করছে তখন বাল্মীকিদের হৃতসম্মান ফিরিয়ে দেওয়া খুবই দরকার। গান্ধীজীও এই কাজ পারেন নি। আসুন, আমরা সবাই মিলে তা করার চেষ্টা করি। জন্মসূত্রে বর্ণভেদ বা জাতিভেদ সনাতন হিন্দুধর্ম্মের একটি কলঙ্ক, এই প্রথা অবিলম্বে দূর করা উচিত।

আমাদের কোনো কোনো বন্ধু মনে করেন যে রামায়ণের রাম ব্রাহ্মণ্যধর্ম্মের প্রতীক এবং রাবণ একজন তথাকথিত দলিত রাজা। এজন্য এরা রামের চেয়ে রাবণকেই বেশী পছ্ন্দ করেন! কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ‘ পড়ে দেখা যাচ্ছে যে সেই ধারণা ভুল, বরং তার বিপরীতটাই ঠিক। রাবণ ছিলেন পুরোহিতশ্রেষ্ঠ। রাম তাঁকে বধ করেছিলেন। রামচন্দ্র হরধনু এবং ব্রাহ্মণ পরশুরামের ধনুও ভঙ্গ করেছিলেন। এখানে ধনু মানে আইন বলে বুঝতে হবে। যুগাবতার রামচন্দ্র সনাতন রীতি বা আইন ভঙ্গ করে লক্ষ্মীপুঁজির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। প্রতীকী শব্দার্ধবিধি কাজে লাগিয়ে হরধনু মানে একটি bow বুঝলে রামায়ণ বোঝা যায় না। হরধনু ভঙ্গ আর ব্রাহ্মণ্যবাদের অবসান প্রায় সমার্থক বলে বিবেচনা করা চলে। আমার টাইমলাইনে ‘হরধনু ভঙ্গ‘ কবিতায় বিষয়টি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

খান-চক্রবর্তী দেখিয়েছেন যে রামায়ণ মোটেই কায়েমী ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রচারে সহায়তা করে না, বরং রামায়ণে রয়েছে বৈদিক ভারতের বৌদ্ধ ভারতে উত্তরণের সামাজিক চালচিত্র। জনক রাজারা (বিষ্ণু পুরাণে ৫২ জন জনক রাজার কথা আছে) তখন জন করে পাইকারী হারে কৃষিকাজ শুরু করে দিয়েছেন এবং তারপর দেশের উৎপাদন কর্ম্মযজ্ঞ কৃষি থেকে কুটীর শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। এইসব বিষয়ে আরও জানতে হলে কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ‘ বইটি পড়ুন।

রাম, রাবণ প্রভৃতি চরিত্রগুলি কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। রামায়ণ ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায় লেখা যেখানে ব্যক্তি নয়, ক্রিয়াগুলিই প্রধান। রাম বিষ্ণুর অবতার। বিষ্ণু সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর স্বামী। তিনি বৈকুণ্ঠধাম ছেড়ে রামচন্দ্ররূপে মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করলেন মানে ক্রীড়াকারী পুঁজি (finance capital) বাজারে আবির্ভুত হল। অবশ্য আজকের পুঁজিপতিদের সঙ্গে বিষ্ণু বা রামচন্দ্রের তুলনা করা চলে না। আজকের পুঁজিপতিরা গরীবের দুঃখ দূর করতে অবতার হন না, বিষ্ণু হন। কার্ল মার্কস তাঁর ‘পুঁজি‘ গ্রন্থে আধুনিক পুঁজিপতিদের বিষ্ণুর অধঃপতিত রূপ বলে মনে করেছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি ঠিক কথাই বলেছেন।

মার্কসের Das Kapital গ্রন্থের প্রাসঙ্গিক পৃষ্ঠা।

বাল্মীকিগের হৃতসম্মান ফিরিয়ে দিতে হিন্দু ধর্ম্মগুরুরা এবং রাজনীতিবিদরা অগ্রণী হোন। আমি আগেই বলেছি যে জাতিভেদ প্রথা সনাতন ধর্ম্মের কোনো আবশ্যকীয় অঙ্গ নয়। সুমহান সনাতন হিন্দুধর্ম্ম এত ঠুনকো জিনিষ নয় যে জাতপাত প্রথা উঠে গেলে এই ধর্ম্ম টিকবে না। রামরাজত্ব গড়তে ক্রিয়াভিত্তিক সংস্কৃতভাষা চর্চ্চার দরকার আছে, কিন্তু নতুন ক’রে আর কোনো রামমন্দির গড়ার দরকার নাই। আসুন, আমরা সব রকম গোঁড়ামি ও মৌলবাদের বিরোধিতা করি এবং জাতীয় সংহতির কথা ভাবি। দেশে সঙ্কীর্ণ দলাদলির রাজনীতি বন্ধ হোক এবং প্রকৃত পরিবর্ত্তন আসুক। আজকের কবি ও সাহিত্যিকেরা সেই পরিবর্ত্তনের কারিগর হোন।