শুভাশিস চিরকল্যাণ পাত্র

 

বর এবং আহ জুড়ে বরাহ শব্দটি নিষ্পন্ন হয় (বর+ আহ =বরাহ)। এখানে আহ মানে আঘাত করা। যিনি বরণীয় আঘাত হানতে পারেন তিনিই বরাহ। শূয়ার নামক প্রাণীটির দাঁতে খুব জোর বলে দাঁত দিয়ে জমি থেকে মূল তুলে ফেলার কাজে শুয়ারকে লাগানো হয় (বরণ করা হয়)। এই জন্যই শূয়ারকে বরাহ বলে।

তবে বরাহ শব্দে প্রথমেই শূয়ার ভাবলে চলবে না (ইহা বরাহ শব্দের একটি প্রতীকী অর্থ মাত্র)। যেসব শক্তিমান ব্যক্তিকে নানা কাজে বরণ করা হয় তারা সবাই বরাহ পদবাচ্য। তারা যে নগরে থাকেন সেই নগরটিকে বরাহনগর বলা চলে। কলকাতার বরাহনগরে হয়ত একসময় হোমরাচোমরা, আমলাদের বাস ছিল এবং তার থেকেই স্থানটির নাম বরাহনগর হয়ে থাকতে পারে। বরাহ শব্দটি একটি অত্যন্ত সম্মাননীয় শব্দ। এই জন্যই প্রাচীন কালে লোকে নিজের সন্তানের নাম বরাহ রাখত। বিখ্যাত কবি বরাহমিহির এবং আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বরাহগিরি ভেঙ্কটগিরি মহাশয়ের নাম আপনারা জানেন।

বরাহ অবতারে বিষ্ণু দৈত্য হিরণাক্ষ্যকে বধ ক’রে দন্তাগ্রভাগের দ্বারা পৃথিবীকে ধারণ করেছেন। এর মানে হল ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ (investing capital) এসে আদিম রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করেছিল (এখানে পৃথিবী মানে ভূগোলোক না বুঝে আদিম রাষ্ট্র বলে বুঝতে হবে)। পরবর্ত্তী নৃসিংহ অবতারে বিষ্ণু হিরণ্যাক্ষের ভ্রাতা হিরণ্যকশিপুকে (যে যৌথ সমাজের মধ্যেই হিরণ্য বা সোনা বা সম্পদ করে , তাকে) বধ করেছিলেন। তারপর হিরণ্যকশিপুর পুত্ত্র প্রহ্লাদ রাজা হলে প্রজাদের মনে প্রকৃষ্ট আহ্লাদ হয়েছিল।পঞ্জিকায় বর্ত্তমান কল্পকে বরাহকল্প বলে। এর কারণ বর্ত্তমান কালে একজন আর একজনকে বরণ ক’রে কর্ম্মে নিয়োগ করেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় আপনি আপনার ছেলের জন্য প্রাইভেট টিউটর নিয়োগ করেন, জনগণ দেশ শাসনের জন্য নেতা নিয়োগ করেন, রাষ্ট্রসংঘ ইরাককে জব্দ করতে আমেরিকাকে নিয়োগ করেন ইত্যাদি ইত্যাদি। বরাহকল্পের আগে এই ধরণের বরাহ নিয়োগের প্রথা ছিল না।

বর্ত্তমানে বাঙালীরা বরাহ-এর মতো উচ্চমানের শব্দটির ভিতরের মানে ভুলে গেছেন। আজকাল ‘বরাহনন্দন’, ‘শূয়ারের বাচ্চা’ ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ গালিগালাজ হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। কেন শূয়ারকে বরাহ বলে তা জিজ্ঞাসা করা হলে অনেকেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না। আবার কিছু স্বঘোষিত মুক্তমনা ব্যক্তি বরাহ অবতারের তাৎপর্য্য বিন্দুমাত্রও না বুঝে নানা কুৎসিৎ কথা বলেন এবং ধর্ম্মগ্রন্থের কদর্থ করাটাই বৈজ্ঞানিক মনের পরিচয় বলে মনে করেন।

খান-চক্রবর্তীর মতে বিষ্ণুর দশাবতার আসলে পুঁজির (capital-এর) দশবিধ রূপ এবং পুরাণগুলি ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক তথ্যে ভরপুর। এই বিষয়ে আরও বিশদে জানতে চাইলে খান-চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ’ দ্রষ্টব্য। যদি বরাহ অবতারের তাৎপর্য্য সম্বন্ধে অন্য কোনো যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা আর কারো জানা থাকে, তবে তিনি অনুগ্রহ করে তা জানান।